#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৬৪]
বৈশাখের কড়া রোদে গৃহস্থ বাড়ির ধানের কাজ শেষ হয়ে জৈষ্ঠ্যের আগমন ঘটেছে। আম, কাঁঠাল পাকার গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। লতিফ, মিল্টন এখন সুস্থ। ধান মিলে তাদের প্রচুর ব্যস্ততা। নাজির সুযোগ বুঝে কম দামে বছরের জন্য কয়েক মণ চাল কিনে রেখেছে। সংসার তো চালাতে হবে!
আমিরুল শাহর চল্লিশা গতকাল শেষ হয়েছে। তবে শাহ বাড়ির ভেতরে শান্তি নেই। তাঁর সাথেই যেন মাটির নিচে চাপা পড়েছে। ফরিদা আগের তুলনায় শান্ত হয়ে গিয়েছেন। সংসারের সর্বেসর্বা এখন বিথী। দিনদিন নিজেকে বড়ো কিছু মনে করছে। শান্তশিষ্ট সামিউলেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যখন তখন মেঘের মতো গর্জে উঠছে। গত রাতেও বাড়িতে প্রবেশ ঘটেছে আজেবাজে লোকের। শোনা গিয়েছে হাসির শব্দ। বাইরের আড্ডা এখন ঠাঁই পেয়েছে ঘরে। তার পাশাপাশি চাচার সাথে দুদিন পরপর ব্যবসায়িক কাজকর্ম নিয়ে ঝামেলা তো লেগেই আছে। মুমিনুল শাহ এতে অতিষ্ঠ। বাপকে সহ্য করেছেন বলে ছেলেকেও সহ্য করবেন নাকি? যেকোনো সময় ঝড় আসতে পারে।
নাজির তাদের সেই ঝামেলার আগে পাছে কোথাও নেই। এক ফাঁকে আমিরুল শাহর থেকে প্রাপ্ত জমির কিছু অংশ নওশাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দলিল নিরাপদ স্থানে সুরক্ষিত করে রেখেছে সে। তাই এসব নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নেই। তবে তার চিন্তা অন্য জায়গায়। গতকাল উঠোন ঝাড়ু দিতে গিয়ে মরিচ গাছের নিচে একটা তাবিজ, ভিন্ন ভাষায় লেখা ছোট্ট একটা কাগজ, আর কিছু মেয়েলি চুল পেয়েছিল শালিক। সেটা দেখেই মর্জিনা বলে উঠলেন,“এইসব দিয়া তো কালাজাদু করে। আমগো বাড়িত কইত্তে আইলো?”
তৎক্ষণাৎ সেগুলো নিয়ে মসজিদের ইমামের কাছে গিয়েছিল নাজির। মর্জিনার কথাই ঠিক। হুজুরও বললেন,“সূরা উল্টা কইরা লেখা। মাইয়া লোকের চুল দেখা যায়। কাউরে নিশ্চিত সন্তান নষ্ট হওয়ার বান মারা হইছে। তুমগো বাড়িত পোয়াতি কেডা?”
“আমার বউ।”
“কোনো অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছো?”
নাজির ভাবার জন্য সময় নিলো। কিছুদিন ধরে মেয়েটা ঠিকমতো খায় না, মেজাজ খিটখিটে, তার সাথে ঠিক করে কথা বলে না, সেদিনই তো বলছিল পেট ব্যথা করছে। সব শুনে হুজুর পানি পড়া আর রুকাইয়া করার পরামর্শ দিলেন। নাজির নিশ্চিত, বড়ো চাচী ছাড়া এই কাজ আর অন্য কারো নয়। এই মহিলাকেই সে অনেকদিন আগে ভোরবেলায় তাবিজ হাতে ফিরতে দেখেছিল।
একহাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে কলা খেতে খেতে বাড়ির পথ ধরলো নাজির। ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ভালো মেজাজখানা বিগড়ে গেলো। আজকাল কিছুতেই সে মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না। মাচায় গোল হয়ে বসে কয়েকজন লোকের সাথে বিড়ি খেতে খেতে তাস খেলছে সামিউল। ওদিকে বাড়ির নারীরা দুপুরের রান্না চাপিয়েছে চুলায়। লোক তিনটে খেলার ফাঁকে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। বিশেষ করে শালিকের দিকে। ওখান থেকে খোলা রান্নাঘরের চুলা পর্যন্ত ভালো দেখা যায়। মিছরি ভেতরে থাকায় তাকে দেখা যাচ্ছে না।
নাজির গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো। কলার খোসা চুলার ধারে ফেলে হেঁটে চলে গেলো মাচার কাছে। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“ভর দুপুরে কোন ভদ্দর লোকের বাড়ি মাইনষে এমনে আড্ডা দেয়, ভাই? মাইয়া লোক তো একটু হাঁটতে চলতেও পারতাছে না।”
লোকগুলোর মধ্যে একজন সামিউলের সমবয়সী। বাকিগুলো ছোটো। তবে এই গ্ৰামের নয়, বাজারের দিকের। গ্ৰামের হলে এখানে এসে বসে থাকার মতো দুঃসাহস পেতো না। সামিউল বিরক্ত হয়ে বললো, “তোর কী? যা এনতে।”
“আমার অনেক কিছু। এ ভাই, আমনেরা যানতো। মন মেজাজ এমনিতেই ভালা না। বাড়িত মেয়েলোক আছে। আর কহনো যাতে ত্রিসীমানায় না দেহি। এইডা আড্ডা ফুর্তি করার জায়গা না। যান, নাজিররে তো চিনেনই? না চিনলে আশেপাশে খবর নিয়েন। এসব ফাতরামি পছন্দ করি না। কত মাইনষেরে যে পিডাইছি!”
একজন মনে হয় রেগে গেলো কথাটায়। লোকটার নাম কাদের। বললো,“তোর ভাই কী আমগো হুমকি দিতাছে, সামিউল?”
বাকিরাও একসঙ্গে বললো,“বাড়িত ডাইকা আইন্না অপমান!”
সামিউল এবার চটে গেলো,“মাতব্বরি দেহাবি না, নাজির। তুই কওয়ার কেডা? আমার যারে ইচ্ছা তারে বাড়িত আনমু। কী করবি কর।”
“তুমি আনার কেডা? বাপ মরছে মাস খানেক হইছে, তার মধ্যে নিজেরে বাড়ির কর্তা মনে করো? এইসব অন্তত আমার সামনে চলবো না। আমি তোমার বাপরেও মানি নাই, তুমি তো কোন চেটের বাল। এই ভুল দ্বিতীয়বার কইরো না। আমনেরা এহনো বইয়া রইছেন ক্যান? যান।”
লোকগুলো গম্ভীর দৃষ্টিতে সামিউলের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। সামিউল তাদের পিছু ডাকলেও সাড়া দিলো না। শেষে রাগ সামলাতে না পেরে তেড়ে এসে কয়েকটা গালি দিয়ে বললো, “বেশি বাড় বাইড়া গেছোস? আমারে আমার বাপ মনে করছোস? এই ভিটে ছাড়া তোর আর আছে কী? আশেপাশের সব আমগো। কর্তাগিরি ফলাইতে আসিস না।”
নাজির ঘাড় চুলকে হাসলো,“তুমি কেডা? নিজেরে বাপের থাইক্যা বড়ো খেলোয়াড় মনে করো? হুনো, এত উজাইয়ো না। ব্যবসায় মন দেও, শান্তি বজায় রাইখা চলো। কোনডা কার তা সময় হইলেই দেহা যাইবো।”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে নাজিরের শার্টের কলার টেনে ধরলো সামিউল। জাহিদ দৌড়ে গিয়ে মাকে ডেকে আনলো,“আম্মা, নাজির ভাই আর সামিউল ভাইয়ে কাইজ্জা লাগছে।”
মর্জিনা ঘর থেকে দৌড়ে এলেন। রান্নাবান্না পুত্রবধূ শিউলি করছে। এমন দৃশ্য দেখে দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,“এইসব কী, সামিউল? তুই না বড়ো ভাই? বড়োরা এমন করলে ছুডোরা কী করবো? ছাড় ওরে।”
সামিউল একই ভঙিতে বললো,“আদব শিখাইতাছি, চাচী।”
রান্নাঘর থেকে মিছরি বেরিয়ে এলো। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। কী বলবে সে বড়দের মাঝখানে? চেঁচামেচিতে ভেতর থেকে নাজমুল, মুমিনুল শাহও বেরিয়ে এলো। নাজিরের চোখ চিকচিক করছে। মৃদু হেসে আচমকা সিংহের মতো থাবা দিয়ে ধরলো তার কলার টেনে ধরা চাচাতো ভাইয়ের হাতটা। মুচড়ে ধরে বললো,“তোমার বাপ-মা, মামা,চাচার থাইক্যা অনেক আদব শিখছি। তোমার আর শিখানের দরকার নাই। কইছিলাম, কামে মন দেও। তা না, আইছো আমার লগে ঝামেলা করতে। চোপার মাঝে দুইডা দিয়া দিলে কী করবা?”
সামিউল ব্যথা পেলো, কিন্তু প্রকাশ করল না। দাঁতে দাঁত পিষে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। সে ছোটো থেকেই বাবা-মায়ের আদরের সন্তান ছিল। কখনো কাঁধে চালের বস্তা তুলেছে কিনা, কুড়াল দিয়ে খড়ি কেটেছে কিনা সন্দেহ। বিপরীতে নাজির জীবনে সব কাজই করেছে। তাই তার শক্তির সাথে না পেরে ওঠাই স্বাভাবিক। চেঁচামেচিতে ফরিদাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ছেলের কান্ড দেখে চিন্তিত হয়ে বললেন,“কী শুরু করছোস তোরা? সামিউল বাপ আমার, ওর লগে লাগিস না। ঘরে আয়।”
সামিউল মায়ের কথা শুনলো না। আজকাল মাকে সে এড়িয়ে চলে। কথা বলতে এলেও না শোনার ভান করে থাকে।
“আমনে চাইয়া চাইয়া দেহেন কী? যান দুইডারে গিয়া ছুডান। বাড়িত দুইদিন পরপর রঙ্গলীলা চলে। পাপের বাড়ি।”
মুমিনুল শাহ দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করছিলেন। মনে মনে তো কখন থেকেই বলছেন,“দে দুই ঘা। অনেক উজাইছিল। তোর বাপরে তোষামোদ কইরা চলছি দেইখা তোরেও করমু? নাজিরই তোরে শায়েস্তা করতে পারবো।”
কিন্তু স্ত্রীর ধমকে কিছুটা লাফিয়ে উঠলেন তিনি। মনক্ষুণ্ণ হয়ে সেদিকে যেতে যেতে ছেলেদের উদ্দেশ্যে বললেন,“আমি নাজিররে ধরমু, তোরা ওই পাডারে ধরিস।”
তারপর তিনজন মিলে তাদের দুজনকে আলাদা করল। অবশ্য নাজিরকে সরাতে ততটা ঝামেলা হলো না। এমনিতেই সে ছেড়ে দিয়েছে। সামিউল চিৎকার করে বললো,“এইডা ভালা করলি না, নাজির।”
“আমি আবার কবে ভালা করি? এই বাড়িত এইসব আড্ডা চলবো না। ভিটে তোমার একলা না। আর কহনো পরপুরুষ ঢুকাইতে দেখলে পাছা লাল কইরা দিমু। সাহস কত! আমারে ক্ষমতা দেহাইতে আইয়ে।”
সেখানে আর দাঁড়ালো না নাজির। ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। স্ত্রীকে দেখে ধমকালো,“কিছু হইলেই দৌড় মারতে হইবো ক্যান? ভিতরে যাও।”
মিছরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। রান্নাঘরে গিয়ে বসে রইল। তরকারিতে ঝোল দিয়ে ঢাকনা চাপালো শালিক। নত স্বরে বললো,“এই বাড়ির মানুষ দেহি আসলেই দুই নম্বর। বড়ো চাচাডা অক্কা পাওয়ার পর থাইক্যা কাইজ্জা লাইগাই থাকে।”
মিছরি বিপরীতে চুপ রইল। আজকাল কথা বলতে তার ভালো লাগে না। সবকিছুর উপর থেকে মন উঠে গিয়েছে।
দুপুরের রান্না আর গোসল সেরে ঘরে এলেন মর্জিনা। চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ডেকে বললেন,“বউ, ভাত বাইড়া ফেলাও।”
“আইচ্ছা, আম্মা।” শাশুড়ির আদেশ পেতেই খাবার ঘরে ছুটলো শিউলি। ভীষণ ভয় পায় কিনা!
মর্জিনা একেবারে অযু করে এসেছেন। সর্বপ্রথম যহরের নামাজ পড়লেন। কোরআন পড়েন ফজর শেষে। রোজ এক পারা করে না পড়লে তাঁর হয় না। জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন, “বয়স তো কম হয় নাই, আর কবে নামাজ কালাম পড়বেন? সময় থাকতে থাকতে ভালা হইয়া যান কইয়া দিলাম।”
“মাজায় বিষ, বউ।”
“ঢং! কোনো কামই তো করেন না। এতকাল ভাইয়ের পিছনে ঘুরছেন আর এহন ভাই পুতের পিছনে ঘুরতে হইবো। বাবাগো বাবা, পোলার কী তেজ! কবে কবে এই তেজ জন্মাইলো? বাড়িরে পল্লি বানাইতে চায়? কয়দিন ধইরা খালি দেখতাছি। কত্ত বড়ো সাহস আইজ নাজিরের গায়ে হাত দিছে, কাইল আমগো নাজমুল, শাহরিয়ারের গায়ে হাত দিতে আইবো।”
“হুট কইরা পাখনা গজাইলে উলু পোকও নিজেরে পক্ষী মনে করে। ওর অবস্থাও হইছে তেমন। উড়তে দেও। যহন পাখনা ঝরবো তহন আর চাইলেও উড়তে পারবো না। ওর বাপেও এমন উড়াই উড়ছিল।”
“তাও ঠিক। গাছই তো খারাপ, ফল আর কেমন হইবো? বড়জন দেখলাম, একেবারে চুপ হইয়া গেছে। নাটক নাকি হাছাই বুঝি না। এই মহিলার শয়তানি আমি ছাড়া আর কেডা জানে? আমার তো সেই কবে থাইক্যাই সন্দেহ হয়।”
“কী সন্দেহ?”
“আব্বারে ওরাই মারছে।”
ভ্রুয়ের মাঝখানে ভাঁজ পড়ল মুমিনুল শাহর। সোজা হয়ে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“ক্যান সন্দেহ হয়?”
“কারণের অভাব নাই। আমনের হয় না?”
মুমিনুল শাহ উত্তর দিলেন না। ও ঘর থেকে খাওয়ার জন্য পুত্রবধূর ডাক এলো। কথাটা এড়িয়ে যেতে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন।
দুপুরের খাবার আজ নাজিরকে একা একাই খেতে হয়েছে। শালিককে সে আগেই বলে দিয়েছে,“ভাসুর সেবা করার কোনো প্রয়োজন নাই। নিজের মতো থাকো, খাও। এইডা তোমারই বাড়ি।”
তাই রান্নাবান্না শেষে খাবার খেয়ে ঘরে চলে যায় শালিক। মিছরি গোসল সেরে বিছানায় শুয়ে আছে। দুপুরে এখনো খায়নি। নাজির খাওয়া শেষে সঙ্গে করে স্ত্রীর জন্যও খাবার বেড়ে নিয়ে এলো। একপেশে শুয়ে থাকায় শাড়িটা সামান্য অগোছালো হয়ে উদোর উন্মুক্ত হয়ে আছে মিছরির। নাজির তর্জনী আঙুল দিয়ে সেখানে জোরেই খোঁচা দিলো।
“আইজ আবার কোন ঢং? খাইবা না?”
কাপড় ঠিক করে মুখ ঘুরিয়ে নিলো মিছরি। নাজির এতে বিরক্ত হলো,“বিয়া করাডাই জীবনে বড়ো ভুল আছিলো। প্রত্যেকদিন খাওয়ার সময় মুখ ফুলাইয়া রাখে। মান ভাঙাও, খাওয়াইয়া দেও, রাইত দুপুরে বুকে লইয়া সোহাগ করো, আবার গাধার মতন খাটো। আল্লাহ, এই রাখছিলা এই অভাগার কপালে? ওঠো, তোমারে লইয়া আমার চিন্তা নাই। আমার চিন্তা বাক্স ভর্তি মিষ্টি লইয়া। আমার বাচ্চাডা না খাইয়া রইছে। অসুখ হইবো।”
মিছরি উঠে বসলো। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নাক টেনে বললো,“খারাপ লোক।”
“আইচ্ছা যাও, অপ্রয়োজনে আর কহনো কারো লগে ঝামেলা করমু না। কারো গায়ে হাত তুলমু না। খুশি? হেইদিনের পর থাইক্যা অযথা কাউরে একটা গালিও দেই নাই।”
“মিথ্যুক, বিশ্বাস করি না আপনাকে।”
“কোনদিন করছো? তোমার বিশ্বাস তো নড়বড়ে।”
ভাত মাখিয়ে মুখের ভেতরে ঠেসে দিলো নাজির। রাগ চেপে রেখে খেতে লাগলো মিছরি। এ নতুন কিছু নয়। বিয়ের পর থেকেই এমন হয়ে আসছে। মুখ ভার করে দুর্বল কণ্ঠে বললো,“আমার আর এই বাড়িতে ভালো লাগে না। দমবন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, আশেপাশের সবাই খারাপ। খুব ভয় হয়।”
কী বলবে ভেবে পায় না নাজির। খাওয়ানো শেষে মুখ মুছিয়ে চুপচাপ উঠে যায়। সেদিন বিকেলেই বাড়িতে এসে উপস্থিত হন কাশেম আলী। নাজির বাইরে যাবে বলে বারান্দা থেকে সবে নেমেছে। শ্বশুরকে দেখে অবাক হলো না সে। বাড়িতে বিশেষ কিছু রান্না হলে মাঝেমধ্যেই ভদ্রলোক টিফিন বাটিতে করে মেয়েকে দিয়ে যান। নাজির সালাম দিলো,“আসসালামু আলাইকুম, প্রাণপ্রিয় শ্বশুর আব্বা। তা হঠাৎ কী মনে কইরা?”
কাশেম আলী সালামের জবাব নিলেন,“ওয়া আলাইকুমুসসালাম। কেমন আছোস, প্রিয় জামাই?”
“সবসময় আলহামদুলিল্লাহ।”
“ঘটনা তো একটা ঘইটা গেছে, বাপ। একটু আগে আমগো তালেবের মাইয়া হইছে। তাই আম্মায় মিছরি আর শালিকরে বাড়ি লইয়া যাইতে পাঠাইলো।”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালা খবর। তালমিছরি! দেহো তোমার আব্বায় আইছে। আমনে ভিতরে আইয়া বসেন।”
“এহন বওয়া যাইবো না। রুহুলরে মিষ্টি আনতে হাটে পাঠাইছি। মাসুম তো ভাতিজির কাছ থাইক্যা নড়তাছেই না। নাতিনরে এহনো ঠিক কইরা কোলে লইতে পারি নাই। কানে আজান দিতেই তালেব লইয়া গেলো।”
স্বামীর ডাকে মিছরি ছুটে এলো ঘরের বাইরে। নাজির ধমকালো,“দৌড় মারলা ক্যান?”
মিছরি সেকথার উত্তর দিলো না। সব কথা ঘরে বসেই সে শুনেছে। আনন্দিত কণ্ঠে বললো,“একটু দাঁড়াও, আব্বা। আমি তৈরি হয়ে আসছি।”
মিছরি ঘরে চলে গেলো। শালিকও বেরিয়ে এলো। কাশেম আলী তার উদ্দেশ্যে বললেন,“তুইও একটু তাড়াতাড়ি তৈয়ার হ, মামা।”
সেও মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। এবার কাশেম আলী জামাতাকে বললেন,“তুইও কিন্তু আইয়া পড়িস। রাইতে থাকবি। ফুফা হিসেবে দায়িত্ব আছে না?”
“পরে যামু না হয়।”
“সবসময় খালি বাহানা।”
“ওহ, একটা কথা। দাদীরে একটু কইয়েন, আমার বউডারে রুকাইয়া আর ঝাড়ফুঁক কইরা দিতে। আমি তো এতকিছু বুঝি না। তাও হুজুরের থাইক্যা পানি পড়া আইনা খাওয়াইছি, নিজে টুকটাক সূরা পইড়া ফুঁ দিছি।”
“ওর আবার কী হইছে?”
“তেমন কিছু না। কয়দিন আগে তাবিজ পাইছিলাম। পোয়াতি মাইয়া, তাই আরকি।”
বিস্তারিত কিছু জানালো না নাজির। ভেতর থেকে কেদারা এনে শ্বশুরকে বসতে দিলো। কিছুক্ষণ আগে গাছ থেকে ডাব পেরেছে জাহিদ। সেখান থেকে বড়ো একটা ডাব কেটে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“খাইতে থাকেন। আইতাছি আমি।”
ঘরে চলে এলো নাজির। এটুকু সময়ের মধ্যে কী কী যেন ভেবেও ফেলল। বরাবরই তার মস্তিষ্ক একটু দ্রুত চলে।
মিছরি বোরখা পরে তৈরি। এখন শুধু ব্যাগ গোছাচ্ছে। নাজির নিজ থেকে বাদবাকি পোশাক, প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র তাতে ভরে দিলো। তার কান্ড দেখে মিছরি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী করছেন এসব? একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি?”
“কয়দিন তো থাকবা।”
“সব লাগবে না।”
“লাগবো।”
মিছরি আর কিছু বলতে পারলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো স্বামীর কান্ড। ব্যাগ গোছানো শেষে আচমকাই সে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলো। মিছরি অপ্রস্তুত হলো। আমতা আমতা করে বললো,“কী করছেন? মাথা গেছে? অন্যরা মাসের পর মাস বাপের বাড়িতে বেড়ায় অথচ আমি দুদিনের জন্যও যেতে পারি না। রাতে তো আসবেন নাকি?”
নাজির উত্তর দিলো না। কপালে চুমু দিয়ে বললো, “নিজের যত্ন নিও। আমার থাইক্যাও আমগো সন্তান এহন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার ক্ষতি হইবো এমন কিছু কইরো না।”
লোকটার কান্ড কারখানা দেখলে মাঝেমধ্যে সে অবাকই হয়। তবুও মাথা নাড়ালো। তারপর বিদায় নিয়ে বাবার সাথে চলে গেলো। সাথে ছিল শালিকও।
________
আঁতুড়ঘরে শুয়ে আছে পলি। সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যা মায়ের পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। রাতের মধ্যেই সবাই বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে। কাশেম আলী আর নজরুল আলম এতক্ষণ আশেপাশে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। মিছরি পরিষ্কার হয়ে ভাবির পাশে এসে বসলো। ভাতিজির দিকে তাকিয়ে বললো,“মাশাআল্লাহ, কন্যার জননী হয়ে কেমন লাগছে, ভাবি?”
পলি হাসলো,“ভালাই লাগতাছে। তবে ভাবছিলাম পোলা হইবো।”
“সুজন ভাইজানের প্রথম মেয়ে হয়েছে, বড়ো ভাইজানেরও হয়েছে। আমাদের বাড়িতে ভাইয়ে ভাইয়ে কত মিল দেখেছো? চাচারও প্রথম ছেলে, আব্বারও প্রথম ছেলে। ওদিকে তিন ফুফুর আবার প্রথম সন্তান মেয়ে। কি মিল!”
“আমার তো শখ আছিলো তোমার আর ফাহমিদার মাইয়া হইলে আমার পোলার বউ কইরা ঘরে তুলমু। এহন কী হইবো? শখ আর পূরণ হইলো না।”
“হায়হায়, এক ছেলের দুই বউ?”
“হ, ভালাই হইতো।”
মিছরি হেসে ফেলল। পলিটা যা তা। কিছুক্ষণ আগে নাড়ি ছিঁড়ে সন্তান জন্ম দিয়েছে। অথচ এখনো মুখটা বন্ধ হয়নি। বকবক করেই যাচ্ছে। বাবা হয়ে তালেবের আনন্দ যেন দেখার মতো। পলি আর তার মেয়েকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। তালেব এর মধ্যে মেয়ের নামও ঠিক করে ফেলেছে। মেয়ের নাম, বেলী। রাতে সেই ঘরে আর কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হলো না।
সৈয়দুন নেছাও তাদের বিরক্ত করতে সবাইকে নিষেধ করে দিলেন। বউটাও তো অসুস্থ। মিছরি দাদীর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বৃদ্ধা নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন,“চোখের নিচে কালি পড়ছে ক্যান? ঘুমাস না?”
“ঘুম আসে না। এলেও মাঝরাতে বাজে স্বপ্ন দেখে ভেঙে যায়।”
“পেডে পোলাপাইন নড়ে না?”
“না তো। নড়ে নাকি?”
“হ, তোর কয় মাস জানি? ফাহমিদারটা নাকি অনেক নড়ে। হড়ি কোনো হেনে যাইতে দেয় না। ওর ভাগের হড়িডা ভালা পড়ছে নাকি খারাপ পড়ছে বুঝি না। তয় একটু কুসংস্কারী।”
পরক্ষণেই নাতনির গাল টেনে দিয়ে বললেন,“তবে আমগো মিছরির ভাগে ভালা একটা জামাই পড়ছে।”
“ভালো না ছাই। সারাক্ষণ চিন্তায় রাখে। যতক্ষণ কাছে থাকে ততক্ষণ শুধু শান্তি।”
সৈয়দুন নেছা মুচকি হাসলেন। এশার নামাজ আদায় করে নাতনিকে ঝাড়ফুঁক করলেন।
চলবে _______
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

