যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৭৪]

0
26

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৭৪]

পারভেজের আজ বেলা করে ঘুম ভাঙলো। সূর্যের আলো উঠোনে এসে পড়েছে। রাতে না খেয়ে শুয়ে থাকায় ঘুম ভাঙতেই ক্ষুধার চোটে চোখে ঝাপসা দেখছে। হাত-মুখ ধুয়ে সে খাবার ঘরে উঁকি দিলো। বাসি তেহারি পেয়ে গাপুস গুপুস কয়েক গাল খেয়ে হাত ধুয়ে নিলো।

দূরের কোনো এক গাছের ডালে কাক ডাকছে। মানুষের সাড়া শব্দ নেই। ঘর থেকে বের হয়ে মায়ের ঘরে একবার উঁকি দিলো পারভেজ। বিছানার চাদর এলোমেলো, ঘর ফাঁকা। বাড়ির আশেপাশে খুঁজেও কোথাও পাওয়া গেলো না তাকে। কুকীর্তি উন্মোচিত হওয়ার পর থেকে মা বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বাইরের মানুষও এখন আর আসে না। প্রথম প্রথম অবশ্য প্রতিবেশীরা এসে বিরক্ত করতো, কটু কথা বলতো। কিন্তু পারভেজের নিষেধাজ্ঞায় এখন আর ঢোকার সাহস পায় না।

ধূলো জমা বৈদ্যুতিক পাখার দিকে তাকিয়ে মুমিনুল শাহ শুয়ে আছেন। কতদিন ধরে যে সূর্যের আলো দেখেন না হিসেব নেই। বিছানায় শুয়ে নিজের কর্ম নিয়ে আজকাল অনেক ভাবেন। হয়তো আফসোসও করেন। তবে এখন আর আফসোস করে লাভ কী? কম সুযোগ কী জীবনে পেয়েছিলেন?

মাকে না পেয়ে পারভেজ দোকানে গিয়েছিল। দুটো পাউরুটি কিনে সোজা চাচার ঘরের বিছানায় এনে রাখলো। জিজ্ঞেস করল,“খাইছেন কিছু?”

মুমিনুল শাহ ভাতিজার দিকে তাকালেন। উত্তর না দিয়ে বললেন,“একটু পায়খানায় যাওয়া দরকার। চোখেমুখে পানি ছিটাইতে হইবো।”

“আইয়েন।”

পারভেজ তাকে শোয়া থেকে উঠিয়ে নিজের কাঁধে ভর করিয়ে ল্যাট্রিনে নিয়ে গেলো। কলপাড় থেকে হাত-মুখ ধুইয়ে ঘরে এনে পুনরায় শোয়ালো। চোখমুখ মুছে মুমিনুল শাহ জিজ্ঞেস করলেন,“তোর মায় কই?”

“জানি না, ঘুম থাইক্যা উইঠা কোত্থাও দেখলাম না।”

“শেষ কহন দেখছোস? কিছু কইয়া গেছে?”

“রাইতে দরজা ধাক্কাইয়া কতকিছুই তো কইছে। কেডা ধরে হের কথা?”

“একটু খোঁজ কর। কাইল রাইতে আমারেও কী কী কইয়া গেলো। সুবিধার লাগলো না। যদি কিছু ঘটাইয়া ফেলায়?”

“ঘটাইলে ঘটাক। জীবনে কম কিছু তো আর ঘটায় নাই। আমনেও বেশি কিছু আশা কইরেন না। শুধু মনুষ্যত্বের খাতিরে আমনের থাইক্যা মুখ ফিরাইয়া নিতে পারতাছি না।”

“তোর লগে কহনো কিছু করছি?”

“সুযোগ পাইলে তো করতেন। মাথার উপরে বাপ, মা, বড়ো ভাই আছিলো। মাইনষে তো দুর্বল গো পিছনে লাগে। এই যে এহন যদি দুর্ঘটনা না হইতো তাইলে কী আমারে ছাইড়া দিতেন?”

মুমিনুল শাহ চুপ হয়ে গেলেন। সত্যিই তো, দুর্ঘটনা না ঘটলে পারভেজ কী নিস্তার পেতো তাঁর হাত থেকে? পেতো শাহ বাড়ির মালিকানা আর ব্যবসায়ের ভাগ? পারভেজ উঠে দাঁড়ালো,“আড়তে যামু। ফিরতে দেরি হইতে পারে। ক্ষুধা লাগলে রুডি খাইয়েন।”

দরজা চাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো পারভেজ। কে জানতো, একসময় শাহদের ব্যবসার সর্বেসর্বা বাবার অপছন্দের এই বোকা ছেলেটাই হবে? আল্লাহ কখন কাকে যে কোথায় নিয়ে দাঁড় করান!

ছেলেকে গোসল করিয়ে খোলা বারান্দায় মাদুর পেতে রোদের মধ্যে বসে আছে মিছরি। বাপের বাড়ি থেকে গতকাল বিকেলে ফিরেছে। ছোটো বাচ্চাকে কীভাবে গোসল করাতে হয় তার জানা নেই। পটি পরিষ্কার করাও মা ধরে ধরে শিখিয়েছে। তবে আজ ছেলেকে গোসল করিয়েছে শালিক। সে আবার এসব ভালো পারে।

নক্ষত্র আনন্দে দুই হাত, পা নাড়াচ্ছে। মিছরি তার শরীরে সরিষার তেল মাখিয়ে দিয়ে বললো,“আমার ছোট্ট সোনামণিটা গোসল করেছে! মাশাআল্লাহ, কি সুন্দর লাগছে তাকে। এখন নতুন পোশাক পরিয়ে দেবো, একদম পটি করে নষ্ট করবে না। চুপচাপ ঘুমাবে।”

মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে অ, আ উচ্চারণ করে মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো নক্ষত্র। ছেলেটা সারাক্ষণ হাসে। শুধু অপরিচিত মুখ দেখলে আর খিদে পেলেই কাঁদে। শালিক রোদে মেলে দেওয়া শুকনো পাতা টাবায় ভরে রান্নাঘরে যেতে যেতে বললো,“এহন আর হাফ প্যান্ট পরাইস না। ছুডো খেতা পুকিত বাইন্ধা দে। এহন হের কামই হাসতে হাসতে পটি করা। বেশি তেলও ডলিস না। শরীর কিন্তু নরম।”

নক্ষত্র শালিককে দেখার জন্য ঘাড় উল্টে তাকাতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। মিছরি তার কোমরে কাঁথা বেঁধে দিলো। কাঁথাগুলো পারুল নাতি-নাতনিদের জন্য সেলাই করে রেখেছিলেন। মেয়েরগুলো প্রথম দিনই তাকে বুঝিয়ে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। ছেলেকে কোলে নিয়ে মিছরি নিজেই ঘুরিয়ে দিয়ে বললো,“চাচীকে দেখবে তুমি? ওই যে দেখো।”

নক্ষত্র শরীর ঝাঁকিয়ে ডাকতে লাগলো,“অ্যাএএ।”

শালিক হাসলো। কাজ ফেলে শাড়ির আঁচলে হাত মুছে এগিয়ে এলো। দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “আমার কাছে আইবা?”

নক্ষত্র নিজের হাত বাড়িয়ে দিতেই দুজনে হেসে উঠলো। তাকে কোলে নিয়ে বসলো শালিক। ঘাড় নাড়িয়ে বললো,“দেখ, তোর পোলায় কেমনে মায়রে থুইয়া চাচীর কোলে আইতে চায়।”

“বাপের মতো হয়েছে। আমাকে ছাড়া সবকিছু ভালো লাগে।”

“কিন্তু এহন তো তোমারে কোলে লইয়া বইয়া থাকতে পারমু না, আব্বা। আমার রানতে হইবো, গোসল করতে হইবো, হেরপরে নামাজ পড়তে হইবো। তুমি খাইয়া বরং ঘুমাও। ঘুম থাইক্যা উঠলে কোলে নিমু।” মিছরির উদ্দেশ্যে বললো,“ঘরে লইয়া যা।”

“তুই ভাত বসা। আজ তরকারি আমি রান্না করবো।”

নক্ষত্রকে নিয়ে উঠে গেলো মিছরি। গালে গাল ঘষে বললো,“আসেন, আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে দেই। আপনার বাপ কোথায় গেছে কে জানে? বউয়ের থেকে এখন ছেলের প্রতি ভালোবাসা তার বেশি।”

নক্ষত্রকে ঘুম পাড়াতে বিশেষ ভোগান্তি পোহাতে হয় না। খেতে খেতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। এখনো ঘুমিয়ে গেলো। মিছরি শব্দহীন তাকে দোলনায় শুইয়ে ছোট্ট মশারি দিয়ে ঢেকে দরজা চাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

নাজির এখন বাড়িতে নেই। সকালের নাশতা সেরেই মিল্টনকে নিয়ে ক্ষেতে গিয়েছে। যহরের আজানের সময় লতিফ এলো। হাতে বিশাল বড়ো একটা মাছ। সালাম দিয়ে বললো,“ভাবি, ভাইয়ে মাছ পাঠাইছে।”

ভাতের পাতিল সবে উপোড় করা হয়েছে। তরকারি রান্না শেষ। ডালে বাগার দিচ্ছে শালিক। মিছরি উঠে এলো। মাছ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী মাছ এটা?”

“কাইল্লা বাউস, একটু আগে জালে উঠছে। ভাইয়ে দেখতেই কিন্না ফেলল।”

“কে কাটবে এত বড়ো মাছ? এটা মাছ আনার সময় হলো?”

ঘাড় চুলকে লতিফ হাসলো। কেনার সময়েই নাজির বলেছিল,“তগো ভাবি এই মাছ দেখলে নির্ঘাত আমার লগে কাইজ্জা করবো। যা, তুই দিয়া আয়।”

মাছটা কোনোমতে মিছরির হাতে ধরিয়ে দিয়ে লতিফ কেটে পড়ল। মিছরি রাগে গজগজ করে বললো,“এই লোকটা আর কখনো ভালো হবে না। এত বড়ো মাছ তাকে আমি ঠেসে ধরে খাওয়াবো।”

শালিক বঁটি নিয়ে উঠে এলো,“আহা, রাগ করোস ক্যান? একটা মাছই তো। আমি কাটতাছি।”

“তুই কেন কাটবি? সে নিজে এসে কাটবে। এমনিতেই তুই কম কাজ করছিস না। সেই ভোরে উঠেছিস।আমি তো কিছুই করতে পারি না। তোর স্বামী জানলে বলবে, আমার বউটাকে ভাবি কাজের লোক বানিয়ে রেখেছে।”

শালিক হাসলো,“ঢং, তোর দেওর কহনো এইসব কইবো না। উল্ডা আমারে চিঠিতে লিখছে, ভাবির লগে মিলমিশ কইরা থাকবা। এই সংসার তোমারও।”

“এই মাসের চিঠি আসেনি এখনো?”

“না, পাঠাইলেও তো সময় মতন পাই না। উনি কইছে, এইবার টেলিফোন আর মোবাইল পাঠাইবো। ওই দেশে নাকি এইসব দিয়া যোগাযোগ করে।”

স্বামীকে নিয়ে কথা বলতে গেলে শালিকের মুখমন্ডলে চাপা আনন্দ দেখা যায়, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে মুচকি হাসি। মিছরি ভারি অবাক হয়। তাদের মাত্র অল্প কিছুদিনের সংসার ছিল, অথচ দুজনার মধ্যে কত প্রেম!

বিদ্যালয়ে ছুটির ঘণ্টা বেজেছে। বাড়ি ফিরতেই মা ধরে গোসল করিয়ে দিলো সুজাতাকে। শাসিয়ে বললো,“চুপচাপ ঘরে গিয়া বইয়া থাকবি। আমি গোসল সাইরা আইতাছি। তগো দুইডারে খাওয়াইয়া দিমু।”

সুজাতা মায়ের কথা শুনলো না। জেসমিন কলপাড় যেতেই সিফাতকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। ফটক পর্যন্ত আসতেই ফাহমিদার ডাক পড়ল,“কী রে, কই যাস? ভাবি না কইলো ঘরে থাকতে?”

“ছোটো ফুফুর বাড়ি যাই।”

“ভর দুপুরে যাওয়ার দরকার নাই। বিহালে যাইস, তহন আমিও লগে যামু।”

“আমি এখনি যাবো।”

সুজাতা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। দুই ভাই-বোন দৌড়ালো। তাদের অর্ধেক বেলাই এখন ফুফুর নতুন বাড়িতে কাটে।

ফাহমিদা আকিকার দাওয়াত পেয়ে গতকাল সকালে এসেছিল। স্বামী, শাশুড়ি ফিরে গেলেও বাবা তাকে কয়েকদিনের জন্য রেখে দিয়েছে। মেয়ে তানিয়াকে কোলে নিয়ে এই রোদের মধ্যেই উঠোনে হাঁটছে সে। মেয়েটাকে কিছুক্ষণ আগে ঘুম পাড়িয়ে রেখে গোসল করতে গিয়েছিল। এসেই দেখে পলির কোলে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদছে। বেলীটা ভারি দুষ্টু। খামচি মেরে গাল থেকে মাংস তুলে ফেলেছে ফুফাতো বোনের। এখন সেই কান্না থামানোর জন্যই খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে তাকে। রুহুলের স্ত্রী খুশবু চুলে খোপা বেঁধে এলো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“ওরে আমার কোলে দিয়া তুমি খাইতে যাও। কান্দে ক্যান এমনে?”

“আর কইয়ো না, সব মেজো ভাবির দোষ। ছুডো মাইয়াডার হাতে বড়ো বড়ো নখ হইছে, তবুও কাটে না। না কাটলে না কাটুক, আমার ঘুমন্ত মাইয়াডার কাছে নিয়া শোয়াইতে হইবো ক্যান?”

“থাউক, পোলাপাইন মাইনষে একটা কাম কইরা লাইছে। তুমি খাইতে যাও। আম্মা বাড়া ভাত লইয়া বইয়া রইছে।”

ফাহমিদা তানিয়াকে খুশবুর কোলে দিয়ে ভেতরে চলে গেলো।

তাজা মাছটা কুটে বেছে কয়েক টুকরো তেল মশলা দিয়ে ভেজে রেখেছে শালিক। বাকিটুকু বিকেলে রান্না করবে। গোসল সেরে এখন নামাজ পড়ছে সে। ফুফু, ফুফু ডাক শুনে ঘরের বাইরে এলো মিছরি। সুজাতা, সিফাতকে দেখে অবাক হলো না। জিজ্ঞেস করল, “ইশকুল থেকে ফিরেই এখানে চলে এসেছিস?”

সুজাতা হাসলো। সামনের দাঁত দুটো পড়ে গিয়ে নতুন আরেকটি গজাচ্ছে। বললো,“নক্ষত্রের সাথে খেলতে এসেছি।”

“ওর খেলার বয়স হয়েছে? সোজা করে কোলেও তো নেওয়া যায় না।”

মুখ ভার করল সুজাতা। সিফাত ছাড়া পেয়ে বাড়ি জুড়ে দৌড়াতে লাগলো। মিছরি পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“দুপুরে খাওয়া হয়েছে?”

“না, পরে খাবো।”

“ভেতরে আয়।”

ওদের বিছানায় বসিয়ে থালায় করে ভাত তরকারি নিয়ে এলো মিছরি। গল্প করতে করতে দুজনকেই একসঙ্গে খাইয়ে দিলো।

ক্ষেতের ধানে আর কিছুদিনের মধ্যেই পাক ধরবে। কচুর লতি এক হাত সমান লম্বা হয়েছে। লতিফ, মোখলেছ আগাছা পরিষ্কার করছে। বাজারের চায়ের দোকানে ঘটক লাল মিয়াকে পেয়ে মিল্টনকে নিয়ে মেয়ে দেখতে গিয়েছিল নাজির। লজ্জায় মাথা তুলতে পারেনি মিল্টন। মেয়ে মন্দ নয়। বেশ সুনাম শুনেছে পাড়ায়। বলে এসেছে, কয়েকদিন পর পরিবার নিয়ে আসবে। পছন্দ হলে তখনি বিয়ে দিয়ে ঘরে তুলবে।

মেঠোপথ দিয়ে মহিষের গাড়ি যাচ্ছে। লুঙ্গির কোণা উঁচু করে ধরে বাড়ির পথে হাঁটছে নাজির। পাশেই মিল্টন। বললো,“কার্তিকের মধ্যেই তোরে বিয়া দিমু। যত তাড়াতাড়ি বিয়া করা যায় ততই ভালা। আমি গত বছর বিয়া করছি, আর এই বছর বাপ হইয়া গেছি। আল্লাহ দিলে সামনের বছর আমার পোলায় দৌড়াইবো।”

লজ্জায় মিল্টন কথা বলছে না। কলিমের মা হেঁটে এদিকেই আসছিল। তাদের দেখে পথ বদলালো। রাস্তা থেকে নেমে সবজি ক্ষেত দিয়ে হাঁটা ধরলো। নাজির দাঁড়িয়ে গেলো। চেঁচিয়ে ডাকলো,“চাচী! ও চোগলখোর চাচী! আগে তো নাজির আর শাহ গো ছাড়া কিছুই বুঝতেন না, আর এহন আমারে দেইখা পলান?”

কলিমের মা উত্তর দিলেন না, পিছুও ফিরলেন না। ঘোমটা টেনে দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন। নাজির হেসে আবার পথ চলতে লাগলো। বললো,“দুনিয়ার সব স্বার্থপর। সময়ে অসময়ে পল্টি খায়।”

“এ আর নতুন কী, ভাইজান? আমনের বৌদলতে কত দেখলাম!”

প্রসঙ্গ বদলালো নাজির,“আমগো বাড়ি আয়। দুপুরের খাওন খাইয়া বাড়িত যাইস।”

“না, ভাইজান। বাড়িত যাইয়া গোসল করমু।”

“আইচ্ছা, যা তাইলে।”

দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে চেঁচিয়ে ডাকলো নাজির,“আমার পোলার মা, তারামন বিবি! ও তারামান বিবি! বাড়িত আছো?”

সুজাতা, সিফাতের শব্দে কিছুক্ষণ আগেই নক্ষত্রের ঘুম ভেঙেছে। শালিক নামাজ পড়ে খাবার খেয়ে ঘুম দিয়েছে। কাকডাকা ভোরে মেয়েটা উঠেছিল। তাই শরীর ক্লান্ত। মিছরি ছেলেকে কোলে নিয়েই বাইরে এলো। ছেলের উদ্দেশ্যে বললো,“কখনো বাপের মতো অভদ্র হবি না।”

“ওর বাপ অভদ্র?” নাজির ভ্রু কুঁচকালো।

“কোনো সন্দেহ?”

“তাইলে নক্ষত্রের মা বেয়াদব।”

“কী বেয়াদবি করেছি?”

“কী অভদ্রতা করছি?”

“তারামন বিবি বলেছেন কেন?”

“তোমার নাম তারামন না?”

“যা ইচ্ছে থাকুক, আপনার কী? ডাকনাম তো মিছরি।”

“ঢং!”

“এত বড়ো মাছ পাঠিয়েছেন কেন? টাকায় কুড়কুড়ায়, অসভ্য ব্যাটা?”

“হ, তোর কী?”

“অনেক কিছু। আমার ছেলের ভাগে কম পড়বে।”

“আইছে, ঢং! পোলা তাড়াতাড়ি বড়ো কর। ওয় বড়ো হইলে মাইয়া আমদানি করমু।”

“কীহ?”

ঘর থেকে গামছা নিয়ে এলো নাজির। গোসল করবে। ছেলের দিকে ঝুঁকে বললো,“আব্বাজান, বোইন লাগবো না? ভাইও তো লাগবো। ভাই থাকলে শরীরে বল থাকে। প্রত্যেক বছর আমনেরে নতুন ভাই-বোন দিমু। তাড়াতাড়ি বড়ো হইয়া যান।”

মিছরি রাগে ফুঁসতে লাগলো। এমন ঘাউড়া, অভদ্র লোককে কিছু বলার মতো শব্দ তার ভান্ডারে নেই। বারান্দা থেকে নেমে কলপাড়ে যেতে যেতে নাজির বললো,“কী রে সুজন মাঝির ছাও? ভাত খাইছোস?”

খিলখিলিয়ে হাসলো সুজাতা। সিফাত না বুঝেই মাথা নাড়িয়ে বললো,“পুপু কাইয়ে দিছে।”

মিছরি ভাতিজার ঘাড় চেপে ধরলো। তার মেজাজ আপাতত খারাপ। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,“তোর বাপের নাম সুজন মাঝি?”
______

দিন তিনেক পেরোলো। গ্ৰামে হাওয়ার মতো ছড়িয়ে গেলো ফরিদার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ। সব দায় এড়িয়ে গেলেও নিখোঁজ মাকে খোঁজার দায় এড়াতে পারলো না পারভেজ। মামার বাড়ি থেকে শুরু করে খালার বাড়ি, প্রতিবেশীদের বাড়ি এবং পুরো গ্ৰাম খুঁজলো। তবুও তাঁর টিকিটিও পেলো না।
পারভেজ হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরলো। বুঝলো, মানুষ মূলত একা। কঠিন এবং শেষ সময়ে এসে পাষাণের মতো মাও তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এই পৃথিবীতে নিজের বলতে তার আর কেউ রইল না।

সেই গুরুত্বর সংবাদ নাজিরের কানেও পৌঁছে গেলো। সে এবারেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বরং এমন কিছু হবে তা যেন সে আগে থেকেই জানতো। বাজার থেকে ফেরার পথে মিন্নত ব্যাপারি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,“তগো বাড়ির সামিউলের মায় নাকি নিখোঁজ? এই শেষ বয়সে আইয়া মনে রং লাগছে? গেছে কই?”

“আমি কী জানি? হের পোলারে গিয়া জিগান।”

“দুইদিন পরপর যা রটে তগো নামে! এত ক্ষমতাধর, ভালা একটা পরিবার হঠাৎ কইরা ধ্বংস হইয়া গেলো। নিজেগো মাঝেই খুনাখুনি। সামিউলের মায়রে ভালা মানুষ হিসাবেই জানতাম। কিন্তু হেয়ও শেষমেশ কিনা…

নাজিরের বুঝতে বাকি থাকে না, বুড়ো তাকে অপমান করছে। তাই হেসে বললো,“পুরাইন্না সংসার নষ্ট হইয়া নতুন আরেকটা সংসার হইছে। তাতে কী ক্ষমতা কইম্মা গেছে? বরং বাড়ছে। ধীরে ধীরে আরো কত কী দেখবেন! এই শেষ বয়সে চোগলখোরী না কইরা ইবাদত বন্দেগীতে মন দেন।”

থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন মিন্নত ব্যাপারি। নাজির বাড়িতে চলে এলো। সেই রাতের আঁধারে যে ফরিদা বানু আত্মাহুতি দিলেন তা আর কেউ জানতে পারলো না। শাপলা বিলের কোথায় সেই দেহ ভেসে বেড়ালো তাও কেউ জানে না। জানে না তাঁর জঘন্য পরিণতির কথা। গোটা একটা জীবন পাপে আর হেলায় কাটলো। তাকে স্মরণ করার মতোও কেউ রইল না, কেউ না। নাসরিনের মতো তাঁরও কবর হলো না।

কার্তিক গিয়ে অগ্ৰহায়ণ এলো। ক্ষেতের সোনালী আমন ধান কেটে ঘরে তোলা হলো। আগে ধান সেদ্ধ করে দিতেন কলিমের মা। এবার তিনি না থাকায় লতিফের মা এসে সেদ্ধ করে দিয়ে গিয়েছেন। সপ্তাহ খানেক ধরে কড়া রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ধান থেকে চাল করে চড়া দামে বিক্রি করল নাজির। কয়েক কেজি আবার নিজেদের জন্যও ভানিয়ে এনেছে। শীতে পিঠা খাওয়া যাবে।

ভালো দিনগুলো হয়তো খারাপ দিনের তুলনায় দ্রুতই কেটে যায়। নাজির, মিছরির দিনগুলোও ছেলেকে নিয়ে তাই কাটছে। দিন শেষে রাত হচ্ছে, রাত শেষে দিন। মাঝেমধ্যে বেলীকে কোলে নিয়ে মাসুম, তালেবও চলে আসে তাদের বাড়ি। কাশেম আলীর তো একদিন নাতিকে না দেখলে হয় না। পারুলও এটা সেটা রান্না করে পাঠিয়ে দেন।

দালানের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। ঘরের পিলার স্থাপন করা শেষ হয়েছে। অগ্ৰহায়ণ শেষ হওয়ার পূর্বেই ভালো দিনক্ষণ দেখে মিল্টনের বিয়েটাও দিয়ে দিলো নাজির। বউ নিয়ে সে মহাখুশি।

হাড় কাঁপানো শীত আসতে আসতে ছাদের ঢালাই দেওয়া সম্পূর্ণ হলো। এবার ঢালাই মজবুত হলেই ইটের গাঁথুনি দেওয়ার পালা।
সব ছেড়েছুড়ে নাজির তার নতুন ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শীতে মাছের প্রজেক্ট সে কয়েক বছর ধরেই করছে। পাশাপাশি গুড়ের ব্যবসায় হাত দিয়েছে। ব্যাপারির মাধ্যমে চেনা অচেনা বেশ কিছু খেজুর গাছ কিনে রেখেছিল। রস সংগ্রহ করেই ভাবছে কাজ শুরু করে দেবে।

শীতের আগমন ঘটতে না ঘটতেই বার্ধক্য জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানার সাথে সন্ধি বেঁধেছেন সৈয়দুন নেছা। উঠে বসার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন। একাধারে ডাক্তার, বৈদ্য দেখানোর পরও কোনো সুরাহা করতে না পেরে পুত্র, নাতিরা ভারি চিন্তিত।

বৃদ্ধা অসুস্থতা নিয়েই ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। দুজনকে দুইপাশে বসিয়ে বললেন,“জীবনে অনেক কিছু হারাইছি, অনেক কিছু সহ্য করছি। শেষ মুহূর্তে আল্লাহ আমার জীবনে তোর আব্বারে পাঠাইলো। বন্ধ্যা হইয়াও তগো মাধ্যমে মাতৃত্বের স্বাদ পাইলাম। তোরা যা করছোস তা নিজের পেটের পোলারাও মনে হয় মায়ের লাইগা করে না। আমি তগো প্রতি সন্তুষ্ট, বাপ। তোরা সন্তুষ্ট তো? কহনো অজান্তে কোনো ভুল কইরা থাকলে মাফ কইরা দেইস।”

“আম্মা! কী কন?” নজরুল আলম ভারাক্রান্ত হয়ে বললেন।

কাশেম আলী বললেন,“আমরা আমনের প্রতি সন্তুষ্ট, আম্মা। পেটে না ধইরাও যেমনে আমগো আগলাইয়া রাখছিলেন! আমনেরে মা হিসাবে পাইয়া আমরা খুশি। আরো একবার যদি সুযোগ থাকে তাইলে তহনও আমরা আমনেরেই আমগো মা হিসাবে বাইছা নিমু।”

সৈয়দুন নেছার চোখে অশ্রু জমলো। সুখের অশ্রু। আকবর মিয়া বলতেন,“আল্লাহ যা নেন, তারচেয়েও বেশি মাইনষেরে দেন। ধৈর্য ধরো, দুনা।” একসময় জীবন নিয়ে অভিযোগ করা সৈয়দুন নেছাও ধৈর্যের ফল পেয়েছেন। শেষ সময়ে এসে তিনি পরিপূর্ণ, সুখী। বললেন,“সবসময় দুই ভাই এমনেই মিলমিশ কইরা থাকিস। সন্তানগো সুশিক্ষা দেইস। শাহ গো মতন ভাই যেন ভাইয়ের শত্রু না হইয়া যায়।”

মায়ের উপদেশে দুজনেই মাথা নাড়ালেন। তিনি পুনরায় বললেন,“তমিজা, আবেদা, সরলাগো আইতে কইস। মনে হয় হাতে আর বেশি সময় নাই। যদি শেষ দেখাডা দেইখা যাইতে পারতাম?”

“এমন কথা মুখে আইনেন না, আম্মা। আব্বা গেছে গা। এহন আমনেও যদি যান গা! আমগো কী হইবো?”

“জীবন যাত্রা শেষে সবাইরেই একদিন যাইতে হয়। এইডাই তো নিয়ম।”

সৈয়দুন নেছা ছেলেদের সাথে অনেক কথাই বললেন। পুত্রবধূরা তাঁর সেবায় সর্বদা এগিয়ে। কাশেম আলী এবার দ্রুতই ছেলে মাসুমের বিয়ের আয়োজন করলেন। মা অন্তত শেষ নাতির বিয়েটা যেন দেখে যেতে পারে।

মাস্টার বাড়ির কোনো নারী পুরুষ আজ পর্যন্ত প্রণয়ে জড়িয়ে বিবাহ করেনি। তাদের বিয়ে গুরুজনদের মতামত নিয়ে সামাজিকভাবে হয়েছে। তাই মাসুমের বিয়েও সেভাবেই সমাপ্ত হলো। তবে তার বিয়েটা খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ হলো না। শুধু আত্মীয়-স্বজন আর নিকটীয় পাড়া প্রতিবেশীদের দাওয়াত দেওয়া হলো।

ইংরেজি বছরটা পুনরায় বদলালো। ডিসেম্বর শেষে জানুয়ারি শুরু হলো। গতবারের তুলনায় এবার ঠান্ডা বোধহয় একটু বেশিই পড়েছে। সপ্তাহ খানেক বড়ো ভাইয়ের বিয়ে খেয়ে গতকাল বাড়িতে ফিরেছে সবাই। রাতের থালা-বাসন সকালে মেজে কলপাড় থেকে সবে বেরিয়েছে শালিক। গায়ে শাল জড়ানো। শীতে কাঁপতে কাঁপতে বারান্দার কাছাকাছি আসতেই পথিমধ্যে সে থেমে দাঁড়ালো। সম্মুখ মানুষটাকে দেখে চোখে-মুখে জমলো বিস্ময়। হাতের চকচকে থালা- বাসন খানিক কাঁপলো। এটা ভ্রম নাকি সত্য? দুয়ের মাঝখানে আটকে পড়ল মেয়েটা।

চলবে_______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here