মোহমায়ার_বাহুডোরে #পর্ব_৪৬

0
27

#মোহমায়ার_বাহুডোরে
#পর্ব_৪৬
#সাদিয়া

ইহামের সিংহ গর্জনে ফোনের ওপাশে থাকা মায়রা কেঁপে উঠল। ভয় আতঙ্ক নিয়ে গেল তাকে অন্য কোথাও। চোখের পাতা ফেলে শুকনো ঢোক গিলার আগে আবার ইহাম বলে উঠল,

“মেজাজ গরম করিস না মায়রা। যা বলার বলে ফেল। আমার কিন্তু মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে।”

গলা শুকিয়ে কাঠ। প্রাণ পাখিটা যেন পালাই পালাই করছে মায়রার। দূরে থেকেও লোকটার ভয়ংকর রাগ পুরোপুরি না হলেও খানিক আঁচ করতে পারছে। আজকাল লোকটা তার বিষয়ে যেন আরো সচেতন হয়ে গিয়েছে। সামান্য কিছুও সহ্য করতে পারে না। এক রাত ঔষধ খায়নি ফাতেমা বেগম বলেছিলেন উনার কাছে। সেই রাত ১২ টার পরেই লোকটা কল দিয়ে সেই কি বকা। অগত্যা ঘুম ভেঙ্গে ঔষধ খেতে হয়েছে তাকে। ওই পাষাণ মানুষটা কাছে না থেকেও যেন নিজের সবটুকু হুকুম তার উপর জারী করে দিচ্ছে সব ক্ষেত্রে।

“আমি উত্তর চাইছি মায়রা। আন্সার মি।”

থতমত খায় মায়রা। ঢোক গিলে বলে,

“আ আসলে…”

“কাল প্রাইভেট থেকে বাড়ি ফেরার পথে তোমার সিনিয়র একটা ছেলে তোমায় আজেবাজে কথা বলেছে এমন কি হাতও ধরেছে। এক পর্যায়ে তুমি জোরাজোরি করে পর থেকে ছুটে এসেছো। রাইট?”

মায়রা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এই লোক চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার সব খবর জানে কি করে? মায়রার বিস্মিত চোখ গোলগোল। ঠোঁট উল্টানো।

“অথচ তুমি আমাকে ঘটনাটা জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না রাবিশ? কাল রাত তোমার সাথে এক ঘন্টা ৮ মিনিট কথা হয়নি? বলেছিলে?”

মাথা নুয়ে আনে মায়রা। অপরাধী কন্ঠে জানায়,

“কোনো ঝামেলা হোক আমি সেটা চাইনি।”

“তুমি কি ভেবেছো আমি চট্টগ্রাম থাকি বা ভিনগ্রহে আমার বউ কে কোনো স্কাউন্ড্রেল কিছু বলে চলে যাবে আর আমি সেটা জানব না? আমার কানে আসবে না সেই কথা? একদম ওর কলিজা ছিড়ে নিয়ে আসব না?”

মায়রা বুঝল শেষের বাক্যটা বেশ ক্ষোভের সাথে বলল ইহাম।

“সামান্য একটা বিষয় তাই…”

“হেই বেয়াদব তুই আমার কাছে সামান্য?”

“….

“উত্তর দে। বল? তুই আমার কাছে কি তুই নিজে জানিস?”

“….

“ক্যাপ্টেন ফাহাদ ইহাম চৌধুরীর বউ তুই। মুটেও সামান্য কিছু নস। কথাটা মনে রাখবি। ইউ আর বেরি এক্সপেন্সিভ টু মি।”

মায়রা বুলি হারিয়ে ফেলেছে। আবেগে চোখ দুটি টইটম্বুর তার। কিছু বলবে তার আগে তাকে থামিয়ে দিয়ে ইহাম বলল,

“আমার তো রেগে তোমাকে আগে দুইটা চড় দিতে ইচ্ছা হচ্ছে মাথামোটা বেয়াদব। এমন একটা ঘটনা আমার কাছ থেকে লুকিয়েছো কোন বুদ্ধিতে?”

“শুনুন আমার কথাটা। আমি তো..”

“আমি কল না দেওয়ার আগ পর্যন্ত তুমি আমায় কল দিবে না মায়রা।”

“শুনুন রাখবেন না ফোন।”

মায়রার কথা শুনল না ইহাম। নীরব ক্রোধ নিয়ে নিজেই গট করে কল রাখল। চোখের পানিগুলি এবার টুপটুপ করে পড়ল মায়রার। সামান্য একটা কারণে ওই লোক এত রিয়েক্ট কেন করে ফেলে বুঝে না সে। লোকটা এতটা রাগী কেন? সে না হয় একটু ভুল করেছে তাই বলে এমন করবে? চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মায়রা আবার কল দেয়। কিন্তু ফোন টা বন্ধ পাওয়া যায়। মেয়েটা যতবার কল লাগায় ততবারই বন্ধ আসে।

কোনো কিছুই ভালো লাগছে না মায়রার। পরীক্ষার বাকি আর মাত্র পাঁচ দিন। অথচ এই এক মাসে যে পিপারেশান নিয়েছিল এখন সেই জোরটা নেই। গত দুই দিন ধরে ইহাম তাকে কল দেয়না। কথা হয়না লোকটার সাথে। ব্যালকুনিতে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েটা। আচমকা ফোনের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে তার। অবুঝ ছোট্ট মনটা সায় দেয় ইহাম কল করেছে। কিন্তু তার মন খানখান হয়ে দিয়ে মিথিলার কল আসে। বিবশ মুখে ফোনটা তুলে সে।

“কিরে কল দিয়েছিলি? ভার্সিটি তে ছিলাম।”

“কয়টা কল দিয়েছি দেখেছো?”

তিক্ত অভিমুখে প্রশ্ন করে মায়রা। কোনো কিছুই তার ভালো লাগছে না।

“দেখেছি। এবার বল কেন কল দিয়েছিস।”

মায়রা সব ঘটনা খুলে বলে। তার মন খারাপের কারণও বলে।

“বুঝলাম। তোর যখন দরকার পরে তখনি মিথিলা আপুর কথা মনে হয় তাই না? অন্য সময় কয়বার কল দিস আমায়?”

“তুমিও কথা শুনাবে নাকি এখন?”

“আচ্ছা শুনাচ্ছি না। কিন্তু তোর কি মনে হয় না বিষয়টা উনার কাছ থেকে লুকিয়ে খারাপ করেছিস?”

“মানলাম একটু ভুল হয়েছে তাই বলে কথা বন্ধ করে দিবে? কল দিবে না?”

“দেখ, একটা জিনিস একটু চিন্তা কর তুই। যেই লোকটা এত দূর থেকেও তোর হাত ধরে রাফি অসভ্যতা করেছে বলো ছেলেটাকে মেরে আবার হসপিটালে ভর্তি করেছে। কাছে না থাকুক যেভাবেই হোক ঘটনাটা ঘটিয়েছে তো? আবার তাকে হসপিটালে ভর্তি করানোর আগে তোর বাড়ি বয়ে এসে সরিও বলিয়েছে। বিষয়টা বুঝতে পারছিস?”

মায়রা চুপচাপ মলিন মুখে শুনে গেল মিথিলার কথা।

“তাহলে তুই নিজ থেকেই বুঝ লোকটার কাছে তুই কতটা দামী। আমার মনে হয় লোকটা মানতে পারছে না তার আদরের বউ এর হাত কোনো ছেলে ধরেছে। তারউপর কথাটা তোর মুখ থেকে না শুনে আরেকজনের থেকে জানতে হয়েছে বলে রেগে গিয়েছে। উনি হয়তো বেশিই রগচটা। হয়তো কথা কম বলে গম্ভীর কিন্তু খুব রাগী।”

“আমি পড়ায় মন বসাতে পারছি না আপু।”

“বোকার মতো কথা বলিস না মায়রা। পাঁচ দিন পর পরীক্ষা মনোযোগে দিয়ে পড়। টেস্ট পরীক্ষার আগেও তো উনার সাথে তোর ঝামেলা হয়েছিল কিন্তু ইহাম ভাইয়াই তো তোর সাথে কথা বলেছে নাকি? এবারও দেখবি উনিই কল দিবে।”

“আমার যে সহ্য হচ্ছে না।”

মায়রার কন্ঠে ছিল অগাধ অসহায় বোধ, কিছু করতে না পারার নীরব আহাজারি। মিথিলা সবটা আঁচ করল,

“স্বামী সোহাগী বোন রে আমার। তোর যদি তর না সয় তো নিজে কল দিয়ে দে।”

“ফোন বন্ধ। কাল থেকে হাজারবার দিয়েছি।”

“তবে আর কি বলব?”

“বাদ দাও তোমার খবার কি?”

“নতুন বয়ফ্রেন্ড এসেছে জীবনে। মনে হচ্ছে এটা পার্মানেন্ট হয়ে যাবে।”

“তাড়াতাড়ি বিয়ে করো আপু।”

মিথিলার সাথে কথার ফাঁকে মায়রার ফোনে কল এলো। কান থেকে ফোন সরিয়ে “পাষাণ মানব” টা স্কিনে ভাসতেই লাফিয়ে উঠল মায়রা। চটজলদি বলল “আপু ফোন রাখো, ফোন রাখো। উনি কল দিয়েছে।”

ফোন ধরতেই ইহাম কেমন জলদগম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“শরীর কেমন এখন?”

অভিমানে গাল ফুলে উঠে মায়রার। মাথা নিচু করে ব্যালকুনির গ্রিলে নখ খুটতে খুটতে গম্ভীর গলায় সেও জবাব দেয়,

“আপনার কি আর আমার খুঁজ রাখতে হয়?”

“না হলে কি আর কল দিতাম? তর্ক না করে সেটার উত্তর দাও।”

“এই দুদিন তো খুঁজ নেন নি। তাহলে?”

“তুমি যেন বুঝতে পারো যেটা তুমি সামান্য ভেবেছো সেটা আমার কাছে কতটা গুরুতর ব্যাপার মাথামোটা।”

“যখন কথাই শুনো না তখন আর কথা বলে কাজ কি? যা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দাও। শরীর কেমন এখন?”

“দুদিন যখন জানতে চান নি তখন আর জানতে হবে না।”

“জবাব দিবে নাকি ফোন রাখব কেন?”

গাল ফুলিয়ে মায়রা অভিমানি সুরে বলল, “আপনি এমন কেন? এত রাগী কেন আপনি?”

“তোমায় তো আগেই বলে দিয়েছি মায়রা আমি গদগদ হয়ে যাওয়া পুরুষের মতো না। আমি একটু এমনই। মেনে নিতে শিখে যাও।”

“ভালো আছি।”

মায়রা এত দিনে বেশ বুঝে গিয়েছে লোকটা উপরে উপরে বেশ কড়া হলেও দায়িত্ব কিংবা যত্নের দিক থেকে তার প্রতি কোনো ছাড় দেয় না। ব্যবহারটা এমন হলেও ভেতরের নরমত্ব কাজে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারে সে। মানুষটা একটু অন্যরকমই। সব কিছুর ধরনও তাই অন্যরকম।

“রাগ অভিমানের মাত্রা টা কি একটু বেশি যে জিজ্ঞেস করা যায় না আমি কেমন আছি?”

“হুম।”

“তো ম্যাডামের রাগ কিভাবে ভাঙ্গবে?”

“একবার আসুন না ক্যাপ্টেন সাহেব।”

মায়রার কন্ঠে আকুল আবদার। মেয়েটার মুখের ভঙ্গি কল্পনা করে ইহামের বুকটা জ্বলে উঠে। নিজের অপারগতার কথা ভেবে ভেতরটা তছনছ হলো তার। অবুঝ মেয়েটা বুঝে না সে চাইলেই ছুটে চলে আসতে পারে না। সব কিছুর নিয়ম আছে এত ঘনঘন ছুটি তার হয় না। অথচ মেয়েটাকে বুকে চেঁপে ধরার বোবা ইচ্ছাটা সবসময় তাকে জ্বালিয়ে মারে।

“ভিডিও কলটা ধরো।”

ল্যাপটপের বিশাল স্কিনে মায়রার শুভ্র নীল আকাশে এক রাশ কালো মেঘ জমা দৃশ্য দেখা যায়। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠে ইহামের। ওই বলদ মেয়েটাকে কি করে বুঝাবে তার ব্যাকুল মনটা অস্থিরভাবে কতটা ছটফট করছে এক ছুটে গিয়ে মেয়েটাকে বুকের সাথে চেঁপে ধরতে? কপালে গালে অসংখ্য চুমু খেয়ে “আমার মায়রা, আমার হার্টবিট তুমি এভাবে মুখ করে থেকো না তোমার ওমন মুখ দেখলে আমার খুব রাগ লাগে” বলার ইচ্ছাটুক ওই নরম মনের মেয়েকে কি করে বলে সে? নিজের সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে ভেতরটা চুরমার হলেও শক্ত থাকে ইহাম। বরাবরই তো সে শক্ত কঠোর। স্পর্শকাতর বিষয়গুলিও তো সে শক্ত ভাবে সামলে নেয়। কিন্তু তার সকল দূর্বলতা অসহায় বোধ বুঝি ঘুরেফিরে ওই একটা মেয়েতেই নিবদ্ধ হয়। এখন যদি একটু গলে যায় ইহাম তবে ওই মাথামোটা মেয়ে একেবারে কাঁদা কাঁদা হয়ে যাবে। ফোঁস করে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে নিজের চিরাগত ফর্মে ফিরে ইহাম। সেই রুক্ষ কঠিন আদল।

“আমার সুইটহার্ট এমন আবদার করতে নেই। তোমায় তো বলেছি তিন মাসের আগে আমার আর ছুটি নেই।”

মায়রার মুখ আরো কালো হতে দেখা যায়। ইহাম জানে সব বুঝে। মায়রার বয়সটা বড্ড আবেগি ভালো লাগার। এই বয়সে মেয়েরা নিজেদের পছন্দের মানুষকে সবসময় কাছে পেতে চায়। কিন্তু সেটা অনেক বাঁধা বিপত্তির কারণে সেটা হয়ে উঠছে না।

“ডার্লিং ফিরে এলে তোমায় ধামাকা অফার দিবো। কোনো মন খারাপ নয়।”

তবুও মায়রা কিছু বলে না। মাথা নিচু করে বিষণ্ণ নীল মুখে তাকিয়ে থাকে। মানুষটা খুব পাষাণ। তার কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না। সামান্য একটা আবদারই তো করেছে। এটাও কি রাখা যায় না? অথচ বোকা মেয়েটা ইহামের কঠিন আবরণের মধ্যকোণে অন্তঃকরণের তীব্র নরমত্ব এখনো উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি।

প্রসঙ্গ পাল্টাতে ইহাম প্রশ্ন করে “মেডিসিন নেওয়া হয় ঠিক মতো?”

মায়রা হু না কিছু করে না। মাথা নুয়ে রেখেই টুপটাপ চোখের পানি ফেলে। দৃশ্যটুক দেখেই ইহামের মেজাজ ছলকে উঠে। রেগে দাঁত চাঁপে নিজের। ধমকের সুরে বলে,

“মায়রা কান্না থামাও। কতবার বলব আমার সামনে কাঁদবে না বেয়াদব মেয়ে কথা কানে যায় না?”

ইহামের ধমকে এবার মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠে। মায়রার কান্না তার বিশ্রী লাগে। রাগ বাড়ায়। তার চেয়ে বড় কথা বুকটা অস্থির ভাবে ছটফট করে ওর চোখের পানিতে। কেমন অশান্তি অশান্তি লাগে। মেয়েটার মন খারাপের বিষয়টা মাথায় এনে নিজেকে শান্ত করে। কোমল সুরে ডাক,

“মায়রা এদিকে তাকাও।”

“…..

“তাকও আমার দিকে।”

মেয়েটা আস্তেধীরে মাথা তুলে। এই অল্প সময়েই নাকের ঢগাটা লাল হয়ে গিয়েছে। টুকটুকে লাল নাক দেখে ম্লান হাসে।

“আমি তো কাছে নেই। আমার কাজটা না হয় তুমি করে। দ্রুত চোখের পানিটা মুছো তো। কতবার বলব কাঁদলে তোমায় বিশ্রী দেখায়?”

“লাগুক।”

“আমার রাগ হয়।”

“হোক।”

“এখন যে তোমার চেরির মতো নাকটা খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা হচ্ছে তার বেলা?”

জবাব দেয় না মায়রা। লজ্জা পায়। লোকটা একটা অসভ্য। বিব্রত বোধে ফেলতে ভাবে না একটুও। এই খারাপ তো এই ভালো।

“পড়াশুনো হচ্ছে তো?”

মাথা নাড়ায় মায়রা।

“তুমি আমার মন আকাশের এক ফালি সূর্য কিরণ মায়রা। সূর্য যেমন বহু দূর থেকেও পৃথিবীতে রশ্মি ছড়িয়ে দেয় ঠিক তেমনি তুমি আমার কাছে না থাকলেও তোমার অস্বস্তিটুক সূর্যের কিরণের মতো আমার অন্তঃকরণে সর্বদা আলো ছড়ায়।”


শিফুর অবস্থাটা দম বন্ধকর পরিস্থিতির মাঝে আটকে গিয়েছে। তুহিন ভাই এর এই এড়িয়ে চলা তাকে বড্ড কষ্ট দেয় প্রতিনিয়ত। বাকি সবার কাছে নিজেকে ভাই এর মতো শক্ত দেখানোর চেষ্টা করলেও সে তো জানে ভেতরে ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে একদম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সে। বুকের থেকে প্রতিনিয়ত তার অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সেই বোবা আর্তনাদ চারদেওয়ালেই বন্দী।

বই এর দিকে চেয়েও মন দিতে পারছিল না একটুও। তখনি ফোন বাজে। দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখে তুহিনের কল এসেছে। বিস্ময়ে কপাল কুঁচকায় মেয়েটা। সেকেন্ড কয়েক সময় নিয়েই ফোন রিসিভ করে। কিছু না বলে চুপচাপ থাকে কিছুর অপেক্ষায়।

“শিফুটিফু?”

“কেমন আছো?”

“ভালো?”

“সত্যি ভালো নাকি মিথ্যে কথা বলছো?”

“খারাপ থাকার কথা ছিলো কি? ভালোই আছি তুহিন ভাই।”

শিফুর গলার ওমন সুর শুনেই চটে গেল তুহিন।

“এই মেয়ে একদম আমার সামনে শক্ত হবার অভিনয় করবে না। ওই টুকুন ল্যাদা এক বাচ্চা আবার ভাব নেয় আশি বছরের বুড়ির।”

“আমি তো বুড়িই হবো। আপনার সামনে এখনো মালয়েশিয়ার কচি কচি মেয়ে গুলি আছে না?”

“থাকলেই?”

“থাকলেই আবার কি? ওদের ভালো লাগবে আপনার।”

“কিন্তু কেউ আমার শিফুটিফুর মতো তো নয়।”

আনন্দে চোখ দুটি চিকচিক করে উঠে শিফুর।


দিন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়। দেখতে দেখতেই এক মাসে মায়রার এক্সাম শেষ হয়ে যায়। আজ শেষের এক্সাম টা দিয়ে এসে খুব খুশি। যেন পারে না শুধু রাস্তাতে নাচতে। পরীক্ষার হল থেকে বের হতেই বাবা কে দেখতে পায়। ইচ্ছা ছিল তখনি লোকটাকে কল করবে। কিন্তু পরে আর করেনি। আস্তেধীরে নিজের রুমে গিয়েই না হয় রিলেক্সে বলবে।

“পরীক্ষা কেমন দিলি মা?”

“ভালো। এক প্লাস না পেলেও ফেল করব না এটা নিশ্চিতে থাকো।”

মেয়ের কথা শুনে তাজ্জব বনে যায় মহিন সাহেব। নির্বোধের মতো তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করেন?

“এ কেমন কথা আম্মা?”

“ইশশ বাবা একটুও চিন্তা করো না। একেবারে সুপারডুপার লেভেলের ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট না হলেও খারাপ তো আর না? আমার সব পরীক্ষা ভালো হয়েছে আব্বু। স্যাররা যদি দয়া করে নাম্বার দেয় তবে প্লাসটাস পেলে পেতেও পারি। নো টেনশন ডো ফুর্তি আব্বু।”

মেয়ের কথা শুনে তাজ্জব বনে যান মহিন সাহেব।

বাড়ি ফিরে মায়রা আগে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। ফাতেমা বেগম এই যে মেয়েকে ডাকলেন কিছু খেয়ে রেস্ট নিতে মেয়েটা শুনল না। খুশির জোয়ারে তার হৃদয়টা দুরন্ত ভাবে চনমনা করছে। ঠোঁটের কোণে বহু কাঙ্ক্ষিত একটা হাসি সরছেই না মেয়েটার মুখ থেকে। আনন্দে আটখানা হয়ে সে একবুক আশার ঝিলিক নিয়ে সে কল দিল ইহাম কে। দুইবার রিং বাজতেই কলটা কেটে গেল। মায়রা জানে এখনি পাষাণ লোকটা কল দিবে।

হলোও তাই। ইহাম কল করতেই খুশিতে আত্মহারা মায়রার চোখ দুলে উঠল। ফোন রিসিভ করে সালাম দিল। হৃদয়টা খুশিতে থরথর করে কাঁপছে মায়রার।

“ক্যাপ্টেন সাহেব আমার পরীক্ষা শেষ।”

কতটা উচ্ছ্বাসের সাথে কথাটা বলেছে তা যেন গলার সুরেই বুঝা যায়। যেন কতদিনের স্বপ্ন পূরণ হবার আনন্দ ঝড়ছে কথার নিমিত্তে। ইহাম সবটা বুঝেই রুক্ষ মুখে কঠিন রইল। শক্ত আওয়াজে প্রশ্ন করল,

“কেমন হয়েছে এক্সাম?”

“ভালো।”

“শুধু ভালো?”

“ইশশ রাখুন না আপনার ওসব কথা। আমি কি বলছি সেটা শুনুন।”

কথার প্রতিটা ভাঁজে উৎকণ্ঠা উবছে পড়ছে টের পায় ইহাম। তবুও কঠোর ভঙ্গিতে চুপ থাকে সে। যেন নিজের অসহায়ত্ব টুক পাষাণ আচ্ছাদনে মুড়ে চুপ রইল সে। মায়রা কি বলবে তা যেন সে বুঝেই গিয়েছে। তাই তো তাড়াহুড়া করে সে ব্যস্ততা দেখালো।

“আমার একটু কাজ আছে। আমি তোমার সাথে পরে কথা বলব মায়রা।”

“আরে শুনুন না। ক্যাপ্টেন সাহেব ফোন রাখবেন না। আমার কথাটা একটু শুনুন। বেশি সময় নিবো না প্লিজ।”

মায়রার ওই আহাজারি ইহামের পাষাণ হৃদয়ে প্রবল আঘাত করে। ভেতরে কেমন চিড় ধরে তার। দাঁত চেঁপে নিজেকে দৃঢ় করে আর ফোন কাটার ইচ্ছা হয় না। মেয়েটা দূরে থাকা ইহামের ভাবভঙ্গি না দেখেই উদগ্রীবের সাথে বলে,

“ক্যাপ্টেন সাহেব আমার পরীক্ষা শেষ। আমায় নিতে কবে আসবেন আপনি?”

ইহাম কিছুক্ষণ চুপ থাকে। জলদগম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয় এবার, “দেখি” বলে। ইহামের এমন চুপচাপ গম্ভীর ভাব দেখে কপাল কুঁচকে আনে মায়রা। এতক্ষণ মানুষটার গুরুগম্ভীর ভাবটা পাত্তা না দিলেও এখন মায়রা সন্দিহান।

“দেখি মানে? ক্যাপ্টেন সাহেব আপনিই তো বলেছিলেন এক্সামের পর আমায় আপনা..”

ইহাম একদম পাথরের মতো শক্ত হয়ে মায়রার মন টাকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে জানাল,

“তার দরকার নেই। এখন আসতে হবে না। সময় করে আমি আনব তোমায়। কিন্তু এখন নয়।”

চলবে….
অসংখ্য ভুল থাকতে পারে রিচেক দেওয়া হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here