#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ২২
বর্তমানে অনন্যা লিলির ঘরে বসে আছে ৷ লিলির জ্ঞান ফিরে এসেছে ৷ ও লজ্জিত মুখে অনন্যার সামনে বসে আছে ৷ ওদের থেকে খানিকটা দূরে আলমগীর প্রামানিক লিলির বাবা মায়ের সাথে গল্প করছেন ৷ লিলি বসা থেকে উঠে কিছু শুকনো খাবার নিয়ে এসে অনন্যার সামনে রাখল ৷ তারপর সামান্য হেসে বলল,,,
খেয়ে নাও ৷
লিলি অনন্যার পাশে বসে পড়ল ৷ খানিকটা সময় নিরবতা বিরাজ করল ৷ লিলি ইতস্তত করে বলতে লাগল,,,
তখনকার ঘটনার জন্য কিছু মনে করো না ৷
বলে ও লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল ৷ অনন্যা শান্ত গলায় বলল,,,
আমি কিছু মনে করিনি ৷ তবে খানিকটা অবাক হয়েছি ৷
লিলি হেসে ফেলল এবং বলতে লাগল,,, আসলে অলি ভাইয়াকে না চাইতেও ভালোবেসে ফেলতে হয় ৷ এমন ছলনার যুগে তার মতো সহজ সরল আর নিষ্পাপ মনের মানুষ খুব কম পাওয়া যায় ৷ এমন একটা মানুষকে কেউ ভালো না বেসে পারে?
অনন্যা মুচকি হাসল, কোনো জবাব দিল না ৷ লিলি অলির প্রসঙ্গে না গিয়ে অনন্যাকে খাওয়ার জন্য তাগিদ দিতে লাগল ৷ অনন্যা ভদ্রতার খাতিরে একটা বিস্কুট নিয়ে সেটাতে কামড় দিল ৷ লিলি অন্যদিকে মুখ করে মুচকি মুচকি হাসছে ৷ হয়তো অলির কথা মনে পড়ে গেছে ওর ৷
অনন্যা আড়চোখে ওর মুখের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকল ৷ এত্তো রুপবতী একটা মেয়ের ব্যবহার কি মিষ্টি! এমন একটা মেয়েকে কি কেউ না বলতে পারে? অলিও এই মেয়েকে ভালোবাসতে বাধ্য হবে ৷ অনন্যা চোখ সরিয়ে নিল লিলির থেকে ৷ ও চায় না ওর নজর লেগে যাক ৷
লিলি টুকটাক কথা বলতে লাগল অনন্যার সাথে ৷ কথা বলার মাঝে ও অনন্যার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ৷ মেয়েটার সৌন্দর্য ওর কাছে মোটেও কম বলে মনে হলো না ৷ তবে একটা খুঁত রয়ে গেছে ৷ সেই খুঁতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে লিলি অস্ফুট স্বরে বলল,,,
একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি? যদি কিছু না মনে করো ৷
অনন্যা খাওয়া থামিয়ে দিল ৷ ও হয়তো বুঝে গেল প্রশ্ন টা কি রিলেটেড হতে পারে ৷ তাই আগে ভাগেই নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে ফেলল ৷ ও মাথা উপর নিচ করে সম্মতি জানাল ৷ লিলি ইতস্তত করে বলতে লাগল,,,
তোমার চোখের সমস্যা টা কি জন্মগত না জন্মের পর হয়েছে?
অনন্যা নিশ্চুপ হয়ে এক জায়গায় চোখ নিবদ্ধ করে রাখল ৷ তা দেখে লিলি ভড়কে গিয়ে বলল,,,
আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি ৷ ঠিক আছে তোমাকে উত্তর দিতে হবে না ৷
অনন্যা একপলক লিলির ঘাবড়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসল ৷ অতঃপর বলতে লাগল,,,
কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই ৷ এটা আমার শরীরের অংশ ৷ ওকে তো না দেখার ভান করে থাকতে পারি না ৷ চোখের সমস্যা জন্মের পর দেখা দিয়েছে ৷ যখন আমার বয়স কম তখন হঠাৎ আমার চোখে ছানি দেখা দিল ৷ শুরুতে ওতোটা গুরুত্ব না দিলেও সেটা পরবর্তীতে বেশ ঝামেলার সৃষ্টি করে দিল ৷ অপারেশন করার জন্য ভারতে গিয়েছিলাম কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি ৷ যতবার আশা নিয়ে গিয়েছি ততবারই হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে ৷ শেষে নিজের নিয়তিকে মেনে নিয়েছি ৷ আল্লাহ যদি আমার ভাগ্যে এটাই লিখে রাখেন তো এটাই থাক ৷
লিলি ওর কথা শুনে হতাশ শ্বাস ফেলল ৷ ভীষণ খারাপ লাগা কাজ করতে লাগল ওর ৷ ও অনন্যার কাঁধে হাত রাখল ৷ দুজনের কেউ ই কোনো কথা বলল না ৷ কিছুক্ষণ পর অনন্যা কাটকাট গলায় বলল,,,
কেউ আমাকে সহানুভূতি দেখালে আমার ভালো লাগে না তাই প্লিজ স্বাভাবিক আচরণ করো লিলি ৷ আমাকে অসহায় ভেবে কোনো দয়া দেখানোর চেষ্টা করো না প্লিজ ৷
লিলি হাত সরিয়ে নিল ৷ তারপর হাসিমুখে বলল,,,ঠিক আছে ৷ তোমার যেটা ভালো লাগে না সেটা আমি করব না ৷
অনন্যা মৃদু হাসল ৷ এমন সময় আলমগীর প্রামানিক সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন,,,
তোমরা চুপচাপ হয়ে আছো কেন? বিল্টুর মতো কি কথা না বলার প্রতিজ্ঞা করেছো?
বিল্টু কোথা থেকে উড়ে এসে বলল,,, আমার সম্পর্কে কোনো কথা বলবে না আলু দাদু ৷ আমি ভিআইপি মানুষ ৷ আমার নাম যেখানে সেখানে নেওয়া উচিত না ওকে?
আলমগীর প্রামানিক কপাল কুঁচকে বিল্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
ভিআইপি মানুষ তো বটেই! যে এতো সুন্দর ষান্ত্বনা বানান করতে পারে সে তো ভিআইপি মানুষই ৷ এখনো কোনো রিপোর্টার আসছে না কেন সেটা নিয়েই তো আমি শঙ্কিত ৷
বিল্টু কটমট দৃষ্টিতে আলমগীর প্রামানিকের দিকে তাকিয়ে বলল,,, খবরদার বানানের প্রসঙ্গ তুলবে না তুমি ৷ বানানের সাথে বর্তমানে আমার ব্রেকআপ চলছে ৷
ওহ হো পিকুর মতো হয়ে গেছো দেখছি ৷ না না পিকুর সাথে তোমার কিছু না কিছু তো আছেই ৷
আলমগীর প্রামানিক বৃদ্ধ বিধায় বিল্টু নিজের হাতকে সংযত করে রাখল ৷ তবে চোখ পাকিয়ে আলমগীর প্রামানিকের দিকে এক মিনিটের মতো তাকিয়ে থেকে বলল,,,
তোমাকে আমি দেখে নিব!
আলমগীর প্রামানিক হাই তুলে বললেন,,, এটাও পিকুর কথা ৷
সব কি ওর দলিল করা কথা নাকি? ও যেটা বলবে সেটা অন্য কেউ বলতে পারবে না?
অন্যদের কথা জানি না ৷ কিন্তু পিকুর বলা কথাগুলো অবশ্যই বলা যাবে না ৷
বিল্টু কিছু বলতে ধরেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল এবং ধুপধাপ পা ফেলে ঘরের বাইরে যেতে ধরেও ফিরে আসল ৷ কটমট দৃষ্টিতে আলমগীর প্রামানিকের আপাদমস্তক দেখতে দেখতে ও অনন্যার সামনে গেল তারপর হাত মুঠ করে বিস্কুট আর চানাচুর নিয়ে মুখে দিয়ে খেতে লাগল আর আলমগীর প্রামানিকের দিকে কটমট দৃষ্টি অব্যাহত রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ৷
ওর অবস্থা দেখে আলমগীর প্রামানিক আর লিলি জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ তবে অনন্যা সম্পূর্ণ নিরব দর্শক ৷ লিলির কথায় ও একটুও মন খারাপ করেনি ৷ কিন্তু নিজের অতীতের সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেছে ওর ৷ কতসব আশা নিয়ে দেশের বাইরে গিয়ে যখন ডাক্তারের মুখে নেতিবাচক কথা শুনতে হয় তখনকার অনুভুতির মতো বি*শ্রী অনুভূতি আর দুটো হয় না ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
লিলিদের বাড়িতে আরও কিছুক্ষণ থাকার পর অনন্যা রা খোদেজা বেগমের বাড়িতে ফিরে গেল ৷ দুপুরের খাবার খেতে হবে ৷ অলি খেতে আসতেও পারে আবার নাও পারে ৷ ছাগলের সাথে ওর বোঝাপড়া এখনও শেষ হয়েছে কিনা কে জানে!
অনন্যা মন খারাপ থাকার কারনে খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহ পেল না ৷ তবুও খোদেজা বেগমের মন রক্ষার্থে খেতে বসল ৷ এক লোকমা মুখে দিয়েই ও বুঝে গেল রান্না অনেক অসাধারণ করেন খোদেজা বেগম ৷ অন্য সময় হলে অনন্যা গামলায় গামলায় উনার বানানো খাবার খেত ৷ কিন্তু আজ অল্প একটু খেয়েই উঠে পড়ল ৷
তা দেখে খোদেজা বেগম চিন্তিত স্বরে বললেন,,, খাবার পছন্দ হয়নি?
অনন্যা মৃদু স্বরে বলল,, খাবার অসাধারণ হয়েছে কিন্তু আমার শরীর টা একটু খারাপ লাগছে তাই খেতে পারছি না ৷
সেকি! কি হয়েছে তোমার? জ্বর?
উহু ৷ প্রকৃতির মাঝে কিছুক্ষণ থাকলেই ভালো হয়ে যাব আমি ৷
কথাটা বলে অনন্যা খোদেজা বেগমের বাড়ির আঙিনা আর গেটের কাছাকাছি চলে গেল ৷ সুন্দর সুন্দর ফুল দেখলে মন আপনাআপনিই ভালো হয়ে যাবে ৷ ও যখন প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত তখন দেখল অলি নিজের মুখে হাসির ইমোজি ফুটিয়ে রেখে খুবই গাম্ভীর্যের সাথে হেঁটে আসছে ৷
কিন্তু হঠাৎ উস্টা খেয়ে ও মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সাথে ওর ভাব নিয়ে হাঁটা টাও লজ্জিত হয়ে গেল ৷ ঘটনা টা খুব দ্রুত ঘটল তাই অনন্যা কয়েক সেকেন্ড হতভম্ভ হয়ে থাকল ৷ অলি আশেপাশে না থাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে লাগল ৷ নিশ্চয়ই মাটির থেকে মাফ টাফ চাচ্ছে ৷
ওর কান্ডকারখানা দেখে অনন্যা না চাইতেও জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ ওর হাসির শব্দে অলি চকিতে ওর দিকে তাকাল ৷ অনন্যা এখনও হেসেই চলেছে ৷ অলি খানিকটা লজ্জা পেলেও অনন্যার হাসির দিকে ভালো করে তাকাতেই মুগ্ধ হয়ে গেল ৷ ও হা হয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ ওর চোখের সামনে থেকে সমস্ত কিছু হারিয়ে গেল , থেকে গেল অনন্যা আর ওর হাসির শব্দ ৷ ও কি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেল? হেনিনের কথা কি সত্যি হতে চলেছে? উস্টা খেয়ে কেউ প্রেমে পড়ে বুঝি?
এসবের উত্তর দিতে ইচ্ছুক না অলি ৷ ও ব্যস্ত সামনের রমনী টার দিকে তাকিয়ে থাকতে ৷ মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েও ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে লাজুক হাসি আর চোখে মুগ্ধতা ৷ অলি মনে হয় সত্যি সত্যি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেল!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
অনন্যার মন এখন ঝরঝরে ৷ ওর মন খারাপের কথা মনেই থাকল না ৷ ও হাস্যজ্জ্বল মুখে বিল্টুর সাথে বসে থাকল ৷ অলি খোদেজা বেগমের সাথে বসে খাবার খাচ্ছে ৷ আলমগীর প্রামানিক পাখি ধরার একটা ছোট্ট চেষ্টা চালাচ্ছেন কিন্তু কোনোভাবেই সফল হচ্ছেন না ৷ অনেকক্ষন থেকে উনার কান্ডকারখানা দেখে চলেছে অনন্যা ৷ এবার বিরক্ত হয়ে ও বলতে লাগল,,,
এই বুড়ো খুব কুরকুরি উঠেছে? পাখিরা ক্ষেপে গেলে তোমার মাথার চুল ছিঁড়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে স্টেডিয়াম বানিয়ে দিবে!
আলমগীর প্রামানিক থতমত খেয়ে গেলেন ৷ উনি সবার সাথে কথায় পারলেও নিজের নাতনির সাথে পেরে ওঠেন না ৷ উনি হতাশ শ্বাস ফেলে অনন্যার পাশে এসে বসে পড়লেন ৷ অতঃপর বললেন,,,
তুমি কি পাখিদের পক্ষে না আমার পক্ষে?
পাখিদের পক্ষে ৷
সাথে সাথেই এমন সত্য কথা বলতে নেই ৷ মাঝখানে একটু দম নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলবে ৷ যাতে বিপরীত মানুষ টা একটু কম কষ্ট পায় ৷
যেমন?
তুমি বলবে, ‘দাদু তোমার পক্ষে থাকা আমার জন্য ড্রিম কিন্তু আমি অত্যন্ত নগন্য মানুষ তাই তোমার মতো শ্রেষ্ঠ মানুষের পক্ষে যেতে পারলাম না ৷ আমাকে পাখিদের পক্ষ বেছে নিতে হলো ৷’
অনন্যা চোখ বড় বড় করে নিজের দাদুর দিকে তাকাল ৷ নাতনিকে ওভাবে তাকাতে দেখে আলমগীর প্রামানিক গলা খাকারি দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নাতনির দৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করলেন ৷ অনন্যা কপাল কুঁচকে আরো কিছুক্ষণ উনার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল ৷ অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল,,,
নিজের প্রশংসা নিজে করতে একটুও লজ্জা করল না তোমার?
ছেলে মানুষের লজ্জা নেই ৷ এটা তুমি বারবার ভুলে যাও লালকুমারী ৷
বাকিদের কথা জানি না কিন্তু তোমার যে নেই সেটা বেশ ভালোভাবেই জানি ৷
অনেক উপকার করলে ৷ যাক গে, কেউ যখন প্রশংসা করে না তখন নিজেই নিজের প্রশংসা করতে হয় বুঝলে?
না বুঝলাম না ৷
তাহলে শোনো ৷ একদিন আমার পুরনো বন্ধুদের সাথে একজোট হয়েছি ৷ তো সকলে খুবই আনন্দের সাথে গল্প করতেছিল ৷ কার কি আছে সেটা বেশ গর্বের সাথে বলতে লাগল ৷ তো আমিও এক পর্যায়ে বললাম, ‘আমার কাছে এমন দুটা জিনিস আছে যেটা তোদের কারো নেই’ ৷ সকলে আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল জিনিস দুটোর ব্যাপারে ৷ আমি বলে ফেললাম, ‘আমার ডায়াবেটিস আছে আর তোদের মতো কিছু গা’ধা টাইপ বন্ধুর পাল’ ৷
বিল্টু আর অনন্যা হেসে ফেলল ৷ বিল্টু হাসি অব্যাহত রেখে বলল,,, তারপর?
তারপর আর কি? আমার লজ্জা নেই তাই আমি ওদের টাকায় চা খেয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম ৷ যদিও এরপর ওরা আর আমার সাথে যোগাযোগ করেনি ৷
ওরা দুজন হাসতে লাগল ৷ কিছুক্ষণ হাসির পর্ব চলার পর বিল্টু বলে উঠল,,,
তুমি একটা কথা ভুল বলেছো আলু দাদু ৷ ছেলেদের লজ্জা নেই এটা ভুল কথা ৷ অলি ভাইয়ার অনেক লজ্জা ৷
আলমগীর প্রামানিক তৎক্ষণাৎ বললেন,,, অলি বাবু তো আর ছেলে না ৷ ও তো দুটো বেহায়া রামছাগলের বাবা ৷
চলবে,,,,

