বারবার পাত্রপক্ষের থেকে প্রত্যাখান পাওয়া অনন্যার কাছে নতুন কিছু নয় ৷ কিন্তু আজ যখন শুনল পাত্রপক্ষ ওকে পছন্দ করেছে তখন বেশ খানিকক্ষণ অবাক হয়ে বসে থাকল ৷ তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সব বুঝে ফেলল ও ৷ ড্রয়িংরুমে পাত্রপক্ষরা বসে আছে ৷ সাথে আছে ওর বাবা আপন প্রামানিক আর মা রিনা খাতুন ৷
অনন্যা পাত্রকে একপলক দেখেছিল ৷ বয়সে ওর বাবার থেকে খানিকটা ছোট হবে ৷ তাতে অবশ্য ওর কোনো যায় আসে না ৷ কিন্তু একটু পর কানে যে কথা ভেসে আসল সেটা ওকে ভিতর থেকে ভেঙে দিল ৷ পাত্রের বাবা বলছেন,,,
দেখুন আপনার মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চাবে না কিন্তু আমরা নেহাতই ভালো মানুষ জন্য রাজি হয়েছি ৷ এখন আমাদের পাওনা নিয়ে যদি একটু কথা বলতেন?
আপন প্রামানিক সামান্য হেসে বললেন,,, আপনাদের দাবি কি?
পাত্রের বাবা মানিক মিয়া পান চিবোতে চিবোতে বলতে লাগলেন,,, আমরা বেশিকিছু চাই না ৷ পনের লাখ টাকা, আমার ছেলে মানে আপনার জামাইয়ের জন্য একটা গাড়ি আর আপনার মেয়ের ব্যবহারের জন্য সব ফার্নিচার আর গহনা দিলেই হবে ৷ ব্যস এটুকুই ৷
আপন প্রামানিকের মুখে গাঢ় অন্ধকার ছেঁয়ে গেল ৷ রিনা বেগম চিন্তিত মুখে একবার স্বামীর দিকে তাকালেন ৷ উনাদের অবস্থা দেখে পাত্রের মা বলতে লাগলেন,,,
এটাই যদি না দিতে পারেন তাহলে কিভাবে চলবে? আপনার মেয়ের পাশে দাঁড়ালে আমার ছেলেকে কি যে বাজে লাগবে! তবুও মানবতার খাতিরে আমরা বিয়ে দিতে রাজি হয়েছি ৷ আমার ওমন সুন্দর ছেলেটা আপনার মেয়ের দুঃখ সহ্য করতে পারেনি তাই আমরা কোনো বাক্য খরচ ব্যতীত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি ৷
পাত্রের মায়ের ভাষ্যমতে উনার সুদর্শন ছেলের মাথায় টাক, পেট টা বাইরের দিকে বেরিয়ে উঁকিঝুকি মারছে, দাঁতগুলো সবসময় বের করে রাখা আর সকলকে দেখে হাসা যেন ওই ছেলের জাত অভ্যাস, বয়সের কথা না হয় নাই বলা হলো ৷ পাত্রের থেকে চোখ সরিয়ে আপন প্রামানিক ঠান্ডা গলায় বলতে লাগলেন,,,
আমরা আপনাদের সাথে যোগাযোগ করব ৷
হ্যাঁ তা তো করবেনই ৷ আমরা ছাড়া আপনাদের অন্য কোনো উপায় নেই ৷ ওহ হ্যাঁ খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাপাতি কিছু করেছেন?
‘জ্বি নিশ্চয়ই’ বলে রিনা বেগম চট জলদি খাবারের ব্যবস্থা করতে লাগলেন ৷ শুরুতে অনেক চা নাস্তা দেওয়া হয়েছিল ৷ সেসব খাওয়া শেষ করেছে ৷ রান্না করাই ছিল, রিনা বেগম শুধু গরম করে উনাদের খেতে দিলেন ৷ পাত্রপক্ষ রাক্ষসের মতো গপাগপ সবকিছু খেয়ে বিদায় হলো ৷ অবশ্য যাওয়ার আগে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে গেছে আপনার মেয়ের ভাগ্যে আমার ছেলেই আছে ৷
পাত্রপক্ষকে বিদায় দিয়ে দুই দম্পতি চিন্তিত মুখে নিজেদের রুমে গিয়ে টাকা সংক্রান্ত আলোচনা করতে লাগল ৷ উনারা জমি বিক্রি করে টাকা জোগার করার কথা ভাবছেন ৷ এমন সময় অনন্যা বাবা মায়ের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,,,
ভিতরে আসব?
দম্পতি নিজেদের আলোচনা স্থগিত করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,,, আসো ৷
অনন্যা রুমে প্রবেশ করে সরাসরি বলল,,, এ বিয়েটা ভেঙে দাও ৷
রিনা বেগম ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,,, কেন? অযথা ভাঙতে যাব কেন? তাছাড়া…
তাছাড়া কি মা? আমাকে কেউ বিয়ে করবে না এটাই তো বলতে চাচ্ছ তাই না?
না মানে তেমন কিছু বলতে চাচ্ছি না আমি ৷
অনন্যা জোরপূর্বক একটু হেসে বলল,,, কিন্তু এটাই তো বাস্তব ৷ আমি তা অস্বীকার করব না ৷ তবে একটা কথা না বললেই নয় ৷ যারা বিয়ের আগেই এতোকিছু দাবি করতে পারে তারা বিয়ের পর করবে না এটার কোনো গ্যারান্টি নেই ৷ লোভ জিনিসটা বড়ই খারাপ ৷ এই লোভ মানুষকে অনেক নিচে নামিয়ে ফেলে!
আপন প্রামানিক বলতে লাগলেন,, আমরা সব দিব ৷ তুমি সুখে থাকবে মামনি ৷
সবকিছু দিলেই যে সুখী হবো সেটা কিন্তু না বাবা ৷ আসল কথা হচ্ছে মানুষগুলোর মানসিকতা কেমন ৷ মানসিকতা ভালো হলে একটা খড়ের ঘরেও সুখে থাকা যায় ৷ সত্যি বলতে এদের দেখে আমার ভালো মনে হচ্ছে না ৷
দুই দম্পতি একে অপরের দিকে চিন্তিত মুখে তাকাতে লাগলেন ৷ তা দেখে অনন্যা উনাদের সম্মুখে গিয়ে বসে নরম গলায় বলতে লাগল,,,
মা, বাবা শোনো আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার জন্য কাউকে না কাউকে রেখেছেন ৷ সময় হলে সে আপনাআপনি ধরা দিবে ৷ আল্লাহ তো আমাকে জোড়াবিহীন দুনিয়াতে পাঠায়নি তাই না? কেউ না কেউ তো আছেই ৷ কিন্তু সেই কেউ টা এনারা না ৷
আপন প্রামানিক আর রিনা বেগম মেয়ের কথায় সম্মত হলেন ৷ এমন সময় অনন্যার দাদু আলমগীর প্রামানিক ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন,,,
ওই ফুটবলের সাথে আমি আমার নাতনির বিয়ে দিব না! পেয়েছে টা কি? কেমন লোভীর মতো সব খাবার খেল! ব্রিটিশের দল! যাক গে আমার নাতনি কত সুন্দর ৷ ওর জন্য আমি নিজে পাত্র খুঁজব ৷
উনার কথা শুনে সবাই সামান্য হাসল ৷ অনন্যা দাদুর থেকে নজর সরিয়ে বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,
বাবা আমি ভ্রমণ করতে চাই আমাদের দেশটা ৷ নিজের সৌন্দর্য না হয় নাই দেখলাম কিন্তু দেশের সৌন্দর্য আমি দেখতে চাই ৷
আপন প্রামানিক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,,,
ঠিক আছে তোমার যা ভালো মনে হয় ৷
অনন্যা স্বস্তির হাসি হাসল ৷ এই জীবনে সব দুঃখ কষ্ট একদিকে আর এমন সাপোর্টিভ মা বাবা একদিকে ৷ মূলত এই দুটো মানুষের জন্যই ও বাঁচার স্বপ্ন দেখে ৷ ওহ হ্যাঁ আরও একজন আছে ৷ সে হচ্ছে ওর দাদু ৷
আরো কথাবার্তা বলে অনন্যা নিজের রুমে চলে গেল ৷ গিয়ে হুট করে আয়নায় নিজেকে একটুখানি দেখার স্বাধ জাগল ওর ৷ নিজের মুখের, শরীরের সবকিছুই ঠিকঠাক দেখতে পেল ও ৷ কিন্তু একটা সমস্যা আছে ৷ ওর ডান চোখ টা অন্যদের মতো স্বাভাবিক না ৷ সেই চোখ কিছুটা বাঁকা ৷ সহজ ভাষায় বলতে গেলে অনন্যার এক চোখ ট্যারা ৷
বেশ কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ও হতাশ শ্বাস ফেলল ৷ অতঃপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে প্রকৃতির রুপ দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
পাহাড়ি এলাকা ৷ চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ ৷ গাছে গাছে নানান জাতের পাখি বাসা বেঁধেছে এবং কিচির মিচির করে নিজেদের মাঝে কথা বলে চলেছে ৷ এই সবুজের মাঝে একটা ছোট্ট বাড়ি নজরে আসছে ৷ বাড়ির সামনে একটা ফুলের বাগান , পাশে কয়েকটা ছাগল আর শাক সবজির বাগান ৷ এই সমস্ত কিছু চতুর্দিক থেকে বেড়া দিয়ে আবদ্ধ ৷
এই বাড়িতে আর একটা জিনিস আছে ৷ সে এখন বিছানায় পড়ে আছে ৷ অবশ্য এমনি পড়ে নেই, ও ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে আছে ৷ হঠাৎ ৮-১০ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে সেই বাড়িটাতে প্রবেশ করে গলা উচিয়ে বলতে লাগল,,,
এই যে অলি ভাইয়া ৷ কতক্ষণ ঘুমাবে?
দুই তিনবার ডাকার পর একজন যুবক আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলে তাকাল ৷ দুনিয়াটা দেখার সাথেই ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল ৷ মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখেই ও নিজের গায়ে একটা শার্ট চাপাতে চাপাতে বলল,,,
আসছি রে বিল্টু ৷
যুবকটা বাইরে চলে আসল ৷ ওর নাম অলি আহাদ ৷ তাই কেউ অলি বলে ডাকে তো কেউ আহাদ বলে ডাকে ৷ বিল্টু কোমড়ে হাত গুজে বলল,,,
এতো বেলা করে কেউ ঘুমোয়? তোমার না আমাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল?
মাফ করে দিস রে ৷ আসলে আজ ফজরের পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ৷
বিল্টু নিজের রাগী মুখটা নরম করে বলল,,, আবারও মনে পড়েছিল বুঝি?
অলির মুখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা বেদনা ফুটে উঠলেও সেটা তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে গেল ৷ ও হাসি ফুটিয়ে বিল্টুর মাথায় চাপড় মে*রে বলল,,,
বেশি পাকা পাকা কথা বলিস না তো ৷ চল যাওয়া যাক ৷
প্রকৃতির বুক চিরে ওরা হেঁটে চলেছে ৷ যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই গাছগাছালি ৷ পাশাপাশি ফুটে রয়েছে নাম না জানা অসংখ্য বুনো ফুল ৷ এমন পরিবেশে চলে আসলে অসুস্থ মানুষও মুহূর্তে সুস্থ হয়ে যাবে ৷ হাসিমুখে যেতে যেতে হঠাৎ অলি থেমে গেল ৷ ওকে থামতে দেখে বিল্টুও থেমে গেল ৷ ও ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগল,,
কি হলো? থামলে কেন?
অলি দোনা মোনা করে বলতে লাগল,,, একটা জিনিস চাব ৷ দিবি?
বিল্টু হয়তো বুঝে গেল তবুও বলল,,, কি?
মাফ ৷ একটু আগে তোর মাথায় চাপড় মে*রেছি তার জন্য মাফ করে দিবি?
বিল্টু কপাল চাপড়ে বলল,,আমি জানতাম তুমি এটাই চাইবে ৷ ছোট্ট ছোট্ট বিষয়েও তোমাকে মাফ চাইতে হবে?
ছোট বড় কোনো ব্যাপার না ৷ ভুল করলে মাফ তো চাব তাই না? এখন বল তুই আমাকে মাফ করেছিস?
হ্যাঁ বাবা করেছি মাফ ৷
বলে বিল্টু হাঁটতে ধরলে অলি ওর হাত টেনে ধরে বলল,,, পাক্কা? আমার মন রাখার জন্য মিথ্যা কথা বলছিস না তো?
আল্লাহ! কি এমন করেছো যে আমি মাফ করব না?
তার মানে মাফ করেছিস?
বিল্টু কাটকাট গলায় বলল,,, হ্যাঁএএ ৷
অলি ওর গাল টেনে দিয়ে বলল,,, ধন্যবাদ রে ৷
বিল্টু গালে হাত দিয়ে বলল,, আবার এটার জন্য মাফ চেও না যেন!
ওর কথায় অলি হেসে ফেলল ৷ কিছু বলল না ৷ ওরা দুজন আবারও হাঁটতে শুরু করল ৷ এলাকার ভিতরে চলে আসতেই সবাই ওর সাথে কথা বলতে লাগল ৷ একজন বৃদ্ধ বলতে লাগল,,,
কি রে আহাদ তুই আজ এতো দেরি করে আসলি কেন?
দাদু ভুল হয়ে গেছে ৷ মাফ করে দিও ৷
এভাবে সবার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে অলি আর বিল্টু নির্দিষ্ট বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল ৷ বিল্টুর মা ওকে দেখে বলতে লাগল,,,
আয় বাবা ৷ তোর জন্য আজ খিচুড়ি বানিয়েছি ৷ তোর তো খুব পছন্দের ৷
অলি হাস্যজ্জ্বল মুখে সেদিকে এগিয়ে গেল ৷ খোদেজা বেগম অলি আর বিল্টুকে খিচুড়ি দিতে লাগলেন ৷ ওরা বেশ মজা করে খেতে লাগল ৷ অলি খাওয়ার পাশাপাশি মুগ্ধ হয়ে বলতে লাগল,,,
উমম চাচীজান সেই রান্না করেছো ৷ তোমার হাতে জাদু আছে ৷
খোদেজা বেগম খানিকটা লজ্জা পেয়ে গেলেন ৷ উনি আরেকটু খিচুড়ি অলির পাতে তুলে দিলেন ৷ খাওয়া দাওয়া শেষ করে অলি বিল্টুর সাথে হাত ধুতে লাগল ৷ খোদেজা বেগম সেদিকে একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলতে লাগলেন,,,
বেচারা ছেলেটা জীবনে নিজের বাবা মায়ের মুখ দেখল না আর দেখারও তো উপায় নেই কারন তারা যে দুনিয়াতেই নেই ৷ জামিল চাচা তো ওকে জঙ্গলের এক পাশে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পেয়েছিলেন ৷ তখন ওর বয়স মাত্র পাঁচ বছর ৷ তারপর মানুষ করা শুরু করলেন ৷ কিন্তু কি ভাগ্য দেখো! সেই জামিল চাচাও বেচারাকে একা করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল ৷ তবুও ছেলেটা দিব্যি হাসিখুশি অবস্থায় জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে ৷
আরো একবার হতাশ শ্বাস ফেলে খোদেজা বেগম চোখ সরালেন ৷ অলি বিল্টুর সাথে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠেছে ৷ একটু পর ও খোদেজা বেগমের দিকে এগিয়ে এসে বলতে লাগল,,,
চাচীজান একটা জিনিস চাব ৷ দিবে?
কি বাবা? আরেকটু খিচুড়ি খাবি?
উহু ৷
তাহলে কি?
মাফ ৷
বিল্টু বিরক্তিতে চ কারান্ত উচ্চারণ করে বলতে লাগল, আবার কোন অপরাধ করে ফেললে?
অলি বলতে লাগল,,, ৮ টায় আসার কথা থাকলেও আমি এসেছি ১০ টায় ৷ এর জন্য মাফ করে দাও আমাকে ৷
বিল্টু বলে উঠল,,, আরে এ তো মহাপাপ করে ফেলেছো! এই পাপ থেকে কিভাবে রেহাই পাবে অলি ভাইয়া? আমার তো ভয়ে বুক কেঁপে উঠছে!
চলবে,,,
#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১
[এক ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে আর এক এক্সট্রোভার্ট ছেলের জীবন কাহিনী ফুটিয়ে তুলতে আমি খুবই এক্সাইটেড ৷ তোমাদের কেমন লাগল সেটা বলো দেখি বাপু!]

