#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১৯ (প্রথমাংশ)
আরশানের ফুপু চলে গেছে, কিন্তু যাওয়ার আগে আরাফাত সাহেবকে আরশানের আচরণের বিষয়ে কিছু কথা বলে গেছে। বোনের সেসব নেতিবাচক কথাগুলো শুনে আরাফাত সাহেব মনে মনে বেশ দমে গেছেন এবং একই সাথে ছেলের ওপর অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। অফিসে যাওয়ার পর আরশানকে উনি নিজের কেবিনে ডেকে পাঠান। আরশান এসে বসতেই উনি রুক্ষ স্বরে বললেন — “আরশান! নিজের এমন আচরণ কবে বদলাবে তুমি? এভাবে কি সবসময় চলবে? আত্মীয়-স্বজনদের সাথে এমন দুর্ব্যবহার করলে কিভাবে চলবে? জানো তোমার ফুফু তোমার আচরণে কতটা কষ্ট পেয়েছে?”
“ওহ! তো এতদিন আমাদের বাসায় আরাম করে থেকে যাওয়ার সময় আমার নামে কমপ্লেইনও করে গেছে? Wow!”
“তোমার মজা মনে হচ্ছে এগুলো, তুমি কিন্তু আমাদের সবার সামনেই তোমার ফুফুর সঙ্গে রুক্ষভাবে কথা বলেছিলে আরশান আর নীরাকেও নাকি কি বলেছ তুমি? মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে। এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমাদের?”
“আব্বু, কেনো আমি অমন আচরণ করেছি বা কিছু বলেছি সেটা কি তোমার বোন বা ভাগ্নি বিস্তারিত বলেনি?”
আরাফাত সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন কারণ উনি এ বিষয়ে সত্যিই বিস্তারিত কিছু সেভাবে জানতে চাননি — “কি বলবে?”
বাবার প্রতিক্রিয়া দেখে আরশান বুঝে গেলো যে ওর একপাক্ষিক দোষ দিয়েই গেছে, তো ও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো — “আমার হাতে কারো নষ্ট করার মতো অতিরিক্ত সময় নেই আব্বু। তোমার বোন ও ভাগ্নিকে আমি শুধু ওকে তাদের লিমিট মনে করিয়ে দিয়েছি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার চর্চা আমি কারও থেকেই বরদাস্ত করি না, সে আত্মীয় হোক বা তোমরা!”
ছেলের কথা শুনে আরাফাত সাহেবের মাথা রাগে টনটন করে উঠলো, উনি বর্তমানে আরশানের সঙ্গে যথাসম্ভব ঠান্ডা আচরণের চেষ্টা করেন কিন্তু মাঝে মাঝে ছেলের এমন শীতল আচরণে নিজের রাগ ধরে রাখতে পারেন না। আরশান ছোটো থেকেই নিজের তৈরি জগৎটায় থাকতে ভালবাসে, কেউ সেখানে হস্তক্ষেপ করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে। সেটা বাসায় হোক বা বাইরে। আরাফাত সাহেবকে এ জন্যে লোক সমাজে অনেকসময় কথাও শুনতে হয় কিন্তু ছেলেকে বকে এখন বিশেষ লাভ হয় না কারণ বকা শুনে আচরণ শোধরানোর বয়স আরশান বহু আগেই পার করে এসেছে! ওনার কথা যেহেতু শুনতে আরশান আগ্রহী নয় তাই বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে বললেন ছেলের সঙ্গে কথা বলতে। রাতে…সুরভী বেগম ছেলের ঘরে আসেন। ছেলের অনুমতি নিয়েই তিনি ঘরে ঢোকেন, যেহেতু ছেলে তার ঘরে ঢোকা বিশেষ পছন্দ করেনা। আরশান বিছানায় বসেছিলো, মাকে এ সময় দেখে ও বিশেষ অবাক হলো না যেনো ও জানতো ওর মা আসবে। সুরভী বেগম এসে ছেলের পাশে বসলেন, কাজের বিষয়ে টুকটাক কথা শেষে হুট করেই আরশানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আরশান বাঁকা হেসে বললো — “তোমার হাসবেন্ড কি তোমাকে পাঠিয়েছে আমাকে বোঝানোর জন্যে?”
“আরশান, তোর বাবা তোর খারাপের জন্য তো কিছু বলছে না। ওনার ওপর রাগ করিস না। আত্মীয়রা তো এমনই হয়, একটু এদিক-সেদিক হলে কথা শোনাবেই আর তোর ফুপুর কাহিনী তো জানিস। নীরার সঙ্গে তোকে বিয়েতে রাজি করানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিলো। ভাগ্যিস তোর বাবা পাত্তা দেয়নি”
“আব্বু পাত্তা দিলেই বা কি? আমি এমন কারো সঙ্গে রুম শেয়ার করতে পারবো না যার আচরণ আমার পছন্দ নয়”
আরশান এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকাল। সুরভী বেগম মৃদু হেসে আবার বললেন— “ঠিক আছে। তোর নিজের মর্জি আছে সেটা আমি বুঝি। কিন্তু বাবা, ভবিষ্যতে যখন তুই বিয়ে করবি, তখন যদি তুই নিজের মর্জিমতো এমন কঠোর আচরণ করিস, তবে সেই মেয়েটার তো খুব খারাপ লাগবে। আমরা না হয় তোকে জানি, তোর আচরণে অভ্যস্ত কিন্তু সে তো তোকে ভয় পাবে। এভাবে কি সংসার হয়?”
মা আরশানের হাতটা নিজের হাতের ওপর রেখে আরও নরম গলায় বললেন— “সবসময় কি নিজের জেদ ধরে রাখা ঠিক? যাকে তুই নিজের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিবি, তাকে কি তুই এই ভয়ংকর আরশানের সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য করবি? নাকি তার জন্য নিজেকে একটু হলেও নরম করবি?”
আরশান মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। ওর মনে হঠাৎ রিমির মুখটা ভেসে উঠল! মনে মনে ভেবে বসলো যে রিমিকে তো ও নিজের স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত করতে সক্ষম হচ্ছে। এটাই যথেষ্ট!
আরশান মায়ের কথায় উত্তর দিলো — “যাকে আমি নিজের করে নেব, সে আমার এই রুক্ষতাকেও ভালোবাসতে শিখবে। আর যদি না শেখে, তবে আমি তাকে আমার ছাঁচে গড়ে নিতে জানি। আমার মর্জির বাইরে আমার পৃথিবীতে কারোরই কোনো জায়গা হবেনা।”
সুরভী বেগম ছেলের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আরশানকে বদলানো অসম্ভব। ও নিজেকে এমনভাবে তৈরি করে নিয়েছে, যে নিজের গতিতে চলে। ছেলের সি অবস্থার জন্যে উনি নিজেকেও দায়ী করেন, হয়তো ওনার উপস্থিতিতে আরশান এমন হতো না! নিজের স্বামীর ওপরও অনেক ক্ষোভ আছে ওনার কারণ বর্তমানে আরশানের এমন হয়ে ওঠার পেছনে কারণটা ছিলো আরাফাত সাহেব নিজেই!
____________________________________
সুরভী বেগম তখন একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন, চাকরির সুবাদে তাকে দিনের অনেকটা সময় বাইরে, এমনকি মাঝেমধ্যে অন্য শহরেও কাটাতে হতো। ছোট্ট আরশান বড় হচ্ছিল তার বাবার শাসনে আর দাদার কড়া নজরদারিতে। আরাফাত সাহেব ছিলেন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী, ছেলেকে দেওয়ার মতো সময় তাঁর হাতে ছিল না, কিন্তু প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। আরশানের দাদা ছিলেন এক কঠোর স্বভাবের মানুষ। তিনি চাইতেন বংশের বড় নাতি আরশান হবে একদম নিখুঁত। কিন্তু আরশান তখন ছিল ভীষণ দুরন্ত, চঞ্চল এক শিশু। আর এটাই ছিল দাদার বিরক্তির কারণ। তিনি নিজে নাতিকে কখনো শাসন করতেন না কিন্তু সারাক্ষণ আরাফাত সাহেবের কানে বিষ ঢালতেন — “ছেলেকে তো মানুষ করতে পারছ না, ও তো বখে যাচ্ছে।” বাবার এই খোঁটা আরাফাত সাহেবের ইগোতে গিয়ে লাগত। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে তাঁর বন্ধুদের সন্তানরা যখন শান্ত-ভদ্র হয়ে বসে থাকত, আরশান তখন দৌড়ে বেড়াত। পড়াশোনায় মন ছিল না ওর, আর এটাই আরাফাত সাহেবের পৌরুষে আঘাত করত।আরশানের বয়স যখন মাত্র আট, তখন থেকেই তার ওপর শুরু হলো অমানবিক এক শাসন। আরাফাত সাহেবের মাথায় যেন ভূত চেপে বসল ছেলেকে যেভাবেই হোক ‘পারফেক্ট’ বানাতে হবে। সামান্য ভুলের জন্য ভয় দেখানো বা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখার মতো শাস্তি হয়ে উঠল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাবার সেই অতিরিক্ত কঠোরতায় আরশানের ভেতরের সেই চঞ্চল শিশুটা একদিন গুমরে ম’রে গেল। ও বদলে যেতে শুরু করল। ও ঠিক তেমনই হয়ে উঠল যেমনটা ওর বাবা চেয়েছিলেন পড়াশোনায় তুখোড়, ভীষণ শান্ত আর বাবার বাধ্য। কিন্তু এই শান্ত স্বভাবের আড়ালে যে এক ভয়ংকর ঝড় দানা বাঁধছে, সেটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সুরভী বেগম যখন ছেলের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন, তিনি তড়িঘড়ি চাকরি ছেড়ে বাসায় ফিরে এলেন। কিন্তু ততদিনে আরশানের মনস্তত্ত্বের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। ওর দেখাদেখি ছোট বোন ইনায়ার ওপরেও এর প্রভাব পড়েছিল, তবে ইনায়া দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেও আরশান তলিয়ে যেতে থাকল এক অন্ধকার গহ্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আরশানের আচরণে এক চরম বিকৃতি লক্ষ্য করা গেল। ও নিজেকে একটা অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে বন্দি করে ফেলল। একা থাকা ওর নেশা হয়ে দাঁড়াল। ও কাউকে সহ্য করতে পারত না, ওর রুমে কারও প্রবেশ নিষেধ ছিল। এমনকি নিজের বাবা-মায়ের স্পর্শও ওর কাছে ছিল অসহ্য। আর সেই সাথে জন্ম নিল এক ভয়ংকর জেদ যা ও পছন্দ করবে, তা যেকোনো মূল্যে হাসিল করতে হবে।
একবার পাড়ার এক কুকুর আরশানের খুব পছন্দ হয়েছিল। ও চেয়েছিল ওটাকে পোষ মানাতে, কিন্তু কুকুরটি ওর পোষ মানেনি উল্টো পাশের বাসার এক শান্ত ছেলের সাথে কুকুরটির বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আরশান এটা মেনে নিতে পারেনি। ওর মাথায় তখন সেই অন্ধকার দর্শন কাজ করত “যা আমার হবে না, তা এই পৃথিবীতে আর কারোরই হবে না।” একদিন ঠান্ডা মাথায় ও নিজের সাইকেল দিয়ে পিষে কুকুরটাকে মে’রে ফেলল।
ছেলের এই ধ্বংসাত্মক আচরণ দেখে আরাফাত সাহেব শিউরে উঠলেন। তড়িঘড়ি করে আরশানকে প্রখ্যাত মনোবিদ ড. জুবায়েরের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ল যে, শৈশবের সেই অত্যধিক মানসিক চাপ আর একাকীত্ব থেকে আরশান OCD (Obsessive Compulsive Disorder)-এ আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষ করে কোনো কিছু নিখুঁতভাবে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর আশেপাশে সবকিছু নিখুঁত রাখার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা এগুলো ছিল সেই রোগেরই লক্ষণ।দীর্ঘদিন চিকিৎসা আর কাউন্সেলিংয়ের পর আরশান বর্তমানে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওর অবচেতন মনে সেই ‘পজেসিভ’ সত্তাটা এখনো রয়ে গেছে। ও এখনো বিশ্বাস করে, ওর প্রিয় জিনিসে অন্য কারও ভাগ থাকা মানেই সেটা অপবিত্র হয়ে যাওয়া। রিমির প্রতিও আরশানের যে টান তৈরি হয়েছে সেটা ওর অসুখেরই একটা অংশ ছিলো বটে কিন্তু ধীরে ধীরে ওর মনে হচ্ছে রিমিকে যেনো নিজের অসুখের অংশ নয় বরং ওর জীবনের একটা অংশ হিসেবে হাসিল করতে চাইছে!
চলবে…
[আজকে পর্ব দেওয়ার কথা ছিলো না কারণ বেশি লিখতে পারিনি আর লিখতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। পরে ভাবলাম যেটুকু লিখেছি দিয়ে দেই! ]
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1ERDoHqDCn/?mibextid=oFDknk

