মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_১৬

0
24

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১৬

বাসায় ফিরতে আজ রিমির বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছিলো, রিমি ভেবেছিল হয়তো ইলোরা বেগমের শাশুড়ি কিছু বলবে কিন্তু ও যখন বাসায় ঢুকলো তখন ভদ্রমহিলা নিজের ঘরে ছিলেন বিধায় ওকে কোনো কথা শুনতে হয়নি। ইদানিং রিমি বাসায় ফেরার সময় আয়শার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসে, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রুমে ঢুকে আয়েশার হাতে চিপসের প্যাকেট দিতেই পিচ্ছি মেয়েটা এই কদিনেই রিমির ভক্ত হয়ে গেছে। রিমিকে দেখা মাত্রই ও খিলখিল করে হেসে ওর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রিমির সারা দিনের ক্লান্তি যেন ওই এক চিলতে হাসিতে উবে গেল রিমির। ফ্রেশ হয়ে রিমি যখন ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসল, ভেজা চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেল লেকের পাড়ের সেই পনেরো মিনিটের কথা। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই রিমির গাল দুটো বিনা কারণেই লাল হয়ে উঠল। ওর মনে হয়েছিল ঘুমের ঘোরে ও বোধহয় খুব অদ্ভুত আর জীবন্ত একটা স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নে ও দেখেছিল আরশান খুব নিবিড়ভাবে ওর ঠোঁট ছুঁয়ে দিচ্ছে! রিমি নিজের মনেই মাথা নাড়ল। চিরুনিটা টেবিলের ওপর রেখে ও বিড়বিড় করে নিজেকেই বকা দিলো — “রিমি! তুই কি দিন দিন পা’গল হয়ে যাচ্ছিস? ওই অ’সভ্য লোকটাকে নিয়ে এসব আজেবাজে স্বপ্ন দেখার মানে কী? একবার লোকটা জোর করে অমন করেছিল বলে কি এখন অবচেতন মনেও সেই কথা বারবার ভাববি!”

রিমি আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ও নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, যা দেখেছে সেটা ওর স্বপ্ন ছিল কিন্তু ও একবারের জন্যও বুঝতে পারল না যে সেই মুহূর্তটা কোনো অলীক স্বপ্ন ছিল না। ও জানলই না যে, আরশান ওর অবাধ্য ঘুমের সুযোগ নিয়ে নিজের বুকের ভেতরের জমে থাকা পঁচিশ দিনের অস্থিরতাটুকু নিংড়ে নিয়েছে!

সকাল থেকেই আরশান আজ ভীষণ ব্যস্ত কারণ একটা জরুরি মিটিং আছে তো ও দ্রুত তৈরি হয়ে নেয়। ডাইনিং টেবিলে সবার জন্য নাস্তা সাজানো হলেও আরশানের সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। ও দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে নামছিল ঠিক তখনই সিড়ির মুখেই আরশানের পথ আটকে দাঁড়াল নীরা। ওর পরনে বেশ জমকালো একটা সালোয়ার কামিজ, মনে হচ্ছে সকাল সকাল আরশানের নজরে পড়ার জন্যই এই বিশেষ প্রস্তুতি। ও হাসিমুখে একটা প্লেট এগিয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল — “আরশান ভাইয়া, নাস্তা না করেই বেরিয়ে যাচ্ছ?”

“আমার এখন খাওয়ার সময় নেই”

“আজ আমি নিজে নাস্তা বানিয়েছি ভাইয়া, একটু খেয়ে যাও। দেখো কেমন হয়েছে”

আরশান এক মুহূর্ত থামল। ওর কপালে বিরক্তির ভাঁজ গভীর হলো। ও নীরার দিকে না তাকিয়ে খুব নিরাসক্ত এবং রুঢ় গলায় বলল — “তোমার হাতের রান্না খাওয়ার চেয়েও পৃথিবীতে অনেক জরুরি কাজ আছে নীরা। রান্নার খেয়ে প্রশংসা করে তোমার সখ মেটানোর চেয়ে আমার কাজ বেশি জরুরি”

কথাটা বলেই আরশান নীরাকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। সাত সকালে আরশানের কড়া কথা শুনে নীরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ডাইনিং টেবিলে বসে আয়ান আয়েশ করে পাউরুটি চিবোচ্ছিল। ও দৃশ্যটা দেখে ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল— “উচিত কাজ হয়েছে! ভাইয়াকে চেনেনি তো এখনো, সকালবেলা ওনার মুডের সাথে পাঙ্গা নিতে যাওয়া মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।”

ইনায়ার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ও ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে মাথা নিচু করেই বলল— “উমম…ঠিকই বলেছিস। নীরা আপুর এতো বাড়াবাড়ি করা উচিত না”

ও নিজের চ্যাটিংয়ে এতটাই মগ্ন যে আশেপাশে কী হচ্ছে তা ওর কাছে পৌঁছাচ্ছেই না, শুধু আয়ান যা বলেছে সে হিসেবেই উত্তর দিয়েছে। নীরার চোখ দুটো জলে ভরে এল। ও গুটিগুটি পায়ে এসে ওর মায়ের পাশে বসে পড়ল। ফুপুর মেজাজও এবার চড়ে গেল। উনি সুরভী বেগমকে উদ্দেশ্য করে বেশ ঝাঁঝালো গলায় বললেন — “ভাবী, আরশান যদি এরকমই করতে থাকে তাহলে ও মেয়ে পাবে কোথায়? আজকালকার মেয়েরা তো আর আমাদের আমলের মতো ধৈর্যশীল নয়। এত রুক্ষ আচরণের ছেলেকে কোনো মেয়েই পছন্দ করবে না!”

সুরভী বেগম নিজের ছেলের স্বভাব খুব ভালো করেই জানেন। ছেলের নামে এমন কড়া কথা শুনে ওনার মাতৃসত্তা কিছুটা আহত হলো। উনি শান্ত গলায় কিন্তু বেশ দৃঢ়ভাবে জাস্টিফাই করে বললেন— “ও তো সবসময় এমন করে না আপা। আর আপনিই বলুন, ওর অফিসের তাড়া আছে বুঝে আমিও কিন্তু ওকে খেতে বলিনি। এখন এমন সময় কেউ যদি পথ আটকে দাঁড়ায়, তবে যে কেউ বিরক্ত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই না আপা?”

সুরভী বেগমের এই মোক্ষম জবাবে ফুপুর মুখটা একটু তেতো হয়ে গেল। উনি আর কথা বাড়ালেন না, তবে নীরার মুখটা তখনো অন্ধকার হয়ে আছে। আরশানের এই অবজ্ঞা ওর কাছে তীরের মতো বিঁধেছে!

ভার্সিটিতে মেয়েদের কমনরুমের দরজাটা ঠেলে বেরোতেই রিমির চোখ আটকে গেল করিডোরের শেষ মাথায়। শাফিন দাঁড়িয়ে আছে, ওর সামনে ওদেরই ক্লাসমেট একটা মেয়ে। মেয়েটার দিকে ঝুঁকে পড়ে কী যেন বলছে ও, আর মেয়েটা লজ্জায় রাঙা হয়ে হাসছে। শাফিনের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, যেটা ও প্রায় সব মেয়ের সামনেই বিলিয়ে বেড়ায়। রিমির মনটা ভেতরটা খচখচ করে উঠল। ইনায়া কদিন আগেই ওকে জানিয়েছে যে ও শাফিনকে পছন্দ করে। বন্ধুর এই খুশিতে রিমি সেদিন খুশি হলেও, আজ দৃশ্যটা দেখে ওর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। শাফিনের এই অতিরিক্ত মিশুক স্বভাব, বিশেষ করে মেয়েদের সাথে এই ফ্লার্ট করার ধরনটা রিমির মোটেও পছন্দ না। রিমি স্থির করল, আজই ইনায়াকে সাবধান করতে হবে। ইনায়া মেয়েটা খুব সহজ-সরল, আবেগের বশে ভুল মানুষের হাতে নিজের মনটা তুলে দিক সেটা রিমি অন্তত বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে হতে দিতে পারে না। ক্লাস ব্রেকের সময় রিমি ইনায়াকে একরকম টেনে নিয়েই ক্যাফেটেরিয়ার দিকে বেরোল। ওর পরিকল্পনা ছিল নিরিবিলিতে বসে ইনায়াকে বোঝাবে যে, শাফিনকে নিয়ে এগোনোর আগে ওর আরও কয়েকবার ভাবা উচিত — “শোন ইনায়া, তোকে একটা কথা বলার ছিল। শাফিনকে নিয়ে যে তুই ভাবছিস…”

রিমির কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ইনায়ার চোখ দুটো হঠাৎ চকমক করে উঠল। ও রিমির হাতটা হালকা ধাক্কা দিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল — “আরে দেখ রিমি! শাফিন এদিকেই আসছে!”

রিমি তাকিয়ে দেখল শাফিন বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে ওদের দিকেই হেঁটে আসছে। ও দূর থেকেই হাত নাড়ল ওদের দিকে তাকিয়ে। রিমির অস্বস্তিটা চরমে পৌঁছালেও ইনায়া যেন দুনিয়া ভুলে গেল। ও খুশিতে ডগমগ হয়ে রিমির হাত ছেড়ে দিয়ে শাফিনের দিকে এক পা এগিয়ে গেল। শাফিন কাছে আসতেই রিমি এক পা পিছিয়ে গেল। ইনায়া শাফিনের সাথে গল্পে এতটাই মশগুল হয়ে পড়ল যে, রিমির উপস্থিতি যেন ওর কাছে গৌণ হয়ে গেল। রিমি দূরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও যা বলতে চেয়েছিল, তা গলার কাছেই আটকে রইল। ইনায়াকে শাফিনের সঙ্গে গল্পে মত্ত দেখে ওকে রেখেই রিমি ক্যাফেটেরিয়ার দিকে পা বাড়ালো, খিদেয় মেয়েটার পেট চো চো করছে!

ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে বসে রিমি খুব মনোযোগ দিয়ে একটা স্যান্ডউইচ চিবোচ্ছে। ব্রেডটা কিছুটা শুকনো, আর ভেতরের পুরটাও যৎসামান্য। ও জানে এই নামমাত্র খাবারে ওর দুপুরের ক্ষুধা মিটবে না, কিন্তু পকেটের অবস্থার কথা চিন্তা করলে সস্তার মধ্যে এর চেয়ে ভালো বিকল্প আর নেই। রিমি চিবোতে চিবোতে উদাস নজরে চারপাশে তাকাল। ওর ঠিক সামনের টেবিলটাতেই এক সিনিয়র কাপল বসে আছে। ছেলেটা খুব যত্ন করে নিজের স্যান্ডউইচ থেকে এক টুকরো ছিঁড়ে মেয়েটার মুখে তুলে দিচ্ছে, আর মেয়েটা খিলখিল করে হেসে ওর কাঁধে মাথা রাখছে। ওদের চোখেমুখে এক ধরণের নিশ্চিন্ত আনন্দের ঝিলিক। দৃশ্যটা দেখে রিমির বুকের ভেতরটা হুট করে একটু হাহাকার করে উঠল। ও এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলো আসলে তো এটা আমারও প্রেম করে বেড়ানোর বয়স। প্রিয় মানুষের হাত ধরে হাঁটা, গল্প করা এসব তো আমারও পাওয়ার কথা ছিল! কিন্তু রিমির বাস্তবতার পৃথিবীটা বড্ড বেশি কর্কশ। ওর মাথায় এখন হাজারটা দুনিয়াদারি চিন্তা। মায়ের নতুন বাসায় কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে, সামনের সেমিস্টারের ফি কোত্থেকে আসবে, টিউশনির টাকা দিয়ে কি মাসের খরচটা টানা যাবে এইসব হিসেব মেলাতেই ওর দিন কেটে যায়।রিমি আবার স্যান্ডউইচে কামড় দিল। হঠাৎই ওর মস্তিস্কের কোণে আরশানের সেই গম্ভীর মুখটা ভেসে উঠল। কাল রাতের সেই দৃশ্যটা ওর স্মৃতির আয়নায় টলটল করে উঠল। বিশেষ করে সেই হেলমেটের বিষয়টা।আরশানের তো আগে কখনো বাইক ছিল না। লোকটা তো সবসময় গাড়িতে চলাফেরা করতেই অভ্যস্ত। তাহলে হুট করে বাইক কেনল কেন? আর দুটো হেলমেট কেনার কারণটাই বা কী? রিমি চিবোনো থামিয়ে একটু ভাবল। আরশান বলেছিল — “সেফটির জন্য দুজনেরই হেলমেট পরা উচিত, তাই একসাথে দুটোই কিনেছিলাম।” ওর অবচেতন মনে একটা কৌতূহল উঁকি দিল তবে কি বাইকটা আরশান শুধু রিমির জন্যই কিনেছে যাতে এখানে আসতে সুবিধা হয়? ভাবতেই রিমির ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য, প্রায় অদৃশ্য এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। লোকটা ভয়ংকর, লোকটা জেদি, কিন্তু এই যে সূক্ষ্ম একটা যত্ন, এই যে রিমির নিরাপত্তার কথা ভেবে আগেভাগেই একটা হেলমেট কিনে রাখা এই বিষয়টা রিমির মনেও যেন একটু ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দিল। রিমি নিজের মনেই মাথা নাড়ল — “পা’গল নাকি আমি? লোকটা কি’ডন্যাপ করার হুমকি দেয়, আর আমি ওনার এক হেলমেটের কাহিনী দেখে দেখে গলে যাচ্ছি! রিমি, তোর মাথাটা না সত্যিই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।”

ভার্সিটির গেট দিয়ে বেরোনোর সময় ইনায়া আর রিমি একসাথেই ছিল। রিমির খুব ইচ্ছা ছিল ইনায়াকে শাফিনের ব্যাপারে একটু সাবধান করে দেওয়ার, কিন্তু শাফিন নাছোড়বান্দার মতো ওদের পিছু ছাড়ল না। ও সারাক্ষণ ইনায়ার সাথে হাসাহাসি আর গল্পে মজে রইল, ফলে রিমি চাইলেও কোনো ব্যক্তিগত কথা তোলার সুযোগ পেল না। ইনায়া শাফিনের সাথে চলে যাওয়ার পর রিমি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসের জন্য দাঁড়াল। ঠিক যখন ও ভিড় ঠেলে বাসের পাদানিতে পা রেখেছে, তখনই ওর ফোনটা তীব্র স্বরে বেজে উঠল। স্ক্রিনে সেই পরিচিত নাম—’আরশান’! রিমি ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই আদেশসূচক গম্ভীর কণ্ঠস্বর — “Rimi, I need you in my office right now. Don’t make me wait.”

রিমি চমকে উঠল। বাসের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে ও বিড়বিড় করে বলল — “এখন? কিন্তু আমার তো আজ টিউশনি আছে। আমি এখন কীভাবে আসব?”

আরশানের গলার স্বর এবার এক ধাক্কায় কয়েক ধাপ নিচে নেমে এল, যা রিমির শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল— “I don’t care about your d’amn private tuitions, Rimi! I said NOW! Move your feet and get here before I lose my temper.”

ফোনটা কেটে গেল। রিমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, আবার কি হলো এই লোকটার? আরশানের সাথে করা সেই শর্তের কথা মনে পড়ল ওর ও কথা দিয়েছিল যেকোনো সময় আরশান ডাকলে ও সাড়া দেবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ও বাসের কন্ডাক্টরকে বলে মাঝরাস্তায় নেমে উল্টো দিকের বাসে উঠে পড়ল। ইনায়া একবার ভার্সিটি যাওয়ার সময় আরশানের অফিসটা দূর থেকে দেখিয়েছিল কিন্তু আজ রিমি একটা ভুল করে বসল, ও তাড়াহুড়ো করে এক স্টেশন আগেই বাস থেকে নেমে গেল। সেখান থেকে আরশানের অফিস পর্যন্ত হেঁটে যেতে রিমির আরও পনেরো মিনিট দেরি হয়ে গেল। লিফট দিয়ে উপরে উঠে আরশানের কেবিনের দিকে এগোতেই আরশানের সেক্রেটারি ইয়াসির হন্তদন্ত হয়ে ওপাশ থেকে দৌড়ে আসছে। রিমিকে আরশানের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইয়াসির চোখ কপালে তুলল। ও ফিসফিস করে আতঙ্কিত গলায় বলল — “ম্যাম! আপনি এখন ভেতরে যেতে পারবেন না! স্যার আজ প্রচণ্ড রেগে আছেন”

রিমি ঢোক গিলল, ফোনেও আরশানের কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছিল রেগে আছে। ও ইয়াসিরের দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল— “উনিই আমাকে আসতে বলেছেন”

ইয়াসির অসহায়ভাবে মাথা চুলকাল, যেহেতু আরশান আসতে বলেছে ওর তো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। রিমি ভেতরে যাওয়ার আগে জিজ্ঞাসা করলো — “আপনার স্যার এতো রেগে কেনো আছে? কিছু হয়েছে?”

ইয়াসির জবাব দিলো — “সরি ম্যাডাম, আমরা আমাদের কাজের বিষয়ের কিছু শেয়ার করতে পারবো না”

তো রিমি ধরে নিলো আরশানের রাগের কারণটা ওর কর্ম সম্পর্কিত কিছু! রিমি যখন আরশানের কেবিনের সেই স্বচ্ছ কাঁচের দরজাটার দিকে তাকালো, কাঁচের ওপাশে আবছা দেখা যাচ্ছে আরশানকে। ও ওর বিশাল রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে আছে, মাথাটা পেছনে হেলানো, চোখ দুটো বোজা। ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকায় ওর গলার সুঠাম গঠন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টাইটা ছিঁড়ে একপাশে সরিয়ে রাখা। টেবিলের ওপর রাখা দামী চশমাটা যেন এক অব্যক্ত ক্লান্তির সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। রিমি কাঁপাকাঁপা হাতে সেই মসৃণ কাঁচের দরজায় খুব সন্তর্পণে টোকা দিল। টুং করে একটা শব্দ হলো নিস্তব্ধ করিডোরে। শব্দটা হতেই আরশান ঝটকা দিয়ে চোখ মেলল। ওর চোখের মণি দুটো আজ রক্তবর্ণ হয়ে আছে, যেন ভেতরে কোনো এক দাবানল পুড়ছে। অন্য সময় রিমির অপ্রস্তুত দশা দেখে ওর ঠোঁটের কোণে যে বাঁকা হাসিটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে, আজ সেখানে কেবল মরুভূমির রুক্ষতা। ও এক পলক নিজের বাম হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল, সময়টা মেপে নিল নিখুঁতভাবে। তারপর রিমির দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে হাড়হিম করা গম্ভীর গলায় আদেশ করল — “Come here!”

রিমি একটু এগিয়ে এলো, কিন্তু টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আরশান এবার চেয়ারটা সামনের দিকে টেনে আনল। ওর দু-হাতের কনুই টেবিলের ওপর রাখা, আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জট পাকানো। ও রিমির দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে আবার তর্জনী নির্দেশ করল — “I said, come closer!”

রিমি আরও কয়েক পা এগিয়ে একদম টেবিল পেরিয়ে আরশানের সামনে এসে দাঁড়াল। আরশানের শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব শীতল কিন্তু ভারী গলায় বলল — “আজ একটা বড় ডিল হাতছাড়া হয়ে গেল রিমি। মাসের পর মাসের প্রিপারেশন, নির্ঘুম রাত সবকিছু বেকার গেলো কারণ ক্লায়েন্টের আমাদের প্রপোজাল পছন্দ হয়নি”

রিমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ও কী বলবে জানা নেই কিন্তু আরশানের পরবর্তী বাক্যটা রিমির পায়ের নিচের মাটি আবারও কাঁপিয়ে দিল। ও রিমির চোখের গভীরে সরাসরি তাকিয়ে বলল — I’m loosing my mind now! soothe me right now!”

রিমির মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে উঠল। ও একদম আহাম্মক বনে আরশানের দিকে তাকিয়ে রইল। একজনের প্রফেশনাল লাইফে লস হয়েছে, মাথা গরম হয়ে আছে সেটা আর একজন মানুষ কীভাবে ঠান্ডা করবে? তাও আবার ওর মতো কেউ!

রিমি আমতা আমতা করে অস্ফুট স্বরে বলল — “মেজাজ আপনার গরম সেটা আমি কিভাবে ঠিক করবো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি বরং কফি খান কিংবা অন্যকিছু…”

আরশান চোখটা বুজে আবারো হেলান দিলো চেয়ারে — “do whatever it takes to calm me down.”

আরশানের এই অদ্ভুত জেদ আর মেজাজ ঠিক করার ‘অসম্ভব’ আবদার যেনো রিমিকে এক অদৃশ্য চোরাবালিতে ফেলে দিল। ও বুঝতে পারছে না, এই মুহূর্তে ওর ঠিক কী করা উচিত। এই উন্মাদ লোকটার মেজাজ শান্ত করার কোনো মন্ত্র কি ওর কাছে আছে?

চলবে…

[আজকে কারেন্ট না থাকায় গল্প দিতে পারবো না ভেবেছিলাম, তবে রাত গভীর হলেও কারেন্ট আসতেই নতুন পর্ব দিয়ে দিলাম !! Enjoy Readers ✌️]

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/187V1xUoJu/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here