#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২১
জন্মদিন উপলক্ষে রিমির জন্যে ওর মা ওর পছন্দের খাবার বানিয়েছিলেন ও উপহারও দিয়েছিলেন কিন্তু এসবের কিছুই মেয়েটা মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। রিমি আজ বাসায়ই ছিলো। এতো বছর পর একটা জন্মদিনে মাকে পেয়েছে তাই ভেবেছিল মায়ের সঙ্গেই দিন কাটাবে। বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ফ্লোরে। রিমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু ওর দৃষ্টিতে কোনো গন্তব্য নেই। পেছনে ইলোরা বেগম আলমারি গুছিয়ে রাখছিলেন। ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা, যা কেবল কাঁচের ওপর হাত ঘষার শব্দের মতো কানে বাজছে। রিমি হঠাৎ খুব শান্ত গলায়, পেছন না ফিরেই প্রশ্ন করল — “মা, তুমি কি সত্যিই চাও আমি ওই ছেলেটাকে বিয়ে করি?”
ইলোরা বেগম হাতের কাজ থামিয়ে মেয়ের পিঠের দিকে তাকালেন। ওনার চেহারায় কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরণের যান্ত্রিক প্রশান্তি। ওনি ধীর পায়ে রিমির কাছে এসে দাঁড়ালেন। রিমির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন — “কেন চাইব না বল তো? ছেলেটা তো ভালোই, বংশমর্যাদাও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তোকে ওর পাশে বেশ মানায়ও। তা ছাড়া এই বাসার সবার দিকে তাকিয়ে দেখ, সবাই তোর বিয়ে নিয়ে কত ভাবছেন। বিয়ে হলে মন্দ কি!”
মায়ের মুখে ‘সবাই তোর কথা ভাবছে’ এই কথাটা শোনার পর রিমির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ও জানালার কাঁচ থেকে চোখ সরিয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। রিমি নিচু স্বরে, বিদ্রূপের সুরে বলল — “সত্যিই কি আমার ভালোর জন্যই এসব করছো মা? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ আছে? আমার তো কেন জানি অন্যকিছু মনে হচ্ছে।”
মেয়ের এই অপ্রত্যাশিত তীরের মতো বিঁধে যাওয়া প্রশ্নে ইলোরা বেগম যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ওনার কপাল কুঁচকে এল একরাশ বিস্ময়ে। উনি রিমির দুহাত চেপে ধরে আশ্বাসের সুরে বললেন — “কী বলছিস এসব রিমি? তুই কি ভাবছিস আমি তোর ক্ষতি চাইব? এসব অলুক্ষুণে চিন্তা মাথা থেকে বের কর। অনেক ভেবেই কিন্তু আমি এই বিয়ের সম্মতি দিয়েছি। দেখিস, সব ভালোই হবে”
মায়ের এই অতিমাত্রার আগ্রহ আর জোরপূর্বক দেওয়া আশ্বাস রিমির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিল। ও হাতটা আলতো করে সরিয়ে নিল। ওর হঠাৎ মনে হলো, হয়তো দূরত্ব সত্যিই মায়া কমিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছেদ কি তবে মায়ের হৃদয়ের সেই অদৃশ্য নাড়ির টানটাও ক্ষীন করে দিয়েছে? নিজের জন্মদাত্রী মায়ের ওপর থেকে যখন বিশ্বাস উঠে যায়, তখন পৃথিবীর বাকি সব রঙ ফিকে মনে হতে থাকে। রিমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। ইলোরা বেগম এক অচেনা চরিত্রহীন ছেলের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে চাইছেন শুধু কিছু ঋণের শোধের বিনিময়ে এই সত্যটা রিমির ভেতরটাকে তিলে তিলে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। অথচ মা এখনো জানেন না যে রিমি সব জেনে গেছে। রিমি ঠিক করেছে, আপাতত ও এই বাসায় একটা বস্তুর মতো থাকবে। ওর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এখন চুপচাপ থেকে পরিস্থিতির সাথে যতদিন মানিয়ে নেওয়া যায় এ ছাড়া আর কোনো পথ ওর খোলা নেই!
টিউশনির জমানো টাকাগুলো গুছিয়ে রিমি এই সেমিস্টারের ফি নিজেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরাফাত সাহেবকে যখন ও জানাল যে উনি যেন আর ফি না দেন। বর্তমানে ইনায়া নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। শাফিনের সেই কুরুচিপূর্ণ কথা শোনার পর ওর সাজানো পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রিমিকে ও এখন আর ভুল বোঝে না। সাময়িক বিরহের চেয়ে আজীবন প্রতারিত হওয়া অনেক বেশি যন্ত্রণার এই ধ্রুব সত্যটা ইনায়া বুঝতে পেরেছে। রিমি ইনায়া আবারো সেই পুরোনো দিনগুলোর মতো ক্লাসের শেষে একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। তো কদিন ধরে ইনায়ার ধুম জ্বর আসায় ও কদিন ধরে ভার্সিটিতে আসতে পারছেনা। রিমিকে একাই আসতে ক্লাস করতে হচ্ছে। প্রথম বর্ষের শেষ সেমিস্টারের ফি জমা দেওয়ার তারিখও চলে এসেছে। ক্লাসের বিল্ডিংয়ে শেষ লেকচারটা শেষ করে ও যখন অফিসের বিল্ডিংয়ের দিকে পা বাড়াল, তখন সূর্যের তেজটা বেশ চড়া। অফিস বিল্ডিংয়ের মেইন গেট দিয়ে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তেই রিমির বুকটা ধক করে উঠল। সামনের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে আরশান!
এই অসময়ে আরশান এখানে? মুহূর্তের জন্য রিমির মনে এক তীব্র কৌতূহল জাগলেও পরক্ষণেই সেই বৃষ্টির রাতের জবরদস্তি আর থাপ্পড়ের কথা মনে পড়তেই ওর সারা শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। ও আরশানের সাথে কোনো ধরণের তর্কে যেতে চায় না, এমনকি ওর ছায়াও মাড়াতে চায় না। রিমি সিদ্ধান্ত নিল ও আরশানকে দেখেনি এমন ভান করে একদম পাশ কাটিয়ে দ্রুত প্রস্থান করবে। রিমি মাথা নিচু করে নিজের কাঁধের ব্যাগটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু আরশানকে এড়িয়ে যাওয়া কি এতই সহজ? রিমি পাশ কাটানোর ঠিক আগের মুহূর্তে আরশান এক বিশাল পাহাড়ের মতো ওর পথ আটকে দাঁড়াল। রিমি ডানে সরতে চাইলে আরশানও ডানে সরল, বামে সরতে চাইলে আরশানও বামে। এক প্রকার জবরদস্তি করেই সে রিমির সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিল। রিমি আর সহ্য করতে পারল না, মাথা তুলে আরশানের দিকে তাকাল। ও কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু এই লোকটাকে কিছু বলে যে কোনো লাভ নেই তাও রিমির অজানা নয়! আরশান রিমির চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, ও ভেবেছিল মেয়েটা হয়তো বরাবরের ন্যায় প্রশ্নের ঝুলি খুলে বসবে কিন্তু সেই চোখে আজ কোনো কৈফিয়ত নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। কেন ও এই অসময়ে ভার্সিটিতে এসেছে সেই প্রশ্নের উত্তর জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই! আরশান খুবই নরম স্বরে রিমিকে জিজ্ঞাসা করলো — “You look drained. Are you okay?”
রিমি কোনো উত্তর না দিয়ে এক পলকও আরশানের চোখের দিকে না তাকিয়ে আবার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আরশান এবার ক্ষিপ্র গতিতে রিমির বাহু টেনে ধরল। আরশান ওকে নিজের শরীরের খুব কাছে টেনে নিল। ওর শরীরের সেই তীব্র পারফিউমের সুবাস রিমির মগজে ঝিম ধরিয়ে দিচ্ছে। রিমি আশেপাশে তাকাল, এ সময়ে বেশিরভাগ স্টুডেন্ট ক্লাসে তাই বাইরে তেমন কেউ নেই আর এই বিল্ডিং একটু কর্নারে হওয়ায় এখানে লোকের আনাগোনাও একটু কম। রিমি চোখ গরম করে তাকালো — “আরশান, এটা ভার্সিটি! এখানে এমনকিছু করবেন না যাতে আমার আপনার দুজনেরই সম্মানহানি হয়”
আরশান যেনো ওর কথা শুনে মজা পেলো! ও বাঁকা হেসে বললো — “তোমার জন্যে বদনাম হতে আমার কোনো আপত্তি নেই”
আরশান এবার একটু ঝুঁকে এল রিমির কানের খুব কাছে। ওর তপ্ত নিশ্বাস রিমির কানের লতিতে বিঁধছে বিষাক্ত তীরের মতো। ও খুব শান্ত অথচ চরম হুমকির সুরে ফিসফিস করে বললো — “Get used to answering me the very first time I ask. ok? তোমার এই অবাধ্যতা কমানোর জন্য আমার কাছে অনেক পথ খোলা আছে”
রিমি দাঁতে দাঁত চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। ও ভেবেছিল আরশান হয়তো আবার কোনো জবরদস্তি করবে, আজকে এমনকিছু করলে রিমি ওকে আরেকবার থা’প্পড় দিতেও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো। কিন্তু সেসবের প্রয়োজন হয়নি, আরশান নিজেই ওকে ছেড়ে দিয়ে দিয়ে বললো — “take good care of yourself!”
রিমি উত্তর দিলো না! আরশান আর ওখানে দাঁড়ায়নি চলে গেছে। ও যেতেই রিমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অফিস বিল্ডিংয়ের দো-তলায় অ্যাকাউন্টস সেকশনের কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। কিছু কারণে এ বার বেশ কিছু ক্লাস মিস গেছে ওর। উপস্থিতির হার কম থাকায় সেমিস্টার ফির সাথে বড় অংকের একটা ‘নন-কলেজিয়েট ফাইন’ বা ক্লাস না করার জরিমানা গুনতে হবে ওকে। সঠিক মনে নেই কতদিন ক্লাস মিস গেছে, তাই ফাইনের টাকার পরিমাণ জানতেই এখানে এসেছে। অফিসের সামনে মোটামুটি একটা লাইন। অনেকেই আজ ফি জমা দিতে এসেছে তাই ভিড়টা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। রিমি লাইনের একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল। মিনিট পনেরো পর রিমির পালা এল। কাউন্টারের ওপাশে বসা মধ্যবয়সী লোকটি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে একঘেয়ে ভঙ্গিতে রিমির দিকে তাকাতেই রিমি বললো যে ও ফাইন কতো হয়েছে সেটা জানতে চায়। লোকটা জিজ্ঞাসা করলো — “ডিপার্টমেন্ট, রোল, সেশন বলো”
রিমি সবকিছু বলার পর লোকটা কিবোর্ডে রিমির আইডি নম্বর টাইপ করতে শুরু করলেন। কয়েক সেকেন্ড পর লোকটা ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন, তারপর রিমির দিকে তাকিয়ে বললেন— “তোমার ফাইন সমেত সব ফি তো জমা হয়ে গেছে”
রিমির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ও অস্ফুট স্বরে বলল — “জমা হয়ে গেছে? কিন্তু আমি তো…আচ্ছা আরেকবার একটু চেক করে দেখুন তো”
“দেখার কিছু নেই, তোমার টাকা জমা হয়ে গেছে”
রিমি ভাবলো আরাফাত সাহেব কি তবে সেমিস্টার ফি ভুলে দিয়ে দিলেন? লোকটা এর মধ্যে হুট করে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় যা বললেন সেটা রিমির শুনতে বড্ড অস্বাভাবিক লাগলো!
“আরে, তোমার হাসবেন্ডই তো কিছুক্ষণ আগে এসে পেমেন্ট স্লিপ জমা দিয়ে গেলো”
‘হাসবেন্ড’ শব্দটা শোনার সাথে সাথে রিমির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ওর চোখ দুটো কপালে উঠে গেছে, মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে আছে। রিমির কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠলো!
“আমার…আমার হাসবেন্ড?”
“স্টুডেন্টরা সাধারণত নিজেরাই আসে পেমেন্ট স্লিপ নিয়ে, গার্ডিয়ানরা কমই আসে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো তোমার ভাই তাই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পরে বললো হাসবেন্ড”
“কী বলছেন আপনি? আমার তো বিয়েই হয়নি! হাসবেন্ড আসবে কোত্থেকে?”
কাউন্টারের লোকটা রিমির কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বললেন — “বিয়েশাদীর বিষয়গুলোকে এ যুগের ছেলেমেয়েরা মজা মনে করে বলেই তো এখনকার ছাড়াছাড়ির হার এতো বেশি! কি মজা পাও এসব করে কে জানে”
রিমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাউন্টারের লোকটা ভাবছে ও হয়তো মজা করছে বা বিয়ের কথা গোপন রাখতে চাইছে, তাই ওনাকে আর বিশেষ কিছু বললেন না। কিন্তু রিমির মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কে হাসবেন্ডের পরিচয় দিয়ে টাকা জমা দিয়ে এলো তাও আবার এই ভার্সিটির অফিসের মতো পাবলিক প্লেসে?
__________________________________
আরশানের সামনে টেবিলের ওপর রাখা তিনটি স্ট্যাম্প পেপার। কিছুটা খসখসে, অফ-হোয়াইট রঙের সেই দাপ্তরিক কাগজের ওপরের অংশে জলছাপে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের লোগো। আর তার ঠিক নিচেই বড় বড় অক্ষরে কালো কালিতে টাইপ করা শিরোনাম— ‘বিবাহের হলফনামা’। আরশান খুব ধীরলয়ে নিজের দীর্ঘ আঙুলগুলো সেই আইনি দলিলের ওপর দিয়ে বুলিয়ে নিল। কাগজের নিচে নোটারি পাবলিকের সেই গাড় লাল গোল সিলমোহর আর অ্যাডভোকেটের স্বাক্ষর যেন আরশানের জয়োল্লাসের চূড়ান্ত সাক্ষী। রিমির সেই গোটা গোটা অক্ষরের অরিজিনাল সই—’Rubaiya Samad’—আজ আরশানের চোখের সামনে এক পৈশাচিক বিজয়ের দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরশানের ঠোঁটের কোণে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। রিমি জানুক বা না জানুক, ওর জীবনের সবটুকু স্বাধীনতা এখন আরশান মির্জার এই আইনি শিকলে বন্দি! কেবিনের দরজার কাছে ইয়াসির দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আরশানের এই নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করছিল। আরশানের চোখে যে একাধিপত্যের নেশা ও দেখতে পাচ্ছে, তাতে ওর মনের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। ইয়াসির আরশানের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহচর, তাই হয়তো আজ একটু বেশিই সাহস সঞ্চয় করে সে নিচু স্বরে মুখ খুলল — “স্যার, একটা কথা বলব?”
আরশান সেই হলফনামার কাগজগুলো থেকে চোখ না সরিয়েই খুব নির্লিপ্ত স্বরে বলল — “বলুন।”
“স্যার, কাজটা কি সত্যিই ঠিক হলো? ম্যাডামের অগোচরে, ওর সইটা অন্য একটা কাজে নিয়ে সেটাকে বিবাহের হলফনামায় ব্যবহার করা…উনি যখন এই সত্যটা জানবেন, তখন পরিস্থিতি হয়তো আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একটা মেয়ের অমতে বিয়ের মত এমন…”
ইয়াসিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরশান ওর আঙুল চালানো থামিয়ে দিল। কেবিনের শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তেই এক তীব্র উত্তেজনায় টানটান হয়ে গেল। আরশান খুব ধীর গতিতে মাথা তুলে ইয়াসিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — “Mr. Yasir, Are you interested in her?”
ইয়াসির চমকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে গেল — “ন-না স্যার! আপনি ভুল বুঝছেন। আমার তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই”
আরশান চেয়ার থেকে উঠে ইয়াসিরের মুখোমুখি দাঁড়ালো। তার কাঁধে নিজের একটা হাত রাখল। ইয়াসির কাঁধে তখন একটা চাপ অনুভব করলো, চাপটা মৃদু হলেও ইয়াসির বুঝতে পারল এটা একটা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা!
“I don’t like anyone interfering in my personal territory. So mind your own business”
____________________________________
রিমি কিছুতেই ভেবে কুল কিনারা করতে পারছিল না যে কে ওর স্বামী পরিচয়ে ঘুরছে, কাউন্টারের ওই লোককেও জিজ্ঞাসা করেছিল যে দেখতে কেমন ছিলো কিন্তু লোকটা বিশেষ কিছু বলতে পারেনি। এর মধ্যেই হলো আরেক কাহিনী। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওই বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করা ছেলেটার সঙ্গে রিমিকে আজ শহরের একটি নামী দামী একটু রেস্টুরেন্টে আসতে হয়েছে। বাসার সবার জোরাজুরিতে আর রিমি যে ওনাদের সব পরিকল্পনার কথা জানে এই বিষয়টা গোপন রাখতে ও ছেলেটার সাথে ডিনারে আসতে রাজি হয়েছে। ও ভাবল, জনসম্মুখে এই ছেলেটা অন্তত ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর এই সুযোগে ও সরাসরি জানিয়ে দেবে যে এই বিয়েতে ওর বিন্দুমাত্র মত নেই। রেস্টুরেন্টটি বেশ বড় হলেও আজ গেস্ট সংখ্যা হাতেগোনা। রিমি আর ওই ছেলেটি একদম কোনার দিকের একটা টেবিলে বসল। রিমি সচেতনভাবেই নিজের আর ছেলেটার মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেছে। ওর বসার ভঙ্গি আর চোখের চাউনি বলে দিচ্ছে ও কতটা অস্বস্তিতে আছে। ছেলেটি যখন বারবার কথা বলার চেষ্টা করছিল, রিমি শুধু সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। ওর মনজুড়ে তখন একটাই চিন্তা কীভাবে এই জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।ঠিক সেই মুহূর্তেই রেস্টুরেন্টের প্রধান দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল আরশানের পুরো পরিবার। ওরা উল্টোপাশের একটা বড় রাউন্ড টেবিলে গিয়ে বসল। রিমি এক সাইড হয়ে বসেছিলো তাই ও লক্ষ্যই করেনি যে আরশানরা ঠিক ওর উল্টো দিকেই বসেছে।কিন্তু আরশান? আরশানের তীক্ষ্ণ নজর এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। ও চেয়ারে বসার আগেই ওর চোখ গিয়ে স্থির হলো সেই কোণায়। যেখানে রিমি অন্য এক পুরুষের সাথে নিভৃতে বসে আছে! আরশানের চোয়াল ইতিমধ্যে শক্ত হয়ে উঠেছে। ইনায়া হঠাৎ রিমিকে দেখে উল্লসিত হয়ে উঠল — “আরে, ওইটা তো রিমি!”
ইনায়া উৎসুক হয়ে উঠে দাঁড়াতেই সুরভী বেগম ওর হাত চেপে ধরলেন। নিচু স্বরে বললেন — “না ইনায়া, এখন ডাকার দরকার নেই। দেখছিস না, ও একটা ছেলের সাথে বসে আছে”
“সেটাই তো জানতে চাইছি আম্মু! রিমি যে কাউকে ডেট করছে সেটা তো আমাকে কখনো বলেনি!”
আরাফাত সাহেব মৃদু গলা খেঁকিয়ে মেনু কার্ডটা হাতে নিলেন। শান্ত গলায় বললেন — “এ যুগের ছেলেমেয়েরা তো আগে পছন্দ করে তারপর বিয়ে করে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই ইনায়া। ওদের ডিস্টার্ব করো না, হয়তো কোনো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলাপ করছে। আমরা নিজেদের ডিনারে মনোযোগ দিই।”
ইনায়া কাঁধ নাচিয়ে বসে পড়ল। ও ভাবল রিমি যেহেতু ওদের খেয়াল করেনি, তাই আজ আর যেচে গিয়ে পরিস্থিতি নষ্ট করবে না। পুরো পরিবার যখন খাবার অর্ডার দিতে ব্যস্ত, তখন আরশান পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। ওর সামনে রাখা পানির গ্লাসটা এমনভাবে ধরে আছে যেন সেটা এক নিমিষেই চুরমার করে দেবে। আরশানের এই অস্বাভাবিক শান্ত রূপটা কেউ লক্ষ্য না করলেও আয়ানের নজর এড়ালো না কারণ এ পরিবারে একমাত্র ওই তো জানে যে আরশান রিমিকে পছন্দ করে!
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/17UFid6Y8y/?mibextid=oFDknk

