#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২৩
[𝗔 𝗨𝗻𝗶𝗼𝗻 𝗪𝗶𝘁𝗵 𝗕𝗹𝗶𝘀𝘀, 𝗔 𝗠𝗲𝗿𝗴𝗲𝗿 𝗪𝗶𝘁𝗵 𝗠𝗮𝗹𝗶𝗰𝗲]
ফার্মহাউসের ঘড়ির কাঁটা রাত ন’টার ঘর ছুঁইছুঁই। আরশানের ভেতরে এখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে। রিমি যখন একবার ‘হ্যাঁ’ বলেছে, তখন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করার পাত্র আরশান নয়। ও প্রথমেই নিজের বিশ্বস্ত কিছু লোককে রিমির বড় চাচা ও চাচীকে ‘সম্মানের সাথে’ তুলে আনার নির্দেশ দিল। এরপর আরশান আরো কিছু প্রস্তুতি সেরে রাত যখন সাড়ে এগারোটা বাজলো তখন আরাফাত সাহেবকে ফোন করে বললো — “আমি ইয়াসিরকে পাঠিয়েছি। তোমরা ওর সঙ্গে চলে এসো”
আরাফাত সাহেব তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন! ঘড়ির দিকে আরেকবার তাকিয়ে সময়টা দেখে উনি বললেন — “এই রাত-বিরাতে কোথায় যাব? আর তুমি কোথায় আছো? বাসায় আসোনি কেনো কাল থেকে?”
আরশান ফোনের ওপাশে এক রহস্যময় হাসি হাসল, এরপর শান্ত গলায় বলল — “আগেই এতো প্রশ্ন কেনো আব্বু? এলেই সব জানতে পারবে। তোমরা শুধু ইয়াসিরের সাথে চলে এসো। আর হ্যাঁ, পারলে একটু সেজেগুজে এসো। After all, it’s a special occasion!”
কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আরশান ফোনটা কেটে দিল। সুরভী বেগম পাশে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন — “আরশান ফোন করেছিলো নাকি? কোথায় ও এখন?”
আরাফাত সাহেব কপালে হাত দিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন — “কিছুই বুঝলাম না। বললো, ইয়াসির নাকি আমাদের নিতে আসছে”
“নিতে আসবে? এই অসময়ে কোথায় যাবো?”
“তোমার ছেলে কি সোজাভাবে কোনো কথার উত্তর দেওয়ার মানুষ? কিন্তু ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে বড় কোনো গণ্ডগোল পাকাতে যাচ্ছে”
আরাফাত সাহেবের মনে কেমন সন্দেহ জাগলো, কিন্তু উনি ধারণা করতে পারছেন না যে তার ছেলে ঠিক কি করতে যাচ্ছে। এদিকে ফার্মহাউসের করিডোরে এক চরম করুণ এবং একই সাথে অদ্ভুত পরিস্থিতি। রিমির বড় চাচা আর চাচীকে তাদের বাসার ডাইনিং টেবিল থেকে তুলে আনা হয়েছে। চাচার পরনে তখনও চেককাটা লুঙ্গি আর একটা হাফ হাতা গেঞ্জি। ওনারা ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন, যেন কসাইখানায় নিয়ে আসা হয়েছে। চাচী ফিসফিস করে রিমির চাচার কানে বললেন — “হ্যাঁ গো, সত্যি করে বলোতো তুমি কারো কাছে থেকে কি মোটা অংকের টাকা ধার টার করেছো নাকি? শোধাতে পারোনি বলেই কি এভাবে তুলে আনলো?”
“আমি কারো কাছ থেকে কোনো টাকা আনিনি”
“তাহলে এরা আমাদের কেনো তুলে আনলো? আমাদের মে’রে ফেলবে নাকি? ওই লোকগুলোর কোমরে তো পিস্তল গোঁজা ছিল!”
চাচা বিরক্ত হয়ে ধমক দিলেন — “আগেভাগেই ভয় পেও না তো! কী হচ্ছে আমিও তো বুঝতে পারছি না। ওই লোকগুলো তো একটা কথার উত্তরও দিল না, শুধু বললো বসের অর্ডার আছে!”
ওনারা যখন নিজেদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই ইয়াসিরের সাথে আরাফাত সাহেব, সুরভী বেগম, ইনায়া আর আয়ান ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। সুরভী বেগম ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলেন। সামনে বসা এই অচেনা মানুষ দুটোকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন — “আপনারা কারা?”
রিমির চাচী সুরভী বেগমসহ বাকি সবাইকে একবার পরখ করে আরও ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি চাচার গায়ে চিমটি কেটে বললেন — “দেখো দেখো, আমরা একা নই। আরও মানুষ তুলে আনা হয়েছে! এটা কি কোনো বড়সড় আন্তর্জাতিক পা’চারকারী দল? মনে হচ্ছে আমাদের কিডনি লিভার বেঁচে দেবে”
রিমির চাচীর চোখে পানি এসে গেলো এ কথা বলতে বলতে, এদিকে আরাফাত সাহেব কথাটি শুনেই রেগে আ’গুন হয়ে গেলেন…
“কী ফালতু কথা বলছেন আপনারা?”
রিমির চাচা বললো — “সত্য কথা বলছি আমাদের সবাইকে এখানে নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্যে উঠিয়ে আনা হয়েছে”
আরাফাত সাহেব বিরক্ত হলেন — ” অদ্ভুত লোক তো আপনি, কি ভুলভাল বকছেন? তুলে আনতে যাবে কেন? আমার ছেলে আমাদের আসতে বলেছে। কিন্তু আমার ছেলের ফার্মহাউসে আপনারা কোত্থেকে এসেছেন? কারা আপনারা?”
রিমির চাচা এবার চোখ বড় বড় করে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন — “আপনার ছেলে? তার মানে এই গু’ণ্ডাগুলোকে আপনার ছেলে পাঠিয়েছে? আপনারাও এসবের সঙ্গে যুক্ত?”
পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এক লেজেগোবরে অবস্থা। সুরভী বেগম আর রিমির চাচী একে অপরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ইয়াসির এক কোণে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ঘামছে। আরাফাত সাহেবের সঙ্গে তো রিমির চাচা কথা কাটাকাটিও লেগে গেছিলো। সে সময় আরাফাত সাহেব বিরক্ত হয়ে ইয়াসিরকে জিজ্ঞাসা করলো — “ইয়াসির! কি হচ্ছে এখানে আমাদের একটু বলবে?”
ইয়াসির মোটামুটি সব জানা সত্বেও না উত্তর দিলো — “আমি জানিনা স্যার”
আরাফাত সাহেব রেগে উঠলেন — “জানো না মানে কি? আরশান তো তোমাকে বলেছিলো আমাদের এখানে নিয়ে আসতে। তাহলে এখানে কি হচ্ছে সেটা তোমার জানার কথা”
ইয়াসির নীরব রইলো কারণ আরশান ওকে বারণ করেছে যে কাউকে কিছু বলা যাবেনা। এসব দেখে আয়ান সুযোগ বুঝে ইনায়ার হাতে একটা জোরে চিমটি কাটল। ইনায়া ‘উফ’ করে উঠে আয়ানকে একটা কিল মে’রে বলল — “কী শুরু করলি তুই? এমনিতেই পরিস্থিতি সুবিধার না দেখছিস তো!”
আয়ান নিচু স্বরে বিড়বিড় করল — “কী হচ্ছে রে এসব? মনে হচ্ছে কোনো থ্রিলার মুভি অর্ধেক শেষ হওয়ার পর সিনেমা হলে ঢুকে গেছি। এখন আগামাথা কিছুই মাথায় ঢুকছে না। সব একদম জগাখিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে!”
ইনায়া অস্থির হয়ে বলল, “দাঁড়া, আমি ভাইয়াকে ফোন করছি। ওই বলবে সব”
ইনায়া ফোন বের করে ডায়াল করতে যাবে, ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের এসে রিমিকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলো আরশান। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মাঝখানে হঠাৎ পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আরশান ধীর পায়ে হেঁটে আসছে আর ওর শক্ত হাতের মুঠোয় বন্দি হয়ে আছে রিমির অবশ হাতটা। রিমি কোনো প্রতিবাদ করছে না, কোনো কান্নাকাটি করছে না। ও শুধু এক যান্ত্রিক পুতুলের মতো আরশানের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করে যাচ্ছে। যেন ভেতরের সব অনুভূতি আজ কোনো এক অতল গহ্বরে বিসর্জন দিয়ে এসেছে ও। নিজের চাচা-চাচী আর আরশানের পুরো পরিবারকে এভাবে এক ছাদের নিচে দেখে রিমির চমকে উঠতেই আরশান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড় করে বলল — “কী ভেবেছিলে রিমি? গোপনে তোমাকে নিজের করে নেব? না! আরশান মির্জা যা করে, বুক ফুলিয়ে সবার সামনেই করে। আমাদের সম্পর্কের এই নতুন শুরুর সাক্ষী আমাদের দুই পরিবারই হবে। Life is about to change, Mrs. Mirza.”
আরশানের কথাগুলো রিমির কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। জালিয়াতি করে যে লোকটা বিয়ের মতো একটা বিষয় নিয়ে জঘন্য রসিকতা করল, সে আজ সবার সামনে সাক্ষী রেখে বিয়ের কথা বলছে! ওদের দেখেই রিমির চাচা বিদ্যুৎবেগে বলে উঠলেন — “রিমি! তুই এখানে? আর এই ছেলেটা কে?”
আরাফাত সাহেবও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। নিজের ছেলেকে এভাবে রিমির হাত ধরে সবার আবির্ভূত হতে দেখে তাঁর র’ক্তচাপ যেন এক লাফে বেড়ে গেল। সুরভী বেগম তড়িৎগতিতে এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন — “আরশান! এসবের মানে কী? রিমি তোর সঙ্গে এখানে কী করছে?”
আরাফাত সাহেব রেগে বললেন — “তোমার কথা শুনেই আমার মনে হয়েছিল কিছু একটা গন্ডগোল অবশ্যই আছে। তুমি ঠিক কি করতে চাইছো?”
সবার মনে শত প্রশ্ন জমে আছে, একেকজন একেক প্রশ্নও করছে কিন্তু আরশান কোনো উত্তর দিল না। ও রিমির হাতটা আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরল, যেন বুঝিয়ে দিল এটাই ওর চিরস্থায়ী ঠিকানা। ও শান্ত স্বরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল — “সবাই শান্ত হয়ে বসুন। সব প্রশ্নের উত্তর এখনই পেয়ে যাবেন।”
আরাফাত সাহেব গর্জে উঠলেন….
“শান্ত হব মানে? তুমি মাঝরাতে একটা মেয়ের সঙ্গে এখানে কি করছো? আর আমাদের এখানে নিয়ে এসে বলছো শান্ত হতে? কী করতে চাইছো পরিষ্কার করে বলো!”
আরশান বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর চোখে কোনো ভয় নেই, বরং এক আদিম জয়ের তৃপ্তি। ও বাবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে ইয়াসিরকে ইশারা করল — “মি. ইয়াসির, সবাই উপস্থিত আছে। কাজী সাহেবকে এবার নিয়ে আসুন”
‘কাজী সাহেব’ শব্দটা শোনার সাথে সাথে ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া যেন বরফ হয়ে গেল। রিমির চাচী ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরলেন, আর আরাফাত সাহেব তো সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। আয়ান আর ইনায়া একে অপরের দিকে একনজর তাকালো। আয়ান নিজের কৌতূহল আটকে রাখতে না পেরে ফট করে জিজ্ঞাসা করে বসল — “ভাইয়া তুমি কি ওকে বিয়ে করবে?”
আয়ানের প্রশ্ন শুনে সবাই ওর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালো, ইনায়া সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে কারণ ওর ভাই আর রিমির মধ্যে কিছু চলছে বা এরকম কিছু ও কখনো টেরই পায়নি আর না ওর বাসার কেউ বুঝেছে। আরশান ছোটো ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে বাঁকা একটা হাসি দিয়ে বললো — “Bingo!! we are getting married today, right now”
পুরো ড্রয়িংরুমে যেন এক প্রলয়ংকরী স্তব্ধতা নেমে এল। সুরভী বেগম ও আরাফাত সাহেব যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আরাফাত সাহেব সবসময় চিন্তা করতেন যে তার ছেলে কি আদৌ কখনো বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চাইবে? কারণ আরশান বরাবরই অন্যরকম কিন্তু এভাবে যে ছেলে তাদের সারপ্রাইজ দিয়ে বসবে কে জানত? রিমির চাচা-চাচী একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন যেন কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড দেখছেন। ইনায়া রিমির খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর চোখেমুখে বিস্ময় আর একরাশ কৌতূহল। ও অস্ফুট স্বরে রিমির দিকে তাকিয়ে বলল — “রিমি! তুই… তুই ভাইয়াকে পছন্দ করিস? অথচ কোনোদিন একবারও তো আমাকে বলিসনি! তাহলে সেদিন রেস্টুরেন্টে ওই ছেলেটা কে ছিল রে? যার জন্য তুই এত কান্নাকাটি করছিলি?”
ইনায়ার প্রশ্নে রিমির স্তব্ধ হয়ে রইলো, কি বলবে? কিভাবে বোঝাবে সব? রিমি মুখ খোলার আগেই আরশান হাত বাড়িয়ে ইনায়াকে থামিয়ে বললো…
“এসব ফালতু প্রসঙ্গ এখন বাদ দে ইনায়া। বিয়ের আগে আমি বাইরের কোনো মানুষের নাম বা কথা শুনতে চাই না। আজ রিমির অতীত-বর্তমান সব আমার নামের সাথে জুড়ে যাবে, so just stop it!”
আরাফাত সাহেব সোফা থেকে ধপ করে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের এমন একরোখা এবং অদ্ভুত আচরণে তিনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন!
“আরশান! বিয়েটা কি তোমার কাছে ছেলেখেলা মনে হয়? এভাবে বিয়ে হয়? বিয়ের আগে দুটো পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন আরো কত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় সেসব সম্পর্কে ধারণা আছে?”
আরশান বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর চোখে কোনো অনুশোচনা নেই।
“কেনো? এভাবে বিয়ে করতে কি সমস্যা আছে আব্বু? পাত্র-পাত্রী দুজনেই আমরা প্রাপ্তবয়স্ক। আমরা দুজনেই রাজি। সাক্ষী হিসেবে আমাদের দুই পক্ষের পরিবার এখন এক ছাদের নিচে উপস্থিত আছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?”
“তুমি কাকে বিয়ে করবে না করবে সেটা নিয়ে আমার সঙ্গে একবার আলাপের প্রয়োজন বোধ করলে না? আমার তাকে পছন্দ হবে কিনা সেটাও জানার দরকার নেই তোমার?”
আরশান বাবার প্রশ্নের উত্তরে খুব শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল — “আব্বু, আমি যদি তোমাকে বলতাম যে আমি রিমিকে বিয়ে করতে চাই তুমি কখনোই রাজি হতে না বরং বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করতে। এমনকিছু করতে যাতে আমাদের বিয়েটাই না হয়। she doesn’t possess the high lineage or the elite social standing that we do! You care more about the prestige of our family name than the happiness of your own son. Right?”
ছেলের কথা শুনে আরাফাত সাহেব স্তব্ধ হয়ে রইলেন! সুরভী বেগম নীরবে একবার স্বামীর দিকে আরেকবার ছেলের দিকে তাকালেন। আরশান যে সত্য বলেছে এ বিষয়ে তিনি অস্বীকার করতে পারবেন না। আরাফাত সাহেব আগে জানলে হয়তো এমনকিছুই করতো। বাবাকে নীরব দেখে আরশান বললো…
“সারাজীবন তো আমি তোমার পছন্দ চলেছি আব্বু, আমার বিয়ের সিদ্ধান্তটা না হয় আমিই নিলাম & she’ll be a good daughter in law! so don’t worry”
রিমির চাচা এবার সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন
“দেখো আমি জানিনা তোমাদের মধ্যে কি হচ্ছে। তোমরা যা খুশি করো, কিন্তু আমাদের কেন নিয়ে এলে? রিমি তো আমাদের সাথে এখন থাকেও না। ও তো ওর মায়ের সাথে থাকে তাহলে আমাদের কেন জড়াচ্ছো এই ঝামেলার মধ্যে?”
আরশান এক বাঁকা হাসি হাসল, যা দেখে চাচার আত্মা কেঁপে উঠল। ও খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল — “আসলে আমার শাশুড়ি আম্মুকে এভাবে মাঝরাতে তুলে আনাটা একটু অশোভন দেখায়, তাই সেটা করিনি। তাছাড়া রিমি আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে, আপনাদের সঙ্গেই ওর জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে। সেই অধিকারবোধ থেকেই মনে হলো রিমির পক্ষ থেকে অভিভাবক হিসেবে থাকাটাই বেশি মানানসই। অন্তত বিয়ের দলিলে আপনাদের সইটা থাকা জরুরি।”
রিমিকে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে সেই সুযোগই আরশান দিলো না, যা বলার ও নিজেই বলছে আর ড্রয়িংরুমের এই গুমোট পরিস্থিতিতে রিমি এক নিস্পৃহ দর্শকের মতো বসে আছে। ও জানে, আরাফাত সাহেবের কাছে ওর যেটুকু সম্মান আর স্নেহ ছিল, আজ এই মুহূর্তের পর তার অবশিষ্ট আর কিছুই থাকবে না। আরশানের এই জেদ আজ শুধু রিমিকে নয়, বরং রিমির সাথে জড়িয়ে থাকা প্রতিটা মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। রিমির মনে হচ্ছে, সময়টা যদি এখান থেকেই থমকে যেত! অথবা যদি এমন হতো যে বর্তমান বলে কিছু নেই, আরশানের সাথে ওর কোনোদিন দেখাই হয়নি? ততক্ষণে কাজী সাহেব কাঁপা হাতে নিজের ব্যাগ থেকে রেজিস্ট্রি খাতা বের করলেন। ওনাকেও প্রায় বাসা থেকে একপ্রকার জোর করেই তুলে আনা হয়েছে। আরশানের লোকদের গম্ভীর মুখ আর কোমরের অস্ত্র দেখে কাজী সাহেবের কলম ধরার হাতটাও কাঁপছে। আরশান রিমির জন্য বিয়ের শাড়ি, গয়না সবকিছুর আয়োজন করে রেখেছিল কিন্তু রিমি সেসব ছুঁয়েও দেখেনি। ও এখন যে ড্রেসে ছিলো এভাবেই বিয়েতে বসেছে। আরশানও আর জোরাজুরি করেনি। ওর কাছে রিমির সাজগোজের চেয়ে বিয়েটা বেশি জরুরি।কাজী সাহেব শুকনো ঢোক গিলে বিড়বিড় করে বিয়ের নিয়মগুলো শুরু করলেন। ড্রয়িংরুমে এক ভুতুড়ে নীরবতা। কাজী সাহেব খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন — “মেয়ের বাবা বা অভিভাবক কে?”
রিমির চাচা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে সই করলেন। এরপর কাজী সাহেব দেনমোহরের বিষয় উল্লেখ শেষে আরশানের দিকে তাকিয়ে বললেন — “বাবা, কি রুবাইয়া সামাদকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন?”
আরশান এক মুহূর্ত দেরি না করে কবুল বলে নিলো। এবার কাজী সাহেব রিমির দিকে ফিরলেন। রিমির মনে হলো ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘরের প্রতিটি মানুষ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কাজী সাহেব বলতে শুরু করলেন — “মা, আপনি কি এই বিয়েতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলুন কবুল”
রিমির ঠোঁট দুটো একবার নড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। আরশান ওর হাতটা আলতো করে চাপ দিল। সেই স্পর্শে যেন এক প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল। রিমি চোখ বন্ধ করে নিজের সব স্বপ্ন, সব সম্মান আর সব স্বাধীনতাকে বলি দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল “কবুল”
তিনবার এই শব্দটা উচ্চারণের সাথে সাথে কাজী সাহেব প্রথমে আরশানের দিকে খাতাটা এগিয়ে দিলেন সই করার জন্য। আরশান সই করলো, এরপর যখন রিমির পালা এলো মেয়েটা কয়েক মুহূর্তের জন্যে স্থির হয়ে ছিলো, ওর প্রতিক্রিয়া না দেখে আরশান কলমটা তুলে ওর দিকে এগিয়ে দিতেই রিমি ওর দিকে তাকালো। মুক্তির নেশা যে রিমির ভেতরে কত বড় শক্তি যুগিয়েছে, তা হয়তো আজ আরশান জানেনা। নিজের সবটুকু ঘৃণা নিয়ে সই করলো রিমি!
চলবে…
[আরশান গোপনে বিয়ে করবে? That’s not his style। সবাইকে নিয়েই বিয়েটা করলো তো 🥱🤷]
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/17NiAjfsrn/?mibextid=oFDknk

