মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব

0
26

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব

সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থেকে রিমির দম বন্ধ হয়ে আসছিল। গত রাতের সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো যখনই মনের জানালায় কড়া নাড়ছিল, তখনই ও নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছে। সন্ধ্যায় আয়ান আর ইনায়াকে নিয়ে ছাদে গিয়েছিল ও। ইনায়া জবরদস্তি করে কিছু স্ন্যাকস বানাল, আর তিনজনে মিলে ছাদে বসে আড্ডা দিয়ে সময়টা মন্দ কাটেনি। তবুও রিমির অবচেতন মন বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল। ও ভেবেছিল আরশান অন্তত একবার ফোন করে ওর খবর নেবে, আর সেই সুযোগেই ও কৃতজ্ঞতাটুকু জানিয়ে দেবে। কিন্তু সারাদিন পার হয়ে গেলেও আরশানের কোনো পাত্তা নেই। সাধারণত আরশান সন্ধ্যার পরপরই বাসায় ফেরে। আজ রাত আটটা পেরিয়ে গেলেও আসেনি। রিমি ভাবল, হয়তো অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত। লোকটা তো আবার কাজের নেশায় সব ভুলে যায়। মন খারাপের এক সূক্ষ্ম রেশ নিয়ে ও নিজের ঘরে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মনটা বারবার ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিচ্ছিল। রাত ঠিক নয়টা। নিচ থেকে সুরভী বেগমের উচ্চকণ্ঠের ডাক কানে এল রিমির।

“রিমি! একটু নিচে এসো তো!”

রিমি অবাক হয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল আরশানের সেক্রেটারি ইয়াসির দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখেই ইয়াসির বিনীতভাবে হাসল!

“Hello Madam. I hope you are doing fine now.”

রিমি মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। ইয়াসির নিজের হাতঘড়িটায় সময় দেখে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল — “ম্যাডাম, আপনাকে আমার সাথে এখনই যেতে হবে। স্যার আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন।”

সুরভী বেগম পাশে দাঁড়িয়ে ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার সাজাচ্ছিলেন। ইয়াসিরের কথা শুনে তিনি হাত মুছে এগিয়ে এলেন। কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলেন — “এত রাতে ওকে কোথায় নিতে পাঠিয়েছে? আর আরশানই বা কোথায়? রাত নয়টা বাজে, এখনো এলো না যে!”

ইয়াসির একটু আমতা আমতা করে বলল — “স্যার আসলে একটা কাজে একটু বেশিই ব্যস্ত আছেন। তবে তিনি বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন রিমি ম্যাডামকে নিয়ে যেতে।”

যেহেতু আরশানের নির্দেশ, তাই সুরভী বেগম আর কোনো প্রশ্ন তুললেন না। ওনার জানা আছে, আরশান যা বলে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় কারণ থাকে। রিমি কিছুটা দ্বিধায় পড়ল। এত রাতে হুট করে কোথায় ডাকল লোকটা? ও একটু সময় চাইল রেডি হওয়ার জন্য। কিন্তু ইয়াসির তাড়া দিয়ে বলল — “ম্যাডাম, হাতে একদমই সময় নেই। আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে হবে।”

রিমি তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে গেল। ওর পরনে তখন আরামদায়ক পাজামা সেট ছিল, সেটা বদলে চট করে একটা নেভি ব্লু কালারের ফুল স্লিভ লং গাউন পরে নিল। চুলে একটা সাধারণ ক্লিপ এঁটে ও যখন নিচে নামল। গাড়িতে ওঠার পর রিমি জানালার বাইরের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে ইয়াসিরকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল — “আমাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে পারি?”

ইয়াসির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল — “আমি নিজেও বিশেষ কিছু জানি না ম্যাডাম। স্যার শুধু একটা লোকেশন দিয়েছেন আর আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতে বলেছেন। আপনি গেলেই সবটা নিজের চোখে দেখতে পাবেন।”

ইয়াসিরের উত্তরের মধ্যে এক ধরণের রহস্যময়তা ছিল, যা রিমির মনের ভেতরের ধুকপুকুনি আরও বাড়িয়ে দিল। আরশান আবার নতুন করে কি করতে যাচ্ছে?

শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে গাড়িটা যখন একটা শুনশান নির্জন এলাকায় এসে থামল, তখন রিমির বুকের ধুকপুকুনি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। চারদিকে কেবল ঘুটঘুটে অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। ইয়াসির গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিয়ে বলল — “গাড়ি আর ভেতরে যাবে না। আমার সঙ্গে আসুন, একটু হেঁটে যেতে হবে।”

রিমি দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। ও বুঝতে পারছে না এই জনমানবহীন এলাকায় আরশান ওকে কেন ডেকেছে। ইয়াসিরের পেছন পেছন কিছুটা হাঁটার পর ওর সামনে বিশাল এক পুরনো গোডাউন দৃশ্যমান হলো। জং ধরা লোহার গেটটা অর্ধেক খোলা। ইয়াসির ভেতরে ইশারা করতেই রিমি ধীর পায়ে প্রবেশ করল। গোডাউনের ভেতরটা গুমোট। ওপর থেকে ঝুলতে থাকা কয়েকটা টিমটিমে সাদা আলো জ্বলছে। ভেতরে কয়েক পা বাড়াতেই যা দেখল, তাতে রিমির চোখ কপালে উঠে গেল! সেই বিশাল গোডাউনের মাঝখানে শাফিন মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। ওর দুহাত পেছনে শক্ত করে বাঁধা। অবিন্যস্ত চুল আর র’ক্তাক্ত মুখ দেখে রিমি শিউরে উঠল। শাফিনের পাশে একটা বিশাল তেলের ড্রাম রাখা। আর ঠিক ওর সামনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরশান। আরশানের পরনের সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। ওর হাতের পেশিগুলো রাগে টানটান হয়ে আছে। হাতে ধরা একটা হকি স্টিক টাইপ শক্ত কিছু, যা ও মাটির দিকে ঠেকিয়ে রেখেছে। শাফিন ওভাবে বসেও যন্ত্রণায় টলছে, বোঝাই যাচ্ছে আরশান ওকে মে’রেছে! শাফিন যন্ত্রণায় শরীর এলিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু আরশান হাতের স্টিকটা দিয়ে ওর চিবুকটা সজোরে ঠেলে তুলে ধরল। রিমি এ দৃশ্য দেখে নিজের আতঙ্ক সামলাতে না পেরে দৌড়ে শাফিনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শাফিনের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে ওর গলার স্বর বুজে এল। ও পাশ ফিরে আরশানের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল — “ওর সঙ্গে কী করেছেন আপনি?”

আরশান রিমির দিকে এক পলক তাকালো, এরপর শাফিনের কানের কাছে গিয়ে স্টিকটা দিয়ে ওর ঘাড়ে একটু চাপ দিল। এরপর শান্ত কিন্তু অত্যন্ত ভারী গলায় উত্তর দিল — “আমি চেয়েছিলাম পুরো বিচারটা তোমার সামনেই শুরু করবো। কিন্তু কী করব বলো, ওকে সামনে পাওয়ার পর নিজের হাত দুটোকে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না। আমার সারা রাত কেটেছে তোমার ডুবে যাওয়ার সেই বীভৎস দৃশ্যটা কল্পনা করে, আর ওর রাত কাটবে তার ফল ভোগ করে!”

শাফিন যন্ত্রণায় একটা অস্ফুট চিৎকার করে উঠল, কিন্তু ওর মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকায় সেই শব্দ গোঙানির মতো শোনাল। রিমি ভয় পেয়ে আরশানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে অস্ফুট স্বরে বলল — “ছেড়ে দিন ওকে, প্লিজ! ও মরে যাবে!”

“He tried to k!ll you, Rimi. He tried to take you away from me forever & you’re telling me to let him go?”

কথাটা শেষ করেই আরশান হাতের স্টিকটা দিয়ে সজোরে পাশের ড্রামটায় এক আঘাত করল। সেই ভয়ংকর শব্দ পুরো গোডাউনে প্রতিধ্বনিত হয়ে রিমির হৃদপিন্ড কাঁপিয়ে দিলো, ও ভয়ে দুহাতে নিজের কান চেপে ধরল, ওর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। ও আরশানের অনেক রূপ দেখেছে ও। শাসন দেখেছে, অধিকারবোধ দেখেছে, কিন্তু এমন হিংস্র রূপ এই প্রথম দেখছে! লোকটা যদি রাগের মাথায় ছেলেটাকে মে’রে ফেলে তাহলে কি হবে! রিমি আরশানকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো — “তো প্রায় আপনার ছোট ভাইয়ের বয়সী মতো আরশান! যা হওয়ার হয়ে গেছে। প্লিজ, ওকে ক্ষমা করে দিন!”

আরশান রিমির আকুতিতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করল না। বরং রিমির এই অহেতুক দয়া যেন ওর ভেতরের রাগটা আরও উসকে দিল। ও রিমির হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল।

“চুপচাপ ওখানে গিয়ে বসো রিমি। একটা কথাও আর বলবে না। আজ যা হবে, তা কেবল আমাকেই করতে দাও।”

আরশান একপ্রকার জোর করেই রিমিকে টেনে নিয়ে গিয়ে এক কোণায় রাখা একটা কাঠের চেয়ারে বসিয়ে দিল। আরশানের সেই ধমকে রিমির নড়াচড়া করার ক্ষমতাটুকুও যেন লোপ পেল। শাফিন তখন যন্ত্রণায় বারবার একদিকে ঢলে পড়ছিল। ওর জ্ঞান হারানোর উপক্রম। আরশান ইশারা করতেই ইয়াসির এগিয়ে এল। ও পেছন থেকে শাফিনের কলার ধরে ওকে সোজা করে বসিয়ে রাখল, যেন ও আরশানের প্রতিটি কথা আর প্রতিটি আঘাত সজ্ঞানে অনুভব করতে পারে। আরশান এবার ধীর পায়ে শাফিনের সামনে গিয়ে একদম হাঁটু গেড়ে বসে ভারি গলায় বলল — “You tried to k!ll my wife. Did you really think you could get away with that?”

শাফিন শুধু একটু গোঙানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আরশান থামল না। ও শাফিনের মুখের আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে বিষাক্ত এক হাসি হাসল — “তুই কিভাবে ধরা পড়েছিস জানিস? সবাই যখন রিমির কথা শুনে ওদিকে ছুটে আসছিল তখন তুই ওখান থেকে দ্রুত পায়ে ফিরে আসছিলি। আবার সবাইকে যখন আমি জড়ো করলাম তখন তোর চোখমুখের ভয়ই তোকে ধরিয়ে দিয়েছিল। কি ভেবেছিলি ভিড়ের মধ্যে কেউ কিছু টের পাবে না আর তুই বেচে যাবি? আমার নজর কিন্তু তুই এড়াতে পারিসনি। আর তুই ভেবেছিস আমি কিছু জানি না? আমার বোনের সঙ্গেও তুই জঘন্য আচরণ করেছিস। ওকে তুই ডিস্টার্ব করেছিস!”

আরশানের এই কথায় শাফিন এক নিমেষে কুঁকড়ে গেল। ওর নিস্তেজ হয়ে আসা চেতনাতেও একরাশ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। আরশান এটা জানল কী করে? ইনায়া তো এমন মেয়েও না যে এ কথা কাউকে বলবে! শুধু শাফিন নয়, চেয়ারে বসে থাকা রিমিও চমকে উঠল। ইনায়ার সাথেও শাফিন এমন কিছু করেছে এটা আরশান জানে? শাফিন এবার যন্ত্রণার চেয়েও বেশি ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। ও কাঁপাকাঁপা গলায় অস্পষ্টভাবে বলতে চাইল — “আ… আমাকে ক্ষমা করে দিন! ভুল হয়ে গেছে… আমি আর কখনো…”

আরশান এ কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল। ও হাসতে হাসতেই শাফিনের কলারটা খপ করে ধরল!

“ক্ষমা? ক্ষমা চাইলেই কি পাওয়া যায়? পৃথিবীটা এত সহজ না। ক্ষমা কেবল তাদের জন্য যারা ভুল করে, কিন্তু যারা জা’নোয়ারের মতো আচরণ করে, তাদের জন্য থাকে কেবল শাস্তি। আজ তোকে আমি এমন শিক্ষা দেব যে, ভবিষ্যতে কোনো মেয়ের সাথে খারাপ আচরণ করার কথা তোর মস্তিষ্ক কল্পনাও করতে পারবি না”

গোডাউনের ভ্যাপসা গুমোট বাতাস যেন হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে উঠল। আরশান শাফিনকে ঘাড়ে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল সেই কানায় কানায় পানি ভর্তি বিশাল ড্রামটার কাছে। শাফিন বুঝতে পারল তার জন্য কী বিভীষিকা অপেক্ষা করছে। ও আপ্রাণ চেষ্টা করল হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু আরশানের হাতের মুঠো থেকে বেরোনোর সাধ্য ওর নেই। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আরশান শাফিনের মাথাটা সজোরে ড্রামের পানির ভেতর চুবিয়ে ধরল। রিমি আতঙ্কে আর্তনাদ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।

“না! আরশান, থামুন আপনি! ও ম’রে যাবে!”

পানির ভেতরে শাফিনের হাত-পা ছোঁড়াছুড়ির শব্দ আর ছলাতছল আওয়াজ পুরো গোডাউনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শাফিন বাঁচার জন্য ছটফট করছে, ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় এক মিনিট পার হওয়ার পর আরশান এক ঝটকায় শাফিনকে পানি থেকে টেনে তুলল। শাফিন তখন জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে, মুখ দিয়ে পানি উগড়ে দিয়ে খাবি খাচ্ছে। কিন্তু ওকে থিতু হওয়ার সুযোগ না দিয়েই আরশান পুনরায় ওর মাথাটা পানির নিচে তলিয়ে দিল।আরশানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে ইয়াসিরও শিউরে উঠল। ও আরশানকে কয়েক বছর ধরে দেখে আসছে, ও জানে আরশান কতটা ধীরস্থির এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কিন্তু আজ ওর সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে যেনো অন্য কেউ। এ যেন এক প্রাচীন কোনো শিকারি, যে তার শিকারকে তিলে তিলে নিশ্বাস নিতে ভুলে যাওয়ার স্বাদ দিচ্ছে! রিমি আর সহ্য করতে পারল না। ও দৌড়ে গিয়ে আরশানের শক্ত হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। কান্নায় ভেঙে পড়ে ও বলতে লাগল — “আরশান, দোহাই আপনার, ছেড়ে দিন ওকে! একটা অঘটন ঘটে গেলে কী করবেন? তার দায় কি আপনি নিতে পারবেন? প্লিজ, ওকে মুক্তি দিন!”

রিমির কোনো আকুতি, কোনো চোখের জল আরশানের কানে পৌঁছাচ্ছিল না। ওর মস্তিষ্ক তখন কেবল একটা দৃশ্যই বারংবার দেখছে—কাল রাতের সেই উত্তাল কালো জলরাশি আর সেখানে রিমির নিথর হয়ে যাওয়া শরীরটা। আরশান রিমির হাতের টান গ্রাহ্য না করেই শাফিনকে শেষবারের মতো পানি থেকে হ্যাঁচকা টানে টেনে তুলল। শাফিন এখন এতটাই দুর্বল যে ওর শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ছে। আরশান শাফিনের কপাল থেকে চুইয়ে পড়া পানি আর রক্তের মিশ্রণটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো — “How does it feel, Shafin? পানিতে ডোবার অভিজ্ঞতা কেমন? যখন এক বিন্দু অক্সিজেনের জন্য কলিজাটা ছিঁড়ে আসে, যখন মনে হয় যমদূত সামনে দাঁড়িয়ে আছে তখন কেমন লাগে, সেটা বুঝতে পারছিস?”

শাফিন তখনো কাশছে, ওর নাক-মুখ দিয়ে পানি বেরোচ্ছে। ও অতি কষ্টে আরশানের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে গোঙাতে লাগল!

“আ… আমাকে… ক্ষমা… ক্ষমা করে দিন! আমি… আমি ভুল করেছি… প্লিজ…”

আরশান শাফিনের ভিজে যাওয়া চুলের মুঠিটা আরও শক্ত করে ধরল। ওর চোখে তখন এক পৈশাচিক আনন্দ। ও রিমির দিকে একবার তাকালো, মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। আরশান শাফিনকে বললো — “মৃ’ত্যুর মালিক আমি নই, সেটা সৃষ্টিকর্তা যখন চাইবে তখনই আসবে। আমি তোকে শুধু সেই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাব, যা তুই রিমিকে দিয়েছিস”

শাফিনের হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি একসময় স্তিমিত হয়ে এল। আরশানের প্রতিশোধের নেশা যখন কিছুটা শান্ত হলো, তখন ও শাফিনের চুলের মুঠিটা অবজ্ঞাভরে ছেড়ে দিল। শাফিন তালের বস্তার মতো গোডাউনের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ওর নিশ্বাস খুব ক্ষীণ, শরীরটা পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গেছে। আরশান নির্বিকার। ইয়াসির দৌড়ে গিয়ে গাড়ি থেকে একটা পানির বোতল এনে আরশানের হাতে দিলো। সেই পানি নিয়ে নিজের হাতে লেগে থাকা শাফিনের র’ক্ত আর ময়লা খুব যত্ন করে ধুয়ে ফেলল আরশান। হাত ধোয়া শেষ করে ও ইয়াসিরের দিকে ফিরে তাকালো — “একে কোনো ভালো প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যান। ওর প্রপার ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করবেন। আমি চাই না এর এই পরিণতির জন্য ওর মা-বাবাকে একটা পয়সাও খরচ করতে হোক।”

ইয়াসির মাথা নিচু করে সায় দিল। শাফিন তখন মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। রিমি পলকহীন চোখে সেই দৃশ্যটা দেখছিল। ওর চোখের জল গাল বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে। ও বুঝতে পারছে না, ও কি এই বীভৎসতায় ভয় পেয়েছে নাকি আরশানের এই হিংস্রতায় ও তপ্ত হয়ে উঠেছে। আরশান পকেট থেকে একটা সাদা টিস্যু বের করে হাতের আঙুলগুলো খুব সাবধানে মুছে নিল। তারপর ও রিমির দিকে এগিয়ে এল। ও রিমির শীতল হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব ধীর গলায় বলল — “চলো রিমি। অনেক রাত হয়েছে। আর এসব নিয়ে তোমাকে একদমই স্ট্রেস নিতে হবে না”

তখনই হঠাৎ ঘর কাঁপানো এক শব্দে পুরো গোডাউন স্তব্ধ হয়ে গেল। রিমি নিজের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে আরশানের গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছে। আরশানের মাথাটা একপাশে ঝুঁকে পড়ল। বিস্ময়ে ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। ও ভাবতেও পারেনি যে, রিমি এই পরিস্থিতিতে এমন কিছু করার সাহস দেখাবে। ইয়াসির দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে চমকে হয়ে গেল। আরশানকে কেউ থা’প্পড় দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারে এটা কল্পনারও বাইরে! আরশান ধীরে ধীরে মাথা সোজা করে রিমির দিকে তাকালো। ওর গালে রিমির আঙুলের লাল দাগটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রিমি তখনো কাঁপছে। ওর দুচোখে নোনা জলের বন্যা, জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে মেয়েটা। আরশান বুঝতে পারল না, রিমির এই প্রতিক্রিয়া কি রাগের কারণে, নাকি ও ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। রিমি হাঁটা শুরু করলো। এখানে আর এক মুহুর্তও থাকবে না। রিমি প্রায় দৌড়ে যাচ্ছে দেখে আরশানও ওর পিছু যেতে শুরু করল। দ্রুত পায়ে গিয়ে ও রিমির হাতটা ধরতেই রিমি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে আর্তনাদ করে ভাঙা গলায় বলল — “মানুষ আপনি? আপনি কি একবারও ভেবেছেন যে ওর কিছু হয়ে গেলে আপনার কী হতো? আপনি কি খু’নি হতে চেয়েছিলেন আরশান? কার জন্য? আমার জন্য?”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1DiphsjUTX/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here