#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪৭ (কপি করা নিষেধ)
________________________________________
ইবনাতের ডে অফ থাকায় সে আজ তার দাদুকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল হামিদুর রহমানের সাথে কথা বলতে তার আর মৌনতার আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ের ব্যাপারে। তারা চাইছে এই বিয়ে নিয়ে আর মাতামাতি না করে স্বাভাবিকভাবেই মৌনতাকে ইবনাতের বাসায় নিয়ে যেতে। কারণ আবার বিয়ের আয়োজন করলে ইবনাতের স্টেপ মাদার আরও সুযোগ পাবে তাদের কাছে থাকাত এবং মৌনতার ক্ষতি করার। তাই বিয়ে তো হয়েছেই এখন তাদের একসাথে থাকতে তো আর বাঁধা নেই।
এদিকে মেয়ের ক্ষতি হতে পারে ভেবেই হামিদুর রহমান রাজি হয়ে গিয়েছেন। প্রয়োজন নেই এমন অনুষ্ঠানের যেখানে তার মেয়ের ক্ষতি হতে পারার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া এই অনুষ্ঠান মানেই তো লোক ডেকে খাওয়ানো ছাড়া কিছুই নয়। নাই বা হলো তা। মৌনতাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় তার বড় পাপা যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই করবে সে।
সেই অনুযায়ী ঠিক করা হয়েছে আগামী শুক্রবার মৌনতাকে ইবনাতের বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। তার আগেই ঢাকায় ফিরবে অনিল, মীম, সাদাফ।
তাছাড়া ইবনাত চাইছে সাদাফ তুরিনের সম্পর্ক টিকে থাকুক। সাদাফ কোনো ভাবেই যাতে তাকে আর তুরিনকে নিয়ে কোনো পাগলামি করতে না পারে তাই তার জীবনে মৌনতার জায়গা কতটা তা পরিষ্কার করছে দুনিয়ার কাছে। তার আর তুরিনের দুজনেরই যখন আলাদা আলাদা মানুষের সাথে জীবন জুড়ে গিয়েছে তারাই থাকুক আজন্ম। কারণ সে বিশ্বাস করে আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। হয়তো তুরিন সাদাফের সাথে ভালো থাকবে। হয়তো সাদাফ তুরিনকে যতটা ভালো রাখতে পারবে তা সে নিজেও পারতো না কখনো। তাই জন্যই হয়তো এতো ভালোবেসেও সে পেলো না মেয়েটাকে। আর কখনো না চাইতেই আল্লাহ তাকে সাদাফের ঝুলিতে ঢেলে দিয়েছেন অতি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে।
ইবনাতের ভালো করেই জানা আছে বিয়ে যখন হয়ে গিয়েছে হাজার কিছু করলেও তুরিন সাদাফকে ছাড়বে না। সম্পর্ক মেনে নেবে। মনে ভালোবাসা যে নেই তাও সে জানে। আর এও জানে যে যেদিন থেকে বিয়ে হয়েছে তুরিন সেদিন সেই মূহুর্তে তাকে মনের সংগোপনে লুকিয়ে ফেলেছে। এবার সে সাদাফকে ভালোবাসার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। হয়তো সময়ের সাথে সাথে সেই চেষ্টা তার সফল ও হবে।
আর সেও তো অস্বীকার করতে পারবে না মৌনতা শেখকে। নিজের ইচ্ছেতে তার সাথে জড়িয়ে না গেলেও ভাগ্যের উত্থান-পতনের গল্পেই জুড়ে গিয়েছে দুজনের নিয়তি। এক দূর্ঘটনা ঘটেছে দুজনের মধ্যে। আর সেই কলঙ্ক যাতে মেয়েটার গায়ে না লাগে তাইতো সে পরিনতি দিয়েছিল দুজনের মধ্যের না বলে কয়ে গড়ে ওঠা সেই সম্পর্ক। এখন মেয়েটা তার স্ত্রী। ভালো না বাসলেও তার প্রতি পূর্ণ সম্মান রয়েছে ইবনাতের। সে এই মৌনতার হাত জীবনেও ছাড়বে না। জীবনেও না। নিজের বাবার মতো সে কখনোই হবে না। স্ত্রীকে সম্পূর্ণ মর্যাদা দেবে। তাছাড়া মেয়েটা অত্যাধিক উচ্চতর মনের অধিকারী। তার অতীতের সবকিছু জানার পরেও দূরে সরে যায়নি। অবহেলা করেনি। ইবনাতের ভালোবাসা পাবে কি না তা না জেনেই তার পাশে দাঁড়িয়েছে।
সেদিনের ইবনাতের বলা কথাগুলোর পর থেকেই নিজের মাঝের অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে সবরকম চেষ্টা করেছে। তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সেই মরিয়া এখন। বিয়ের দিন বেঁকে বসা মেয়েটাই এখন এই বিয়ে বাঁচাতে তৎপর। ইবনাতের কাছে ফোন করা, তার সম্পর্কে সবরকম তথ্য সংগ্রহ, তার একাকী জীবনে এক টুকরো আলো হয়ে প্রবেশ সবকিছুই করেছে মেয়েটা। আর তার এই পদক্ষেপে ইবনাতের নিজেরও অস্বস্তি কেটেছে। দূর হয়েছে দূরে দূরে থাকার প্রবণতা। এখনো হুটহাট জড়িয়ে ধরার সম্পর্ক তাদের গড়ে না উঠলেও হাত ধরলে অস্বস্তি হয় না এমন সম্পর্ক হয়েছে। স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রী না হলেও স্বাভাবিক বন্ধুত্ব হয়েছে।
আর ইবনাত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন একটা কোহিনূরকে সে জীবন থেকে হারাতে তো দেবে না। তার কাছেই নিজের বাকী জীবন তুলে দেবে। তাকে ভালোবাসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। একদিন না একদিন ভালোবাসাটাও হয়েই যাবে।
.
.
.
.
তাহমিদ রিসোর্ট থেকে উদ্ধার করা সেই মেয়েটাকে ঢাকায় এনেছে সাথে করে। ঠিকানা অনুযায়ী মেয়েটার বাসা বারিধারা জে ব্লক। আমেরিকান এম্বাসির পাশ দিয়ে যেতে হবে। ঠিকানা অনুযায়ী সে একাই মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে তার বাসায় পৌঁছে দিতে। তার গাড়ি একটা বিল্ডিংয়ের সামনে থামিয়ে বের হয় সে। অপরপ্রান্তের ডোর খুলে মেয়েটাকে বের হতে বলে। এদিকে মেয়েটার শরীর অত্যাধিক দূর্বল থাকায় সে ঢলে পড়তে যায়। তখনই তাহমিদ না চাইতেও মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে যাতে পড়ে না যায়। মেয়েটাও তার শার্ট এর বুকের দিকে মুঠো বন্দী করে ধরে প্রায় বুকের সাথে মিশে যায়। প্রচন্ড অস্বস্তি অনুভব করে তাহমিদ। তাও দায়িত্বের কাছে হার মেনে বিল্ডিংয়ের ভিতর যেতে গিয়ে পুরো দুনিয়া স্থীর হয় তার। বিল্ডিংয়ের লিফটের সামনে অবিশ্বাস্য চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিবা। যেন সে কিছুতেই নিজের চোখে দেখা দৃশ্য বিশ্বাস করতে পারছে না। তাহমিদ একটা মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে হেটে আসছে এর চেয়ে খারাপ কোনো কিছু সে কখনো দেখেছে বলে তার মনে পড়ছে না। চোখ জ্বলে উঠে তার চোখে পানি আসে। এদিকে আরিবার চোখে পানি দেখে বুকের মধ্যে মুচড়ে ধরে তাহমিদের। আরিবা কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে চেয়ে আছে তার ধরে রাখা ওই অসুস্থ মেয়েটার কাঁধের দিকে। আর ওই মেয়েটা তার শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে সেখানেও কেমন করে চেয়ে আছে। আরিবা এখানে কি করছে? কেনই বা তাকে এখানে থাকতে হবে? যতই সে মেয়েটাকে দূরে রাখুক তবুও তো সে অস্বীকার করতে পারে না যে আরিবা তাকে ভালোবাসে। মনে প্রাণে তাকে চায়। আর ভালোবাসার মানুষ অন্য মেয়েকে এভাবে ধরে আছে তা দেখার মতো মনোবল কোন নারীর নেই। তাহমিদ আরিবাকে কিছু বলবে তার আগেই তার সাথে থাকা মেয়েটা আরও অসুস্থ হয়ে যায়। তাহমিদ ও কিছু না বলেই লিফটে উঠে যায় মেয়েটার বাসার উদ্দেশ্যে।
আরিবা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে এখনো। এই বিল্ডিংয়ে তার এক বান্ধবী থাকে। কিছুদিন আগের তার বেবি হয়েছে। তাদেরই দেখতে এসেছিলো আরিবা। কিন্তু এখানে এসে সে এভাবে সারপ্রাইজ হবে তা ভাবতেও পারেনি। তবে কি তাহমিদ অন্যকাউকে ভালোবাসে যে কারণে তাকে ফিরিয়ে দেয় বারবার? তবে কি তার এতো বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্নের কোনো দাম নেই? তবে কি তার আর তাহমিদকে পাওয়া হলো না? তার এতো বছরের ভালোবাসা কি কখনোই তাহমিদের মন গলাতে পারেনি? কিভাবে তাহমিদ অন্য একটা মেয়েকে জড়িয়ে ছিলো ভাবলেই সবকিছু থেমে যাচ্ছে আরিবার। তবে কি সেই অনধিকার চর্চা করে এসেছে এতকাল? এক পা দুই পা করে সামনে এগোতে থাকে আরিবা। এগিয়ে সে মেইন রাস্তার পাশে যেয়ে কিনারে বসে পড়ে।
মেয়েটাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেই ফিরে যায় তাহমিদ। সে জানে আরিবা সামলাতে পারবে না এসব। অনিলের বোন হলেও আরিবা মোটেই অনিলের মতো নয়। অত্যন্ত আবেগী সে। বিশেষ করে তাহমিদের ব্যাপারে বেশী আবেগী। তাহমিদের নাম আসলেই আর চিন্তাভাবনা ও করে না মেয়েটা। আগেই কেঁদে ভাসায়। যদিও তাহমিদ কখনো স্বীকার করেনি নিজের ভালোবাসার কথা তবুও সে ভালো তো বাসে। আরিবাকে সে নিজের করতে না পারলেও তাকে কষ্ট দিতে কখনোই পারবে না। তাছাড়া এখন রাত বাজে নয়টা। এখন একা একা কিছুতেই সে আরিবার রাস্তাঘাটে চলাচল পছন্দ করবে না।
তাহমিদ নিচে এসে আরিবাকে পায় না। দ্রুত গাড়ি নিয়ে বের হয়। আস্তে আস্তে চালিয়ে এগোচ্ছে আর দুইপাশে নজর দিয়ে দেখছে। মেইন রাস্তায় আসলে দেখে রাস্তার একপাশে দুই হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে আরিবা। আর তার থেকে একটু দূরেই কিছু ছেলে অদ্ভুত ভাবে দেখছে তাকে। রাগ হয় তাহমিদের। কেন মেয়েটা এতো বেখেয়ালি? জানা নেই বোঝা নেই নিজের মতো ভেবেই ইমোশনাল কেন হতে হবে? প্রচন্ড রাগ নিয়েই গাড়ি থেকে বের হয়ে আরিবার কাছে যেয়ে মেয়েটার হাত ধরে হেঁচকা টানে দাঁড় করায় সে। কিন্তু তার মুখ দেখতেই নিজের আকাশ সম রাগ যেন হাওয়ায় উড়ে যায়। আরিবার ফর্সা চেহারা লাল হয়ে গিয়েছে কেঁদে। সেদিন হাসপাতালে যে অবস্থা হয়েছিল ঠিক সেরকম। তার এমন অবস্থা দেখে কিছুই বলতে পারে না তাহমিদ।
আরিবার হাত ধরে তাকে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে হাঁটা ধরে তাহমিদ আর বলে,
“রাত হয়েছে। বাড়ি ফিরতে হবে আরু।”
আরিবা তার হাতের দিকে চেয়ে আছে। এই হাতেই না কি অবলীলায় এতোক্ষণ অন্য মেয়েকে ধরে ছিলো। সেও হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
“উবার কল করেছি তাহমিদ ভাই। আপনার মূল্যবান সময় আমার জন্য নষ্ট করতে হবে না।”
ধড়াম করে যেন কিছু ভাঙলো তাহমিদের ভিতরে। আরিবা তাকে কখনোই ভাই বলে ডাকে নি। অনেক ছোটবেলা থেকেই তার তাহমিদের প্রতি দূর্বলতা আছে। আর সেইজন্য সে কখনোই ভাই ডাকে না। আজ সেই মেয়ের কেঁদে গলা ভাঙা আওয়াজে ভাই ডাক ঠিক সহ্য হলো না তাহমিদের। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিবার ডাকা উবার চলে আসে। আর আরিবা চলে যায় তার সামনে থেকে। তাহমিদও নিজের গাড়ি উবারের পিছন পিছন চালাতে থাকে।
এদিকে গাড়িতে উঠে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আরিবা। উবার ড্রাইভার একপলক ভিউ মিররে দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয়। প্রতিদিন কতরকম মানুষ ওঠে তার গাড়িতে হিসেব নেই। সেই মানুষের কতকিছু দেখে তারও হিসাব নেই। তাইতো আর কারো কোনো কিছুতেই অবাক হয়না।
আরিবা নিজেকে সামলে নিয়ে তার বাবাকে কল করে।
“হ্যা মামনি।”
“তোমার কোন এক বিজনেস পার্টনারের ছেলের সাথে আমার বিয়ের কথা বলেছিলে বাবা। তাদের জানিয়ে দাও আমি রাজি।”
“আর ইউ শিওর মামনি?”
“হ্যা বাবা।”
“আচ্ছা। তোমার ভাই ভাবী ফিরুক তারপর তাদের আসতে বলবো।”
কল কেঁটে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসে আরিবা। এবার তবে নিজেকে শেষ করার রাস্তায় চলে দেখা যাক। শেষ হতে কতটা সময় প্রয়োজন।
..
..
..
চলবে___

