#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২৪ (কপি করবেন না)
_________________________________
নারায়ণগঞ্জ এর শীতলক্ষ্যা পার হয়ে কাঁচপুরের ভিতর যেয়ে একদম ভিতর দিকে পরিত্যক্ত বিশাল বড় একটা গোডাউন রয়েছে। দিনের বেলা বাইরে থেকে দেখলেও জায়গাটা অদ্ভুত ভূতুড়ে লাগে। আশেপাশে তেমন জনবসতি নেই বললেই চলে। মানুষ হতে বেশ অনেকটা দূরে জায়গাটা। তাও কখনো কোনো মানুষ ওদিকে গেলেও জায়গাটার ওমন রুপ দেখে ভিতরে যাওয়ার সাহস করে না। তাই ঠিক ক’বছর ধরে জায়গাটা ওমন জনমানবহীন হয়ে পড়ে আছে তার সঠিক হিসেব কেউ জানে না। তাছাড়া ওই জায়গার উপর অযথা কৌতূহল কারো জাগে নি।
কিন্তু ইদানিং সেখানে আবারও মানুষের পা পড়েছে। খুব গোপনে সন্তপর্ণে। গভীর রাতের অন্ধকার ও নগরীর ঘুমের সুযোগ ভালো করেই ব্যবহার করে চলেছে কিছু মানুষ। এই যেমন সেনাবাহিনীর একটা টিম লণ্ডভণ্ড করে একটা পুরনো গাড়িটা সেই গোডাউনের সামনে যেয়ে থামলে একজন নেমে যেয়ে গোডাউনের দরজা খুলে দেয়। গাড়িটা ভিতরে ঢুকে গেলো। গোডাউনের দরজা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ গুলো নেমে যায়। সাথে করে তাদের সঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া অর্ধ অচেতন অরুপ দাস। কিন্তু আজকে হাতে সময় নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান পড়বে। দিনের বেলা আবার তারা র*ক্ত*পাত করে না। তাই কারো নজরে পড়ার আগেই এখন তাদের এই জায়গা ত্যাগ করে যেতে হবে। যদিও গোডাউন অনেক বেশি বড়। ভিতরে যতই শব্দ হোক তা বাইরে যাবে না। কিন্তু নিজেদের কাজ শেষ করে তাদের ফিরতে তো হবে। তখন যে কেউ দেখবে না তা অসম্ভব। তাই এতোদিন তাদের কাজ তারা রাতেই করে। সেজন্যই অরুপ দাসকে গোডাউনের মধ্যে একটা চেয়ারে বেঁধে রেখে মুখ ও বন্ধ করে তারা যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই বেরিয়ে যায়। দিন শেষ হলে রাতে আবারও আসবে তারা। তখন না হয় অরুপের রুপ পরিবর্তন করা যাবে।
.
.
.
.
মীম যে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল অনিলকে তা সেখানকার ছোট একটা হাসপাতাল। এতো বড় আর ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন করা সম্ভব ছিলো না। তাই তারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কোনরূপ বাঁচিয়ে রেখেছে। দশমিনিটের মধ্যে তাহমিদ এসে পৌঁছায় সেখানে। তারপর অনিলকে নিয়ে ঢাকা সিএম এইচ যাওয়ার জন্য তাকে এ্যাম্বুলেন্সে তুললেই মীম ও যেয়ে বসে ভিতরে। তাহমিদ মানা করে না। অনিল ততক্ষণে ও পুরোপুরি চেতনা হারায়নি। একটু আধটু হুশ আছে তার।
আঁধো বুজে যাওয়া চোখে অনিল দেখলো তার সেনাবাহিনী টিমের ক্যাপ্টেন আর তার বন্ধু তাহমিদ উদভ্রান্তের মতো এসেছে হাসপাতালে। তার নিজের ঝরা র*ক্তে রঞ্জিত হয়ে মাশফিয়া মীমের করুণ অবস্থা। সিএম এইচ এ নেওয়ার আগেই সেখানে কথা বলে রেখেছিলো তাহমিদ। তাছাড়া মেজর এএকের দূর্ঘটনার কথা সেনা মহলে এতোক্ষণে অজানা নেই কারোই। সেখানে যাওয়ার সাথে সাথেই অপারেশন শুরু করার জন্য অনিলকে ওটিতে নেওয়া হয়। আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন জেনারেল আব্দুর ওয়াহিদ আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। নিজের মেয়ের এমন অবস্থা দেখেও একটা প্রশ্ন করেন না ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। কারণ তার মেয়েই মেজর এএকে কে উদ্ধার করেছে সে খবর আছে তার কাছে মেজরের অপারেশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত সেনা ডাক্তার মেজর নাফিসের কাছে যেয়ে জেনারেল আব্দুর ওয়াহিদ বলেন,
“ওটির ভিতরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক অমূল্য রত্ন শুয়ে আছে। তাকে বাঁচিয়ে দেশ ও দশের কল্যাণ করুন মেজর।”
“আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবো স্যার। বাকীটা উপরওয়ালা যা ভালো মনে করেন। আপনারা তাকে ডাকুন।”
বলেই ডাক্তার ওটির ভিতর ঢুকে গেলো।
অনিলের অপারেশন শুরু হলেই সেখানে দৌড়ে উপস্থিত হয় তার বাবা আবরার খান ও তার কানাডা ফেরত বোন আরিবা আবরার খান। তাহমিদ এক পলক তাঁকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। ওই মানুষ দুইটার দিকে কিভাবে বা তাকাবে সে!
সবাই অপেক্ষায় আছে অনিলের জন্য। সবাই আল্লাহকে ডাকছে। তাহমিদ ডাকছে তার পরম বন্ধুর জন্য। আবরার খান নিজ পুত্রের জন্য। আরিবা তার ভাইয়ের জন্য। সেনা কর্তাগণ ডাকছে এমন এক রত্নকে না হারানোর জন্য। কিন্তু মীম! সে কেন ডাকছে সে জানে না। এম মানুষটাকে এই অবস্থায় দেখে তার কলিজা ছিড়ে যাওয়ার মতো কষ্ট কেন হচ্ছে সে জানে না। সে জানেনা তার অবাধ্য চোখ দুইটা আক কেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। সে জানে না তার কেন মনে হচ্ছে যে নিজের জীবন দিয়ে হলেও এই মানুষটাকে বাঁচাতে। তার মনে হচ্ছে এই অনিল আবরার এর কিছু হলে সে বাঁচবে না। কিন্তু এসব নিয়ে সে ভাবার ফুসরত টুকু পাচ্ছে না। কারণ এখন সম্পূর্ণ তার চেতনা জুড়ে রয়েছে ওটিতে জীবন-ম*রণের মাঝে থাকা মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান।
.
.
.
.
সকাল আটটা বাজে। সাদাফ তার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের মুখ দেখে নাই। মেয়েটাকে বিয়ে করে সেই মূহুর্তেই সাদাফ বেরিয়ে যায় আশিক আর তার বউকে নিয়ে। চট্টগ্রাম শহরে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে সেখানেই রাখতে যায় মেয়েটাকে আজ সকালে। কারণ মেয়েটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। মাস্টার্স করছে এটুকু আশিক কোনভাবে জেনে নিয়েছে মেয়েটা থেকে। মেয়েটা নিজেকে একদম পর্দার আড়ালে আবডালে রাখে। সেখানে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। এমন একটা মেয়ের সাথে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো ভেবেই অদ্ভুত ভাবে রাগ হচ্ছে সাদাফের। এখন সে এই মেয়েটার পূর্ণ নিরাপত্তা দিবে। মেয়েটা এখন তার বউ তার সম্মান। সে সারাজীবন এই দায়িত্ব আর এই সম্মানিত নারীর সম্মান রক্ষা করবে বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। তাইতো একবেলার মধ্যেই শহরের মধ্যে অন্যতম নিরাপদ একটা বাসা ঠিক করে তার থাকার জন্য। যেই তিন,চারমাস মেয়েটার পড়া বাকি আছে এখানেই থাকুক। তারপর নাহয় তাকে ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করে সাদাফ।
নতুন বাসায় এসে সাদাফ মেয়েটার সাথে একটু কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
“আমি সাদাফ আদনান। একজন সাংবাদিক। তোমার আর আমার বিয়েটা কোন অবস্থায় হয়েছে তা তোমার অজানা নয়। তাই আমাকে ভুল বুঝো না। দেখো তোমাকে আমি চিনিনা। তুমিও আমাকে না। কিন্তু যেহেতু আমরা এখন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি তাই এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমি আমার সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা অবস্থায় তোমাকে বিয়ে করেছি। আর আমি এই বিয়ে আর তোমাকে মানি। আমি আমৃত্যু আমার স্ত্রীকে রক্ষা করবো। এখানে থাকো। লেখাপড়া শেষ করো তারপর তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাবো। ততোদিন তুমি নিজেকে সামলাও। নিজের মনকে সামলাতে থাকো। আমাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে শেখো। তারপর না আমরা সম্পর্কটা এগোলাম। আমাকে ফিরে যেতে হবে। তার আগে আমি তোমার প্রয়োজনীয় সব কিছু ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবো।”
মেয়েটার উত্তরের অপেক্ষা করলেও তার থেকে কোনো উত্তর আসে না। সাদাফ আবার বলে,
“আর হ্যা শোনো এখন থেকে আর কোনো টিউশনি করবা না। তোমার যাবতীয় খরচ আমি দেবো। তোমার স্বামী এতোটাও অযোগ্য নয় যে তোমাকে এতো ঝুঁকি নিতে হবে। বুঝেছ?”
প্রথমত সাদাফ আদনান নাম শুনেই মেয়েটার শরীর অবশ হয়ে যায়। সে কিভাবে এই সম্পর্ক সামলাবে? কি হবে এরপর?
সাদাফ একটু দূরে গেলেই সে মুখের সামনে থেকে নিকাব একটু উঠিয়ে দেখেই মনে মনে বলে,
“সাদাফ ভাইইইইইইইইইইইই!
শেষে কিনা তুমি! তোমার সাথে বিয়ে হওয়ার ছিলো আমার!
সে জানলে যে অনর্থ ঘটে যাবে। কিভাবে সামলাবো আমি আগামীর পরিস্থিতি! আল্লাহ এ আমাকে তুমি কোথায় এনে দাঁড় করালে? যেখান থেকে পালাতে চাইলাম ঘুরে ফিরে সেখানেই আমাকে নিয়ে যাচ্ছো তুমি!”
তার নিরব অশ্রু মূহুর্তেই সবকিছু ভারী করে দিলো।
বাসায় সব জিনিস এনে ক্লান্ত সাদাফ ড্রয়িং রুমে ফ্যান চালিয়ে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে টিভিতে খবর দেখার জন্য তাদের চ্যানেল অন করে। সেখানে তাদেরই এক খবর পাঠিকা খুব সুন্দর করে সেজেগুজে বসে খবর পড়ছে।
~আজ ভোররাতে একদল আত*তায়ী অর্থাৎ চক্র খু*নে*র আ*সা*মী*দের ফলো করার সময় তাদের হামলার সম্মুখীন হয়ে স্পটেই শহীদ হন ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম সহ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য। আর গু*লি বিদ্ধ হন ওই কে*সের দায়িত্বে থাকা মেজর এএকে। এখন সে বাঁচবে কি না সেরকম কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি। তবে কি…….”
কিন্তু পরের খবর আর দেখা হলো না সাদাফের। ততক্ষণে সে উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে যেই অবস্থায় ছিলো সেই অবস্থাতেই বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। তার বন্ধুর জীবনের টানাটানি আর সে এখানে বসে থাকতে পারবে এমন তো পাঁচতারকা নয়।
কাউকে একটা ফোন করে বলতে বলতে যাচ্ছিলো,
“ইমারজেন্সি ঢাকা যাওয়ার টিকিট লাগবে আমার। আর না পেলে বাবাকে বলে হেলিকপ্টার এর ব্যবস্থা করো।”
এসবকিছুই শুনলো তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী যে কিনা এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে এনেছিলো তারজন্য। কিন্তু খবর দেখে আর সাদাফের সবকিছু ভুলে বেরিয়ে যাওয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,
“আল্লাহ তুমি অনিল ভাই এর প্রাণ নিয়ো না। বাঁচিয়ে দাও দয়া করে। তাকে যে এ দেশের বড্ড দরকার। তাকে যে তার আপনজনদের বড্ড দরকার।”
.
..
..
..
চলবে ____
.

