#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_১২
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
বাসর রাতের সেই তথাকথিত রোমান্টিক আবহাওয়া সকাল হতে না হতেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সকাল সাতটা বাজে। রিন্নি অঘোরে ঘুমাচ্ছে, ঠিক তখন তার কানের কাছে বিকট শব্দে একটা অ্যালার্ম বেজে উঠল।
রিন্নি ধড়ফড় করে উঠে দেখল, আরাভ চৌধুরী ফ্রেশ হয়ে ইস্ত্রি করা শার্ট পরে একদম রেডি। হাতে একটা স্টপওয়াচ।
আরাভ গম্ভীর মুখে বলল, “গুড মর্নিং মিসেস চৌধুরী। আপনার হাতে ঠিক ১৫ মিনিট সময় আছে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্টিং টেবিলে রিপোর্ট করতে হবে। মনে রাখবেন, আজ আমার সাড়ে আটটায় ইউনিভার্সিটি ল্যাবে ভাইভা আছে।”
রিন্নি চোখ কচলাতে কচলাতে টেনে টেনে বলল, “স্যার! আপনি কি প-াগল হয়ে গেছেন? আজ আমাদের বাসর রাতের পরের সকাল। মানুষ আজ বেড়াতে যায়, আর আপনি যাচ্ছেন ভাইভা নিতে? আর আমাকে কেন তুলছেন?”
আরাভ চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলল, “কারণ আপনি এখন এই বাড়ির বড় বউ। আব্বু আর আম্মু ডাইনিং টেবিলে অপেক্ষা করছেন। নিউটনের ফার্স্ট ল অনুযায়ী, বাহ্যিক বল প্রয়োগ না করলে আপনার এই ঘুম ভাঙত না। সো, বি কুইক!”
রিন্নি বালিশটা ছুড়ে মা-রল আরাভের দিকে। “যান আপনি আপনার ল্যাবে! আমি যাব না। আমি আজ সারা দিন ঘুমাব।”
আরাভ খুব সাবধানে বালিশটা ক্যাচ ধরল। “রিন্নি, ন্যাকামিটা ড্রয়িংরুমের জন্য তুলে রাখুন। এখন যদি আপনি না ওঠেন, তবে আমি কিন্তু ফাহিমকে ডেকে বলব আপনাকে বালতি ভরে ঠান্ডা পানি দিয়ে আপনাকে ভিজিয়ে দিতে। সে দরজার বাইরেই ওত পেতে আছে কাল রাতের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।”
রিন্নি গজগজ করতে করতে বিছানা ছাড়ল। মনে মনে বলল, “দাঁড়ান রাক্ষস সাহেব! আপনার ব্রেকফাস্টিং আজ আমি ঐতিহাসিক বানাচ্ছি।”
ডাইনিং টেবিলে বসে আফজাল চৌধুরী আর রোকেয়া বেগম গল্প করছিলেন। আরাভ শান্তভাবে খবরের কাগজ পড়ছে। রিন্নি রান্নাঘর থেকে চা আর নাস্তা নিয়ে এল। তার মুখে এক শয়তানি হাসি। সে আরাভের চায়ের কাপে চিনির বদলে তিন চামচ লবণ আর এক চিমটি গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছে।
রিন্নি খুব নম্রভাবে কাপটা আরাভের সামনে রেখে বলল, “নিন স্যার, আপনার স্পেশাল চা। আপনার ব্রেন সার্প হবে।”
আফজাল সাহেব খুশি হয়ে বললেন, “দেখলি আরাভ? মেয়েটা কত যত্ন করে তোকে চা দিচ্ছে। তুই তো শুধু এসাইনমেন্ট আর ল্যাব বুঝিস।”
আরাভ কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল। রিন্নি আড়চোখে তাকিয়ে আছে কখন আরাভ মুখ থেকে চা ছিটকে বের করবে আর ঝগড়া শুরু হবে। কিন্তু একি! আরাভ খুব স্বাভাবিকভাবে পুরো চুমুকটা গিলে ফেলল। তার চেহারায় কোনো পরিবর্তন নেই।
আরাভ কাপটা নামিয়ে রেখে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “চায়ের সোডিয়াম ক্লোরাইডের কনসেন্ট্রেশনটা আজ একটু বেশি, যা হাইপারটেনশনের জন্য ভালো না। তবে গোলমরিচের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রপার্টিটা বেশ রিফ্রেশিং। থ্যাংক ইউ রিন্নি।”
রিন্নি হা করে তাকিয়ে রইল। “আপনি… আপনি এই চা খেলেন কীভাবে?”
আরাভ মুচকি হেসে বলল, “আপনার মনে নেই রিন্নি? আমি ল্যাবে মাঝে মাঝে এইচসিএল (HCl) আর এনএওএইচ (NaOH) এর রিঅ্যাকশনও হ্যান্ডেল করি। এই লবণ-মরিচ তো স্রেফ ডালভাত।”
আফজাল চৌধুরী কিছু না বুঝেই বললেন, “কি বলছিস এসব ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি? চা কি ভালো হয়েছে?”
আরাভ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ আব্বু, তবে রিন্নি হয়তো চাচ্ছিল আমি যেন আজ সারাদিন ঘামতে থাকি। যাই হোক, গিন্নি, আপনার জন্য একটা গিফট আছে।”
আরাভ পকেট থেকে একটা খাম বের করে রিন্নির সামনে ধরল। রিন্নি ভাবল হয়তো কোনো জুয়েলারি বা গিফট ভাউচার। খুশিতে খামটা খুলতেই তার মুখ নীল হয়ে গেল। ওটা একটা নতুন রুটিন!
আরাভ বলল, “সংসার চালানোর একটা নির্দিষ্ট ডাইনামিকস থাকা দরকার। এই রুটিনে আপনার রান্নাবান্না, আমার ল্যাব শিডিউল আর আপনার স্টাডি আওয়ারস সব ফিক্সড করে দিয়েছি। ন্যাকামি করার জন্য দিনে মাত্র ৩০ মিনিট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ওকে?”
রিন্নি এবার ফেটে পড়ল। “আপনি কি আমাকে আপনার ল্যাবের রোবট ভাবেন? আমি এই রুটিন মানি না!”
রোকেয়া বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরাভ! তুই কি শুরু করলি? মেয়েটা মাত্র এই বাড়িতে এল, আর তুই ওকে রুটিন ধরিয়ে দিচ্ছিস?”
আরাভ শান্ত গলায় বলল, “আম্মু, ডিসিপ্লিন ছাড়া লাইফ মানেই হলো অলসতা বেড়ে যাওয়া। আমি চাই না আমাদের সংসারটা ডিসঅর্ডার হয়ে যাক।”
আরাভ ইউনিভার্সিটিতে চলে যাওয়ার পর রিন্নি ফাহিমের সাথে জোট বাঁধল। ফাহিম কাল রাতের টাকার শোকে এখনো কাতর।
রিন্নি বলল, “ফাহিম, তোর ভাই তো আস্ত একটা জল্লাদ। ওকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। ওর ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড জানিস?”
ফাহিম চোখ চকচক করে বলল, “জানি ভাবী! ওটা সবসময় ওর প্রিয় কোনো ফিজিক্সের ধ্রুবক (Constant) থাকে। আজ বোধহয় প্লাঙ্কস কনস্ট্যান্ট রেখেছে।”
রিন্নি বলল, “ঠিক আছে। আমরা ওর ল্যাপটপে একটা এমন ভাইরাস ঢুকাব যে ওটা খুললেই শুধু তানিন ভাইয়ের সেই বিরহী গান বাজবে তাতে যদি মন না ভরে আমারে ডাকিও পাখি’!”
ফাহিম হেসেই অস্থির। “মারাত্মক আইডিয়া ভাবী! ভাইয়া তো গান শুনলে এমনিতেই ক্ষেপে যায়, আর তানিন ভাইয়ের গান শুনলে তো হার্ট অ্যাটাক করবে।”
বিকালে আরাভ বাসায় ফিরল। তার হাতে একটা বড় ফাইল। সে ঘরে ঢুকে ল্যাপটপটা খুলল একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করার জন্য। রিন্নি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফাহিমের সাথে উঁকি দিচ্ছে।
আরাভ পাসওয়ার্ড দিয়ে ল্যাপটপ এন্টার করতেই পুরো ঘরে ফুল ভলিউমে তানিনের সেই করুণ সুর বাজতে শুরু করল, “আমারে তুমি মনে কথা কইও… ও ও ও…”
আরাভ চমকে এক হাত লাফিয়ে উঠল। সে বারবার মিউট করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তানিনের একটা ফানি ছবি বারবার লাফাচ্ছে।
আরাভ চিৎকার করে বলল, “ফাহিম! রিন্নি! এ কার কাজ?”
রিন্নি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খুব নিরীহ মুখে বলল, “কী হয়েছে স্যার? ল্যাপটপ কি কবিতা আবৃত্তি করছে? বাহ! আপনার ল্যাপটপ তো বেশ রোমান্টিক হয়ে গেছে!”
আরাভ ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিয়ে রিন্নির সামনে এসে দাঁড়াল। রিন্নি একটু পিছিয়ে গেল। আরাভ তার চোখের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
আরাভ নিচু গলায় বলল, “খুব আনন্দ হচ্ছে না? আমার ইম্পর্টেন্ট ফাইলগুলো এখন এক্সেস করতে পারছি না। আপনি জানেন এর রেজাল্ট কী হতে পারে?”
রিন্নি ঢোক গিলে বলল, “কী?”
আরাভ হঠাৎ রিন্নির খুব কাছে এসে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। রিন্নি থতমত খেয়ে গেল। আরাভ ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “রেজাল্ট হলো এখন থেকে আপনার ওই রুটিনে শাস্তি হিসেবে একটা নতুন চ্যাপ্টার যোগ হবে। যতক্ষণ না আমি ফাইলটা রিকভার করছি, ততক্ষণ আপনাকে আমার সাথে এই ঘরে বসে তানিনের সব গান শুনতে হবে। কোনো ন্যাকামি চলবে না।”
রিন্নি চোখ বড় বড় করে বলল, “কী! আপনিও তানিন ভাইয়ের গান শুনবেন?”
আরাভ হাসল। “শুনব না কেন? বিরহী গান তো ভালোই। তবে আমি শুনব না, আমি শুধু রেকর্ডার চালিয়ে দিয়ে হেডফোন কানে দিয়ে ঘুমাব, আর আপনি জেগে থেকে ওটা শুনবেন।”
রিন্নি কাঁচুমাচু করে বলল, “সরি স্যার! আর করব না। পাসওয়ার্ডটা ফাহিম জানে, ও ঠিক করে দেবে।”
আরাভ রিন্নিকে ছেড়ে দিয়ে কপালে একটা হালকা টোকা দিল। “টমকে জব্দ করা সহজ না জেরি! এবার জলদি চা বানিয়ে নিয়ে আসুন, আর এবার যেন লবণ না থাকে।”
চলবে,,,,
(৪০০ রিয়াক্টের পর নেক্সট পর্ব দিব। ভাই কাহিনী যে কোনদিকে নিমু সেটাই বুঝছি না🤦♀️)

