#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩৩
লাইব্রেরির সেই ধুলোবালি মাখা অন্ধকার ঘরে তখন টানটান উত্তেজনা। ড্রাগনের লোকগুলো অস্ত্র হাতে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ। আরাভ রিন্নিকে এক ঝটকায় দেয়ালের এক কোণায় ঠেলে দিল। ওর চোখে তখন সেই ভয়ংকর শীতলতা, যা দেখলে যে কোনো হ্যাকারের বুক কেঁপে ওঠে।
আরাভ এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি হাসল। “ড্রাগন! তুমি আমার ঘরের রহস্য জানতে চেয়েছিলে না? আজ আমি তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইকুয়েশনটা দেখাব যেখানে ভিলেনের মান সব সময় জিরো হয়!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ফাহিম পেছন থেকে একটা গোপন দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আরাভ ফাহিমকে ইশারা করে বজ্রকণ্ঠে বলল, “ফাহিম! রিন্নিকে নিয়ে এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যা। চৌধুরী ভিলার সেফ হাউজে নিয়ে যা ওকে। এক সেকেন্ডও দেরি করবি না!”
রিন্নি চিৎকার করে উঠল, “না! আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না! আরাভ, শুনুন”
আরাভ রিন্নির দিকে না তাকিয়েই চেঁচিয়ে বলল, “যাও রিন্নি! আমার মাথা নষ্ট করো না। ফাহিম, নিয়ে যা ওকে!”
ফাহিম রিন্নিকে জোর করে প্রায় পাঁজাকোলা করে ওই গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে বের করে নিয়ে এল। পেছনে শুধু শোনা গেল কাঁচ ভাঙার শব্দ আর গুলির আওয়াজ।
সেদিন রাতে চৌধুরী ভিলার সেফ হাউজে রিন্নি ছটফট করছিল। আরাভ ফেরেনি। ফাহিমও কোনো খবর দিতে পারছে না। বাড়ির সবাই অস্থির। রিন্নির শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ হতে শুরু করল। মাথা ঘোরা আর প্রচণ্ড বমি বমি ভাব। মাঝরাতে বাড়ির ডাক্তার এসে চেকআপ করে যখন রিপোর্ট দিলেন, পুরো চৌধুরী ভিলা স্তম্ভিত হয়ে গেল।
রিন্নি গর্ভবতী!
রিন্নি নিজের পেটে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। যে খুশির খবরটা আরাভকে জড়িয়ে ধরে দেওয়ার কথা ছিল, সেই মুহূর্তে আরাভ কোথায় আছে কেউ জানে না।
পরের দুদিন যেন রিন্নির জীবনের সবচেয়ে লম্বা দুদিন। সে পা*গলের মতো আরাভকে খুঁজেছে। ফোন বন্ধ, ল্যাপটপের সব সিগন্যাল অফ। ফাহিম অনেক চেষ্টা করেও ভাইয়ের কোনো লোকেশন ট্রেস করতে পারছে না। রিন্নি বুঝতে পারল, ড্রাগনের সাথে কোনো এক বড় গেম খেলছে আরাভ, যেখানে সে নিজেকেও লুকিয়ে ফেলেছে।
তৃতীয় দিন দুপুরে ফাহিমের ল্যাপটপে একটা সিগন্যাল বিপ বিপ করে উঠল। শহরের প্রান্তে একটা পরিত্যক্ত জাহাজ ঘাটে আরাভের ফোনের একটা ডামি সিগন্যাল পাওয়া গেছে। রিন্নি আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। ফাহিমকে একরকম ব্ল্যাকমেইল করে সে ওই ঘাটে পৌঁছে গেল।
ঘাটের এক অন্ধকার কেবিনের ভেতরেু ঢুকে রিন্নি দেখল আরাভ একাই একটা কম্পিউটারের সামনে বসে আছে, ওর কপালে ব্যান্ডেজ, শার্টে র*ক্তের দাগ। চারদিকে তারের জঞ্জাল।
রিন্নিকে দেখেই আরাভ চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখে আনন্দ নয়, বরং আগ্নেয়গিরির মতো রাগ ফুটে উঠল। সে দ্রুত পায়ে রিন্নির সামনে এসে ওর দুই কাঁধ খামচে ধরল।
“তুমি এখানে কেন রিন্নি? কে তোমাকে আসতে বলেছে? তোমার কি আসলেও কোনো বুদ্ধি নেই? জানো এটা কত বড় বিপদের জায়গা? ড্রাগনের লোকগুলো এখনো আশেপাশে ওত পেতে আছে। কেন আমার অবাধ্য হও সবসময়? কেন বারবার আমার প্ল্যান নষ্ট করো? কেন আসছ এখানে?”
আরাভ একনাগাড়ে বকেই যাচ্ছিল। ওর রাগী কণ্ঠস্বর পুরো কেবিনে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল। রিন্নি কাঁপাকাঁপা হাতে ওর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সেই প্রেগন্যান্সি রিপোর্টটা বের করার চেষ্টা করল। ওর ঠোঁট কাঁপছে, চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে বলতে চাইল, “আরাভ, আমি একা আসিনি, আমাদের সাথে নতুন একজন আছে।”
কিন্তু আরাভ ওকে বলার কোনো সুযোগই দিল না। সে রিন্নিকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ফাহিমের দিকে সরিয়ে দিল। “ফাহিম! ওকে এখনই নিয়ে যা! এক মুহূর্ত এখানে থাকলে ওর বিপদ হতে পারে। আমি এই কোডটা ক্র্যাক না করে এক চুল নড়ব না। রিন্নি, তোমার কোনো কথা এখন আমি শুনব না। যাও এখান থেকে!”
রিন্নি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর হাতের সেই সাদা রিপোর্টটা মেঝের ধুলোয় পড়ে গেল। আরাভ এতটাই উত্তেজিত যে সে নিচের দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করল না। সে আবার কিবোর্ডে ফিরে গেল।
রিন্নি ফাহিমের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এল। ওর মনে হলো, আরাভ চৌধুরী হয়তো একজন সেরা প্রফেসর, একজন সেরা হ্যাকার কিন্তু সে রিন্নির মনের হাহাকারটুকু ডিকোড করতে পারল না।
রিন্নি চলে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর, আরাভ হঠাৎ মাটির দিকে তাকাল। ধুলোর ওপর পড়ে আছে সেই সাদা কাগজটা। সে ভুরু কুঁচকে কাগজটা তুলে নিল।
লাইব্রেরির আবছা আলোয় সে যখন রিপোর্টটা পড়ল, ওর হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে শুরু করল।
Patient Name: Rinni Chowdhury
Result: POSITIVE
আরাভের হাত থেকে মাউসটা পড়ে গেল। স্ক্রিনের সব কোডিং যেন ঝাপসা হয়ে এল। সে কী করল? সে তার অনাগত সন্তান আর রিন্নিকে এভাবে তাড়িয়ে দিল?
আরাভ চিৎকার করে উঠল, “রিন্নি! জেরি! দাঁড়াও!”
সে ল্যাপটপ ফেলে পা*গলের মতো কেবিনের বাইরে দৌড়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে ফাহিমের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। আরাভ মাঝরাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ওর সেই পাথরের মতো হৃদয়ে আজ যেন এক হাজার ভোল্টের শর্ট সার্কিট হলো।
চলবে,,,,,
(বড় পর্ব চাহিয়া লজ্জা দিবেন না।)

