বিপরীত_মেরুর_টানে #দশম_পর্ব

0
16

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#দশম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রিন্নিদের বাড়ির সামনে আলোকসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে পুরো এলাকাটাই বুঝি নীল আর সোনালি রঙে ডুবে গেছে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে রিন্নির রুমে তখন চলছে অপারেশন ডিস্টার্বেন্স। রিন্নি নীল রঙের ভারী বেনারসি পরে আয়নার সামনে বসে আছে। মেকআপ আর্টিস্ট তার মুখে তুলি চালাচ্ছে, আর রিন্নি মনে মনে শয়তানি বুদ্ধি আঁটছে।

তানিয়া ঘরে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রিন্নি! সর্বনাশ হয়েছে! আরাভ স্যার তো বাইক নিয়ে বিয়ে করতে আসছেন। আর সাথে তার সাঙ্গোপাঙ্গ বলতে ডিপার্টমেন্টের সব কড়া কড়া জুনিয়র ইনস্ট্রাকটররা আছে। তারা সবাইও বাইকে করে আসছে। মনে হচ্ছে বিয়ে করতে না, বাইট রেইচ হচ্ছে।”

রিন্নি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আসুক! আজকে আমি ওনাকে এমন শিক্ষা দেব যে কবুল বলার আগে উনি ফিজিক্সের সূত্র ভুলে যাবেন। তানিয়া, তুই গেটে দাঁড়িয়ে থাকবি। আমি না বলা পর্যন্ত ওদের ভেতরে ঢুকতে দিবি না। আর তানিন ভাইকে বলবি গেট আটকানোর সময় যেন একটু বেশি করে টাকা চায়।”

তানিয়া এক গাল হেসে বলল, “চিন্তা করিস না। আমি আর তানিন ভাই মিলে আজকে প্রফেসরের পকেট খালি করে ছাড়ব। তানিন ভাই তো অলরেডি গেটে দাঁড়িয়ে কবিতা আওড়াচ্ছে।”

বিয়ের গেটের সামনে তখন এলাহি কাণ্ড। আরাভ চৌধুরী একটা ধবধবে সাদা শেরওয়ানি পরে তার সেই আইকনিক ব্ল্যাক আর-ওয়ান ফাইভ (R15) বাইক নিয়ে এন্ট্রি নিল। তার পেছনে সাজানো কয়েকটা গাড়ি, কিন্তু পাত্র নিজে বাইকে! মাথায় পাগড়ি নেই, বরং এক হাতে হেলমেট।

আফজাল চৌধুরী গাড়ি থেকে নেমে কপাল চাপড়ে বললেন, “বাপ রে! তোর কি লজ্জা-শরম কিছু নেই? লোকজন পাত্রকে সাজানো গাড়িতে দেখে, আর তুই আসলি বাইকে ধুলো উড়িয়ে? হাসান সাহেব দেখলে তো বলবে জামাই না, বাইক চোর আসছে।”

আরাভ নির্বিকারভাবে বাইক থেকে নেমে চশমাটা ঠিক করল। “আব্বু, গাড়িতে এলে এয়ার রেজিস্ট্যান্স বেশি হয় আর ট্রাফিক জ্যামে ফিকশন বাড়ে। বাইকে আমি ৫ মিনিট আগে পৌঁছেছি। আর রিন্নি তো আমার রাইডিং পছন্দ করে, সো নো প্রবলেম।”

গেটের সামনে তানিন বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তানিয়া। তানিন হাত উঁচিয়ে বলল, “থামুন হে জ্ঞানপাপী! এই গেট পার হতে হলে আপনাকে দিতে হবে এক লক্ষ এক টাকা। তা না হলে এই বিরহী কবি আপনাকে ভেতরে যেতে দেবে না।”

আরাভ ভুরু কুঁচকে তাকাল। “এক লক্ষ টাকা? কিসের ভিত্তিতে? আপনি কি কোনো ট্যাক্স অফিসার? নাকি গেটে দাঁড়িয়ে তোলাবাজি করছেন?আমি বিয়ে করব আমার আলরেডি এত খচর হয়ে গেছে, চিন্তায় আছি কখন আবার আমার রাস্তা নামা লাগে। পারলে আমায় কয়টা টাকা দেন আপনারা।”

তানিয়া মাঝখান থেকে ফোঁড়ন কাটল, “স্যার, লজিক দেবেন না! এটা শালিদের হক। টাকা বের করুন, নাহলে রিন্নির সাথে আপনার দেখা হওয়া ইমপসিবল।”

আরাভ পকেট থেকে একটা খাম বের করল। সবাই ভাবল টাকা, কিন্তু খাম খুলে দেখা গেল ওটা একটা ম্যাথমেটিক্যাল পাজল বা গণিতের ধাঁধা। আরাভ গম্ভীর মুখে বলল, “এই ধাঁধাটার সমাধান যে করতে পারবে, তাকে আমি এক লক্ষ টাকা দেব। আর যে পারবে না, সে আমাকে ফ্রিতে ঢুকতে দেবে। সময় মাত্র দুই মিনিট।”

তানিন আর তানিয়া হা করে সেই কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল। আফজাল চৌধুরী পাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে হারামি! বিয়ের গেটেও তুই পরীক্ষা নিচ্ছিস? দে টাকা দে!”

আরাভ শেষমেশ ৫০০০০ টাকা দিয়ে গেট পার হলো, কিন্তু তানিনকে কানে কানে বলে গেল, “কবিতা লিখে সময় নষ্ট না করে ক্লাস এইটের অংকগুলো একটু প্র্যাকটিস করবেন তানিন সাহেব।”

বিয়ের আসরে আরাভকে যখন স্টেজে বসানো হলো, সে যেন একটা জীবন্ত মূর্তির মতো বসে আছে। চারদিকে হাসাহাসি, গান-বাজনা সবকিছুকে সে এমনভাবে দেখছে যেন কোনো ডিসকভারি চ্যানেলের ডকুমেন্টারি দেখছে।

কিছুক্ষণ পর রিন্নিকে নিয়ে আসা হলো। নীল শাড়িতে রিন্নিকে দেখে আসরের সবাই থমকে গেল। এমনকি আরাভের চোখের চশমাটাও যেন এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে গেল।কয়েক মূহুর্তের জন্য যেন ভুলেই গেল বিয়ের পিরিতে এমন করে তাকাতে হয় না।

আফজাল চৌধুরী তাড়াতাড়ি ছেলের দিকে ঝুকে বললেন, “ওরে বাপ এত দেখিস না সানি পড়ে যাবে তো!”

আরাভ তাকানো অবস্থা বলল,” তো আমার বউ আমি দেখছি। আর তাছাড়া ৫০০০০ উসুল করতে হবে না?”

রিন্নি স্টেজে উঠে আরাভের পাশে বসতেই আরাভ ফিসফিস করে বলল, “নীল রঙটা আপনার ব্রেনকে হয়তো একটু শান্ত করবে বলে আশা করেছিলাম, কিন্তু আপনার চোখের শয়তানি তো বলছে অন্য কথা।”

রিন্নি টেনে টেনে নিচু স্বরে বলল, “এখন তো শুধু শয়তানি দেখছেন স্যার, কবুলের সময় কিয়ামত দেখবেন।”

কাজী সাহেব সামনে এসে বসলেন। খাতা খুলে গলা পরিষ্কার করে বললেন, “বাবা আরাভ চৌধুরী, আপনি কি রিন্নি রহমানকে… (ব্লা ব্লা ব্লা)… কবুল বলে গ্রহণ করছেন?”

আরাভ খুব স্বাভাবিকভাবে, কোনো আবেগ ছাড়াই বলল, “হ্যাঁ, কবুল।” যেন সে ল্যাবে কোনো এটেনডেন্স দিচ্ছে।

এবার কাজী সাহেব রিন্নির দিকে ঘুরলেন। “মা রিন্নি রহমান, আপনি কি আরাভ চৌধুরীকে স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”

রিন্নি চুপ। পুরো আসরে পিনপতন নীরবতা। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড পার হয়ে গেল।

রিন্নি হঠাৎ ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে শুরু করল।

কাজী সাহেব আবার বললেন, “মা, কবুল বলুন।”

রিন্নি হঠাৎ করে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “আমি বলব না! কাজী সাহেব, এই লোকটা আমাকে দিয়ে বিয়ের পর ল্যাব পরিষ্কার করাবে বলেছে। উনি আমাকে সারাদিন বকেন। আমি এই হাড়কিপ্টে রোবটকে বিয়ে করব না!”

পুরো আসরে শোরগোল পড়ে গেল। হাসান সাহেব আর আফজাল চৌধুরী একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। আরাভ এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেলেও পরক্ষণেই বুঝতে পারল এটা রিন্নির নাটক।

আরাভ রিন্নির দিকে একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল, “রিন্নি, নাটকটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। আপনি কি চান আমি সবার সামনে আপনার কালকের ওই ইচিং পাউডারের কেচ্ছা বলে দিই? আর হ্যাঁ, কবুল না বললে কিন্তু এখনই বাইক নিয়ে স্টার্ট দেব, আর ল্যাবে আপনার গ্রেড এফ নিশ্চিত।”

রিন্নি এবার এক ধাপ এগিয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলল, “দেখুন! দেখুন আপনারা! উনি বিয়ের আসরেও আমাকে ফেল করানোর হুমকি দিচ্ছেন! আমি কি কোনো মানুষ না? আমি কি শুধু ওনার এসাইনমেন্ট?”

আফজাল চৌধুরী এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে উঠে এলেন। “আরে মা রিন্নি! ও তো পা-গল। তুই একটা কাজ কর, তুই ওকে বিয়ে করে সারা জীবন ওকে ঘর মুছিয়ে শাস্তি দে। আমি তোকে পারমিশন দিলাম।”

রিন্নি এবার একটু শান্ত হওয়ার ভান করে বলল, “ঠিক আছে, যদি উনি সবার সামনে প্রমিস করেন যে উনি আমাকে আর নেকা বলবেন না আর সপ্তাহে তিনদিন আমাকে আইসক্রিম খাওয়াবেন, তবেই আমি কবুল বলব।”

আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আসমানের দিকে তাকাল। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “ঠিক আছে, প্রমিস! ন্যাকামিটা আপাতত সহ্য করে নেব। এবার কবুল বলুন, আমার বাইকের টায়ার গরম হয়ে যাচ্ছে।”

রিন্নি এবার বিজয়ী হাসি দিয়ে তিনবার “কবুল” বলল।

বিয়ের আসরে তখন তালি আর হাসির ধুম। তানিন এক কোণায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “একটি নক্ষত্রের পতন হলো, আর একটি রোবটের জয় হলো।”

তানিয়া পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আরে নক্ষত্র পতন না, একটি সুন্দর সংসারের শুরু হলো। তানিন ভাই, আপনার কবিতা কি এখনো শেষ হয়নি? চলেন কাচ্চি খাই।”

খাওয়া-দাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার সময় রিন্নি তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে এমন কান্না শুরু করল যে সবার চোখে জল চলে এল। কিন্তু আরাভ পাশে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখছিল। সে রিন্নির কানের কাছে গিয়ে বলল, “রিন্নি, কান্নার ইকুয়েশনে পানি আর মিউকাসের মিশ্রণটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। এবার চলুন, রাত অনেক হয়েছে। আমার আবার সকালে একটা ক্লাস আছে।”

রিন্নি কান্নার মাঝেই আরাভের হাতে একটা চিমটি কেটে বলল, “আপনি কি কোনোদিন মানুষ হবেন না?”

আরাভ রিন্নিকে একরকম পাজা করে তুলে বাইকের সামনে নিয়ে এল। হাসান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, “আরে! রিন্নিকে গাড়িতে নাও!”

আরাভ বলল, “না আংকেল থুড়ি আব্বু। বাইকের এক্সিলারেটরের যে থ্রিল, ওটা গাড়িতে নেই। আর রিন্নি তো আমার পেছনে বসলে এমনিতেই চুপ হয়ে যায়।”

রিন্নিকে বাইকের পেছনে বসিয়ে আরাভ স্টার্ট দিল। একহাত দিয়ে বাইক ধরে অন্যহাত দিয়ে রিন্নির শাড়ি ধরে আছে যাতে টায়ারে না বাজে। নীল বেনারসির আঁচল বাতাসে উড়ছে, আর রিন্নি আরাভের শেরওয়ানি শক্ত করে ধরে আছে। বাইকটা যখন হাইওয়ে দিয়ে তীরের মতো ছুটছে, রিন্নি ফিসফিস করে বলল, “স্যার, এখন তো আমি আপনার বউ। এখনো কি আমাকে এসাইনমেন্ট দেবেন?”

আরাভ বাইকের আয়নায় রিন্নির দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “বাসর ঘরে যাওয়ার পর আপনার জন্য নতুন একটা প্র্যাকটিক্যাল অপেক্ষা করছে মিসেস চৌধুরী। ওটা ল্যাবের চেয়েও কঠিন হবে।”

রিন্নি মনে মনে শিউরে উঠল। “আল্লাহ! এই লোক কি বাসর রাতেও আমাকে দিয়ে প্রুফ রিডিং করাবে নাকি?”

আরাভদের বাসায় পৌঁছানোর পর অনুষ্ঠান শেষ হলো। রিন্নিকে বাসর ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরটা বেলী আর গোলাপ ফুলে ঠাসা। রিন্নি খাটের মাঝখানে বসে কাঁপছে। তার মাথায় এখন শুধু একটা চিন্তা আরাভ চৌধুরী কি আসলেই রোবট? নাকি এই গাম্ভীর্যের আড়ালে অন্য কেউ লুকিয়ে আছে?

দরজার কাছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। আরাভ ভেতরে ঢুকে দরজাটা খুব ধীরে লক করল। রিন্নি ঘোমটা টেনে দিয়ে পাথরের মতো হয়ে বসে রইল।
আরাভ খাটের কাছে এসে দাঁড়াল। রিন্নি দেখল আরাভের হাতে কোনো ফিজিক্সের বই নেই, বরং একটা ছোট মখমলের বক্স। আরাভ বক্সটা খুলে রিন্নির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “মিসেস চৌধুরী, ন্যাকামি ছেড়ে ঘোমটাটা তুলুন। আপনার বাসর রাতের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে।”

রিন্নি মনে মনে বলল, “হায় আল্লাহ! এ কি বাসর ঘর নাকি এক্সাম হল?”

চলবে,,
(নেক্সট, সুন্দর হইছে, নাইচ এসব বাদে গঠনমূলক কমেন্ট করবেন। আর এতেও যদি কষ্ট হয় তাহলে ভাই আমারও লেখতে কষ্ট হয় ডেইলি পড়ালেখা বাদ দিয়ে। তাহলে ২দিন পরপর দিব)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here