#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_২৩
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
রিন্নির ১০৩ ডিগ্রি জ্বরটা ভোরের দিকে একটু কমলেও শরীরটা যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই ‘বল্লা’ কামড়ানোর স্বপ্নটা ওর মাথায় এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে। ঠোঁটটা আয়নায় দেখে রিন্নির মনে হলো, স্বপ্নেও কি এত নিখুঁত কামড় দেওয়া সম্ভব?
আরাভ সারা রাত রিন্নির পায়ের কাছে বসে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। ওর চশমার আড়ালে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। রিন্নি উঠে বসার চেষ্টা করতেই আরাভ ধমক দিয়ে উঠল।
“একদম নড়বে না জেরি! বল্লার বিষ এখনো নামেনি মনে হয়।”
রিন্নি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “বল্লা কি আপনার পোষা নাকি যে আপনি জানেন বিষ নামেনি? উফ! মাথাটা কেমন ঘুরছে।”
রিন্নি বিছানা থেকে নেমে ডাইনিং টেবিলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। সারা ঘর মৌ মৌ করছে বিরিয়ানির গন্ধে। আফজাল চৌধুরী আর রোকেয়া বেগম নাস্তা করতে বসেছেন। ফাহিম এক কোণায় বসে নয়নার সাথে মেসেজিংয়ে ব্যস্ত, মাঝে মাঝে একা একাই হাসছে।
রিন্নি ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসতেই বিরিয়ানির তেলের গন্ধটা ওর নাকে ধাক্কা দিল। হঠাৎ ওর পাকস্থলীটা উল্টেপাল্টে উঠল। রিন্নি মুখ চেপে ধরে দৌড়ে বেসিনের দিকে গেল।
“ওয়াক… ওয়াক…”
পুরো ডাইনিং টেবিল নিস্তব্ধ। আফজাল চৌধুরী হাতের রুটিটা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। রোকেয়া বেগম চোখ বড় বড় করে রিন্নির দিকে তাকালেন। ফাহিম ফোন রেখে সোজা হয়ে বসল।
রিন্নি মুখ ধুয়ে ফিরে আসতেই আবার সেই গন্ধে ওর বমি ভাব হলো। সে দ্বিতীয়বার বেসিনের দিকে ছুটল। এবার আফজাল চৌধুরী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে পাশের চেয়ারে বসা আরাভের দিকে তাকালেন। বাবার সেই দৃষ্টিতে হাজারটা প্রশ্ন, যার সারমর্ম হলো “আরাভ, ঝগড়া করতে করতে তুমি কাজ সরে ফেলছো?”
আরাভ বাবার সেই চাউনি দেখে এক সেকেন্ডে সব বুঝে ফেলল। ওর গলায় বিরিয়ানির লোকমা আটকে গেল। সে বিষম খেয়ে কাশতে কাশতে একাকার।
আরাভ হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠল, “আস্তাগফিরুল্লাহ্ আব্বু! আমি কিছু করি নাই। আপনি যেভাবে তাকাচ্ছেন, ওটা একদম ভুল ইকুয়েশন!”
ফাহিম এবার সুযোগ বুঝে আসরে নামল। সে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “ছিহ্! ভাইয়া, বউ থাকতেও কিছু করিস নাই মানে? তোর কি কোনো সমস্যা আছে নাকি আবার? আমাদের ফ্যামিলি প্ল্যানিং কি তবে এখানেই স্থগিত?”
আরাভ ফাহিমের দিকে একটা চামচ ছুড়ে মা-রল। ফাহিম মাথা নিচু করে বেঁচে গেল। আরাভ রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “মা-র খাওয়ার আগে সর এখান থেকে হারাম*জাদা!…. করছি! মানে… আমি বলতে চাচ্ছি যে, এমন কিছু করি নাই যে ও প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে। আমাদের মাঝে ফিজিক্স আছে, কেমিস্ট্রি এখনো অতটা ত্বরান্বিত হয় নাই!”
রোকেয়া বেগম এবার কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। “ছি ছি! বিয়ের এক মাসও হয় নি। মানুষ কি বলবে? এখনই যদি এসব হয়, তবে পাড়া-প্রতিবেশী ভাববে আমরা বিয়ের আগেই সব সেরে ফেলেছি। রিন্নি মা, তুই কি সত্যিই…?”
রিন্নি তখন বেসিন থেকে ফিরে এসে সোফায় ধপাস করে বসেছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
আরাভ এবার প্রায় কান্না করে দেওয়ার মতো অবস্থা। সে রোকেয়া বেগমের হাত ধরে বলল, “আম্মু সত্যি আমি কিছু করি নাই। তোমার বউ আমাকে ফাঁসাচ্ছে! ও কাল রাতে কাজে অনেক খাটুনি খেটেছে, খালি পেটে গ্যাস হয়েছে হয়তো। ওই গ্যাসের বমিকে তোমরা কেন বেবি-বাম্প বানাচ্ছো?”
আফজাল চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন, “গ্যাস হলে দুইবার ওভাবে ছোটে না আরাভ। আমি তোকে অনেক বিশ্বাস করেছিলাম। তুই তো দেখি সাইলেন্ট কিলার!”
রিন্নি এবার বুঝতে পারল কাহিনী কোন দিকে যাচ্ছে। সে হাহাকার করে উঠল, “আরে না না! আব্বু, ও যা বলছে ঠিক। কাল রাতে আমি তো জ্বরে অজ্ঞান ছিলাম, ও তো শুধু আমার জলপট্টি দিচ্ছিল। ও কিছু করার সময় পেল কোথায়?”
আরাভ এবার রিন্নির দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “শোনো গিন্নি! এখন ডিফেন্ড করতে গিয়ে আমাকে আরও ফাঁসিয়ে দিও না। জলপট্টি দেওয়ার কথা বলে তুমি আমাকে আরও সন্দেহের তলায় ফেলছো।”
আরাভ এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিল “রিন্নির এই বমি স্রেফ ভাইরাল ফিভারের সাইড ইফেক্ট। এর সাথে আমার কোনো বায়োলজিক্যাল সম্পর্ক নেই। আমি এখনো আমার ব্যাচেলর ইমেজটা মনে মনে ধরে রেখেছি!”
ফাহিম পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল, “ব্যাচেলর ইমেজ? ভাইয়া, কাল রাতে রিন্নির ঠোঁটে যে বল্লা কা-মড়ানোর দাগ পাওয়া গেছে, ওটা কি তবে ড্রোন অ্যাটাক ছিল?”
আরাভ এবার ফাহিমের কলার চেপে ধরল। “তুই কাল থেকে কলেজে যাবি। তোকে আমি ল্যাবে বন্দি করে রাখব।”
রিন্নি এবার হাসি চেপে রাখতে পারল না। আরাভের মতো গম্ভীর মানুষটা আজ বাড়ির সবার সামনে একদম কোণঠাসা হয়ে গেছে। আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “হাসছো? হাসো! কাল রাতে যে ‘ট্যাক্স’ টা মওকুফ করেছিলাম, ওটা আজ সুদে-আসলে উসুল করব। তখন দেখা যাবে কার বমি আসে আর কার কান্না!”
একটু পর ডাক্তার এলেন। ডাক্তার চেকআপ করে বললেন, “উদ্বেগের কিছু নেই। প্রচণ্ড জ্বর আর খালি পেটে কাজ করার জন্য ওর অ্যাসিডিটি হয়ে বমি হচ্ছে। আর হ্যাঁ, গতরাতের কোনো একটা ইনজুরি থেকে ওর ঠোঁটটা একটু ফুলে গেছে, ওখানে বরফ দেবেন।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আফজাল চৌধুরী একটু আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু আরাভের মান-সম্মান তখন ধুলোয় মিশে গেছে। সে রাগ করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
রিন্নি পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল। দেখল আরাভ ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে কিন্তু ল্যাপটপ উল্টো করে ধরা! রাগে ও কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
রিন্নি হাসতে হাসতে বলল, “কী হলো স্যার? প্রেগন্যান্সি টেস্টের রেজাল্ট কি নেগেটিভ এল?”
আরাভ ল্যাপটপ নামিয়ে রিন্নিকে এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে নিল। রিন্নি ওর বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই সাইকো স্টাইলে বলল
“তুমি আমাকে আজ সবার সামনে ভিখারি বানিয়ে ছেড়েছো রিন্নি। সবাই ভাবছে আমি তোমাকে… উফ! এখন থেকে বাড়ির সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। এই যে অপবাদটা আমি নিলাম, এটার শোধ আমি কীভাবে নেব জানো?”
রিন্নি ভয়ে ভয়ে বলল, “কীভাবে?”
আরাভ রিন্নির চিবুকটা শক্ত করে ধরে বলল, “যেহেতু সবাই ভাবছে আমি ‘কিছু একটা’ করেছি, তবে কেন আমি অপবাদটা সত্যি করে দিচ্ছি না? এখন থেকে এই ঘরে কোনো এন্ট্রি নেই ফাহিমের। আজ আমি সত্যিই প্রমাণ করব যে আরাভ চৌধুরী শুধু ল্যাপটপ টিপতে জানে না, সে নিজের অধিকারও আদায় করতে জানে।”
রিন্নি চোখ বড় বড় করে বলল, “আরে! আমি তো মজা করছিলাম…”
আরাভ রিন্নির ঠোঁটের সেই কামড়ের দাগটায় আঙুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে বলল, “কাল রাতের বল্লাটা ছোট ছিল জেরি। আজ রাতের বল্লাটা কিন্তু অনেক বেশি বিষাক্ত হবে। সাবধান!”
আরাভ চৌধুরীকে নিয়ে মজা করা মানে আগুনের সাথে খেলা করা। সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু আরাভ দরজাটা আগেই লক করে দিয়েছিল।
চলবে,,,,

