বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_৩১

0
46

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৩১
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

সোনিয়ার সেই নোংরা অপবাদ থেকে আরাভ মুক্তি পেলেও একটা বড় ধাক্কা দিয়ে গেছে। ড্রাগনের মতো বড় হ্যাকার যখন সরাসরি মাঠে নেমেছে, তখন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট সবাই আরাভকে ঘিরে ধরেছে। দেশের প্রধান ব্যাংকিং সার্ভারে এক ভয়াবহ ম্যালওয়্যার অ্যাটাক হয়েছে, যার সমাধান একমাত্র আরাভ চৌধুরীর মস্তিষ্কেই আছে।

রিন্নি ভেবেছিল সোনিয়া বিদায় হওয়ার পর ওদের জীবনটা একটু ছন্দে ফিরবে, কিন্তু হলো তার উল্টো। গত তিনদিন ধরে আরাভ ঠিকমতো বাড়ি ফিরছে না। ফিরলেও সারারাত ল্যাপটপের নীল আলোয় ডুবে থাকছে। ওর চোখে লাল হয়ে যাওয়া র*ক্তের ছিটে, চেহারায় রাজ্যের ক্লান্তি কিন্তু জেদটা সেই আগের মতোই।

রিন্নি এক কাপ কফি নিয়ে আরাভের স্টাডি রুমে ঢুকল। রাত তখন প্রায় ২টা। আরাভ কিবোর্ডে ঝড়ের বেগে টাইপ করছে, পাশে তিনটে মনিটর জ্বলছে।

রিন্নি টেবিলের এক কোণায় কফিটা রেখে নিচু স্বরে বলল, “কফিটা খেয়ে নিন। আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবেন? শরীরটা তো শেষ হয়ে যাচ্ছে।”

আরাভ একবারও রিন্নির দিকে তাকাল না। ওর চোখ স্ক্রিনে স্থির। সে শুধু যান্ত্রিক গলায় বলল, “রেখে যাও জেরি। এখন কথা বলার সময় নেই। সার্ভারের মেইন গেট হ্যাক হওয়ার পথে। এক সেকেন্ডের ভুল মানে কোটি কোটি মানুষের ডেটা চুরি।”

রিন্নি একটু দমে গেল। সে আরাভের পিঠে হাত রাখতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। গত কয়েকদিন ধরে সে নিজেকে খুব একা অনুভব করছে। আরাভ পাশে থেকেও যেন নেই। সে নিচু গলায় বলল, “আপনি কি জানেন আজ আমাদের বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হলো? ভেবেছিলাম আজ অন্তত একটু সময় দেবেন।”

আরাভ এবার কিবোর্ড থেকে হাত সরাল। তবে রিন্নিকে আদর করার জন্য নয়, বরং ঝরঝর করে একটা ফাইল ডিলিট করার জন্য। সে একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “রিন্নি! আমি এখানে একটা ন্যাশনাল ক্রাইম ডিল করছি আর তুমি আসছো অ্যানিভারসারি নিয়ে? বুদ্ধি কি আসলেও তোমার হাঁটুর নিচে চলে গেছে? যাও, ঘুমাও গিয়ে। আমাকে ডিস্টার্ব করো না।”

রিন্নির বুকটা ধক করে উঠল। আরাভ এর আগেও ওকে বকা দিয়েছে, কিন্তু এবারের কণ্ঠটা ছিল খুব রুক্ষ। রিন্নির চোখে জল টলমল করে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, কফির কাপটা রেখে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

পরদিন সকালে রিন্নি যখন ডাইনিং টেবিলে এল, দেখল আরাভ জ্যাকেট পরে বেরোনোর জন্য তৈরি। ওর হাতে একটা ব্রিফকেস। রোকেয়া বেগম নাস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু আরাভের যেন এক সেকেন্ড বসার সময় নেই।

আরাভ আফজাল চৌধুরীর সাথে কথা বলছিল। “আব্বু, আমি হয়তো আগামী দু-তিন দিন ফিরব না। গোয়েন্দা সংস্থার হেডকোয়ার্টারেই আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিন্নিকে একটু দেখে রেখো।”

রিন্নিকে দেখেও আরাভ যেন দেখল না। সে শুধু পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুষ্ক গলায় বলল, “নিজের খেয়াল রেখো জেরি। খেয়ে নিও ঠিকমতো।”

ব্যাস, এইটুকুই। কোনো কপালে চুমু নেই, কোনো দুষ্টু হাসি নেই। রিন্নি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফাহিম এক কোণায় বসে পাউরুটি চিবোচ্ছিল, সে রিন্নির ফ্যাকাশে মুখ দেখে ফিসফিস করে বলল, “ভাবী, ভাইয়া এখন হিরো মোডে আছে তো, তাই রোমান্স করার সফ্টওয়্যারটা আনইনস্টল করে রেখেছে। তোমার কপালে ভিলেন জুটে নি, যে সব সময় তোমায় নিয়ে থাকবে। মন খারাপ করো না।”

রিন্নি হাসার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার মনে হচ্ছে, আরাভ চৌধুরীকে সে সোনিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেও তার এই নেশার মতো কাজ থেকে বাঁচাতে পারছে না।

বিকেলবেলা রিন্নি একা বাগানে বসে ছিল। হঠাৎ ওর ফোনে একটা মেসেজ এল। অপরিচিত নম্বর। মেসেজে লেখা “তোমার স্বামী তো খুব ব্যস্ত। দেশ বাঁচাতে গিয়ে নিজের ঘরটা যে অরক্ষিত রেখে যাচ্ছে, সেটা কি ও জানে? আজ রাতে তোমার ঘরে একজন নতুন মেহমান আসবে।”

রিন্নির হাত পা ঠান্ডা হয়ে এল। সে তৎক্ষণাৎ আরাভকে ফোন দিল। কিন্তু ওপাশে ফোনটা বেজেই যাচ্ছে, কেউ ধরছে না। রিন্নি কয়েকবার ট্রাই করল, কিন্তু ফলাফল শূন্য। আরাভ এখন এক অন্ধকার জগতে যুদ্ধ করছে, যেখানে রিন্নির ভয়ার্ত গলার আওয়াজ পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই।

রিন্নি ভাবল সুরাইয়া ম্যামকে জানাবে। কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনে হলো, আরাভ হয়তো ঠিকই বলেছে ও আসলেও চঞ্চল। হয়তো এটা কোনো স্প্যাম মেসেজ। কিন্তু মনের কোণায় একটা কু ডাকছে। তবুও একটা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে দিল আরাভের কাছে।

রাত নামল চৌধুরী ভিলায়। বাইরে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার। জেনারেটরটা কেন যেন স্টার্ট হচ্ছে না। রিন্নি নিজের ঘরে একা বিছানায় বসে কাঁপছে। হঠাৎ ও দেখল জানালার ওপাশে একটা কালো ছায়া।

রিন্নি ভয়ে চিৎকার করতে চাইল কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। ঠিক তখনই দরজার লকটা খোলার শব্দ হলো। রিন্নি বালিশের নিচে রাখা সেই ইলেকট্রিক শকারটা খুঁজতে লাগল যা আরাভ ওকে দিয়েছিল।

হঠাৎ একটা জোরালো আলো রিন্নির মুখে পড়ল। রিন্নি চোখ বন্ধ করে ফেলল। “কে? কে ওখানে?”

একটা পরিচিত ভারী কণ্ঠ শোনা গেল, “জেরি, আমি!”

রিন্নি চোখ খুলে দেখল আরাভ দাঁড়িয়ে আছে। ওর সারা শরীর ভেজা, চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। রিন্নি দৌড়ে গিয়ে আরাভকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলল।

আরাভ রিন্নিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে হাত বুলাল। “সরি জেরি। খুব ভয় পেয়ে গেছো? আমি মেইন সার্ভারের কাজটা শেষ করেই ল্যাবের সিকিউরিটি ভেঙে চলে এসেছি। তোমার একটা ভয়েস মেইল পেয়েছিলাম। আমার প্রসেসরের স্পিড যত যাই হোক, তোমার কান্নার আওয়াজ শোনার পর আমার লজিক কাজ করছিল না।”

রিন্নি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আপনি কত খারাপ! আমাকে বকা দিয়ে চলে গেলেন, আবার ফোন ধরছিলেন না কেন?”

আরাভ রিন্নির মুখটা দুহাতে আগলে ধরল। অন্ধকারেও আরাভের চোখ দুটো চিকচিক করছিল। সে রিন্নির কপালে একটা দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল, “আমি কাজ পা-গল হতে পারি জেরি, কিন্তু আমি তোমার পা-গল স্বামীও বটে। ওই মেসেজটা সোনিয়ার কোনো লোক পাঠিয়েছে যাতে আমি কাজে মন দিতে না পারি। কিন্তু ওরা জানে না, আরাভ চৌধুরী তার সব পাসওয়ার্ড তোমার চোখের মনির ভেতরে লুকিয়ে রাখে।”

রিন্নি এবার আরাভের বুকে কিল মেরে বলল, “আর কোনোদিন আমাকে একা রেখে যাবেন না! আপনার ওই ফিজিক্স আর কোডিংয়ের চেয়ে আমি দামী কি না আগে সেটা বলুন!”

আরাভ হেসে ফেলল। সে রিন্নিকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। “তুমি হলে আমার ইউনিভার্সের একমাত্র কনস্ট্যান্ট ভ্যালু রিন্নি। বাকি সব তো ভেরিয়েবল। চলো, আজ রাতে আর কোনো কোডিং নেই। আজ রাতে শুধু আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া অ্যানিভারসারি সেলিব্রেট হবে।”

বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ভেতরে একজোড়া মনের ফিসফাস। চৌধুরী ভিলার প্রতিটি ইটের আড়ালে আজ যেন নতুন করে ভালোবাসা ডিকোড হচ্ছে।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here