#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা নাওশীন
#পর্ব_৪০
কফি শপের ভেতরকার আবহাওয়া এখন বাইরের তপ্ত রোদের চেয়েও বেশি উত্তপ্ত। আরাভ আর শিশের চোখের লড়াই দেখলে মনে হবে, এখনই বুঝি টেবিলটা দুই টুকরো হয়ে যাবে। আরাভ চৌধুরীর মতো একজন গম্ভীর মানুষ, সে আজ একটা বাচ্চার মতো রেসিং চ্যাম্পিয়নের সাথে তর্কে জড়িয়েছে এটা সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না।
শিশ তার কফির কাপটা ঘুরিয়ে বাঁকা চোখে আরাভের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরাভ সাহেব, আপনি কি সব জায়গায় এই কন্ট্রোলিং নেচারটা নিয়ে চলেন? বাইকের পেছনে বসা মানেই যদি কফিন হয়, তবে আপনার ওই গাড়িতে বসা মানে তো সচল জেলখানা। রিমি কি আপনার কয়েদি?”
আরাভ ওর পাথুরে হৃদয়ের সবটুকু কাঠিন্য গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, “আমি রিমির নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছি। তোমার মতো হিরো সাজার নেশা আমার নেই। যে ছেলে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে পারে না, বাইক দিয়ে স্টান্ট দেখায়, তার হাতে আমি কোনো মানুষের সুরক্ষার ভার দিতে পারি না।”
শিশ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “সুরক্ষা? নাকি অধিকারবোধ? আপনি কি রিমিকে নিজের সম্পত্তি ভাবছেন?”
আরাভ এবার এক চুলও দমল না। “সম্পত্তি কি না জানি না, তবে ও আমার সাথে আছে। আর যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ ওর চুলের একটা আগাও বাঁকা হতে দেব না বিশেষ করে তোমার মতো উশৃঙ্খল কারো কারণে।”
ঝগড়াটা যখন বেশ ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, তখন রিমি তার কফির গ্লাসের পাইপ দিয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করল। দুজনেই থমকে গিয়ে রিমির দিকে তাকালো।
রিমি গালে হাত দিয়ে খুব করুণ মুখে বলল, “আপনাদের এই আমিই সেরা কম্পিটিশন কি সারা রাত চলবে? বিশ্বাস করুন, আপনাদের এই ঝগড়া শুনে পাশের টেবিলের ওই আন্টিটা তার জামাইকে বলছে ‘দেখো ওগো, তুমিও তো এক সময় এমন আমাকে নিয়ে লড়াই করতে!’ আন্টিটা তো নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছে, আর আমি এদিকে ক্ষিদেয় ম-রছি।”
আরাভ আর শিশ দুজনেই একসাথে বলে উঠল, “চুপ করো রিমি!”
রিমি ভুরু কুঁচকে বলল, “ওরে বাবা! একদম টম আর জেরির মতো সুর মিলিয়ে ধমক দিলেন তো! শুনুন রাইডার সাহেব, আপনি যে বললেন গম্ভীর সাহেবের গাড়ি জেলখানা তা জেলখানায় কিন্তু অন্তত চোর-পুলিশ খেলা যায়। আর আপনার বাইকে বসলে তো বাতাসে আমার চুলগুলো এমন হবে যে কফি শপ থেকে বের হওয়ার পর লোকে আমাকে ডাইনি ভাববে!”
শিশ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। রিমি এবার আরাভের দিকে ফিরে বলল, “আর আপনি মিস্টার! আপনি যে বললেন বাইক কফিন তা কফিনে শুলে তো অন্তত মানুষ শান্তিতে ঘুমায়। আপনার এই গম্ভীর মুখের দিকে তাকালে তো আমার মনে হয় আমি কোনো ম-রা বাড়িতে বসে আছি। একটু হাসলে কি আপনার মাফিয়া মেম্বারশিপ বাতিল হয়ে যাবে?”
আরাভ নিজের কপাল টিপে ধরে বলল, “রিমি, আমরা এখানে ফাজলামি করছি না।”
“করছেন তো!” রিমি সোজা হয়ে বসে বলল। “ঝগড়া করছেন কোন গাড়িতে যাব সেটা নিয়ে, কিন্তু শেষে তো এলেন গাধার মতো আমার পিছু পিছু হেঁটে। আপনাদের ওই দামী গাড়ি আর বাইক তো এখন ওই রোদেই পুড়ছে। তার চেয়ে ভালো হতো না একটা রিকশায় চড়ে হুড তুলে দিয়ে আসতাম? রোমান্টিকও হতো, আবার আপনাদের এই ইগোর বেলুনটাও ফাটত না!”
শিশ একটু কেশে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “রিমি, আমি সিরিয়াসলি তোমাকে নেক্সট রেসে দেখতে চাই।”
আরাভ সাথে সাথে তার চশমাটা টেবিলের ওপর সশব্দে রেখে বলল, “ওর যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। ওর পড়াশোনা আছে, ক্যারিয়ার আছে। তোমার মতো ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় ওর নেই।”
রিমি এবার আরাভের দিকে একটা অদ্ভুত চাহনি দিল। ওই বেগুনি চোখ দুটো যেন আরাভের আত্মার ভেতরে ঢুকে গেল। সে বলল, “ক্যারিয়ার? ভাইয়া, আপনি কি আমার বাবা নাকি যে আমার ক্যারিয়ার নিয়ে এত টেনশন? আমার তো মনে হয় আপনি ভয় পাচ্ছেন যে শিশের বাইকে চড়লে আমি আপনার এই গম্ভীর রাজত্ব থেকে পালিয়ে যাব!”
আরাভ থমকে গেল। ‘ভাইয়া’ ডাকটা ওর বুকে তীরের মতো বিঁধল। রিন্নিও ওকে কখনো কখনো খুনসুটি করে ভাইয়া ডাকত, যদিও মনে মনে স্যার বলত। আরাভ নিজের আবেগ সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি কারো ক্যারিয়ার গড়ি না, তবে কেউ যেন নষ্ট না করে সেটা খেয়াল রাখি।”
রিমি ফিক করে হেসে দিল। “উফ! কী ডায়লগ! শিশ সাহেব, আপনি কি শুনছেন? ওনার এই কথাগুলো রেকর্ড করে মুভিতে ভিলেনের ডায়লগ হিসেবে চালানো যাবে। আর আপনিও কম যান না, আপনার ওই নীল লেন্স আই মিন নীল চোখ দিয়ে ওনাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন কেন? উনি তো মাফিয়া, ওনাকে ভয় দেখাতে হলে আপনাকে আরও বেশি পিশাচ হতে হবে!”
শিশ অবাক হয়ে বলল, “কি উনি মাফিয়া?”
রিমি ফিক করে হাসি দিয়ে বলল, “কেন আপনার মনে হয় না? আমি যেদিন প্রথম তাকে দেখছি সেইদিনই একদম মাফিয়ার মতোই লাগছে। তাই মাফিয়া ডাকি!”
শিশ এবার হেসেই দিল। আরাভ নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে।রিমির এই চটপটে কথাগুলো কফি শপের ভারি আবহাওয়াটা নিমেষেই হালকা করে দিল।
আরাভ বিল দেওয়ার জন্য কার্ডটা বের করল, কিন্তু শিশ আগেই ক্যাশ টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
আরাভ ওর পথ আটকে নিজের কার্ডটা ওয়েটারের হাতে দিয়ে বলল, “আমার সাথে থাকা অবস্থায় অন্য কেউ বিল দেবে, সেই শিক্ষা আমার নেই।”
শিশ বাঁকা হাসল। “সব জায়গায় ক্রেডিট কার্ড চলে না মিস্টার। মাঝে মাঝে নগদ মায়ারও দাম দিতে হয়।”
রিমি দুজনের মাঝখান দিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে একটা চকলেট তুলে নিয়ে বলল, “বিল যে-ই দিক, এই চকলেটটা কিন্তু আমি এক্সট্রা নিচ্ছি। আপনাদের এই ঝগড়ার এনার্জি ড্রিংক হিসেবে এটা আমার দরকার!”
কফি শপ থেকে যখন ওরা বের হলো, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আরাভ তার গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় রিমির দিকে তাকালো। রিন্নি আর রিমির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। রিন্নি ছিল একটা শান্ত নদী, আর রিমি যেন এক অবাধ্য পাহাড়ি ঝর্না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এই অবাধ্য ঝর্নাটাই আরাভের পাঁচ বছরের জমাট বাঁধা পাথরটাকে একটু একটু করে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
আরাভ গাড়ির দরজা খুলে গম্ভীর গলায় বলল, “উঠুন রিমি। আপনাকে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে আসব।”
রিমি শিশের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, “টা-টা রাইডার সাহেব! পরের বার রেসে জেতার পর ট্রফিটা কিন্তু আমাকেই দেবেন, ওই এসইউভি ওয়ালার সামনে আমি একটু ভাব নেব!”
শিশ হাসল। আরাভ বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
চলবে,,,,

