#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩৮
পাঁচটি বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় মাত্র এক হাজার আটশ পঁচিশটি দিন, কিন্তু আরাভ চৌধুরীর জন্য এ যেন পাঁচটা শতাব্দী। এই দীর্ঘ সময়ে যমুনা দিয়ে অনেক র-ক্ত বয়ে গেছে, ঢাকার রাজপথের ধুলোয় মিশে গেছে অনেক চেনা মানুষের ঘাম। কিন্তু যে জিনিসটা কক্ষনো ফিকে হয়নি, তা হলো আরাভের চোখের সেই হাড়হিম করা শূন্যতা।
প্রফেসর আরাভ চৌধুরী এখন ইতিহাস। সরকারি নথিপত্রে তার নামটা এখন কালো কালিতে কাটা। গোয়েন্দা সংস্থা আর সিআইডির হেডকোয়ার্টারে এখন আর তার পদচিহ্ন পড়ে না। তিনি এখন অন্ধকার জগতের একচ্ছত্র সম্রাট যাকে আন্ডারওয়ার্ল্ড চেনে ‘দ্য আর্কিটেক্ট’ নামে। তার ল্যাপটপের একটা ক্লিকের ওপর নির্ভর করে এই শহরের শেয়ার বাজার উঠবে নাকি ধ্বংস হবে। প্রফেসরের ইউনিফর্ম ছেড়ে সে এখন কালো লেদার জ্যাকেট আর র-ক্তের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এক মাফিয়া।
পাঁচ বছর আগে সেই অভিশপ্ত রাতের পর চৌধুরী ভিলার আকাশ ভেঙে পড়েছিল। ফাহিম আর রিন্নির কবরের মাটি তখনো শুকোয়নি, যখন আফজাল চৌধুরী তার বড় ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সেদিন ড্রয়িং রুমে নেমে এসেছিল এক কবরের নিস্তব্ধতা। রোকেয়া বেগম সোফায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, হাতে ছিল ফাহিমের সেই পুরনো ঘড়ি।
আফজাল চৌধুরী কাঁপা গলায় আরাভকে বলেছিলেন, “তোর এই তথাকথিত দেশপ্রেম আর হ্যাকিংয়ের নেশা আজ আমাদের সাজানো বাগানটা কবর করে দিল। তুই কেন ওদের নিয়ে গিয়েছিলি আরাভ? তুই তো জানতিস তোর শত্রুরা কতটা ভয়ংকর!”
আরাভ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই রোকেয়া বেগম চিৎকার করে উঠলেন
“থামো আরাভ! একটা শব্দও উচ্চারণ করবে না। তোর ওই বিষাক্ত বুদ্ধির কারণেই আজ আমার ছোট ছেলেটা মাটির নিচে, আমার রিন্নি মা নেই, এমনকি আমার অনাগত নাতিটাকেও তুই পৃথিবীতে আসতে দিলি না! তোকে সন্তান হিসেবে পাওয়া আমাদের সাত জনমের দুর্ভাগ্য। আজ থেকে তুই আমাদের জন্য মৃ-ত!”
আফজাল চৌধুরী ছেলের দিকে না তাকিয়েই চূড়ান্ত রায় দিয়েছিলেন, “আজ থেকে এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ। তুই যেখানেই যা, যা খুশি কর, কিন্তু আমাদের সামনে যেন আর কক্ষনো না দেখি। আমাদের কোনো বিপদ হলেও যেন তুই না আসিস। তুই আমাদের কাছে এক জীবন্ত অভিশাপ।”
আরাভ সেদিন কোনো প্রতিবাদ করেনি। তার আত্মসম্মান ছিল গগনচুম্বী। সে শুধু একবার তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়েছিল যেখানে মায়ার বদলে ছিল শুধুই ঘৃণা। সে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পরও সে দায়িত্ব ভোলেনি। গোপনে আজও সে তার মা-বাবার প্রতিটা ওষুধের হিসাব রাখে, বাড়ির নিরাপত্তা দেয়, কিন্তু সে কখনো নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় না। সে জানে, সে এক ব্রাত্য সন্তান।
অন্যদিকে নয়নার জীবনটা হয়ে উঠেছিল এক বন্দিশালা। ফাহিমের মৃ-ত্যুর এক বছর পর নয়নার বাবা-মা তাকে নিয়ে বড্ড চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারা চাইলেন নয়নাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে দিতে।
সেদিন বিকেলে নয়নার বাবা তাকে ডেকে বললেন, “নয়না মা, ফাহিম চলে গেছে এক বছর হতে চলল। তুই কতদিন এভাবে পাথরের মতো থাকবি? আমরা তোকে এক সুপাত্রের সাথে বিয়ে দিতে চাই। ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার, তোকে খুব সুখী রাখবে।”
নয়না জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের সেই হাসিটা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। সে শান্ত গলায় বলল, “বাবা, আমি তো বিবাহিত। ফাহিম আমার নামে কবুল বলেছে। আমি অন্য কারো হতে পারব না।”
নয়নার মা রেগে গিয়ে বললেন, “ওটা ছেলেমানুষি ছিল নয়না! তুই তখন আঠারোও হোসনি। ফাহিম নেই, এটা বাস্তব। তুই কি সারাজীবন একটা ল-াশের স্মৃতি নিয়ে থাকবি?”
“হ্যাঁ মা, আমি ওই লা-শের স্মৃতি নিয়েই থাকব। কিন্তু আমি অন্য কারো বিছানায় যেতে পারব না।” নয়নার গলায় ছিল ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা।
যখন নয়নার বাবা জোর করে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করলেন, নয়না বুঝল এই সমাজে তার আর জায়গা নেই। সে তার বিয়ের কনে সাজের লেহেঙ্গাটা ফেলে দিয়ে সাধারণ একটা কালো পোশাকে মাঝরাতে ঘর থেকে পালাল। সে সোজা গিয়েছিল আরাভের ডেরায়।
আরাভ তাকে দেখে অবাক হয়নি, শুধু বলেছিল “এখানে আসলে আর কক্ষনো আলোর মুখ দেখবি না নয়না। পারবি তো র-ক্তের সাগরে ডুব দিতে?”
নয়না সেদিন শুধু একটা কথা বলেছিল, “যে ফাহিমকে ছাড়া বাঁচতে চেয়েছিলাম, সে আজ আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। ভাইয়া, আমাকে শিখিয়ে দিন কীভাবে মানুষ ম-ারতে হয়।”
আজ নয়না আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই ভয়ংকর বোম, যাকে সবাই চেনে ‘রেড ফিউরি’ নামে। সে আরাভের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অস্ত্র। তার বুলেটের লক্ষ্যে কখনো ভুল হয় না। ড্রাগন আর টাইগার এই দুই জানোয়ারকে শেষ করাই এখন তার জীবনের একমাত্র মন্ত্র।
আরাভ আর নয়না এখন ঢাকার অন্ধকার জগতের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। ড্রাগন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আরাভ ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো তাকে খুঁজছে। টাইগার ড্রাগনের হাত ধরে কাজ করছে।
আরাভ এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘ডার্ক লর্ড’। সে নিজে এখন আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে আর নয়না পাঁচ বছর ধরে তিল তিল করে নিজেদের তৈরি করেছে। তাদের এখন অগাধ ক্ষমতা, অঢেল সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে দুটো নিথর দেহ ফাহিম আর রিন্নি।
আরাভ আর নয়নার প্রতিদিনের সেই কবরস্থানে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল এক অদ্ভুত বিষাদময় আনুষ্ঠানিকতা। যে আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে তাদের এই ৫ বছরের একদিনও ভুল হয় নি। শহর যখন গোধূলির আলোয় ডুবে যায়, তখন আরাভ আসে। আর যখন শহর নিস্তব্ধ অমানিশায় ঢেকে যায়, তখন আসে নয়না। তাদের দুজনের কথা বলার ধরণ আলাদা, কিন্তু হাহাকারটা একই।
আরাভ তার কালো রঙের এসইউভি গাড়িটা কবরস্থানের অনেকটা দূরে রেখে একাই হেঁটে আসে। বডিগার্ডদের কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে কেউ যেন এই সীমানার ভেতর পা না বাড়ায়। আরাভ রিন্নির কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির হাতাটা গুটিয়ে ও কবরের ঘাসগুলো পরম মমতায় সরিয়ে দেয়।
আরাভ খুব নিচু স্বরে কথা বলা শুরু করে, যেন রিন্নি ওর পাশেই বসে কান পেতে শুনছে।
“জেরি, জানো আজ টাইগার ওর নতুন একটা শিপমেন্ট পাঠাচ্ছিল। আমি ওর সার্ভারটা এমনভাবে ক্রাশ করিয়েছি যে মাঝসমুদ্রে ওর তিনটে জাহাজ এখন অকেজো হয়ে ভাসছে। তুমি তো আমায় সবসময় বকতে, বলতে ‘স্যার, আপনি বড্ড বেশি লজিক দেখান’। আজ যদি দেখতে জেরি, তোমার সেই লজিক এখন মানুষের ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে দেয়।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে রিন্নির সেই শেষ র-ক্তমাখা রিপোর্টটা বের করে। ওটা এখন লেমিনেটিং করা।
“বাবা-মা তো আমাকে ত্যাজ্যই করে দিলেন। তারা জানে না জেরি, তাদের ডায়াবেটিসের ইনসুলিন থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি দানা আমি পাঠাই। আমি দূর থেকে দেখি তারা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, কিন্তু আমি সামনে যেতে পারি না। গেলেই তোমার সেই নিথর মুখটা ভেসে ওঠে।”
তারপর পাশেই থাকা ফাহিমের কবরের দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দেয়। ও রিন্নির কবরে হাত রেখেই ফাহিমের উদ্দেশ্যে কথা বলা শুরু করে।
“ফাহিম রে… তুই তো জানতিস তোর এই বড় ভাইটা ইমোশনের দিক দিয়ে কতটা কাঁচা। আজ যদি তুই থাকতিস, হয়তো আমার ল্যাপটপটা কেড়ে নিয়ে বলতিস ‘ভাইয়া, আজ কাজ বাদ দাও, আজ ভাবীকে নিয়ে ঘুরতে চলো’। আজ আমার কোনো কাজ নেই ফাহিম, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার মতো সেই মানুষটা নেই। রিন্নিকে দেখে রাখিস ফাহিম। ও একা থাকতে ভয় পায়। আর জেরি… জানো, আজ নয়না ড্রাগনের একটা পুরোনো আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ছোট বোনটা আমাদের বড্ড বেশি বদলে গেছে। ও এখন আর কাঁদে না, ওর চোখের ভেতরে এখন আগুন জ্বলে।”
আরাভ রিন্নির কবরের মাটি মুঠো করে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আরাভ অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। সে জানে এখান থেকে উঠে গেলেই তাকে আবার সেই ‘আর্কিটেক্ট’ হয়ে ফিরতে হবে, যেখানে এক মুহূর্তের দুর্বলতা মানেই নিশ্চিত মৃ-ত্যু।
আরাভ কবরের মাটি মুঠো করে ধরে মাথা নিচু করে বসে থাকে। রিন্নির কবরের গন্ধ যেন ওকে মনে করিয়ে দেয়, ও এখনো বেঁচে আছে শুধু এই প্রতিশোধের নেশায়।
রাত যখন আড়াইটা, চারপাশ যখন একদম নিঝুম তখন নয়না আসে। ও কোনো আভিজাত্যের ধার ধারে না। বাইকটা স্টার্ট দিয়ে সোজা ফাহিমের কবরের পাশে এসে থামে। নয়নার পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট, কোমরে গোঁজা পিস্তল। ও এসে ধপ করে ফাহিমের কবরের ওপর শুয়ে পড়ে। ওর কাছে এটা কবর নয়, এটা ফাহিমের বুক।
নয়না ফাহিমের কবরের মাটির সাথে নিজের গাল ঘষে ফিসফিস করে বলে
“ফাহিম, আছো? আজ তোমার জন্য কী এনেছি দেখো তো? তোমার সেই প্রিয় বেলী ফুলের মালা। সারাদিন আজ ড্রাগনের চারটে আস্তানায় আগুন দিয়েছি রে। লোকগুলো যখন পুড়ছিল, আমি তখন হাসছিলাম। কারণ আমি জানি, এই আগুনে তুমিও পুড়েছিলে। তোমার বাসর রাতের সেই স্বপ্নগুলো কি এখনো তোমার মনে আছে ফাহিম? আমার কিন্তু সব মনে আছে।”
নয়না ওর হাতের সেই পোড়া দাগটা দেখায় যা লড়তে গিয়ে হয়েছিল।
” বাবা-মা চেয়েছিল অন্য কারো সাথে আমাকে দিতে, আমি তো তোমার আমানত রে পা-গল! আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি। আরাভ ভাইয়া আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে বন্দুক চালাতে হয়। এখন আমি আর কাঁদি না ফাহিম। এখন আমি শুধু শিকার করি। আমি টাইগারকে আজ প্রায় ধরে ফেলেছিলাম, কিন্তু শয়তানটা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। চিন্তা করো না, খুব শীঘ্রই ওকে তোমার পায়ের কাছে এনে জবাই দেব। তারপর আমি আর তুমি এক সাথে ঘুমাব। শুধু একটু অপেক্ষা করো…”
ও রিন্নির কবরের দিকে তাকিয়ে ম্লান মুখে বলে
“রিন্নি আপু, আজ ভাইয়াকে দেখেছ? মানুষটা ভেতরে ভেতরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আপু… তুমি কি আসলেও ফিরে আসতে পারো না? আমাদের এই অগোছালো সংসারটা একটু গুছিয়ে দিতে পারো না? তোমার ওই প্রফেসর তো এখন আস্ত একটা দানব। আর আমি? আমি তো তোমার সেই আদরের ছোট বোন নই আপু।”
নয়না এবার ফাহিমের কবরের পাশে পুরোপুরি শুয়ে পড়ে। মাটির শীতলতা যেন ওর গায়ের চামড়া ভেদ করে হৃদয়ে গিয়ে লাগে। ও ফাহিমের কবরের মাটির সাথে নিজের নাক ঘষে ফিসফিস করে বলে
“ফাহিম… জানো, আজ বাবা ফোন করেছিল। আবার সেই বিয়ের কথা। ওরা বোঝে না কেন যে আমার শরীরে তোমার ঘাম আর র*ক্ত মিশে আছে? তুমি তো বলেছিলে না ওইদিন আমাকে তুলে নিয়ে যাবে? দেখো, আমি ঘর ছেড়ে চলে এসেছি। আরাভ ভাইয়া আমাকে একটা গান শিখিয়েছে ফাহিম… তবে সেটা সুরের নয়, সেটা বন্দুকের ট্রিগারের।”
নয়না হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। কবরের মাটির ওপর নিজের কান পেতে শোনার চেষ্টা করে ভেতর থেকে কোনো স্পন্দন আসে কি না। ওর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি কবরের মাটি ভিজিয়ে দেয়।
“ফাহিম, আজ আমার আর ওই খাঁচায় ফিরতে ইচ্ছে করছে না। এই শহরটা বড্ড মেকি, বড্ড বিষাক্ত। রিন্নি আপু তো তোমার পাশেই আছে, তাহলে আমি কেন দূরে থাকব? আজ এই মাটিই আমার বিছানা। আজ আমি তোমার বুকেই ঘুমিয়ে পড়ব। দেখি কে আমাকে টেনে তোলে! তুমি আমায় জড়িয়ে ধরবে তো ফাহিম? অন্ধকারে ভয় পাব না তো আমি?”
নয়না কবরের ওপর হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে। ওর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে।
নয়না মাঝরাতে ফাহিমের কবরের পাশে বসে নিজের মনেই হাসে, কখনো কখনো গান গায়। ওর এই পাগ-লামি দেখার মতো কেউ নেই। কবরস্থানের অন্ধকার রাত যেন নয়নার এই বীভৎস প্রেমের সাক্ষী হয়ে থাকে।
আরাভ আসে রিন্নিকে সারাদিনের হিসেব দিতে, আর নয়না আসে ফাহিমের কাছে খু-নের জবানবন্দ’ দিতে। এই দুই ভাই-বোনের জীবন এখন এই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচেই সীমাবদ্ধ। বাকি পৃথিবীটা তাদের কাছে শুধু একটা রণক্ষেত্র।
এক বিকেলের ম-রা রোদে কবরস্থানটা আজ বড় বেশি থমথমে হয়ে আছে। আরাভ রিন্নির কবরের পাশে বসে আছে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে। ওর পরনে কুচকুচে কালো শার্ট, কবরের ধুলো লেগে শার্টের হাতাটা একটু সাদাটে হয়ে গেছে। ও পরম মমতায় কবরের ঘাসগুলো হাত দিয়ে সমান করছিল, যেন রিন্নির গায়ে একটুও ব্যথা না লাগে।
আরাভ খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, “জেরি, আজ শহরটা বড্ড বিষাক্ত মনে হচ্ছে। জানো, সবাই বলে আমি নাকি অনেক শক্তিশালী হয়েছি। কিন্তু এই শক্তি দিয়ে আমি কী করব? যখন দিনশেষে বাড়ি ফেরার পর তোমার সেই ‘স্যার’ ডাকটা শোনার মতো কেউ নেই। রিন্নি… একবার ফিরে আসো না? আমার জীবনটা আর চলছে না। এই নিঃশ্বাসগুলো বড্ড ভারি মনে হয়। আমি আর পারছি না জেরি, এই মিথ্যে রাজা সেজে থাকতে আমি আর পারছি না।”
আরাভের চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি চিকচিক করে উঠল, যা ও দ্রুত মুছে ফেলল। মাফিয়া ডনদের কাঁদতে নেই এই নিষ্ঠুর নিয়মটা ও গত পাঁচ বছরে রপ্ত করেছে। ও উঠে দাঁড়াল। রিন্নি আর ফাহিমের কবরে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে ধীর পায়ে গেটের দিকে এগোতে লাগল।
কবরস্থান থেকে বেরিয়ে নির্জন রাস্তাটা দিয়ে হাঁটার সময় আরাভের কানে এল কয়েকটা উচ্চস্বরের হাসি আর একটা মেয়ের কান্নার শব্দ। একটু দূরেই চার-পাঁচটা বখাটে ছেলে একটা মেয়েকে ঘিরে ধরেছে। মেয়েটা নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আরাভ প্রথমে চাইল ইগনোর করে চলে যেতে। ওর জীবনে এখন দয়া-মায়ার কোনো স্থান নেই। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য টান ওকে থামিয়ে দিল। মনে হলো, রিন্নি যেন আড়াল থেকে বলছে, “স্যার, মেয়েটাকে বাঁচান!”
আরাভ পকেটে হাত দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ওকে ছেড়ে দাও।”
বখাটেগুলো আরাভের কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। অন্ধকার থাকায় ওরা আরাভের মুখ দেখতে পাচ্ছিল না। ওদের সর্দার ছেলেটা তাচ্ছিল্য করে বলল, “ওরে আমার হিরো আসছে! এই মিয়া, নিজের জান বাঁচাইতে চাইলে অন্য গলি দিয়ে হাঁটো। বুড়ো বয়সে হিরো সাজার শখ হয়েছে?”
আরাভ আর কোনো কথা না বলে ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে এসে দাঁড়াল। হলদেটে আলোয় যখন ওর তীক্ষ্ণ মুখাবয়ব ফুটে উঠল, বখাটেদের হাসিটা যেন গলায় আটকে গেল। আরাভ চৌধুরীকে চেনে না, এমন অপরাধী এই শহরে নেই। ওর এক ইশারায় আস্ত একটা গলি ভস্মীভূত হতে পারে।
“এখনো হাসবি?” আরাভের সেই শীতল কণ্ঠস্বরটা যেন যমদূতের বার্তার মতো শোনাল।
বখাটেরা ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। সর্দার ছেলেটা কোনোমতে তোতলামি করে বলল, “আ… আরাভ ভাই! স্যরি ভাই! আমরা চিনতে পারিনি! মাফ করে দেন ভাই!” ওরা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, মেয়েটাকে ফেলে জান নিয়ে দৌড়ে পালালো।
বিপদ কেটে যেতেই মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে আরাভের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর দু চোখে তখন আরাভের জন্য চরম বিস্ময় আর শ্রদ্ধা। মেয়েটি বেশ স্মার্ট আর চঞ্চল। সে আরাভের একদম কাছে এসে বলতে শুরু করল, “ও মাই গড! আপনি তো জাস্ট জাদুর মতো কাজ করলেন! থ্যাংক ইউ সো মাচ! আপনি না থাকলে আজ আমার যে কী হতো! আপনি কি এখানকার কোনো বড় অফিসার? ইশ, আপনার স্টাইলটা যা ছিল না!”
আরাভ পাত্তা না দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ও চাচ্ছিল মেয়েটা যেন বিদায় হয়। কিন্তু মেয়েটি নাছোড়বান্দা, সে আরাভের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল। “আপনি কথা বলছেন না কেন? নাম কী আপনার? আমার নাম রিমি। আচ্ছা, ওই ছেলেগুলো আপনাকে দেখে ওভাবে পালালো কেন? আপনি কি পুলিশ? না না, পুলিশরা তো এত হ্যান্ডসাম হয় না!”
আরাভ চোয়াল শক্ত করে বলল, “চুপ করুন। আর বাড়ি যান।”
রিমি হাসতে হাসতে বলল, “আরে বাড়ি তো যাবই! কিন্তু আপনার মতো একজন মানুষের সাথে পরিচয় হওয়ার সুযোগ কি রোজ আসে? আপনি কি জানেন আপনার পার্সোনালিটি একদম আগুন?”
মেয়েটির বকবকানিতে আরাভের মেজাজ চরমে পৌঁছে গেল। ও নারী জাতিকে সম্মান করে, তাই গায়ের হাত তুলতে চায় না। কিন্তু এই অনর্গল কথ বার বার রিন্নির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওর মাথার ভেতর যন্ত্রনা দিচ্ছিল। একটা ল্যাম্পপোস্ট থেকে পরের ল্যাম্পপোস্টে যাওয়ার সময় যখন জোরালো আলোটা মেয়েটির মুখে পড়ল, আরাভ চরম বিরক্তিতে একটা ঝাড়ি দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
“একদম চুপ! বলেছি না বাড়ি…”
বাকি কথাটুকু আরাভের গলায় আটকে গেল। ওর হাতের মুঠো শিথিল হয়ে গেল। ও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হলদেটে আলোয় ও দেখল এ তো রিন্নি! সেই নাক, সেই ঠোঁট, সেই ভরাট গাল। ঠিক যেন রিন্নি কবর থেকে উঠে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বকবক করছে।
আরাভের হৃৎপিণ্ডের গতি এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটির চোখের দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই এক বড় ধাক্কা খেল। রিন্নির চোখ ছিল মায়াবী কালো, অনেকটা শান্ত দীঘির মতো। কিন্তু এই মেয়েটির চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের ভায়োলেন্ট (বেগুনী) রঙের। এক রহস্যময়, বুনো আর তেজস্বী সেই চাহনি।
আরাভ বিড়বিড় করে বলল, “জেরি… তুমি?”
রিমি ভ্রু কুঁচকে হাসল। ওর বেগুনী চোখে এক অদ্ভুত মায়া খেলে গেল। সে বলল, “এই জেরি আবার কে? আমি রিমি! আপনি কি ঘোরের মধ্যে আছেন?”
আরাভ কোনো উত্তর দিতে পারল না। ওর সারা শরীর দিয়ে ঘাম ছুটছে। যে আরাভ চৌধুরী গত পাঁচ বছর ধরে পাথরের মতো হৃদয়ে বেঁচে আছে, সে আজ এক অচেনা মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। রিন্নির মতো দেখতে এই মেয়েটি কে? আর এই বেগুনী চোখের রহস্যই বা কী?
আরাভ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। হন্তদন্ত হয়ে নিজের গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। হাটতে হাটতে কোনো মতে বলল,” তাড়াতাড়ি আসো। বাড়ির নামিয়ে দিচ্ছি। ”
পেছন থেকে রিমি তো মহাখুশি। সে তো বকবক করেই যাচ্ছে, কিন্তু আরাভ তখন নিজের মনের ঝড়ের সাথে লড়ছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ চলতে থাকবে???
(বড় বড় লেখিকারা যখন নায়ককে মে-রে ফেলে তখনও কি তাদের সাথে এমন ব্যবহার করেন।নাকি আমি ছোট লেখিকা বলে)

