বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৩৯

0
11

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩৯

রিমিকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আরাভ যখন গাড়ির এক্সিলারেটরে চাপ দিল, তখন তার মাথার ভেতর কয়েক হাজার প্রশ্ন একসাথে জ্বলছিল আর নিভছিল। রিমির সেই খিলখিল হাসি, ওর চটপটে কথা আর ওই হুবহু রিন্নির মতো মুখটা আরাভের পাঁচ বছরের সাজানো গাণিতিক জগতটাকে এক তুড়িতে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

গাড়িটা ঝড়ের বেগে চালিয়ে ও আবার সেই পুরনো গন্তব্যে ফিরে এল রিন্নি আর ফাহিমের সমাধি।
কবরস্থানের নির্জনতায় এক জটিল সমীকরণ
বিকেলের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামছে। আরাভ রিন্নির কবরের পাশে বসে নিস্তব্ধ হয়ে রইল। চারপাশটা বড্ড চুপচাপ, শুধু দু-একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ও রিন্নির কবরের মাটির ওপর নিজের দীর্ঘ আঙুলগুলো রাখল।

“জেরি, আমি কি আসলেই পা-গল হয়ে যাচ্ছি?” আরাভ বিড়বিড় করে বলল। “আজ যাকে দেখলাম, সে তুমি নও। ও অনেক বেশি কথা বলে, ও অনেক বেশি চঞ্চল। কিন্তু ওর চেহারা… জেরি, প্রকৃতি কি এত বড় রসিকতা করতে পারে?”

আরাভ হঠাৎ স্থির হয়ে বসল। ওর তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক এবার একটা অন্য সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে শুরু করল।
রিন্নি কি তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল? এমন কি হতে পারে যে রিন্নির কোনো জমজ বোন ছিল, যাকে জন্মের সময় আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল? আরাভ জানে, সস্তা বাংলা সিনেমায় এমনটা হয়, কিন্তু বাস্তবে? রিন্নির বাবা-মা তো অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং স্বচ্ছ মানুষ ছিলেন। তবুও, এই চেহারার মিল কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

আরাভ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ওর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। ওকে এই রহস্যের শেষ দেখতেই হবে। ও দ্রুত পায়ে গাড়িতে উঠে বসল। গন্তব্য রিন্নির মা-বাবার বাড়ি।

পাঁচ বছর পর আরাভ যখন রিন্নির মা-বাবার দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, তখন বুকটা একবার কেঁপে উঠল। কলিংবেলের শব্দ শুনে রিন্নির বাবা দরজা খুললেন। আরাভকে দেখা মাত্রই তাঁর শান্ত চোখ দুটো ঘৃণায় লাল হয়ে উঠল।

“তুমি এখানে কেন এসেছো?” রিন্নির বাবা তপ্ত গলায় বললেন। “আমাদের যা কেড়ে নেওয়ার তা তো পাঁচ বছর আগেই নিয়েছো। এখন কি আমাদের বুড়ো হাড়গুলো চিবিয়ে খেতে এসেছো?”

আরাভ কোনো কথা না বলে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ভেতর থেকে রিন্নির মা ছুটে এলেন। আরাভকে দেখে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “বেরিয়ে যাও এই বাড়ি থেকে! খু-নির মুখ আমরা দেখতে চাই না। তোমার জন্যই আমার মেয়েটা আজ মাটির নিচে!”

আরাভ মাথা নিচু করে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, “আমি আপনাদের বিরক্ত করতে আসিনি। শুধু একটা কথা জানতে এসেছি। রিন্নি কি আপনাদের একমাত্র সন্তান ছিল?”

রিন্নির বাবা-মা একে অপরের দিকে চাইলেন। ঘৃণা যেন আরও বেড়ে গেল। রিন্নির বাবা গর্জে উঠলেন, “প-াগলামি শুরু করেছো? রিন্নি আমাদের একমাত্র মেয়ে ছিল। আমাদের অন্য কোনো সন্তান ছিল না। কেন এসব আবোল-তাবোল প্রশ্ন করছ?”

আরাভ দমল না। ও আরও এক ধাপ এগিয়ে জিজ্ঞেস করল, “রিন্নি কি আসলেও আপনাদের নিজের মেয়ে ছিল? মানে… কোনো লুকোনো অতীত?”

এবার রিন্নির মা হাতের কাছে থাকা একটা ফুলদানি তুলে নেওয়ার উপক্রম করলেন। “হার-ামজাদা! আমার মেয়ের পবিত্রতা নিয়ে কথা বলিস? রিন্নি আমাদের র-ক্ত ছিল। যা এখান থেকে! পুলিশ ডাকার আগে বেরিয়ে যা!”

আরাভ বুঝল, এখান থেকে আর কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। সে নিঃশব্দে সেখান থেকে বেরিয়ে এল। তার মানে, রিমি রিন্নির কেউ নয়। তাহলে এই হুবহু মিল কি শুধুই একটা কাকতালীয় ব্যাপার? না, আরাভ চৌধুরী কাকতালীয় তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। এর পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো বড় খেলা আছে।

পরের কয়েকটা দিন আরাভের জন্য ছিল এক অসহায়ত্ব। রিমির সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসছে, কিন্তু ও নিজেকে শাসন করল। ও রিমিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। ওর মনে এক সংশয় যদি রিমি ড্রাগনের কোনো ম-রণফাঁদ হয়?

আরাভ ওর সবটুকু মনোযোগ ড্রাগন আর টাইগারের ওপর নিবদ্ধ করল। ড্রাগন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পালানোর পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় কোনো গেম প্ল্যান করছে কি না, সেটা বের করার জন্য ও দিনরাত ল্যাপটপের সামনে বসে রইল। নয়নাকে নির্দেশ দিল শহরের প্রতিটা কোণায় নজর রাখতে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, ড্রাগন যেন বাতাসের সাথে মিশে গেছে।

এদিকে আরাভ নিজেকে যতই বোঝাক যে ও রিমির সাথে দেখা করবে না, ওর অবচেতন মন বারবার সেই মেয়েটির উপস্থিতি খুঁজছিল। ও অস্থির হয়ে নিজের অফিস রুমে পায়চারি করত, কখনো কখনো বিনা কারণেই গাড়ি নিয়ে শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত। হয়তো তার দেখা পাবে কিন্তু নিজের মনকে বার বার বুঝাচ্ছে যে, সে শুধু ঘুরতে বের হয়েছে।

একদিন জরুরি একটা মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য আরাভ গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে। ট্রাফিক জ্যামে আটকে ও যখন বিরক্তিতে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল, ঠিক তখনই গাড়ির জানলায় সজোরে টোকা পড়ল।

আরাভ গ্লাস নামাতেই দেখল সেই পরিচিত বেগুনি চোখ আর মিষ্টি হাসি। রিমি! পরনে একটা হলুদ কামিজ, হাতে একগুচ্ছ নীল অপরাজিতা।

“আরে! মিস্টার মাফিয়া যে! এই রোদের মধ্যে মুখটা এমন তিতো করলার মতো করে রেখেছেন কেন?” রিমি একদম সাবলীলভাবে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

আরাভ মনে মনে খুশি হলেও উপরে রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম করে বলল, “আপনার সমস্যা কী? আমি কি আপনাকে লিফট দিতে চেয়েছি?”

রিমি খুব আয়েশ করে সিটে বসে বলল, “লিফট দিতে হবে না। আমি আপনাকে লিফট দেব! চলুন, আজ আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”

“আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে যাচ্ছি। নামুন গাড়ি থেকে!” আরাভ গম্ভীর গলায় আদেশ দিল।

রিমি ভ্রু কুঁচকে বলল, “উঁহু! আমি নামব না। আর আপনার ওই গুরুত্বপূর্ণ কাজ আজ পেন্ডিং। আজ শহরে একটা বাইক রেস চ্যাম্পিয়নশিপ আছে, সেটা দেখতে যাব আমরা। চলুন!”

আরাভ অবাক হয়ে বলল, “আপনি কি পা-গল? আমি মিটিং বাদ দিয়ে বাইক রেস দেখতে যাব?”

রিমি একদম জোর করে আরাভের হাত ধরে গিয়ারের ওপর রাখল। “যাবেন মানে অবশ্যই যাবেন! চলুন না! একটু সুস্থ বাতাসের দরকার আপনার।”

আরাভ অনেক চেষ্টা করেও রিমিকে নামাতে পারল না। মেয়েটার জেদ রিন্নির চেয়েও বেশি। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ও গাড়ি ঘোরাতে বাধ্য হলো।

রেসিং গ্রাউন্ডে তখন প্রচুর ভিড়। বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন আর মানুষের চিৎকারে কান পাতা দায়। আরাভ একপাশে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর রিমি উত্তেজনায় লাফাচ্ছে।

মাঠে তখন একজন বাইকার অসম্ভব দ্রুতগতিতে বাইক চালাচ্ছে। তার স্টান্ট দেখে রিমি হাততালি দিয়ে উঠল। “ও মাই গড! দেখছেন দেখছেন? রাইডার চ্যাম্পিয়ন শিশ! ওনার বাইক চালানো দেখলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায়। ওহ! শিশ ইজ মাই ক্রাশ!”

আরাভের কপালে ভাঁজ পড়ল। ওর মনের ভেতর এক অদ্ভুত ঈর্ষা মোচড় দিয়ে উঠল। ও বাঁকা চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার লজ্জা করে না? আমার পিছনেও ঘুরছেন, আবার অন্য একজনের ওপর ক্রাশ খাচ্ছেন? এত নিচ আপনি?”

রিমি হা হয়ে আরাভের দিকে তাকাল। তারপর খিলখিল করে হেসে উঠল। “ওমা! মাফিয়া সাহেব কি জেলাস হচ্ছেন? আপনি ভাবছেন আমি সস্তা মেয়ে?”

আরাভ মুখ ঘুরিয়ে নিল। “সস্তা কি না জানি না, তবে একজনের সামনে দাঁড়িয়ে অন্যকে ক্রাশ বলাটা জঘন্য রুচি।”

রিমি হাসতে হাসতে আরাভের হাতটা একটু চেপে ধরল। ওর বেগুনি চোখে তখন দুষ্টুমির আভা। “শুনুন মিস্টার মাফিয়া! শিশের শুধু রাইডিংটা আমার ভালো লাগে। ওর সাহস আর স্পিডটা ভালো লাগে। কিন্তু…”

রিমি একটু থামল। আরাভের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনার তো সব ভালো লাগে! আপনার এই রাগী চোখ, আপনার গম্ভীর গলা, এমনকি আপনার এই পাথর হৃদয়টাও আমার ভালো লাগে। রাইডার চ্যাম্পিয়ন শিশ তো শুধু মাঠে জেতে, কিন্তু আপনি তো মানুষের মনের গভীরে গিয়ে সব ওলটপালট করে দেন!”

আরাভ এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটা হাজারো অপরাধীর সামনে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে না, সে আজ এক পিচ্চি মেয়ের কথায় থতমত খেয়ে গেল। ওর হৃদয়ের সেই পাঁচ বছরের পুরনো বরফটা যেন একটু গলতে শুরু করল।

বাইক রেসিং গ্রাউন্ডে তখন ধুলো আর পেট্রোলের গন্ধ উড়ছে। রিমি যখন শিশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ঠিক তখনই একটা গর্জন তুলে কালো আর নীল রঙের একটা স্পোর্টস বাইক ঠিক তাদের সামনে এসে থামল। বাইক চালকের পরনে ছিল ব্ল্যাক লেদার সুট, যা তার সুঠাম দেহের সাথে মিশে আছে।

আরাভ আড়চোখে দেখল, ছেলেটা বাইকের স্ট্যান্ড নামিয়ে খুব স্টাইল করে নামল। রিমির উত্তেজনার পারদ তখন আকাশছোঁয়া। সে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, “ও মাই গড! শিশ! ও কি এদিকেই আসছে?”

শিশ ধীর পায়ে এগিয়ে এল। সে রিমির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে যান্ত্রিক কণ্ঠে বলল, “তুমি আমার প্রতিটা রেসেই আসো, তাই না? আমি খেয়াল করেছি, গ্যালারির ওই কোণটায় একটা মেয়ে সবসময় চিৎকার করে আমাকে চিয়ার আপ করে। দ্যাটস ভেরি ইমপ্রেসিভ!”

রিমি তো খুশিতে আত্মহারা! সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আ… আপনি আমাকে চেনেন? মানে… আপনি আমাকে নোটিস করেছেন?”

শিশ এবার তার হেলমেটটা খুলল। হেলমেট খোলার সাথে সাথে একরাশ সিল্কি চুল কপালে এসে পড়ল। বিকেলের পড়ন্ত রোদে তার ধারালো চিবুক আর সমুদ্রের মতো নীল চোখের আভা দেখে রিমি জাস্ট থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটা এত সুদর্শন যে কোনো মডেলকেও হার মানাবে। সাধারণত শিশ কখনো নিজের চেহারা জনসমক্ষে আনে না, সবসময় হেলমেট পরেই থাকে। আজ যেন কোনো এক বিশেষ কারণে সে পর্দা সরাল।

আরাভ পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। শিশের ওই অতিমাত্রায় সুন্দর চেহারাটা আরাভের একদমই পছন্দ হলো না। ওর ভেতরটা জ্বলে উঠল। ও মনে মনে ভাবল, ‘একটা ছেলে এত সুন্দর হয় কী করে? নির্ঘাত প্লাস্টিক সার্জারি!’

আরাভ গম্ভীর গলায় বলল, “রেস তো শেষ, এবার চলুন রিমি।”

শিশ এবার আরাভের দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক চ্যালেঞ্জিং দৃষ্টি। “আই গেস, এই ভদ্রলোক আপনার ভাই? নাকি বডিগার্ড?”

রিমি কিছু বলার আগেই আরাভ এক পা এগিয়ে এসে শিশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কে, সেটা জানার যোগ্যতা অর্জন করতে আপনার আরও কয়েকটা জন্ম লাগবে। রিমি, চলুন!”

শিশ একটা বাঁকা হাসি দিল। “রিমি নামটা বেশ সুন্দর। তবে রিমি কার সাথে যাবে, সেটা রিমির ওপর ছেড়ে দেওয়া ভালো না?” সে রিমির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কফি শপে যাচ্ছি, তুমি কি আসবে?”

আরাভ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ও আমার সাথে এসেছে, আমার সাথেই যাবে।”

শিশ রিমির দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “রিমি, কফিটা কি আমার বাইকের পেছনে বসে খেতে যাবে? প্রমিস করছি, একদম খাঁটি প্রাকৃতিক বাতাস পাবে। এসির ওই কৃত্রিম বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসে না তোমার?”

আরাভ এক পা এগিয়ে এসে রিমির হাতটা হালকা করে ধরে নিজের দিকে টানল। শিশের চোখের দিকে তাকিয়ে ও বরফশীতল গলায় বলল, “প্রাকৃতিক বাতাস খেতে গিয়ে ধুলোবালি গিলে লাঞ্চ করার কোনো দরকার নেই ওর। আমার গাড়িতে চলো রিমি, আরামদায়ক এসিতে শান্তিতে যেতে পারবে।”

শিশ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “গাড়ি? ওই চার দেয়ালের লোহার খাঁচায় বসে থাকাটা তো প্রিজনারদের কাজ। স্বাধীনতার স্বাদ তো বাইকের হ্যান্ডেলে।”

আরাভ এবার মেজাজ হারাল। “লোহার খাঁচা নয়, ওটা সেফটি। আর তোমার ওই দুই চাকার বাহনটা হলো রাস্তার ওপর একটা চলমান কফিন। রিমিকে আমি এমন রিস্কে ফেলতে পারি না।”

শিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, “রিস্ক? আমার বাইক চালানো নিয়ে কথা বলছেন? আমি জানি রিমি কোনটা পছন্দ করে। কী রিমি? আমার সাথে যাবে না?”

আরাভ আরও কঠোর হয়ে বলল, “খবরদার রিমি! ওর সাথে এক কদমও যাবে না। ও শুধু নিজের রাইডিং স্টাইল দেখানোর জন্য তোমাকে নিয়ে পা-গলামি করবে, বিপদ হতে কিন্তু সময় লাগে না।”

রিমি এতক্ষণ এই দুজনের ইগোর লড়াই দেখছিল। একবার শিশের নীল চোখের দিকে তাকাচ্ছিল, আবার আরাভের গম্ভীর পাথুরে মুখের দিকে। সে দুই হাত তুলে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল।

“থামুন! একদম থামুন আপনারা!” রিমি চেঁচিয়ে উঠল।
দুজনই চুপ হয়ে রিমির দিকে তাকাল। রিমি ওর ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে গটগট করে হাঁটতে শুরু করল। যাওয়ার সময় পেছন ফিরে বলল, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি হেঁটেই যাব। আপনারা আসুন যার যা আছে তা নিয়ে। দেখি কার কত দম!”

আরাভ আর শিশ একে অপরের দিকে তাকাল। আরাভের দামি এসইউভি পড়ে রইল পাশে, আর শিশের লাখ টাকার স্পোর্টস বাইক পড়ে রইল মাঠে।

দুজন জাঁদরেল পুরুষ একজন আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপাচ্ছে আর একজন রেসিং ট্র্যাক দুজনেই এখন রিমির পেছনে পেছনে গাধার মতো ঘামতে ঘামতে হাঁটছে।

শিশ হাঁটতে হাঁটতে বলল, “রিমি, অন্তত রোদটা তো দেখো! সানস্ট্রোক হবে তো!”

আরাভ পাশ থেকে ভেঙচি কাটল, “এখন আর রোদ লাগছে না? একটু আগে তো খুব প্রাকৃতিক বাতাস দিচ্ছিলে সেখানে ভুতে এসে ছাতা ধরত!”

কফি শপে ঢোকার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হলো। তিনজন মুখোমুখি বসেছে। আরাভের মুখ রাগে থমথমে, শিশের কপালে ঘাম জমেছে আর রিমি খুব আয়েশ করে একটা বড় গ্লাসে ঠান্ডা পানি খাচ্ছে।

শিশ একটা টিস্যু দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে বলল, “আরাভ সাহেব, আপনি তো দেখছি বড্ড সেকেলে। মেয়েদের কি সারাক্ষণ আগলে রাখার জিনিস মনে করেন?”

আরাভ কফিতে চুমুক দিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল, “সেকেলে হওয়া ভালো যদি সেটা কাউকে সুরক্ষিত রাখে। তোমার মতো উড়নচণ্ডী হয়ে কাউকে বিপদে ফেলার চেয়ে আমি সেকেলে হওয়াটাই পছন্দ করি।”

শিশ ক্ষেপে গিয়ে বলল, “উড়নচণ্ডী? আপনি জানেন আমি কতগুলো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছি? অ্যাড্রেনালিন রাশ কী জিনিস তা কি জানেন?”

আরাভ বাঁকা হাসল। “অ্যাড্রেনালিন রাশ আমার প্রতিদিনের নাস্তা। তবে আমি সেটা বুদ্ধির সাথে করি, তোমার মতো হিরোইজম দেখানোর জন্য নয়।”

রিমি এবার নিজের কফিতে চামচ দিয়ে শব্দ করতে করতে বলল, “আপনারা কি ঝগড়া করতে এসেছেন? অ্যাড্রেনালিন, সেফটি, চ্যাম্পিয়নশিপ উফ! আপনারা ঝগড়া করছেন নাকি একে অপরকে সিভি (CV) দেখাচ্ছেন?”

আরাভ আর শিশ দুজনেই রিমিকে ধমক দিল “চুপ করো রিমি!”

রিমি ভয় পাওয়ার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠল। “ওরে বাবা! একদম সিনক্রোনাইজড ধমক! আচ্ছা শিশ ভাইয়া, আপনার এই নীল চোখ দুটো কি লেন্স নাকি আসল? আমার তো মনে হচ্ছে আপনি লেন্স পরে আমাকে ইমপ্রেস করার ট্রাই করছেন।”

শিশ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না না, এটা একদম ন্যাচারাল।”

রিমি এবার আরাভের দিকে ফিরে বলল, “আর আপনি, আপনার তো চোখ সবসময় লাল হয়ে থাকে। আপনি কি রাতে ঘুমান না নাকি ড্রাগ নেন?”

আরাভ এবার কফির কাপটা সশব্দে টেবিলে রাখল। “রিমি! ড্রাগ কোনো ফাজলামির বিষয় নয়।”

রিমি মুখ ভেংচিয়ে বলল, “জানি জানি। কিন্তু আপনাদের এই ঝগড়া দেখলে তো ড্রাগ নিজেই হাসতে হাসতে ম-রে যাবে। একজন বলছেন বাইক ভালো, একজন বলছেন গাড়ি ভালো আরে ভাই, আসল কথা হলো কফিটা কার টাকায় কেনা হয়েছে? যে বিল দেবে সেই হলো আসল হিরো!”

শিশ সাথে সাথে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল, আরাভও তার গোল্ডেন কার্ড বের করল। দুজনেই ওয়েটারের দিকে একসাথ হাত বাড়াল।

রিমি হাততালি দিয়ে বলল, “দারুণ! একেই বলে আসল টক্কর! তবে শুনুন, আপনাদের এই ঝগড়াটা না একদম কিউট। আমার তো মনে হচ্ছে আমি কোনো নার্সারি স্কুলের বাচ্চাদের সাথে কফি খেতে এসেছি যারা খেলনা নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে!”

আরাভ আর শিশ একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল।

চলবে,,,

(আপনাদের কি ভালো লাগছে না। তাহলে বলুন তাড়াতাড়ি শেষ করে দি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here