বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_৪১

0
10

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৪১
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

গাড়িটা ঝড়ের বেগে ঢাকা শহরের রাজপথ চিরে এগিয়ে চলছে। এসির ঠান্ডা বাতাসেও আরাভের কপালের ঘাম কমছে না। স্টিয়ারিংয়ের ওপর ওর হাতের মুঠি সাদা হয়ে গেছে। রিমি পাশের সিটে বসে কাঁচের বাইরে সন্ধ্যার আলো-ঝলমলে শহর দেখছে। ওর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন একটু আগের সেই শিশ আর আরাভের তান্ডব ওর মনে কোনো দাগই কাটেনি।

আরাভ আড়চোখে একবার রিমিকে দেখল। মনে মনে ও গত পাঁচ বছরের প্রতিটা দৃশ্য রিবাইন্ড করছে। সেই র-ক্তমাখা হাসপাতাল, সেই সাদা কাফনে ঢাকা দেহ, আর সেই কবরের অন্ধকার। ও তো নিজের হাতেই মাটি দিয়েছিল! ফরেনসিক রিপোর্টেও তো কোনো গড়বড় ছিল না। তাহলে কি ওর চোখ ওকে ধোকা দিচ্ছে?

আরাভ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনার বাবা-মা কী করেন?”

রিমি জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল। বেগুনি চোখে বিকেলের রেশ রয়ে গেছে। সে চটপটে গলায় বলল, “বাবা রিটায়ার্ড সার্জেন, মা ঘর সামলান। কেন? বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন নাকি?”

আরাভ ওর ফাজলামি ইগনোর করে বলল, “আপনার জন্ম কি ঢাকাতেই?”

রিমির হাসিখুশি মুখটা এক মুহূর্তের জন্য একটু ম্লান হলো। ও মাথা চুলকিয়ে বলল, “আসলে আমার পাঁচ বছর আগের কথা খুব একটা মনে নেই। একটা বড় এক্সিডেন্ট হয়েছিল আমার। সার্জারি করে এই নতুন জীবন পেয়েছি। মা বলে আমি নাকি পুনর্জন্ম পেয়েছি। তাই তো আমি এত চটপটে, এক জীবনের সব আনন্দ একবারে উশুল করতে চাই!”

আরাভের হৃদস্পন্দন যেন এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। সার্জেন? পাঁচ বছর? এক্সিডেন্ট? সার্জারি? সবগুলো শব্দ ওর মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে লাগল। পাঁচ বছর আগে তো রিন্নিও…

আরাভ সাবধানে প্রসঙ্গ পাড়ল, “আপনার চোখের এই রং… ছোটবেলা থেকেই কি এমন?”

রিমির হাসিখুশি মুখে এক মুহূর্তের জন্য বিষাদ ছুঁয়ে গেল। ও নিজের চোখে একবার হাত বুলিয়ে বলল, “না তো। মা বলে আমি যখন ছোট ছিলাম তখন নাকি আমার চোখ কুচকুচে কালো ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর আগে সেই এক্সিডেন্টের সময় ল্যাবরেটরির কী সব কেমিক্যাল যেন চোখে ঢুকে গিয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর যখন চোখ খুললাম, তখন দেখি আমি বদলে গেছি। বাবা বলে, এই ভায়োলেন্ট কালার নাকি আমার নতুন শক্তির প্রতীক।”

আরাভ আর কথা বাড়াল না। ও জানে, উত্তরগুলো এভাবে সহজে মিলবে না। ওকে ড্রাগনের সেই পুরনো ফাইলের গভীরে যেতে হবে। যে সার্জেন রিন্নির শেষ অপারেশনটা করেছিল, সেই ডক্টর জামান এখন কোথায়?

রিমিকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আরাভ সোজা চলে এল তার গোপন আস্তানায়। নয়না সেখানে ড্রাগনের পুরোনো নেটওয়ার্কের কিছু কোড ভাঙার চেষ্টা করছিল। আরাভ ঘরে ঢুকেই বলল, “নয়না, ডক্টর জামান নামের কাউকে খুঁজে বের করো। ঢাকার কোনো এক হাসপাতালের নিউরোসার্জন ছিলেন হয়তো।”

নয়না কিবোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, “নামটা পরিচিত লাগছে। দাঁড়াও… পেয়েছি! ডক্টর এইচ.কে. জামান। পাঁচ বছর আগে সিটি হাসপাতালের চিফ সার্জন ছিলেন। কিন্তু রিন্নি আপুর অপারেশনের ঠিক সাতদিন পর উনি স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যান। বর্তমানে ওনার কোনো প্র্যাকটিস নেই।”

আরাভ স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। “অপারেশনের সাতদিন পর? ওই অপারেশনে তো উনিও টিমে ছিলেন, তাই না?”

নয়না ফাইলটা ওপেন করে অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ ভাইয়া। রিন্নি আপুর ডেথ সার্টিফিকেট সাইন করার সময় উনিও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানো? ওনার কোনো সন্তান নেই বলেই রেকর্ড বলছে। তাহলে রিমি…”

আরাভ এবার অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগল। “নয়না, ড্রাগন বড্ড ধূর্ত। ও কি পারত কোনো লা-শকে মাস্ক পরিয়ে আমাদের সামনে পাঠাতে? আমাদের শোকের সময় আমরা কি খুব ভালো করে রিন্নিকে দেখেছিলাম?”

নয়না কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ভাইয়া, ড্রাগন সব পারে। যদি রিন্নি আপুকে সে বাঁচাতে চেয়ে থাকে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য, তবে ডক্টর জামান হয়তো সেই পরিকল্পনার অংশ ছিলেন। কিন্তু তিনি কেন রিন্নিকে নিজের মেয়ে বানিয়ে লুকিয়ে রাখবেন?”

আরাভের চোখে খুনের নেশা খেলে গেল। “হয়তো জামান ড্রাগনের পরিকল্পনা জানতেন, কিন্তু নিজের বিবেক বিসর্জন দিতে পারেননি। রিন্নিকে সে অন্য পরিচয় দিয়ে নিজের কাছে আগলে রেখেছেন। কিন্তু নয়না, এমনও তো হতে পারে রিমি আসলে রিন্নি না আমরা বেশি ভাবছি।কিন্তু এতকিছু কিভাবে মিলে যাচ্ছে?”

পরদিন সকালে আরাভ রিমির ইউনিভার্সিটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আজ তার মনে নতুন সংশয়, নতুন আশা। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার মেজাজ সপ্তমে চড়ল।

শিশ আজ একাই আসেনি। তার পেছনে অন্তত বিশজন বাইকার। তারা ক্যাম্পাসের সামনে এক বিশ্রী হট্টগোল করছে। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে শিশের নীল চোখের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে রিমি ওর সাথে সেলফি তুলছে।

শিশের সুদর্শন চেহারা আর তার রাজকীয় বাইক দেখে ক্যাম্পাসের মেয়েরা তো বটেই, শিক্ষকরাও যেন থমকে দাঁড়িয়েছেন। শিশ রিমির কানে কানে কী একটা বলতেই রিমি হেসে ওর কাঁধে একটা চড় মা-রল।

আরাভ গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। বডিগার্ডদের ইশারায় সরিয়ে দিয়ে ও শিশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

শিশ হেলমেটটা হাতে নিয়ে একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে বলল, “মিস্টার মাফিয়া, আবার এসেছেন? আজ কি রিমির জন্য জেলখানা আই মিন আপনার গাড়িটা নিয়ে এসেছেন?”

আরাভ শিশের চোখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি কে শিশ? তোমার এই নীল চোখ আর দামি বাইক কি ড্রাগনের দেওয়া কোনো গিফট?”

শিশের হাসিমুখটা এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ড্রাগন? আমি তো শুধু ট্র্যাকের ড্রাগন চিনি। আপনি কি মুভি বেশি দেখছেন?”

রিমি মাঝখানে ঢুকে বলল, “আরে আপনারা আবার শুরু করলেন? মাফিয়া সাহেব, শিশ ভাইয়া আজকে আমাদের সবাইকে ওর বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছে। আপনিও চলুন না? একটু সামাজিক হবেন!”

আরাভ রিমির হাতটা শক্ত করে ধরল। ওর চোখে তখন আগ্নেয়গিরি। সে রিমিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনার বাবার সাথে আমার কথা আছে। আজই। এখন চলুন!”

রিমি থতমত খেয়ে গেল। আরাভের গলার স্বর আজ অনেক বেশি সিরিয়াস। শিশ এক পা এগিয়ে এসে বলল, “ওর হাত ছাড়ুন আরাভ সাহেব। ও যেতে না চাইলে আপনি জোর করতে পারেন না।”

আরাভ পকেট থেকে একটা ছোট গ্যাজেট বের করে শিশের চোখের সামনে ধরল। “বেশি বাড়াবাড়ি করো না শিশ। রাইডার হতে পারো, কিন্তু আমার দুনিয়ায় তুমি একটা ধুলিকণা মাত্র। রিমি, চলুন!”

রিমি এবার আর ফাজলামি করল না। সে দেখল আরাভের চোখে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা আর আকুতি। সে শিশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি যাই শিশ ভাইয়া। ওনার মুড আজ বড্ড খারাপ। পরে কথা হবে!”

আরাভ রিমিকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। রিমি চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনি কি সত্যি মাফিয়া? নাকি আমার বাবার কোনো শত্রু?”

আরাভ স্টিয়ারিং হুইলে মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি শুধু নিজের হারিয়ে যাওয়া জগতটাকে ফিরে পেতে চাই রিমি। আর তার চাবিটা হয়তো আপনার বাবার কাছে লুকানো আছে।”

গাড়ি যখন ডক্টর জামানের বাড়ির দিকে ছুটছে, তখন এক মাইল দূরে শিশ তার বাইকে বসে ফোনে কথা বলছে। তার নীল চোখ দুটো এখন বরফের মতো শীতল।

“হ্যালো বস। আর্কিটেক্ট মুভ করছে। সে ডক্টর জামানের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সম্ভবত সে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। অর্ডার কী?”

ওপাশ থেকে এক খসখসে কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “ডক্টর জামানকে শেষ করে দাও। কিন্তু রিন্নি… আই মিন রিমিকে যেন কোনো আঁচ না লাগে। ও আমার তুরুপের তাস।”

হঠাৎ রিমি বলে উঠল, “আব্বু তো বাসায় নেই। সে একটা কাজে গেছে আসতে দুইদিন লাগবে!”

আরাভ তাড়াতাড়ি ব্রেক কষে চিৎকার দেয়,” কিহ্! ”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here