#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৫
আরাভ রিন্নিকে শান্ত করার জন্য তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। রিন্নির শরীর তখনো কাঁপছে। এক ধাক্কায় এতগুলো পুরোনো ছবি আর শব্দ ওর মস্তিষ্কে আঘাত করেছে যে ও এখন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আরাভ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব মৃদু স্বরে বলল, “তুমি আজ অনেক ক্লান্ত জেরি। একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। তোমার কোনো ভয় নেই, আমি এখানেই আছি।”
রিন্নি আরাভের হাতের কব্জিটা শক্ত করে ধরে রাখল। ওর বেগুনি চোখে এখন অনেক প্রশ্ন, কিন্তু কথা বলার শক্তি নেই। আরাভ সেখানেই বসে রইল যতক্ষণ না রিন্নির শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলো।
রিন্নি ঘুমিয়ে পড়ার পর আরাভ ঘর থেকে বেরিয়ে ল্যাবে গেল। সেখানে নয়না কিছু সিসিটিভি ফুটেজ চেক করছিল। নয়নার মুখটা গম্ভীর।
আরাভ ভেতরে ঢুকতেই নয়না বলল, “ভাইয়া, শিশের ওপর নজর রাখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। ও যখন এখান থেকে বেরিয়ে গেল, ও সোজা ডক্টর জামানের কাছে যায়নি। ও শহরের পুরনো ডকইয়ার্ডের দিকে গিয়েছিল। সেখানে একটা কালো মার্সিডিজ ওর জন্য অপেক্ষা করছিল।”
আরাভ চোয়াল শক্ত করে বলল, “তার মানে শিশ শুধু একতরফা প্রেমিক নয়, ও ড্রাগনের সাথেও কোনোভাবে লিঙ্কড। নয়না, শিশের লেন্সের আড়ালের ওই বাদামী চোখদুটো আমি আগেও কোথাও দেখেছি। ও কি টাইগারের কোনো লোক?”
নয়না কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে একটা পুরনো ডেটাবেস ওপেন করল। “ভাইয়া, টাইগারের কোনো ছোট ভাই ছিল বলে রেকর্ডে আছে, যাকে সে দেশের বাইরে পাঠিয়েছিল। শিশের বায়োলজিক্যাল ডেটা টাইগারের সাথে ৮০% মিলে যাচ্ছে। তার মানে শিশ আসলে টাইগারের ভাই, যাকে ড্রাগন রিন্নির ছায়া হিসেবে নিয়োগ করেছিল।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝতে পারছে খেলাটা কত বড়। ড্রাগন রিন্নিকে ম-ারেনি, বরং ওকে একটা ঘোরের মধ্যে রেখে আরাভকে তিল তিল করে শেষ করার পরিকল্পনা করেছিল। আর শিশকে রাখা হয়েছিল যাতে রিন্নি কোনোদিন ওর অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে না পারে।
মাঝরাতে রিন্নির ঘুম ভেঙে গেল। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে কার্পেটে পড়েছে। রিন্নি উঠে বসে চারপাশটা দেখল। ও কি সত্যিই রিন্নি? এই সাজানো ঘর, এই ডায়েরি, আর ওই গম্ভীর মানুষটা সবই কি ওর?
হঠাৎ ওর মনে পড়ল সেই নীল বড়িটার কথা। ওটা না খাওয়ায় ওর মাথায় এখন হাজারটা চিন্তা কিলবিল করছে। সে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আলমারি খুলতেই দেখল সেখানে সারি সারি শাড়ি আর সালোয়ার কামিজ। একটা নীল রঙের সিল্কের শাড়ি হাতে নিতেই ওর মনে পড়ল এই শাড়িটা পরে সে একবার কারো জন্মদিনে গিয়েছিল।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়িটা নিজের গায়ের ওপর ধরল। হঠাৎ আয়নার প্রতিবিম্বে সে দেখল আরাভ দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
আরাভ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিন্নির পেছনে দাঁড়াল। আয়নায় দুজনের চোখাচুখি হলো। আরাভ রিন্নির কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিস করে বলল, “শাড়িটা তোমার খুব প্রিয় ছিল জেরি। তুমি যখন এটা পরতে, আমার মনে হতো নীল আকাশটা বুঝি আমার ঘরে নেমে এসেছে।”
রিন্নি ঘুরে দাঁড়াল। ওর দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে। ও আরাভের শার্টের কলারটা ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। “তুমি… তুমি কেন আমাকে আগে খুঁজে বের করোনি? কেন আমাকে ওই মিথ্যে মায়ার মধ্যে পাঁচ বছর থাকতে দিলে?”
আরাভ রিন্নিকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। ওর শক্ত দুহাতে রিন্নিকে আগলে ধরে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি আর নেই জেরি। আমি প্রতি রাতে ওই কবরের পাশে গিয়ে কাঁদতাম। জানতাম না ড্রাগন আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মা,রার জন্য তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু আর না। এবার আমি সব হিসাব চুকাব।”
ওদিকে শহরের এক নির্জন গলিতে শিশ তার বাইক থামাল। ওর নীল লেন্সদুটো ও খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ওর বাদামী চোখদুটো এখন র-ক্তবর্ণ। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাগনের এক লোক।
“বস বলেছে আর্কিটেক্টকে শেষ করার সময় হয়ে গেছে। রিন্নিকে আমাদের আবার লাগবে।” লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল।
শিশ একটা ক্রুর হাসি দিল। “রিন্নি আর আমার কাছে ফিরবে না। ও চিনে ফেলেছে ওর আসল মালিককে। কিন্তু আরাভ চৌধুরীকে আমি জ্যান্ত ছাড়ব না। ও আমার পাঁচ বছরের সাজানো সংসার ভেঙে দিয়েছে। আমি মাফিয়া হতে চাইনি, কিন্তু ও আমাকে বাধ্য করছে।”
শিশ তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা অত্যাধুনিক পিস্তল বের করল। ওর একতরফা ভালোবাসা এখন এক ভয়ংকর প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে।
ম্যানশনের ভেতরকার বাতাস এখন অনেক বেশি ভারি। রিন্নি আরাভের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু আরাভের মস্তিষ্ক এখন কম্পিউটারের প্রসেসরের চেয়েও দ্রুত কাজ করছে। ও জানে, বাইরে যে নিস্তব্ধতা, তা আসলে এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের আগের পূর্বাভাস।
আরাভ রিন্নিকে বিছানায় বসিয়ে ওর মুখোমুখি হলো। রিন্নির ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে খুব কোমল স্বরে বলল, “তুমি কি আজ রাতে আর কোনো ওষুধ খেয়েছ জেরি?”
রিন্নি মাথা নাড়ল। “না। কিন্তু ওটা না খাওয়ার পর থেকে আমার মাথায় অজস্র শব্দ বাজছে। মনে হচ্ছে আমি কোনো একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম এতদিন।”
আরাভ ওর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “তুমি কোনো ঘোরে ছিলে না রিন্নি, তোমাকে ঘোরের মধ্যে রাখা হয়েছিল। ডক্টর জামান হয়তো তোমাকে মায়ার খাতিরে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ড্রাগন তোমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল আমার বিরুদ্ধে। এবার তোমাকে শক্ত হতে হবে।”
রিন্নি হঠাৎ করে আরাভের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ডক্টর জামান কি আমার বাবা নন? উনি কি সত্যিই সব মিথ্যে বলেছেন?”
আরাভ এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “উনি তোমাকে জন্ম দেননি ঠিকই, কিন্তু তোমার ওই নতুন জীবনটা ওনারই দেওয়া। তবে মিথ্যেটা ছিল ওনার আত্মকেন্দ্রিকতা। উনি তোমাকে নিজের একাকীত্ব দূর করার মাধ্যম বানিয়েছিলেন।”
শহরের এক জীর্ণ ডকইয়ার্ডে শিশ দাঁড়িয়ে আছে। ওর আসল বাদামী চোখ দুটো এখন প্রতিশোধের নেশায় জ্বলজ্বল করছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাগনের অন্যতম সেনাপতি টাইগার।
টাইগার একগাল হেসে বলল, “কী ছোট ভাই? লেন্স খুলে ফেলেছিস? প্রেমিকের নাটক কি তবে শেষ?”
শিশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আরাভ চৌধুরী আমার থেকে রিমিকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি ওকে ভালোবেসেছি পাঁচটা বছর। ওর স্মৃতি নেই বলে আমি ওর পাশে ছায়ার মতো ছিলাম। আর আরাভ এসে এক নিমিষেই ওকে ‘রিন্নি’ বানিয়ে ফেলল!”
টাইগার শিশের কাঁধে হাত রাখল। “আরাভ চৌধুরীকে শেষ করার এটাই সুযোগ। ও এখন ইমোশনাল। রিন্নিকে ফিরে পেয়ে ও ওর গার্ড কমিয়ে দিয়েছে। আজ রাতেই আমরা ম্যানশন অ্যাটাক করব। তুই যাবি সামনের সারিতে। রিন্নিকে নিয়ে আয়, আর আরাভকে আমার জন্য রেখে দিস।”
শিশের হাতে ধরা পিস্তলটা ও শক্ত করে মুঠোয় পুরল। ও বিড়বিড় করে বলল, “রিমি যদি আমার না হয়, তবে ও আর কারো হবে না।”
ম্যানশনের ভেতর নয়না হন্তদন্ত হয়ে আরাভের কাছে এল। “ভাইয়া! পেরিমিটার সিকিউরিটি ব্রিচ হয়েছে। ড্রাগনের সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে। ওরা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে।”
আরাভ এক পলক রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নি ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আরাভ ওর কাছে গিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, “তুমি ড্রেসিংরুমের পেছনের সিক্রেট প্যানেলে চলে যাও জেরি। নয়না তোমার সাথে থাকবে। যতক্ষণ না আমি ফিরছি, বের হবে না।”
রিন্নি আরাভের হাত টেনে ধরল। “তুমি যাবে না! ওরা অনেক মানুষ, তুমি একা কী করে পারবে?”
আরাভ রিন্নির চিবুক ছুঁয়ে ম্লান হাসল। “তুমি ভুলে যাচ্ছ জেরি, তোমার এই হাসিখুশি প্রফেসর আসলে একজন মাফিয়া আর্কিটেক্ট। আর আজ আমার জেদটা অনেক বেশি, কারণ আজ আমার হারানো প্রাণ আমার ঘরে ফিরে এসেছে।”
আরাভ ওর ড্রয়ার থেকে দুটো অত্যাধুনিক অটোমেটিক গান বের করল। পরনে কালো শার্ট, হাতা দুটো ফোল্ড করা। ওর চোখের সেই পাথুরে কাঠিন্য দেখে রিন্নি শিউরে উঠল। পাঁচ বছর আগের সেই শান্ত আরাভ আর এই আরাভের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
হঠাৎ বিকট শব্দে ম্যানশনের মেইন গেটটা উড়ে গেল। কালো পোশাকধারী একদল লোক ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। সামনের সারিতে শিশ।
আরাভ দোতলার বারান্দা থেকে নিশানায় নিয়ে প্রথম গুলিটা চালাল। নিস্তব্ধ রাতটা চিৎকারে ভরে উঠল।
আরাভ বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে বলল, “শিশ! লেন্স খুলে কি খুব হিরো মনে হচ্ছে নিজেকে? টাইগারের ভাই হয়ে আমার ম্যানশনে ঢোকার সাহস কোত্থেকে পেলে?”
শিশ নিচ থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দিল, “আরাভ চৌধুরী! ভালোবাসা দিয়ে না পাই, বুলেট দিয়ে আজ রিমিকে আমি আমার করে নেব!”
গুলি আর বারুদের গন্ধে ম্যানশনের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠল। একপাশে রিন্নির স্মৃতি ফিরে আসার লড়াই, অন্যপাশে আরাভের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শিশের সেই বিষাক্ত একতরফা প্রেম।
চলবে…

