#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৭
আরাভ আর রিন্নির জীবনের আকাশে সুখের চাঁদ দেখা দিলেও, আরাভের মনের কোণে একটা কালো মেঘ জমে আছে। সে জানে, ড্রাগন এখনো পর্দার আড়ালে থেকে তার পরবর্তী চাল চালছে। ড্রয়িংরুমে দুই পরিবারের হাসিখুশি আড্ডার মাঝে আরাভ লক্ষ্য করল, রিন্নি বারবার ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। সে কিছু বলতে গিয়েও যেন বলতে পারছে না।
হঠাৎ রিন্নি সোফা থেকে উঠতে গিয়ে টলে পড়ে যাচ্ছিল, আরাভ ক্ষিপ্র হাতে ওকে জড়িয়ে ধরল। “জেরি! কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে?”
রিন্নি কোনোমতে মাথা নাড়ল। রিন্নির মা অভিজ্ঞ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তিনি এগিয়ে এসে রিন্নির মাথায় হাত বুলিয়ে আরাভকে বললেন, “আরাভ বাবা, ভয় পেও না। জেরির শরীরে এখন নতুন প্রাণের স্পন্দন। ও তোমাদের জন্য অনেক বড় এক খুশির খবর নিয়ে এসেছে।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। আরাভ স্তব্ধ হয়ে রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নি লাজুক হাসিতে নিজের পেটে হাত রাখল। আরাভ অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি… তুমি কি সত্যিই মা হতে চলেছ জেরি?”
রিন্নি মাথা নাড়তেই আরাভের চোখে পানি চলে এল। সে খুশিতে রিন্নিকে কোলে তুলে নিতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র আতঙ্ক ওকে গ্রাস করল। ওর মস্তিষ্কে বারবার পাঁচ বছর আগের সেই ভয়ংকর রাতের দৃশ্যগুলো সিনেমা রিলের মতো ঘুরতে লাগল।
পাঁচ বছর আগে ঠিক একই সময়ে রিন্নি ওকে জড়িয়ে ধরে বলতে চেয়েছিল, “স্যার, আমি প্রেগন্যান্ট!” কিন্তু ড্রাগনের সাজানো সেই অ্যাক্সিডেন্ট এক নিমেষে সব তছনছ করে দিয়েছিল। ফাহিম মা*রা গেল, রিন্নি হারিয়ে গেল, আর সেই সাথে আরাভ হারিয়েছিল তার অনাগত প্রথম সন্তানকেও।
আরাভ রিন্নিকে আলতো করে বসিয়ে দিয়ে বারান্দায় চলে এল। ওর শরীর কাঁপছে। নয়না কফি হাতে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। ও জানে ওর ভাই কেন আজ এত বিচলিত।
আরাভ ধরা গলায় বলল, “নয়না, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। পাঁচ বছর আগে ঠিক একই সময় আমি আমার সবকিছু হারিয়েছিলাম। ফাহিম চলে গেল, আমার প্রথম সন্তানটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে গেল। আমি আবার সেই একই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছি। ড্রাগন যদি আবার সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করে?”
নয়না আরাভের হাত শক্ত করে ধরল। “ভাইয়া, তখন আমরা অগোছালো ছিলাম। ড্রাগনের শক্তি জানতাম না। আজ আমরা প্রস্তুত। নয়না সবসময় ভাবীর পাশে ছায়ার মতো থাকবে।”
শহরের এক জীর্ণ ল্যাবরেটরিতে ড্রাগন তার মুখোশের আড়ালে ক্রুর হাসি হাসছে। তার সামনে স্ক্রিনে আরাভের ম্যানশনের হ্যাক করা ফুটেজ। সেখানে আরাভ আর রিন্নিকে হাসতে দেখা যাচ্ছে।
ড্রাগন একটা নীল রঙের সিলিন্ডার তুলে নিল। “হাসো আরাভ চৌধুরী, প্রাণভরে হাসো। তোমার প্রথম সন্তানকে আমি কেড়ে নিয়েছিলাম অ্যাক্সিডেন্ট দিয়ে, আর এবারেরটাকে আমি মা-রব তিল তিল করে নীল বিষে। রিন্নির র*ক্তে এখনো আমার ল্যাবের কেমিক্যাল মিশে আছে। ওর সন্তানের শরীরেও ওই বিষের প্রভাব পড়বে।”
ড্রাগন তার এক অনুচরকে দিয়ে আরাভের ম্যানশনে একটি খাম পাঠাল।
বিকেলে খাওয়ার সময় আরাভের কাছে একটি খাম এল। খামটি খুলতেই আরাভের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। খামের ভেতর ছিল একটি ছোট বাচ্চার জুতো, যা নীল রঙে ভেজানো। আর সাথে একটি চিরকুট:
“আরাভ চৌধুরী, তোমার প্রথম সন্তানকে কেড়ে নিয়েছিলাম অ্যাক্সিডেন্ট দিয়ে। এবারেরটাকে ম-ারব নীল বিষে। রিন্নির র-ক্তে এখনো আমার ল্যাবের কেমিক্যাল মিশে আছে। যদি ওর আর বাচ্চার জীবন চাও, তবে আজ রাত ১২টায় আমার পুরনো আস্তানায় একা এসো। এক মিনিট দেরি হলে রিন্নির শরীরে ওই বিষক্রিয়া শুরু করার সুইচ আমি টিপে দেব।”
আরাভ চিরকুটটা মুচড়ে হাতে পিষে ফেলল। ওর চোখে এখন শুধু খু-নের নেশা। নয়না ছুটে এল। আরাভ গর্জে উঠল, “নয়না! রিন্নিকে এখনই ল্যাবে নিয়ে যাও। ওর ব্লাড প্রোফাইল চেক করো। আর শোনো, আজ রাতে কোনো মাফিয়া নয়, আজ এক বাবা ড্রাগনের সাথে তার শেষ হিসাব চুকাবে।”
আরাভ তার জ্যাকেটটা পরে নিল। ড্রয়ার থেকে বের করল তার সবচেয়ে প্রিয় সিলভার পিস্তলটা। ও জানে ড্রাগন ওকে মা-রতে চায় না, ও চায় আরাভকে তিল তিল করে শেষ করতে। কিন্তু আরাভ আজ তার পরিবারের জন্য ম-ৃত্যুকেও হার মানাতে প্রস্তুত।
নিচে নামতেই দেখল রিন্নি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ওর চোখে প্রশ্ন। আরাভ ওর কাছে গিয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন দিল। “জেরি, তুমি নিজের আর আমাদের ফাহিমের খেয়াল রেখো। তোমার স্যার আজ সব অন্ধকার চিরতরে শেষ করে ফিরবে।”
ম্যানশনের গেট থেকে আরাভের এসইউভি বেরিয়ে গেল ঝড়ের বেগে। রিন্নি পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করল, “ফিরে এসো স্যার। তোমার জেরি আর তোমার সন্তান তোমার অপেক্ষায় থাকবে।”
আরাভের গাড়িটা যখন অন্ধকার হাইওয়ে চিরে ড্রাগনের ডেরার দিকে ছুটছিল, ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ফাহিমের সেই নিথর দেহ আর পাঁচ বছর আগের রিন্নির সেই আর্তনাদ। আজ আর কোনো ভুল করা চলবে না। একদিকে রিন্নির শরীরে বয়ে চলা সেই রহস্যময় কেমিক্যাল, অন্যদিকে এক অজাত শিশুর ভবিষ্যৎ।
শহরের উপকণ্ঠে পরিত্যক্ত সেই কেমিক্যাল ফ্যাক্টরির সামনে গাড়ি থামাল আরাভ। চারপাশটা ভূতুড়ে নিস্তব্ধ। ভেতরে ঢুকতেই আবছা আলোয় ড্রাগনকে দেখা গেল। সে একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মে বসে আছে, তার সামনে রাখা কতগুলো মনিটর আর কেমিক্যাল সিলিন্ডার।
ড্রাগন তার যান্ত্রিক গলায় হাসল। “স্বাগতম আরাভ চৌধুরী। আমি জানতাম তুমি ঠিক সময়ে আসবে। একজন আদর্শ বাবা হিসেবে তুমি পাশ করে গেছ।”
আরাভ ওর পিস্তলটা ড্রাগনের দিকে তাক করে ঠান্ডা গলায় বলল, “ড্রাগন, নাটক বন্ধ কর। রিন্নির র-ক্তে কী মিশিয়েছিস তুই? আর ওটার অ্যান্টিডোট কোথায়?”
ড্রাগন ক্রুর হাসল। “এত তাড়াহুড়ো কিসের? পাঁচ বছর আগে ডক্টর জামান যখন রিন্নিকে বাঁচিয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে রিন্নির শরীরে আমি একটা ‘স্লিপার টক্সিন’ ইনজেক্ট করে রেখেছিলাম। যা পাঁচ বছর সুপ্ত অবস্থায় ছিল। কিন্তু প্রেগন্যান্সির কারণে রিন্নির শরীরে যখন হরমোনাল পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তখন ওই বিষটা সক্রিয় হতে শুরু করেছে। আর ঠিক বারো ঘণ্টা পর ওটা রিন্নির হার্ট ব্লক করে দেবে।”
আরাভের কপালে ঘাম জমে উঠল। ড্রাগন একটা ছোট নীল ভায়াল (Vial) উঁচিয়ে ধরল। “এটা সেই অ্যান্টিডোট। কিন্তু এটা পেতে হলে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। তোমাকে নিজের হাতে নিজের জীবনের সমস্ত হ্যাকিং কোড আর মাফিয়া সাম্রাজ্য আমার নামে লিখে দিতে হবে। আর হ্যাঁ, তোমার এই সিলভার পিস্তলটা ডাস্টবিনে ফেলে দাও।”
ওদিকে ম্যানশনে নয়না আর রিন্নি ল্যাবে বসে আছে। রিন্নির শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে, ওর চোখের বেগুনি আভাটা যেন ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। নয়না ল্যাপটপে ড্রাগনের সার্ভার হ্যাক করার চেষ্টা করছে।
রিন্নি ধীর গলায় বলল, “নয়না, স্যার কি ফিরে আসবে? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে… মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।”
নয়না কাঁদতে কাঁদতে কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছে। “আসবে ভাবী! ভাইয়া আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। আমি ড্রাগনের মেইন ফ্রেম ব্রেক করার চেষ্টা করছি।”
হঠাৎ নয়নার স্ক্রিনে একটা সিগন্যাল ভেসে উঠল। সে চিৎকার করে উঠল, “পেয়েছি! ভাইয়া যেখানে আছে, সেখানেই অ্যান্টিডোটের মেইন ফর্মুলা রাখা। ভাইয়াকে মেসেজ পাঠাতে হবে।”
আরাভ যখন ড্রাগনের চুক্তিপত্রে সই করতে যাবে, তখনই ওর রিস্টওয়াচে নয়নার কোড মেসেজ বেজে উঠল। আরাভ বুঝে গেল ড্রাগন ওকে ধোঁকা দিচ্ছে। এই চুক্তিপত্রে সই করলেও ড্রাগন ওকে অ্যান্টিডোট দেবে না।
আরাভ হঠাৎ বিদ্যুতের গতিতে টেবিলটা উল্টে দিল। ড্রাগনের গার্ডরা গুলি চালানো শুরু করার আগেই আরাভ ডাইভিং দিয়ে একটা ড্রামের আড়ালে আশ্রয় নিল। শুরু হলো দুপক্ষের গোলাগুলি।
আরাভ চিৎকার করে বলল, “ড্রাগন! তুই ভেবেছিস আমি একা এসেছি? ”
ঠিক সেই সময় ফ্যাক্টরির পেছনের দেয়াল ভেঙে আরাভের স্পেশাল ফোর্স ভেতরে ঢুকল। চারপাশটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। আরাভ সরাসরি ড্রাগনের দিকে দৌড়ে গেল। ড্রাগন পালানোর চেষ্টা করছিল সেই নীল ভায়ালটা নিয়ে।
আরাভ ড্রাগনকে একটা ঘুসি মে-রে মাটিতে ফেলে দিল। ড্রাগনের মুখোশটা খুলে ছিটকে পড়ল। আরাভ অবাক হয়ে দেখল ড্রাগন আর কেউ নয়, ডক্টর জামানের সেই পুরনো রাইভাল এবং রিন্নির বাবার একসময়ের ব্যবসায়িক পার্টনার, যে লোকটিকে সবাই মৃ-ত বলে জানত।
“তুই!” আরাভ ওর কপালে পিস্তল ঠেকাল।
“মে-রে ফেল আমাকে! কিন্তু এই অ্যান্টিডোট আমি ভেঙে ফেলব!” ড্রাগন ভায়ালটা ছুড়ে মা-রতে গেল।
আরাভ শূন্যে লাফিয়ে ভায়ালটা ক্যাচ ধরল। ঠিক যেন পাঁচ বছর আগে রিন্নির হাত ধরার মতো এক আকুতি। ভায়ালটা এখন ওর হাতের মুঠোয়। ও আর দেরি না করে ড্রাগনের পায়ে গুলি করল যাতে সে পালাতে না পারে।
আরাভ ঝড়ের বেগে ম্যানশনে ফিরে এল। রিন্নি তখন প্রায় অচেতন। ডক্টর জামান এবং নয়না দ্রুত রিন্নির শরীরে অ্যান্টিডোট পুশ করলেন।
কয়েক মিনিট পর… রিন্নির শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করল। ওর সেই মায়াবী বেগুনি চোখ দুটো ধীরে ধীরে খুলল। সামনে দেখল আরাভ ঘামে ভেজা অবস্থায় ওর হাত ধরে বসে আছে।
রিন্নি দুর্বল গলায় বলল, “স্যার… আপনি ফিরে এসেছেন? আমাদের ফাহিম ঠিক আছে তো?”
আরাভ রিন্নির কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। “সব ঠিক আছে জেরি। আজ থেকে আমাদের জীবনে আর কোনো ড্রাগন নেই, কোনো নীল বিষ নেই। এবার আমাদের পরিবার পূর্ণ হবে।”
বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাঁচ বছরের অন্ধকার রাত কাটিয়ে সূর্য আজ এক নতুন দিনের বার্তা দিচ্ছে। যে বিপরীত মেরুগুলো একদিন বিচ্ছেদে হারিয়ে গিয়েছিল, তারা আজ এক নতুন প্রাণের অপেক্ষায় এক সুতোয় বাঁধা।
চলবে…

