বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৪৩

0
10

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৩

জঙ্গলের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। পায়ের ওপর আরাভের জ্যাকেটটা জড়িয়ে দিতে গিয়ে আরাভ যখন রিমির ওই ছোট্ট তিলটার দিকে তাকিয়ে ছিল, ওর পুরো পৃথিবীটা তখন বনবন করে ঘুরছিল। পাঁচ বছর আগে যে মেয়েটাকে সে কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছিল, তার শরীরের এমন ব্যক্তিগত চিহ্ন এই মেয়ের শরীরে কীভাবে সম্ভব?

আরাভ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিন্নি লজ্জা পেত খুব। এই তিলটার কথা যখন আরাভকে বলেছিল, তখন ওর মুখটা কান পর্যন্ত লাল হয়ে গিয়েছিল। আজ এই মেয়েটির চোখে লজ্জা আছে, কিন্তু কোনো চেনা স্মৃতি নেই।

রিমি একটু কুঁকড়ে গিয়ে বলল, “মাফিয়া সাহেব? ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? খুব বেশি ছিঁড়ে গেছে নাকি? ইশ! আমি তো বুঝতেই পারিনি এই ঝোপটা এত ত্যাঁদড় হবে!”

আরাভ চট করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ও নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল, “বেশি কথা বলবেন না। আপনার পায়ে চোট লেগেছে। র-ক্ত বের হচ্ছে।”

আরাভ নিজের রুমাল বের করে খুব সাবধানে রিমির পায়ের ক্ষতটা মুছতে লাগল। ওর হাত কাঁপছে। যে আরাভ চৌধুরী কয়েক সেকেন্ডে মানুষের হাড়গোড় ভেঙে দিতে পারে, সে আজ রিমির চামড়ায় স্পর্শ করতে গিয়ে ভয় পাচ্ছে। যদি এই ছোঁয়াতেই রিন্নি উধাও হয়ে যায়?

রিমি উফ্ করে উঠল। “আস্তে! কাম-ড় দিচ্ছেন নাকি? আপনার হাত তো দেখি পাথরের চেয়েও শক্ত। একটু মায়া দয়া নেই?”

আরাভ এবার রিমির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। ওর কণ্ঠে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর মমতা মিশে গেল, “আপনি কি আসলেই জানেন না আপনি কে? আপনার বাবা, ওই ডক্টর জামান উনি কি আপনাকে কোনো ওষুধ দেন? বা কোনো ইনজেকশন?”

রিমি ভ্রু কুঁচকে হাসল। “ওমা! বাবা তো ডাক্তার, ওষুধ তো দেবেই! আমার ওই এক্সিডেন্টের পর থেকে মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে, তাই বাবা একটা নীল রঙের বড়ি দেয় রোজ রাতে। কেন বলেন তো? আপনি কি আমার বাবার ওপর গোয়েন্দাগিরি করছেন?”

আরাভের সব সন্দেহ এখন জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। নীল বড়ি! নিশ্চয়ই কোনো স্মৃতিভ্রমের ড্রাগ বা কড়া সিডেটিভ, যা রিন্নিকে তার অতীত ভুলিয়ে রেখেছে। ড্রাগনের সেই নীল বিষের খেলা এখনো চলছে, আর ডক্টর জামান হয়তো মন্দের ভালো হিসেবে রিন্নিকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে ওকে এই ঘোরের মধ্যে রেখেছেন।

আরাভ উঠে দাঁড়াল। ওর চোখে এখন অন্যরকম তেজ। ও রিমির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হাত ধরুন আমার। এখান থেকে বের হতে হবে। রাত হলে জঙ্গল আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।”

রিমি আরাভের হাত ধরল। আরাভের শক্ত হাতের মুঠোয় রিমির ছোট হাতটা যেন পুরোপুরি হারিয়ে গেল। ওরা ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। নেটওয়ার্ক নেই, চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে, কিন্তু আরাভের ভেতরে এখন কোনো ভয় নেই। ও যেন পাঁচ বছর পর ওর হারিয়ে যাওয়া ধ্রুবতারা খুঁজে পেয়েছে।

হাঁটতে হাঁটতে রিমি হঠাৎ থেমে গেল। “মাফিয়া সাহেব, একটা কথা বলব? রাগ করবেন না তো?”

আরাভ গম্ভীর গলায় বলল, “বলুন।”

“আপনার চোখে না এখন একটা অন্যরকম আলো দেখা যাচ্ছে। যেন অনেক দামী কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছেন। আমি কি সেই গুপ্তধন?” রিমি দুষ্টুমি করে চোখ টিপল।

আরাভ থামল। রিমির বেগুনি চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘তুমি গুপ্তধন নও রিমি, তুমি আমার প্রাণ। যে প্রাণটা পাঁচ বছর আগে এই শহরের ধুলোয় মিশে গিয়েছিল।’

মুখে ও শুধু বলল, “আপনার কল্পনাশক্তি বড্ড বেশি। সামনে গর্ত, দেখে হাঁটুন।”

হঠাৎ দূরে একটা বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। এই গভীর জঙ্গলে বাইক? আরাভ সতর্ক হয়ে গেল। ও রিমিকে নিজের পেছনে টেনে নিল। একটু পরেই দেখা গেল, ঝোপঝাড় চিরে শিশের সেই নীল স্পোর্টস বাইকটা হেডলাইট জ্বালিয়ে সামনে এসে থামল।

শিশ বাইক থেকে নেমে হেলমেটটা খুলল। ওর সুদর্শন মুখে এখন চিন্তার রেখা। সে রিমির দিকে তাকিয়ে অস্থির গলায় বলল, “রিমি! তুমি ঠিক আছো? আমি জিপিএস ট্র্যাক করে কোনোমতে এই পর্যন্ত এসেছি। তোমার ফোন কেন বন্ধ?”

রিমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে শিশের দিকে এগোতে চাইল। “শিশ ভাইয়া! আপনি চলে এলেন! এই গম্ভীর মাফিয়াটা তো আমাকে বকে বকে জ্যান্ত মে-রে ফেলছিল!”
আরাভ শিশের দিকে পা বাড়াল। ওর চোখের মণি এখন সংকীর্ণ। ও দেখল শিশের নীল চোখ দুটো অন্ধকারেও অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। শিশ রিমির জ্যাকেট জড়ানো পা-টার দিকে তাকিয়ে আরাভের দিকে একটা তীক্ষ্ণ চাউনি দিল।

“আপনি ওকে এভাবে জঙ্গলে নিয়ে এসেছেন আরাভ চৌধুরী? ওর এই অবস্থা কেন?” শিশের গলায় আজ স্পষ্ট হুমকি।

আরাভ এক চুলও নড়ল না। ও ধীরস্থিরভাবে বলল, “ওর অবস্থার জন্য দায়ী ওর বোকামি আর এই জঙ্গল। কিন্তু তুমি এখানে কীভাবে এলে শিশ? এই এলাকায় নেটওয়ার্ক নেই, জিপিএস কাজ করার কথা না। তুমি কি তবে আগে থেকেই আমাদের পিছু নিয়েছিলে?”

শিশের চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য একটা ছায়া খেলে গেল। কিন্তু সে চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আমি একজন রাইডার। ম্যাপ রিডিং আমার নেশা। রিমি, এসো আমার বাইকে। তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই।”

রিমি আরাভের দিকে তাকাল। আরাভ আজ রিমিকে শিশের সাথে যেতে দিতে চায় না। কিন্তু ও এটাও জানে, এই মুহূর্তে জঙ্গল থেকে বের হওয়াটাই আসল। ও রিমির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “যাও।”

শিশ রিমিকে বাইকে বসিয়ে এক পলক আরাভের দিকে তাকাল। সেই নীল চোখে আজ কোনো বন্ধুত্ব নেই, আছে শুধু এক পেশাদার খ-ুনি আর প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই।

বাইকটা স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল। আরাভ একা অন্ধকার জঙ্গলে দাঁড়িয়ে রইল। ও পকেট থেকে ফোন বের করল। সিগন্যাল একটা কাঠি দেখা যাচ্ছে। ও নয়নাকে ডায়াল করল।

“নয়না, শিশ… ওই ছেলেটার বায়োডাটা আবার চেক করো। ও বাইকার নয়, ও কোনো প্রশিক্ষিত শিকারি। আর শোন… জেরি বেঁচে আছে। রিমিই আমাদের জেরি।”

ওপাশ থেকে নয়নার চিৎকার বা বিস্ময় শোনার অপেক্ষা না করেই আরাভ ফোনটা কেটে দিল। ওর চোখের সামনে এখন শুধু একটা লক্ষ্য ডক্টর জামানের মুখোশ টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলা আর রিন্নিকে এই মায়ার জগত থেকে বের করে আনা।

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে আরাভের এসইউভি গাড়িটা যখন ডক্টর জামানের বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন ওর হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে। হাতে থাকা রিভলবারটা একবার ছুঁয়ে দেখল ও, কিন্তু পরক্ষণেই সেটা ড্রয়ারে রেখে দিল। আজ ও কোনো মাফিয়া হিসেবে আসেনি, আজ ও এসেছে একজন স্বামী হিসেবে, তার হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বকে ছিনিয়ে নিতে।

বাড়িটার ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। আরাভ কলিংবেলে হাত না রেখে সজোরে দরজায় লাথি ম-ারল। দুবার শব্দ হতেই ভেতর থেকে ডক্টর জামান দরজা খুললেন। সামনে আরাভকে দেখে ওনার ফ্যাকাশে মুখটা যেন আরও ধবল হয়ে গেল।

আরাভ কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ল। ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে পাথুরে গলায় বলল, “আমার জেরি কোথায়? না কি বলব রিমি কোথায়?”

ডক্টর জামান একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার কাঁধ দুটো যেন বার্ধক্যের ভারে ভেঙে পড়ল। ওনার কণ্ঠস্বরে কোনো প্রতিবাদ ছিল না, ছিল এক করুণ আত্মসমর্পণ।

“আমি জানতাম তুমি আসবে আরাভ।”

আরাভ ওনার কলার চেপে ধরল। “কেন? কেন পাঁচটা বছর আমাকে এই জীবন্ত নরকে রাখলেন? কেন ওকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন?”

ডক্টর জামান চোখের পানি মুছলেন। “ওরা বলেছিল রিন্নিকে ওদের হাতে তুলে দিতে। ড্রাগন আর টাইগারের পরিকল্পনা ছিল ওকে দিয়ে তোমাকে আজীবন গোলাম করে রাখা। রিন্নিকে ওরা একটা যন্ত্র বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করো আরাভ, এই মায়াবী মুখটা দেখে আমি পারিনি ওকে ওই জানো-য়ারদের হাতে তুলে দিতে। আমি ওকে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে লুকিয়ে ফেলেছিলাম। আমরা পালিয়ে গিয়েছিলাম দূর এক শহরে।”

আরাভ অবাক হয়ে ওনার কথা শুনছিল। জামান সাহেব আবার বললেন, “রিন্নির মাথায় তখন বিষক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আমি ওকে বাঁচিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ওর স্মৃতি ফিরে এলে ও তোমার খোঁজে প-াগল হয়ে যেত। আর ড্রাগন ঠিক ওখানেই ওকে শিকার করত। আমি চাইনি আমার এই একমাত্র অবলম্বনটা আবার হারিয়ে যাক। আমি নিসন্তান আরাভ, গত পাঁচ বছরে ও আমাকে বাবা ডাকার পর আমি আর রিন্নি হতে দেইনি ওকে। আমি শুধু রিমিকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছি।”

ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন ডক্টর জামানের স্ত্রী আর রিমি। ডক্টর জামানের স্ত্রী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন দীর্ঘদেহী এই রাগী যুবকটির দিকে। রিমির পরনে ঘরের সাধারণ পোশাক, ওর চোখে বিস্ময়।

“মাফিয়া সাহেব? আপনি এখানে? আর আপনি আমার বাবার কলার ধরছেন কেন?” রিমি চিৎকার করে উঠল।

ডক্টর জামানের স্ত্রী থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলেন। “কে তুমি বাবা? কেন আমার স্বামীর ওপর চিৎকার করছো?”

আরাভ জামান সাহেবের স্ত্রীকে দেখল। ওনার চোখে নিজের সন্তানের জন্য যে ব্যাকুলতা, তা দেখে আরাভের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু আজ আর আবেগ দেখানোর সময় নেই। আরাভ ওনার চোখের ভাষা পড়ে খুব ধীরস্থিরভাবে বলল, “চিনতে পারছেন না মা? আমি আপনার মেয়ে রিন্নির স্বামী। আপনার জামাই।”

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরে একটা স্তব্ধতা নেমে এল। রিমির চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। ও অবিশ্বাসে হাসল। “কী বলছেন এসব? আমি রিন্নি? আর আপনি আমার স্বামী? পা-গল হয়ে গেছেন?”

আরাভ রিমির কথার উত্তর দিল না। ও সরাসরি ডক্টর জামানের দিকে তাকাল। ওর গলায় তখন ইস্পাতের দৃঢ়তা কিন্তু চোখের কোণে জল।

“ধন্যবাদ ডক্টর। অনেক ধন্যবাদ আমার জিনিসটা এতদিন এত সুরক্ষিতভাবে রাখার জন্য। আজ থেকে আমার জিনিস আমি নিয়ে যাচ্ছি। এই আমানত আর আপনার কাছে থাকবে না।”

আরাভ রিমির হাতটা সজোরে ধরল। রিমি বাধা দিতে চাইল। “না! আমি যাব না! আমি আপনাদের ঠিক মতো চিনিই না! বাবা, মা… কিছু বলো তোমরা!”

ডক্টর জামানের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে আরাভের পা জড়িয়ে ধরলেন। “বাবা, ও তো কিছু জানে না। ও ছাড়া আমাদের দুনিয়ায় কেউ নেই। আমাদের বুকটা খালি করো না বাবা!”

ডক্টর জামান পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি জানেন, আজ আর কোনো মিথ্যে দেয়াল দিয়ে রিন্নিকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। ওপাশ থেকে জামান সাহেব শুধু ফিসফিস করে বললেন, “ছেড়ে দাও ওকে। ওর আসল পরিচয় আজ ওকে মুক্তি দেবে।”

আরাভ কোনো দিকে তাকাল না। রিমির কান্নাকাটি, ওর ছটফটানি সবই আজ তুচ্ছ। ও রিমিকে প্রায় পাঁজাকোলা করে গেটের দিকে নিয়ে এল। রিমি পেছন ফিরে ওর বাবা-মার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল।

গাড়িতে তোলার পর আরাভ ওর চোখের জল মুছে দিতে গেল, কিন্তু রিমি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দিল।

আরাভ ওর দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল, “আজ ঘৃণা করছো জেরি, কিন্তু যেদিন মনে পড়বে এই পাঁচ বছর আমি কীভাবে প্রতিটা সেকেন্ড ম-রেছি সেদিন হয়তো এই অধিকারটা আমাকে নিজ থেকেই দেবে। তুমি আর কারো নও। তুমি শুধু আমার।”

গাড়িটা ঝড়ের বেগে অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল একটা শূন্য বাড়ি আর ডক্টর জামানের অপরাধী নীরবতা।

চলবে…
(কাল বলব রিন্নির চোখের মনির রং পরিবর্তনের কারণ কি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here