একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—১৪

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১৪

সেদিনের পর কেটে গিয়েছে সপ্তাহ। নতুন দিনের সূচনা হয় আবার চলে যায়। এদিকে বর্ষার পানি কখনো বাড়ে তো কমে। এখন আবার বাড়তে আছে। টানা তিনদিন ধরে আবারো বৃষ্টি হচ্ছে। আঙ্গিনা পর্যন্ত পানি ঢেউ খেলছে। শিউলির দিন কাঁটছে জবেদা বিবির সঙ্গে গল্প করে আর মালার সঙ্গে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে বেড়িয়ে। তবুও দিনশেষে কিছু ভালো লাগে না। সে এখন বসে আছে উঠোনে। সকাল থেকে অনবরত বৃষ্টি পড়তে আছে। দুপুর গড়িয়ে গেলেও থামার নাম পর্যন্ত নাই। আমেনা ভিঁজতে ভিঁজতে আঙিনার নালা পরিষ্কার করছে। বাড়ির পানি সব আঁটকে আছে। নালা পরিষ্কার করে দিলে বাহির হয়ে যাবে কিছুটা। নয়তো উঠোন ছুঁতে সময় ও নিবে না। করিম মিয়া আজ অলসতায় কাজে যায়নি। শুয়ে আছে এই অসময়ে। মানুষটা বিশ্রাম খুব কমই নেয় এজন্য ডাকেনি কেউ। শিউলি এক সময় বিরক্ত হয়ে পড়লো। সারাদিন ঘর থেকে বেরোতে পারেনি কেমন হাসফাস লাগছে। ঘর থেকে ছাতাটা এনে আঙ্গিনায় দাঁড়াতেই আমেনা ভ্রু কুঁচকে হুঙ্কার ছেড়ে বলল,

“ ছাতা নিয়ে কই বাহির হইতাছিস? সেবার জ্বরের কথা ভুইলা গেছোস? ঘরে যা,শুইয়া থাক শিউলি।”

শিউলি শুনলো না। জেদ সাথে কিছুটা মন খারাপ করে বলল,

“ আম্মা ঘরে আর ভালো লাগতাছে না। বৃষ্টিতে আর ভিঁজতাম না। সত্যি কইতাছি! শুধু মালা দের বাড়ি যাইমু আর আসমু।”

আমেনা বেগমের মন গললো। অনুমতি দিয়ে সাবধানী বানী ছুড়লো,

“ শিগগির আসবি। পানি যেন শরীরে ছোঁয়া না দেখি।”

“ আইচ্ছা আম্মা।”

শিউলি ছুটে বাহির হয়ে গেলো। মালা দের বাড়ি কাছাকাছি হওয়াতে এক দৌড়ে গিয়ে থাকলো সেখানে। তাদের বাড়ি গিয়ে দেখে মালা বসে কাঁথা সেলাই করছে। শিউলি গিয়ে বসলো তার কাছে।
নকশিকাঁথার ফুলগুলো সুন্দর লাগছে। সেও পারে সেলাই করতে। মালা ওরে দেখেই হাসলো। আশে পাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ একখান রুমাল সেলাই করেছি উনার জন্য,দেখবি?”

শিউলি মাথা নাড়াতেই মালা ওকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। টিনের বাক্সে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা রুমাল টা বাহির করলো। বড় অক্ষরে লেখা ‘নাজির’ আর দুপাশে নকশা করা ঢেউয়ের মতো। শিউলির রুমাল টা সুন্দর লাগলো। এবং তার মনেও ইচ্ছে জাগলো। সেই ইচ্ছে প্রকাশ করে মালা কে বলল,

“ রেশমি সুতা দে আমাকে কিছু।”

“ কি করবি? ডাক্তার সাহেবের জন্য রুমাল সেলাই করবি?” মালা চুপিচুপি হাসতে হাসতে বলল কথাটা। শিউলি লজ্জা পেলো। সম্মতি জানালো।

“ তুই নাজির ভাই জানের জন্যি সেলাই করতে পারলে আমার করলে দোষ কি?”

মালা কৌটা থেকে কিছু রেশমি সুতা শিউলির হাতে দিলো। বলল,

“ কোনো দোষ নাই। ভালোবাসার মানুষের লাইগা সামান্য কিছু করার মধ্যেও মেলা আনন্দ আছে। এই আনন্দ স্বার্থক হইবো তিনি গ্রহণ করলে।”

শিউলি অবাক চিত্তে তাকিয়ে রইলো মালার পানে। অবাক কন্ঠে শুধালো,

“সখী এতো বুঝ হইলো কবে?”

“ যেদিন থেকে জানবার পেরেছি তিনি আমাকে পছন্দ করেন।”

“ তাহলে চল যাই নাজির ভাই কে রুমাল টা দিয়া আসি?”

“ আম্মা যাইতে দিবো না শিউলি। কাল স্কুলে যাওয়ার পথে দিয়া দিবো।”

শিউলি সম্মতি জানিয়ে মালা দের বাড়ি থেকে বাহির হয়ে আসলো। পথে জিহানের সঙ্গে দেখা হলো। ও শিউলি কে দেখেই এগিয়ে আসলো। কিছুটা সময় নিয়ে অনুরোধি কন্ঠে বলল,

“ শিউলি একটা কাজ করে দিবে? তুমি ছাড়া পাচ্ছি না আর কাউকে। না করিও না দয়া করে। ”

শিউলির নিজেকে ছোট মনে হলো। একজন বড় মানুষ কি এমন কাজ যার জন্য এভাবে বলছে? মাস্টার বাড়ির ছেলে যথেষ্ট সুনাম তার আছে। খারাপ কিছু বলবে না নিশ্চয়ই। শিউলি তাই বলল,

“ না ভাইজান আপনি বলুন আর কইরা দিতাছি। কি এমন কাজ যে এভাবে কইতাছেন?”

জিহান একটা চিঠি শিউলির সামনে ধরলো। বলল,

“ এটা পৌঁছে দিতে পারবে পাপিয়ার হাতে? যেকোনো ভাবে দিতে হবে। সম্ভব হলে উত্তর লিখতে বলিও। আমি কাল পর্যন্ত আছি এই গ্রামে।”

শিউলির মুখখানা ছোট হয়ে এলো। যা ভেবেছিলো তার উল্টোটা হলো। চিঠিটা হাতে নিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে কত প্রশ্ন নাড়া দিলো। শিউলি চুপ থাকতে না পেরে শুধালো,

“ একজন বিবাহিত নারীকে চিঠি দেওয়া ভালো কাজ নয় জিহান ভাই। চিঠি নিশ্চয়ই প্রেমেরই হইবো। আপনি কি করে এমন কাজ করবার পারেন?”

শিউলির কন্ঠে বিস্ময়। ও কিছু জানে না জিহান আর পাপিয়ার সম্পর্কে তাই এই বিস্ময়কর দৃষ্টি অস্বাভাবিক নয়। জিহান মাথা থেকে ছাতা নামিয়ে ফেললো৷ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“ প্রেমের চিঠি নয় রে, সে সময় পেরিয়ে এসেছি। প্রেম পরিনত হয়েছে ভালোবাসায়,যা আমি পাইনি।
ভাগ্য তোমার মতো ভালো নয় যে।”

শিউলি পুরো কথাটা বুঝলো না তাই আবার শুধালো,

“ আপনিই পাপিয়া ভাবির সেই মানুষ? যার কথা একবার আড়াল থেকে নিধি আপার মুখ থেকে শুনতে পাইছিলাম?”

জিহান মাথা নাড়ালো। শিউলির বিস্ময় আকাশ ছুঁলো। বলতে পারলো না আর একটা কথাও। অন্যায় জেনেও চিঠিখানা হাত থেকে নিয়ে পা বাড়ালো মাতবর বাড়ির দিকে। সাহেল কতটা অত্যাচার করে তা কেউ না জানলেও ও বাড়ি আসা যাওয়া হওয়াতে সবটা না জানলেও অল্প স্বল্প দেখতে পায়,বুঝতেও পারে। বড় মায়া লাগে ওমন ফুলের মতোন মেয়েটার এমন কষ্ট দেখে। এই সমাজ অবশ্য না জেনে বলবে, ‘ সংসারে একটু আধটু হয়,স্বামী গায়ে হাত তুললে সয়ে নিতে হবে, তাদের গায়ে হাত তোলাও নাকি অধিকার আছে তাও যেকোনো কারণে।

______________

তখন ভর সন্ধ্যা। চারদিক আযানের শব্দে মুখরিত। এখন বৃষ্টি নেই। ছাড় দিয়েছে হয়তো খনিকের জন্য। শিউলি আজও একটা শালিকের ছানা পেয়েছে। মাতবর বাড়ি থেকে ফেরার পথে বড় তাল গাছটার নিচে পড়ে ছিলো। একটা মৃত ছানা আরেকটা জীবিত ছিলো। আশে পাশে মা পাখিকে দেখতে পেলো না। বৃষ্টির পানিতে ভিজে নাজেহাল অবস্থা ছানাটার। পাঁখা সবে গজেছে খুব বড় হয়নি এখনো। এভাবে থাকলে শীতে মারা যাবে রাতের মধ্যেই। উড়তে পারবে না নড়ছে শুধু একটু,একটু। ছোট পাখনা গুলো ভিজে লেপ্টে আছে গায়ে। শিউলির পাখির প্রতি ভালোবাসা বরাবরই বেশি। তাই তো বড় মায়া হলো। আমেনা বেগমের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ছানা টাকে বাড়ি নিয়ে আসলো। লুকিয়ে চুলোর ধারে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণ আর্দ্রতায় কাঁপানো কিছুটা বন্ধ করলো। তখনই আমেনা বেগম কাঁধে শিনটের ( জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত) বোঝা নিয়ে হাজির হলো। শিউলির বেখেয়ালি মনে নজরে পড়লো না। আমেনা বেগম উঠোনে উঠতে নিলে ওর হাতে আবারো পাখি দেখে কিছুটা চেঁচিয়ে ধমকের সুরে বলল,

“ শিউলি আবার পাখি নিয়া আইসিস? তোরে কতবার কইছি পাখির ছাও আনবি না বাড়িত।
পাখিদের খাঁচায় বন্ধি নয়, খোলা আকাশে মানায়।”

শিউলি আচমকা কন্ঠে চমকে উঠলো। তবে ভয় পেলো না। মায়ের প্রতিত্তোরে জবাব দিলো,

“ আম্মা দেখো কেমন কাপতাছে। বাতাসে তালগাছ থাইকা পইড়া গেছে। একটা মইরাও গেছে আর এটা কাঁপছিলো শীতে এজন্য নিয়া আইসি। কয়দিন রাখি উড়তে শিখলেই ছাইড়া দিবো সত্যি।”

আমেনার মন নরম হলো। কঠোর মানুষ তিনি নন। তবুও বললেন,

“ দুদিন বাদে ছাইড়া দেস। মায়া জন্মালে আর ছাড়বার পারবি না। মায়া বড় শত্তুর।”

শিউলি মাথা নাড়িয়ে ঘরে গেলো। শুষ্ক কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখলো পাখির ছানা টাকে। উষ্ণতা দিতে দু’হাতের আজলায় ধরে রাখলো। তখনই আমেনা বেগম শিউলির উদ্দেশ্য বলে উঠলো,

“ শিউলি কার কান্দনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে?
শোন তো দেখি। তুমি শুনবার পাস কিনা।”

শিউলি কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। শুনতেও পেলো। দূরে কাঁদছে কেউ মনে হচ্ছিলো প্রথমে তবে একটু পরই আওয়াজ মুহূর্তেই তীব্র হলো। সে বলল,

“ আম্মা কেউ কানতাছে বাইরে। চলো দেখি কার কিছু হলো নাকি।”

শিউলি ছানা টাকে খাঁচায় রেখে ছুটে বেরিয়ে গেলো। আমেনাও পিছু নিলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। কান্দন অশনি সংকেত মনে করে।
মনের কথাও হলো তাই। শিউলি দৌঁড় থামলো কান্নার শব্দের উৎসহের কাছে। দক্ষিণের নদীর পাড়ের সামনে বসে সোহাগের মা কাঁদছে অঝরে। বুকে জড়িয়ে আছে সোহাগ কে। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলছে,

“ গাঙে আমার বুকের ধন রে খাইলো রে, আমার মানিক কই গেলো রে। ও আব্বাজান কথা ক। তুই চুপ কইরা আছোস কেন বাপ। ”

শাবানা বেগমের আহাজারিতে হাজির হলো গ্রামের প্রায় সকল মানুষ। বিকেল থেকে নিরুদ্দেশ ছিলো সোহাগ। চারদিকে খুঁজে না পেয়ে সঙ্গের কিছু ছেলের কথা অনুযায়ী নদীর পাড়ে কাঁদা তুলতে এসেছিলো বলে। শাবনা ও তার স্বামী সুলতান চারদিকে খুঁজে। শেষে নদীর জলে লাল কাপড়ে মতো সঙ্গে কালো চুলের মাথা দেখে সুলতান দৌঁড়ে নামে নদীতে। দেখে তারই দশ বছরের সন্তান ভেসে আছে। ন্যাসপেস করছে শরীর। পেট ফুলে উঠেছে জলের কারণে। পাড়ে তুলে এনে পেটে চাপ দিয়ে জল বাহির করলেও কোনো আশা মিলেনা।
ইতিমধ্যে সোহাগ চলে গেছে আল্লাহ তায়ালার কাছে। নিষ্পাপ শিশু জান্নাতের ফুল হয়ে রবে। এদিকে শাবানায় আহাজারি কমছে না। শিউলিও কেঁদে ফেলে নিষ্পাপ মুখটার দিকে চেয়ে। সোহাগের সঙ্গে কত খেলেছে। এই সেদিন নদী থেকে কাঁদা নিয়ে গিয়ে বলছিলো ওকে, “ বুবু মাটির পুতুল বানিয়ে দাও না।”

শিউলি হেসে বলেছিলো, “ বড় হলে বিয়ে দিয়ে পুতুল বউ আনবে তোর জন্যে। ”

প্রতিবেশী হলেও মায়া আছে গভীর। আমেনাও নিঃশব্দে কাঁদছে। শিউলি সোহাগের পাশে বসলো। তাকালো মুখটার পানে। কিছু দোয়া, দরুদ পাঠ করলো মনে মনে। মালা এসেছে খানিক পরে।
সে নিজেও কাঁদছে বসে। সোহাগের জন্য সকলের চোখে জল। মৃত মানুষের জন্য সবাই কাঁদে, সকলের চোখে জল ও আসে।
এদিকে শাবানার শাশুড়ী সব দোষ দিতে শুরু করলো শাবানার। সঙ্গে সুলতান ও রেগে তাল মেলালো। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সন্তানের লা*সের সামনেই চুলের গোড়া ধরে মারতে গেলো। দু একটা মারতেই সকলে এগিয়ে এসে ছাড়িয়ে নিলো। শিউলি দৌঁড়ে গিয়ে বলল,

“ চাচা এ আপনার কেমন আচরণ? মানতে কষ্ট হইলেও এ্যাও সত্য সবই সৃষ্টি কর্তার হাতে। সন্তানের জন্য দোয়া না করে মারতে আসছেন কি জন্যি? কোনো মা চায় না সে সন্তান হারা হোক, কিন্তু ভাগ্যের লিখ বদলাইবে কে?”

সুলতান নিশ্চুপ বসে পড়লো উঠোনে। চোখে জল থৈথৈ করছে। আড়ালে মুছে নিচ্ছে সে। একটামাত্র সন্তান তাকে হারিয়ে শাবানার আহাজারি প্রতিনিয়ত বাড়তে আছে, কন্ঠ বাহির হচ্ছে না তবুও পাগলের ন্যায় বিলাপ করতে আছে। দৌড়ে যাচ্ছে ছেলেকে কোলে নিতে। সোহাগ কে খাটিয়ায় শুয়ে রাখা হয়েছে। কবর খুঁড়ছে কিছুজনে। মাটি রাত্রেই হবে।

________

আজ শুক্রবার হওয়াতে মাহাদের কাজ নেই। হসপিটালে দৌঁড় ঝাপ করে তার ব্যস্ত জীবন কাটছে। ব্যস্ততার মধ্যেও ভুলেনি শিউলি কে। নিত্যদিনই মনে পড়ে তার সোনার কন্যা কে। চিঠি লিখে রাখে। যেখানে অব্যক্ত শত কথা লেখা আছে। একদিন সবটা দিবে শিউলির হাতে।

অবসর দিনে দুপুরের খাওয়া শেষ করে ঘরের মধ্যে বসে পেন্সিল হাতে সঙ্গে রং তুলি নিয়েও বসেছে মাহাদ। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার সুনাম আছে বেশ! জীবনে দুটো মানুষের ছবি এঁকেছিলো অনেক আগে। মা এবং বাবার ছবি এঁকে স্কুলে পুরুষ্কার ও পেয়েছিলো। তার পর আর ছবি আঁকেনি ও। সেই ছবি আঁকার প্রতি আজ হুট করে টান অনুভব করলো তাই-তো রং তুলি ও পেন্সিল নিয়ে বসেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত ছবি আঁকতে সক্ষম হলো। একদম ওর মনমতো হলো। তাই তো অঁধর জুড়ে হাসির ঝিলিক। স্ক্রেচে আঁকা ছবিটিতে একটি মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। বয়স পনেরো সবে কিশোরী। শরীরে জড়ানো ছোট ফুলের রঙিন শাড়ি, দীঘল কালো কেশে রক্তের ন্যায় লাল জবা গুঁজে রাখা আছে। চোখ দুটো ইষৎ কালো। ছবিটির দিকে তাকিয়ে মাহাদের অঁধরে প্রফুল্লের হাসির রেখা দেখা দিলো। অস্পষ্ট কন্ঠে বলল,

“ একদম আমার সোনার কন্যার মতোই লাগছে।
জীবন্ত সোনার কন্যার প্রতিক্ষায় আমার হৃদয় শূন্যতা অনুভব করছে।”

হঠাৎ ছবির মাঝে কিছু একটা ফাঁকা অনুভব করলো। যা সে ধীর কন্ঠে আওড়ালো,

“কি যেন নাই মনে হচ্ছে?”

“ কপালে টিপ নাই। টিপ দিলে ছবিটা আরো সুন্দর লাগবে।”

অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তরে মাহাদ ছবি হাতে নিয়েই পিছনে তাকালো। অবশ্য কন্ঠ চুনতে আর এক মুহূর্ত সময় লাগেনি সেকেন্ডই যথেষ্ট। দরজার কাছে একজন মধ্যবয়সী শাড়ী পরিহিত নারী হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অতিব সুন্দরী। কেউ দেখলে বলে না আটাশ বছর বয়সী একটা ছেলে আছে তার। তিনি মাহাদের মা, মহিমা রহমান। চা’য়ের কাপ হাতে তিনি মাহাদের দিকে এগিয়ে আসলো। মাহাদ হাতের ছবিটায় রংতুলি দিয়ে লাল টিপ পরিয়ে দিলো কপালে। মহিমা রহমান এবার ছেলের দিকে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,

“ এই মেয়ে কে?”

প্রশ্ন ছুড়ে উত্তরের আশায় অধির আগ্রহে তাকিয়েই রইলো ছেলের মুখের দিকে। মাহাদ নিজের আঁকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে মুঁচকি হাসলো। ভনিতা ছাড়াই মায়ের দিকে চেয়ে বলে দিলো,

“ ভাটি অঞ্চলে ফেলে আসা সোনার কন্যা। যাকে আমার মনে লেগেছে, হৃদয়ে তার জন্যে ভালোবাসা জেগেছে। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই মা। তোমাকে বলার সময় পাচ্ছিলাম না। একমাসের মধ্যে ওই গ্রামে ফিরে যাবো শিউলি কে নিতে। তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?”

মাহাদের এমন কথা আশ্চর্যের হলেও মহিমা বেশ খুশি হলো। তবে শিউলির বিষয়ে সব শুনে চুপসে গেলো। তিনি ভেবেছিলেন এই শহরের কেউ হবে হয়তো। কিন্তু সবটা ভিন্ন। এবার তিনি চিন্তিত হয়ে বললেন,

“তোমার বাবা মানতে চাইবে কি? মেয়েটার বয়স ও কম, পড়ালেখা স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি। ওমন প্রত্যন্ত গ্রামে বিয়ে কিভাবে সম্ভব? তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান,স্বপ্ন অনুষ্ঠান করে বিয়ে দিবো সবাই কে জানিয়ে।”

শেষ কথায় উনার নিজের ও মুখ কালে হলো।
ছেলে ডাক্তার তার সঙ্গে অজপাড়া গাঁয়ের মেয়ে কে তারা মানলেও প্রতিবেশীরা কথা শোনাতে ছাড়বে না মোটেও। তার উপর মাহাদের বাবা সম্মানের সহিত বাঁচা লোক। মানুষকে অপছন্দ না করলেও ওমন গ্রামে মেনে নিবে কিনা এ নিয়ে চিন্তা হলো। মাহাদ চেয়ার থেকে উঠে মায়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভরসা নিয়ে আবদার করলো,

“আম্মা তুমি বাবাকে বুঝাবে। আমার আস্থা আছে তোমার উপরে। তোমার বিয়েও তো হয়েছিলো তেরো বছর বয়সে। পনেরো বছর বয়সে আমাকে সামলিয়েছো, বড় করেছো একা হাতে, তবে এখন কেন ভয় পাচ্ছো? বিয়ের কথা আরো পরে এগোতাম কিন্তু গ্রামের দিকে তেরো,চৌদ্দ হলেই মেয়েদের বিয়ে দেয়। এজন্য ভয় হয়। আমার সোনার কন্যা কে চাই আম্মা। তাকে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারিনা।”

ছেলের এমন আবদারে গলে গেলেন মহিমা। একমাত্র ছেলে কখনো জোর দাবি করে কিছু চাননি। বিস্মিত হয়েছেন খানিক আগেই। গম্ভীর স্বভাবের ছেলে হঠাৎ করে এতো বেপরোয়া হয়েছে নিশ্চয়ই মেয়েটার মধ্যে জাদু আছে। মহিমা ভাবনা থেকে বেরিয়ে মাহাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে হেসে ভরসায় সহিত বলে,

“ ঠিক আছে আমি দেখছি সবটা। তোর বাবা হসপিটালের কিছু কাজে ব্যস্ত আছে, চিন্তায় রাতে ঘুমায় না পর্যন্ত। চাপ কমলেই বলে দিবো সুযোগ মতো। ”

মহিমা রহমান ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। গল্পের মাঝে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে কিছুটা। উষ্ণ গরম চা’য়ের কাপে চুমুক দিলো মাহাদ। তার পর টেবিলের উপরে শিউলির আঁকা ছবিটার উপর হাত বুলালো। মনে হচ্ছে আশে পাশেই সে আছে, চোখ দুটো তাকেই দেখছে,হাসছে খিলখিলিয়ে। মাহাদ নিজের ভাবনার মাঝে স্মিত হেসে বলে উঠলো,

“ অপেক্ষা বড় যন্ত্রণার, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণার তোমাকে দেখতে না পাওয়ার তৃষ্ণা, সোনার কন্যা।”

চলবে……………..?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here