একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—২৫

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২৫

শীতের আদ্রতাময় সকাল। লেপের ভেতর উষ্ণ শরীর আরামে ঘুমিয়ে আছে মাহাদ। বুক পর্যন্ত টেনে দেওয়া লেপ। পাখির কিচিরমিচির শব্দ তার কানে আসলো। ঘুম ভেঙে গেলো আওয়াজে। চোখ মেলার আগেই হাতরে কাউকে খুঁজলো। না পেয়ে তড়িৎ গতিতে চোখ মেললো। দেখলো তার বামপাশ ফাঁকা। শিউলি নেই। মাহাদ শোয়া থেকে উঠে বসলো। ঘুমঘুম চোখ কচলে কাঠের টেবিল থেকে চশমা টা পরে নিলো। তার পর খুলে দিলো ঘরের জানালা। রোদের কিঞ্চিৎ আলো পড়লো এসে তার চোখে মুখে। শীতের তীব্রতা কমে এসেছে বোধ-হয়
পরশু শীত ছিলো বেশ! কাল অবশ্য কম ছিলো। মাঘ মাসের শেষ আর তিন চারটে দিন আছে। শীত কমে যাওয়া স্বাভাবিক লাগছে।

মাহাদ ঘর থেকে বেরিয়ে দুয়ারে যেতেই কোথা থেকে শালিক এসে ওর কাঁধে বসলো। মাহাদ তাকালো। হেসে কাঁধ থেকে হাতে নিলো। শিষ বাজালো তারই সামনে। আশ্চর্যজনক ভাবে শালিক ও শিষ দিলো কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য। মাহাদের শিষ দেওয়ার আওয়াজে আমেনা রান্ধন ঘর থেকে পিছনে তাকালো। শালিকের শীষ শুনে বলল,

“শিউলি রোজ শীষ শোনায় কিন্তু একদিন ও শালিক শীষ দেয়নি আইজ প্রথম দিলো।”

হাসিমুখে বলল আমেনা। মাহাদ এতটুকু ব্যাপারে বেশ আনন্দিত হলো। জবেদা বিবি ঘর থেকে বেরিয়ে আমেনা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“শিউলি এখনো নদী থাইকা আসেনি? নাত জামাই উইঠা পড়ছে কি লাগবো দিবার হবে।”

“আম্মা এতক্ষণে তো আসার কথা।”

“আইসা পড়ছি ।”

তখনই শিউলির আগমন হলো। দুয়ারে বালতী হাতে দাঁড়িয়ে আছে। মাহাদ উঠোন হতে দেখতে পেলো। জবেদা বিবি আদেশ দিলো,

“নাত জামাই রে নিমের দাঁতন আইনা দে। দাঁত পরিষ্কার কইরা হাত মুখ ধুইয়া খাইতে দিবো তোর আম্মায়।”

শিউলি বালতী রেখে চুল থেকে গামছা খুলে দড়িতে মেলে দিয়ে ঘরের দিকে আসলো। দুয়ারে মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখে থামলো। মাহাদ মিটিমিটি হাসছে। সেই হাসি দেখে শিউলি লজ্জা পেলো। মাথা নিচু করে ঘরে প্রবেশ করলো।
মাহাদ ও ওর পিছু পিছু গেলো। শিউলি শাড়ির আঁচল টেনে হাতে রাখা আয়নার সামনে কাজল মুছছে। চোখে দিতে গিয়ে আরেক দিকে এলোমেলো হয়ে গেছিলো। মাহাদ শিউলির পিছনে এসে দাঁড়ালো। ছোট আয়নার শিউলির নজরে পড়লো মাহাদ তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আয়নার দুজনকে দেখা যাচ্ছে। দুজনের মুখেই হাসি লেগে আছে। শিউলি আয়না রেখে পিছু ঘুরবে তার আগেই মাহাদের হাতের বাঁধনে আটকা পড়ে সে। ঘুরতে পারলো না। তার পিঠ মাহাদের বুকে লেপ্টে আছে। শিউলি কাঁপছে। শীতে নাকি ছোঁয়াতে। ও কাঁপা কন্ঠে বলল,

“ ছেড়ে দিন কেউ আসবে পারে ঘরে।”

মাহাদ তক্ষণাৎ ছেড়ে দিলো। শিউলিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে সদ্য কাজল দেওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“লাল শাড়ি এবং কাজল চোখে অপরূপা লাগছে। শুধু একটা জিনিস নেই।”

শিউলি আগ্রহে জানতে চাইলো।

“ কি?” তার কাছে মাহাদের কি ভালো লাগবে এটাই গুরুত্বপূর্ণ যেন। অধির আগ্রহে তাকিয়ে রইলো। সে বলল,

“ জবা ফুল।”

সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

“ চলুন নিমের দাঁতন পাইড়া আনি বাহির থাইকা।”

মাহাদ শিউলির সঙ্গে পা বাড়ালো। জানতে চাইলো,

“ স্কুলে পড়ো বইয়ের ভাষা জানো নিশ্চয়ই তার পর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলো কেন?”

“ আঞ্চলিক ভাষায় কথা কইতে শান্তি লাগে।
বইয়ের ভাষায় কথা কওয়ার কখনো দরকার পড়েনি তাই কইনা।”

“ আমি যদি বইয়ের ভাষায় কথা বলতে বলি খুব সমস্যা হবে? শহরে আঞ্চলিক ভাষা মানুষ কমই বুঝে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষার প্রয়োগ করতে হয়। সবার আঞ্চলিক ভাষা তার কাছে সুন্দর কিন্তু অন্য মানুষ না বুঝলে সেই ভাষার প্রয়োগ সব জায়গায় না করাই ভালো। তুমি আমার সঙ্গে এভাবেই কথা বলিও সমস্যা নেই কোনো।

“আপনি বললে বলবো শহরে গিয়ে না হয়। একটু কঠিন তবুও অভ্যাস করতে পারবো আপনার জন্যে পারবো।”

আলাপের মধ্য দিয়ে বাড়ির দুয়ার পেরোলো।
শিউলির উত্তরে মাহাদ খুশি হলো। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তার কোনো সমস্যা নেই কিন্তু সে যে অবস্থানে সেখানে তার স্ত্রী হিসাবে অন্যকিছু না হোক সকলে বুঝবে এমন ভাষা বলা উচিত বলে মনে করলো।

নিমের ডাল বেকি দিয়ে পেড়ে শিউলি ভেঙে দিলো দাঁতন হিসাবে ব্যবহার করতে।

“আপনি গাছে উঠতে পারেন?”

“না।”
মাহাদের উত্তর শিউলি হো হো করে হেসে দিলো। সেই হাসি থামছে না যেন। মাহাদ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,

“এতে হাসার কি হলো?”

“পুরুষ মানুষ হয়েও যে গাছে উঠবার পারে না এই কথা শুনলে আমার হাসি পায়। আমি উঁচু গাছেও উঠবার পারি। মালা আর আমি কত গাছের আম,জাম চুরি করে খাইছি।”

মাহাদের দৃষ্টি বড়, বড় হলো।

“চুরি করতে?”

“ হুম কেন? আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? হ চুরি পাপ জানি কিন্তু আম,জাম চুরি করলে কিছু হয় না।”

মাহাদ কিছু না বলে হুট করে ছুটে গেলো সামনে। শিউলি পিছু নিতে নিতে শুধালো,

“ কোথায় যাইতাছেন?”

শিউলি দাঁড়ালো। মাহাদ নিজেও সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। কেন ছুটেছে তার কারণ দেখতে পাচ্ছে। একটু বাদে ফিরলো সে। হাতের লাল জবা ফুলটা শিউলির কানের পিঠে গুঁজে দিলো। তার পর একপলক চেয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল,

“এবার ঠিক আছে। চলো বাবা, সাঈদ নিধি সকলকে ডেকে নিয়ে আসি।”

দুজনে নাজিরের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। পথে নুরুল আলমের সম্মুখে পড়লো মাহাদ। দুজনের মধ্যে দূরত্ব সামান্য। নুরুল আলমের মুখশ্রী আঁধার ও গম্ভীর। ওদের দেখে চোখ মুখ আরো আঁধারে পরিণত হলো। মাহাদ কে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। ভেঙে চুরে গেলেও নিজের দম্ভ বজায় রাখতে হনহনিয়ে চললো। মাহাদ কেবল হাসলো। নুরুল আলম কে শোনাতে জোরেই বলে উঠলো,

“দম্ভের পরিণতি হয় ধ্বংস। সবে শুরু, শেষে এমন না হয় কেউ থাকলো না পাশে। সময় থাকতে গুরুত্ব দিন মাতবর সাহেব।”

নুরুম আলম দাঁড়িয়ে গেলো তবে পিছু ফিরলো না। একটু থেমে আবারো হনহনিয়ে হাঁটা দিলো গন্তব্যে।মাহাদ নিজেও হাঁটতে লাগলো।

____________

জিহান হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলো। মাঠে ধান লাগাতে গিয়েছিলো। একটা জোক ধরেছিলো পায়ে। সেখান থেকে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। কাপড় বাঁধতে বাড়ি এসেছে। এসেই ডাক ছাড়লো,

“পাপিয়া? ” সাড়া না পেয়ে আবারো ডাকলো,
“ পাপিয়া কোথায় তুমি ? ”

দ্বিতীয় বার ডাকে পাপিয়া হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরোলো। বলল,

“ কি হয়েছে? কাজ ছেড়ে আসলেন যে?”

শাড়ির আঁচল মাথায় দিতে দিতে উঠোন থেকে নামলো সে। জিহান সবে মুখ খুলবে তখনই নজর পড়লো পাপিয়ার চোখের দিকে। মুহূর্তে দৃষ্টি তিক্ষ্ণ হলো। কাছে গিয়ে তাকালো ভালো করে। পাপিয়া এভাবে তাকানো দেখে চোখ মাটিতে নিবন্ধ করলো। লুকাতে ব্যস্ত হলো কিছু। কিন্তু পারলো না। জিহান বলল,

“এদিকে তাকাও।”

পাপিয়া তাকালো না। মাথা নিচু করে থাকার কারণে জিহানের পা থেকে রক্ত ঝরছে নজরে আসলো। এই বুঝি কথা কাটানোর একটা উপায় পেলো।

“পা থেকে রক্ত ঝরছে আমি কাপড় নিয়ে আসছি।”

পাপিয়া উঠোনের দিকে পা বাড়ালো কিন্তু যেতে পারলো না। জিহান ওর কনুই চেপে নিজের দিকে ফেরালো। শক্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,

“কাঁদছিলে কেন?”

“ কই? কাঁদবো কেন? চোখে ঝাল পোকা পড়েছিলো এজন্য পানি এসেছিলো ।”

জিহান বিশ্বাস করলো না। তার তিক্ষ্ণ দৃষ্টি কুঁচকে আসলো। আবারো জানতে চাইলো,

“ বলো,কে কি বলেছে?”

পাপিয়া কিছু বলতে নিচ্ছিলো তার আগেই জিহান বলল,

“মিথ্যে বলবে না আমাকে।” থেমে গেলো অঁধর। কিভাবে যেন বুঝতে পারলো এটা ভেবে অবাক হলো। চুপ করে রইলো। তার পর বলল,

“ সন্তান জন্মের ক্ষমতা নেই, এক সংসারে জায়গা হয়নি অথচ একজন অবিবাহিত সুদর্শন পুরুষ কে নিকাহ করেছি এটা বোধ-হয় পাপ বুঝলেন? সকল ক্রুটি নারীর। সমাজের চোখে পুরুষ হয় ক্রুটি হীন। নাই তাদের কলঙ্কের ভয়। খুব সহজে চাই দু চারটে কুমারি বিয়ে করতে পারে এতে কোনো দোষ নেই। দোষ শুধু নারীর বেলায় কেন বলতে পারেন?”

জিহানের সন্দেহ সঠিক। চোখ মুখ কঠোর হয়ে এলো। জানতে চাইলো,

“কে বলেছে নাম বলো।”

“ক’জনের নাম বলবো বলুন? ক’জনের সঙ্গে বিবাদ করবেন? বরং আরো ঝামেলা বাড়বে।”

পাপিয়া হাত ছাড়িয়ে পরিষ্কার কাপড় এনে পায়ের কাঁটা স্থানে রান্ধন ঘরের জালসা দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করলো তার পর কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলো। জিহান উঠোনে বসে পা আঙ্গিনায় রেখেছে। পাপিয়া পায়ের কাছে বসে। সবে উঠতে নিবে তখনই জিহান বলল,

“মানুষের কথায় কান দিও না। সমাজের কিছু মানুষকে কাজই হলে তিরস্কার করা। অন্যের সুখ শান্তি সহ্য না করতে পারা। এসব অবশ্য কিছু কুচুটে মহিলাই করে বেড়ায়। তুমি বললে পুরুষদের গুনগান গায় সমাজ তবে কি জানো? কিছু নারী ও এটাকে সম্মতি দেয়। তুমি আমাকে নিয়ে সুখী না?যদি না থাকো তাহলে বলো।”

পাপিয়া উঠে দাঁড়ালো। টলমল চোখে বলল,

“আমার শত দুঃখের মাঝে সুখের কারণ আপনি।”

“তাহলে আমাকে নিয়ে ভাবো, সংসার এবং সংসারের মানুষদের নিয়ে ভালো থাকো। তারা তোমায় মানলে প্রতিবেশির কথায় কি যায় আসে?”

জিহান শান্ত কন্ঠে বলল। নিজেও উঠে দাঁড়ালো।
পাপিয়া একটু ভেবে উত্তর দিলো,

“ আচ্ছা মনে রাখবো।”

জিহান হাসলো। আবদার করলো,

“এবার একটু হাসো তো। তোমাকে হাসিমুখে সুন্দর লাগে।”

পাপিয়াও হাসলো। জিহান বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো মাঠের উদ্দেশ্য। সেও পিছু পিছু এসে দাঁড়ালো দুয়ারের কাছের। কিছুটা দূর গিয়ে জিহান ও দাঁড়ালে। পিছু ফিরে পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে জোরে বলল,

“ আমি তোমাকে নিয়ে সুখে আছি। কেউ কটুক্তি কিংবা তোমায় কথা শোনালে মুখের উপর জবাব দিবে। অতি ভদ্রতা দেখাতে নেই পাপিয়া। সকল মানুষ ভদ্র ব্যবহারের যোগ্য নয়।”

জিহান আবারো হাঁটতে শুরু করলো। তসর আগে একবার ডানে তাকিয়ে হাসলো। পাপিয়া ডান পাশে তাকিয়ে দেখলো পাশের বাড়ির মহিলা তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ মুখ বিষিয়ে। এবার বুঝলো জিহানের জোরে বলার কারণ। হুট করে মানুষটার কান্ড মনে করে হেসে উঠলো। সম্পর্কে চাচি শাশুড়ী হওয়া মহিলা ফুঁসে উঠলো আরো। তার দিকে তাকিয়ে হাসা মানে তাকে ব্যঙ্গ করে মজা নিচ্ছে ভেবে বসলো। পাপিয়ার যখন খেয়াল আসলো দপ করে হাসি বন্ধ করলো। ওই মহিলা হনহনিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। পাপিয়ার হাসি আবারো শুরু হলো। নিজের কান্ডে নিজেই বিস্মিত হলো। হাসি থামার চেষ্টা করলেও পারলো না। তবে এতটুকু বুঝলো জিহানের মতো মানুষ জীবনে থাকলে দুঃখ ছোঁয়ার আগেই সুখের পরশ হাত বুলিয়ে যাবে।

_________

জোছনা রাত। চারদিকে জ্বলজ্বল করছে জোছনার আলো। সময়টা তখন রাতের প্রথম প্রহর। সকলে গভীর ঘুমে। পুরো গ্রাম নিশ্চুপ হয়ে আছে। মনে হয় মানুষদের সঙ্গে গ্রাম ও ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ কুয়াশা খুবই স্বল্প। কুয়াশার ঘোলাটে ভাব দূরে চোখে পড়ছে। এই রাতে মাহাদ আর শিউলি ঘর থেকে বেরোচ্ছে। ধীরে দুয়ার খুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। তার পর বদুয়ারে ছিকল তুলে দিশে নিঃশব্দে দুজনে পথ চললো। এর মধ্যে দুজনের ফিসফিস কন্ঠে আলাপ চললো। থামলো গিয়ে একেবারে নদীর ঘাটে। যেখানে কয়েকটা নৌকা বাঁধা আছে। জোছনায় নদীর চিকচিক করছে।
শিউলি হাতের হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে রাখলো মাটিতে। বলল,

“ এতো রাতে বাহির হওয়া কি ঠিক হইলো?”

মাহাদ নৌকায় উঠতে উঠতে উত্তর দিলো,

“কেন? আমি কি আজ পর পুরুষ আছি নাকি? কলঙ্কের ভয় নেই তাহলে চিন্তা করছো কিসের?”

মাহাদ নৌকা থেকে হাত বাড়িয়ে দিলো। শিউলি দেখতে পেয়ে হ্যারিকেন হাতে এগিয়ে আসলো। বামহাত মাহাদের হাতে রেখে নৌকায় উঠে দাঁড়ালো। তার পর উত্তর দিলো,

“ কলঙ্কের ভয় নাই কিন্তু ভূতের ভয় আছে।”

শিউলির উত্তর মাহাদের কাছে হাস্যকর লাগলো তাই তো হেসে ফেললো মুহূর্তে। ভূত পেত বিশ্বাস করে না সে। শিউলির দৃষ্টি উঁচু হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“হাসবেন না। নদীর পাড়ে বড় আমগাছের নিচে রাত্রে বড়, বড় লম্বা চুল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে পেতনী অনেকেই বলে।”

মাহাদ হাসি থামাতে পারলো না। নৌকার সামনের দিকে এদিকে গেলো। বৈঠা হাতে নিয়ে বসে পড়লো। জানতে চাইলো,

“ তাই? তুমি পেতনী ভয় পাও?”

শিউলি কপাল কুঁচকে মুখ বাঁকালো।বলল,

“ আপনি বিশ্বাস করতাছেন না তো যখন সামনে আসবে বুঝবেন।”

“ শিউলি তোমার পিছনে পেতনী দাঁড়িয়ে আছে।”

“আহহহ।” শিউলি ভয়ে ছুটে এলো মাহাদের কাছে। ভয়ে জড়িয়ে ধরলো কাঁধ। শক্ত হাতে শার্টের অংশ মুঠো করে রাখলো। মাহাদের হাসি গাঢ় হলো। শিউলি চোখ মেলে দেখলো কেউ নেই শুধু মাহাদ হাসছে। বুঝতে পারলো মজা নিচ্ছে। ও এবার রাগ করে ছঁইয়ের ভেতর গিয়ে বসলো। মাহাদ হাসি থামিয়ে বৈঠা বাইতে শুরু করলো। হ্যারিকেনের মিটিমিটি আলোর শিউলির রাগ মিশ্রিত মুখখানা মোহনীয় লাগছে। মন চাইছে একটা চুমো খেতে নাকের ডগায়। হুটহাট এমন ইচ্ছেতে কেবলই হাসে। নৌকা বইছে দেখে শিউলি মাহাদের দিকে চাইলো। সে এক নজরে তাকিয়ে আছে। ছঁইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো। বসলো মাহাদের সামনে। ওর বুকের দিকে পিঠ করে মাথা ঠেকালো মাহাদের বুকে। তার পর বলল,

“এভাবে তাকিয়ে লজ্জা দেওয়ার চাইতে আপনার বুকে মাথা রাইখা ঘুমানো ভালো।”

“ঘুমাতে আসিনি।”

শিউলি ওর বুকে মাথা রেখে উপর দিয়ে মাহাদের দিকে তাকালো। জানতে চাইলো,

“তাহলে?”

“ গল্প করবো দুজন সারারাত ধরে। তার আগে একটা ইচ্ছে পূরণ করে দাও।”

শিউলি চোখের ইশারায় জানতে চাইলো ‘ “কি?”

মাহাদ মিটিমিটি হেসে বলল,

“চুমো খেতে ইচ্ছে করছে তোমার নাকের ডগায়।”

“ডাক্তার সাহেব আপনি দিনদিন কেমন নির্লজ্জ হইয়া যাইতাছেন?”

“ চুমো চাওয়াতে যদি র্নিলজ্জ উপাধি পেতে হয় তাহলে থাকুক বরং।”

শিউলি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। মাহাদ বৈঠা বাইতে শুরু করলো আবারো। খানিক বাদে মাহাদ অনুভব করলো গালে কেউ অঁধর ছুঁইয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে। সে তো তাকিয়ে ছিলে বামে নদীর গতিপথের দিকে। যখনই টের পেলো তাকানোর আগেই শিউলি আগের স্থানে আবারো বুকে মাথা রেখে বসে পড়লো।

“ বেশ চালাক হয়েছো সোনার কন্যা।”

“ বোকা হইলে আপনি খুশি?”

“ না আমায় ভালোবাসলে।”

খানিকটা নিরবতায় কাটলো সময়। তার পর হুট করে গল্প শুরু হলো দুজনের। শিউলি মাহাদের বুকে মাথা রেখে হাসছে গল্পে মেতে উঠছে। এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্তে্ আর কি হতে পারে? হঠাৎ নৌকা থেমে গেলো। নড়ে উঠলো ওরা দুজনে। পাড়ের সঙ্গে বাড়ি খেয়েছে নৌকা। মাহাদ গল্পের তালে খেয়াল করেনি নৌকা পাড়ের দিকে ভিড়েছে। বৈঠা ঠেলে আবারো অন্যপাশে ফেরালো। শিউলি চারপাশে নজর বুলিয়ে বলল,

“এবার চলুন অনেক রাত হলো।”

মাহাদ অসম্মতি জানালো।

“এই মুহূর্তে গুলো মিষ্টি স্মৃতি হয়ে থাকবে শিউলি। সময়ের সঙ্গে বয়স আর ব্যস্ততা দুই-ই বাড়ে। ভালোবাসা না কমলেও বয়সের সাথে প্রেম কমে।”

শিউলি শুনলো। কিছু না বলেই হুট করে মাহাদের বুক থেকে উঠে পড়লো। মাঝ নদীতে কেবল তারা দুজনে। নিঃস্তব্ধ রাত আর জোছনাময় আকাশ। আকাশে চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। শিউলি উপরে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

“শুনতাছো আকাশ,নদী? আমার পাশের মানুষটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুপুরুষ। তাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। এতোটা…যতটা ভালোবাসলে পৃথিবীর বুকে তার সঙ্গে শত,শত বছর বাঁচার ইচ্ছে জাঁগে।”

শিউলি শব্দগুলো মনে হচ্ছে এখনো চারদিকে উচ্চারিত হচ্ছে। প্রতিধ্বনি মাহাদের কানে বাজছে। ও নিজেও এবার উঠে পড়লো। শিউলির পাশে দাঁড়িয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি আমার ভালেবাসায় শত,শত বছর বেঁচে থেকো। আমাকে ঘিরে তোমার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা থাকুক জড়িয়ে।

চলবে……………?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here