একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—৮-৯

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৮-৯

বিধান নগরের মানুষ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। মেডিকেল টিম এর পরামর্শ মতো সচেতনতা অবলম্বন করে নতুন করে অসুস্থতার হার ও কমেছে। বলা যায় নেই বললেই চলে। আজ স্কুল মাঠে ক্যাম্পেইন সংগঠিত হয়েছিলো। মাহাদ সহ টিমের সকলে উপস্থিত ছিলো। স্কুল মাঠে আরেক দফায় মানুষের ভীড় লাগলো। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অসুস্থতা থেকে বাঁচতে করনীয় কি জানানো। সাথে কিছু রোগীও দেখলো। সবকিছু শেষ করে নিস্তার মিললো দুপুরের দিকে। আজকের পরিবেশ অনেক শান্ত। ঝিরিঝিরি হাওয়ায় দুলছে গাছের পাতা।
বৃষ্টি এলেও আসতে পারে। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। মাহাদ স্কুল মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ কবির এসে বলল,

“ স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে পৌর শহর থেকে একজন এসেছেন।”

“ কোথায় তিনি?”

“ মাতবর বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। খবর নিয়ে আসলো মাতবর বাড়ির কর্মরত থাকেন যে রহমত আলী।”

“ ঠিক আছে। তুমি ওদের ডেকে নিয়ে আসো।”

কবির চলে গেলো। একটু পরেই হাজির হলো মাতবর নুরুল আলম। উনার সঙ্গে কিছু কথা বলে পা বাড়ালো ফেরার পথে। সাঈদ আরহাম আর নাজির ও সঙ্গে আছে।
তাদের আরেকটু পিছনে পুরো টিম আসছে।
ওদের সঙ্গে নীরা ও আছে। ও বার, বার চেষ্টা করছে মাহাদের সঙ্গে আসতে কিন্তু ওর ভাই আছে বলে যেতে পারছে না। আফসানা ওর হাবভাব দেখছে। আর আগেও খেয়াল করেছে। তাই একান্ত ওকে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি কি মাহাদ স্যার কে পছন্দ করো নাকি সাঈদ,আরহাম স্যার কে?”

নীরা চমকায়। আফসানা কিভাবে বুঝলো ভেবে অবাক হয়। রাজিয়াও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রত্না ওকে দেখেই বিরক্ত হয়ে আগে আগে চলছে। নীরা দ্বিধায় পড়ে। কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে না। আমতা আমতা করে বলল,

“ সুন্দর তো সবাই কিন্তু একটু বেশিই সুন্দর মাহাদ উনিই।”

নীরার ঠোঁটে লাজুক হাসি। আফসানা চেয়ে আছে। ওর সন্দেহ ভুল নয় তা স্পষ্ট হতে এই প্রশ্ন করেছিলো। সে এবার বলল,

“ স্যারের বউ আছে জানোনা?”

নীরার লাজুক হাসি নিভে গেলো। অবাক চিত্তে শুধালো,

“ সাচা? শুনি নাই তো।”

“ জিজ্ঞেস করেছিলে যে শুনবে?”

নীরা মাথা নাড়ালো। তার পর মন খারাপ করে আগে আগে ছুটলো। ও যেতেই রাজিয়া শুধালো,

“ মিথ্যা বললি কেন?”

“ স্যাররা এর উপর বিরক্ত। এর জমজ বোন আছে সে একদম আলাদা। আর এ এতো গায়ে পড়া। কাল দেখছিলি কিভাবে মাহাদ স্যারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। স্যার অবশ্য বিরক্ত হয়ে বলেই দিয়েছিলো সরে দাঁড়াতে। তার পর লজ্জা নেই।

রাজিয়া চুপ করে গেলো। রত্না এবার তাদের সঙ্গ দিলো। নীরাকে একদম অপছন্দ তার এজন্য এগিয়ে ছিলো।

মালা আর শিউলি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুল মাঠের একপাশে আলোচনা হলেও ওদের ক্লাস হচ্ছিলো ঘরে। শিউলি কয়েকবার উঁকি ঝুঁকি মেরে মাহাদ কে দেখেছে। মাস্টার তার উঁকি ঝুঁকি দেখতে পেয়ে তো কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো। এখন সেটাই মালা বলছে আর হাসছে। শিউলি বেজার হলো। মুখ কালো করে বলল,

“ তোর সঙ্গে আড়ি। কথা কমু না আর যা।”

মালা হাসি থামালো। সামনে ইশারা করে বলল,

“ দেখ ডাক্তার সাহেব রা আসছেন।”

শিউলি তাকালো। নাজির সকল কে ছাড়িয়ে এগিয়ে আসলো। ওদের ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

“ পথে দাঁড়িয়ে কেন? বাড়ি, ঘর নাই? যাও।”

ধমকে শিউলি ভয় না পেলেও মালা পেলো। ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে ছুটে চললো। মাহাদ দূর থেকে দেখে সামান্য আফসোস করলো। যখন মনে পড়লো পিছনে আরো অনেকে আছে তখন নাজির কে মনে মনে ধন্যবাদ জানালো।

*******
মালা মাতবর বাড়ির আঙ্গিনায় এসে দাঁড়ালো। ভেতরে প্রবেশ করার আগে ডানপাশে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকালো। কাঙ্ক্ষিত কাউকে দেখতে না পেলেও অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের কন্ঠ ঠিকই পেলো,

“ বলেছিলাম না এদিকে না আসতে। তার পরও আবার উঁকিঝুঁকি মারছিস কেন?”

মালা চমকে উঠলো। তাকালো পিছনে। রণমুর্তি ধারন করে নাজির দাঁড়িয়ে আছে। মালা ভয় পেলো সামান্য। থতমত খেয়ে গেলো। বারণ না শুনে একই কাজ করেছে এখন কি জবাব দিবে? তবুও বলল,

“ উঁকিঝুঁকি দিলে ক্ষতি কি নাজির ভাই? যা কওনের পরিষ্কার কইয়া কন। আমি ঘোরাই পেঁচাই কথা বুঝি কম।”

নাজির ডান ভ্রু উঁচু করে তাকালো। মালার এমন প্রশ্নের উত্তর সে ভনিতা ছাড়াই বলল,

“ আমার তোকে ভালো লাগে। ভালোবাসার কথা বুঝিয়ে বলতে পারিনা। ভালো কেন লাগে তাও জানিনা। শুধু জানি তোরে দেখলে হৃদয়ে অন্য রকম অনুভূতির ঢেউ খেলে,আনন্দ লাগে। বিষাদ লাগে অন্য পুরুষের দিকে নজর দিলে। তোরে শুধু আমিই দেখবো,আমিই ভালোবাসবো৷ বউও আমিই বানাবো শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষাটুকু করে অন্য কারো দিকে নজর দিস না বুকে ব্যথা অনুভব হয়।”

মালা স্তদ্ধ হয়ে গেলো। কি বললে সবটা যেন অবিশ্বাস্য আর বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হলো। এ কি করে সম্ভব? মালা কথা বলতে ভুলে গেলো, হারিয়ে গেছে অঁধরে আসা সমস্ত শব্দ। তোতলানো কন্ঠে শুধালো,

“ কি কইতাছেন এসব?”

নাজির মাথা নাড়ায়। আশে পাশে তাকিয়ে বলে,

“ মিথ্যে একটুও নাই। এখন এর বেশি আর কিছু বলতে পারবো না এখানে।”

“ কিন্তু এ সম্পর্ক সম্ভব নয়। আপনার আর আমার অবস্থান তো জানেন।” মালার নরম কন্ঠ। উত্তর জানার আগ্রহে নাজিরের দিকে তাকিয়ে আছে।
নাজির যেতে নিয়েও থেমে গেলো। পিছনে না ফিরে বলল,

“ অসম্ভব কিছুও নয়। ভালোবাসা অবস্থান দেখে নয় হৃদয়ের টানে হয়।”

নাজির চলে গেলো। রয়ে গেলো মালা আর বিস্ময়কর দৃষ্টি। সবটা এখনো অবিশ্বাস্য লাগছে।
নাজির ভালো ছেলে এটা সকলে জানে। কিন্তু মালা মাঝির মেয়ে। সম্পদ বলতে তাদের মতো শত এর দশ ভাগ ও নাই। রুপবতী ও নয় সে। মাতবর বাড়ির সকল বউ রুপবতী হয়, এটা যেন বংশ পরম্পরায় একটা নিয়ম ও বলা যায়। সেখানে আবার সে শ্যামা। এতো বাঁধা পেরোবে কি করে?
শেষ পর্যন্ত আবেগ থাকবে? মালা দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলো। নিধির ডাকে ছুটলো এবার। শিউলি আগেই এসেছে এ বাড়ি।

___________

“ আসবো?”

খনিকের দেখায় অপরিচিত মানুষটা অজান্তেই কিছু কারণে অপছন্দের হয়ে উঠে। কখনো তা ভুল বুঝে কখনো না সত্যিই। দরজার সামনে জিহান দাঁড়িয়ে আছে। মাহাদ সবে গোসল সেরে এসেছে। পরনে আজ লুঙ্গি আর শার্ট। সাঈদ বসে কিছু একটা করছিলো খাতায় মধ্যে। আরহাম মাহাদের পর গোসল করতে গেলো। মাহাদ না চাইতেও আসতে বলল,

“ জ্বী আসুন।”

জিহান অনুমতি পেয়ে ভেতরে আসলো। দৃষ্টি রাখলো সাঈদের উপরও। সে তাকিয়ে আছে অচেনা মানুষটার দিকে। তখনই মনে পড়লো কালই দেখেছে শিউলির সাথে কথা বলা ছেলেটা। মাহাদের দিকে তাকিয়ে জিহান বলল,

“ কিছু সময় হবে কথা বলার জন্য?”

“ হ্যাঁ বলুন।”

“ যদি সময় হয় তাহলে বাড়ির বাহিরে গিয়ে বলি? আসলে কথাগুলো যেখানে সেখানে বলার মতো নয়।”

মাহাদ আন্দাজ করতে পারছে না কি কথা থাকতে পারে তার সঙ্গে? অচেনা মানুষ কে কিই-বা বলবে?
শিউলির ব্যাপারে কিছু নয়তো? একটা ভেবে ভয় পেলো আবার অন্য আরেকটা ভেবে চিন্তা করতে শুরু করলো।

“ কি হলো সময় হবে?”

“ জ্বী চলুন।”

মাহাদ আর জিহান বেরিয়ে গেলো। সাইদ ও একা ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। হুট করে মনে হলো ছাঁদে যাওয়ার কথা। গোসল করে শীত লাগছে একটু। ছাঁদে উঠতেই দেখতে পেলো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন করে গান ও গাইছে মনে,মনে। ঠোঁটে লাজুক হাসি। পরনে বেগুনি শাড়ি। পায়ে তখন সে আলতা দিতে ব্যস্ত সে। সামনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে যা ওর খেয়ালের বাহিরে। সাঈদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। পা নড়লো না একটুও। মনে হয় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।
হুট করে এক চিলতে রোদ এসে পড়লো মেয়েটার চোখে মুখে। রোদের ঝাপটায় চোখ বন্ধ করলো। হাত মেলে ধরলো রোদ আটঁকাতে। ওর এমন আদুরে মুহূর্ত সাঈদের অঁধরে হাসি আনলো। অজান্তেই হেসে উঠলো। হঠাৎ কারো হাসির শব্দে নিধি সামনের পানে চাইলো। সাঈদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার হাসি ভাব মিলিয়ে গেলো। সাঈদ যখন টের পেলো নিধি তার দিকে চেয়ে আছে। হাসিমুখ খানা স্বাভাবিক করলো। কালকের কথাটা মনে পড়লো। সে দ্রুত ছাঁদ ত্যাগ করতে আগত হলো। তার আগে বলল,

“ দুঃখীত। অজান্তে আবারো ব্যক্তিত্বহীনের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

“দাঁড়ান।”

সাঈদ আসতে নিলে নিধি পিছু ডাকে। সে থেমে যায়, তাকায় ওর দিকে। নিধি এগিয়ে আসলো দাঁড়ালো সাঈদের সামনে। অপরাধবোধ অনুভব করেছে সে সারাটাদিন। তাই অনুশোচনায় কাচুমাচু কন্ঠে বলল,

“ কালকে ওমন করে বলা ঠিক হয়নি আমার। রাগ ছিলো কারো উপর হুট করে আপনি বলাতে ঝেরে দিয়েছি। দুঃখীত।”

মাথা নিচু করে বলল নিধি। সাঈদ দৃষ্টি সরালো না।
বিষাদ অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে উঠলো। যা নিধির অগোচরে থেকে গেলো। বলল,

“ শুনুন,আপনার গম্ভীর মুখশ্রী আর মন খারাপ মানায় না, আপনাকে হাসিমুখে ভীষণ সুন্দর লাগে।”

নিধি চট করে তাকালো। মেল বন্ধনে আটকা পড়লো দুটো দৃষ্টি। সাঈদ আর দাঁড়িয়ে না থেকে ছাঁদ থেকে নেমে আসলো। চোখ ও যে সর্বনাশ ডেকপ আনে। যা সে চায় না। কিন্তু মন চায়। নিধি তার গমনের দিকে তাকিয়ে রইলো। যখন অস্তিত্বটুকু আর দেখা গেলো না তখন নিজ মনে হেসে ফেললো। ছাঁদ জুড়ে হাত মেলে পাখির মতন উড়ার চেষ্টা করলো। উচ্ছাস নিয়ে বলল,

“ খুব কি ক্ষতি হতো যদি পাখি হতাম?
উঠে বেড়াতাম সবুজ প্রকৃতির বুকে।
আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবী দেখতাম দু’চোখ ভরে।”

“ মানুষ হয়ে কি আফসোস তবে?”

“ হুট করে ছুড়ে আসা পাপিয়ার প্রশ্নে দাঁড়িয়ে গেলো নিধি। হাসিমুখেই উত্তর দিলো,

“ আফসোস নয়,তবে মানুষরূপী কিছু অমানুষদের সঙ্গে বসবাস করতে হলে আফসোস তো হবেই।”

পাপিয়ার মুখশ্রী আঁধারে নিমজ্জিত হলো। নিধি ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। পুরো মানুষটাকে এক পলকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। তার পর বলল,

“ ভাইজান আবার মেরেছিলো আজ?”

“ না। একজন মানুষকে আর কত ব্যথা দিবে? বিরক্তি চলে এসেছে হয়তো।”

“ জিহান ভাই এসেছিলো তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো?”

“ হ্যাঁ কাল হয়েছিলো। উনি হঠাৎ কেন এসেছে? তুমি কিছু বলেছো?”

নিধি চমকালো। আমতাআমতা করতে নিলো। বলল,

“ স্কুল থেকে আসার পথে শুধিয়েছিলো কেমন আছো তুমি। তখনই সত্যিটা বলেছি। তবে মাইরের কথা বলিনি অন্য কোনে ভাবে জেনেছে। তোমার জন্য আজও অপেক্ষায় তিনি। বিয়ে করেননি আজও।”

পাপিয়া হাসলো। সে হাসি নিজের প্রতি তাচ্ছিল্যের। মনে মনে আওড়ালো,

“ সুখের সঙ্গী করিনি যাকে,সে দুঃখের সঙ্গী হতে আসে। স্বার্থপর হতে চাই না যে।”

__________

মালা আর শিউলি নদীর পাড়ে নৌকায় বসে আছে। তার আব্বার নৌকা। দুজনে গল্প করছে। মালা নাজিরের বলা কথাগুলো বলছে আর লাজ্জায় মরছে। শিউলি আরো লজ্জা দিতে বলল,

“ নাজির ভাইজান তোরে ভালোবাসে। তুই কি বাসিস যে লজ্জা পাইতাছিস?”

“ তা তো জানিনা তয় ভালোলাগে।”

“ ভালো তো শহুরে ডাক্তারদের ও লাগতো।” শিউলির এমন প্রশ্নে ওর লজ্জা লাগলো। সত্যিই তো! মালা ওর দিকে তাকালো। কথাটা একটুখানি ভাবলো। তার পর উত্তর দিলো,

“ ভালো লাগতো উনাদের কথা কওয়ার ধরণ আর পোশাক। সবকিছু কেমন নতুন দেখা। হয়তো এর লাইগাই একটা আর্কষণ কাজ করতো। কিন্তু উনার এই কথা শোনার পর থাইকা কেমন হৃদয়ে ফুরফুরে অনুভূতি হচ্ছে সাথে লজ্জাও লাগছে।”

“ পিরিত ম্যালা বড় রোগ সখী। সেই রোগে ধরলে বাঁচা বড় কঠিন।”

“ ওই দেখ উনি আর ডাক্তার সাহেব আসতাছে।”

শিউলির নজর নদীর পাড়ের দিকে। নাজির আর মাহাদ এদিকে আসছে। মালার লজ্জা আরো বাড়তে শুরু করে। নাজির ভালোবাসে শোনার পর থেকে এমনটা হচ্ছে। এদিকে মাহাদের আগমন কাছাকাছি হওয়াতে শিউলির বুকের ভেতর কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে। কেন এমন হয় জানেনা সে। কই আর কাউকে দেখে তো হয় না এমন অনুভূতি।

“ চল সকলে নদীর ওপার থেকে ঘুরে আসি।”

নাজির ওদের কাছে এসেছি এই প্রস্তাব রাখলো। তবে শিউলি বিনাবাক্যে নাকচ করলো। কারণ হিসাবে বলল,

“ গাঙের জল উত্তাল। আকাশ ভালো না। কখন বৃষ্টি আসে তার ভরসা নাই। দেখতাছেন না কেমন মেঘলা হয়ে আছে আকাশ।”

নাজির বলার আগেই পাশ থেকে মাহাদ অবাক হয়ে বলে উঠলো ,

“ বৃষ্টি পছন্দ করা মেয়ের আজ বৃষ্টি নিয়ে এতো ভয়?”

“ আম্মা বকবে তাই।” মিনমিনে কন্ঠে উত্তর দিলো শিউলি। মাহাদ নিঃশব্দে হাসে। নাজির কে বলে,

“ সন্ধ্যা হচ্ছে থাকুক আজ। চলো ফিরে যাই।”

নাজির সম্মতি জানালো। মালার দিকে এক পলক তাকালো। মাহাদ কে বলল,

“ মালার সঙ্গে কিছু কথা আছে তোমরা একটু থাকো অপেক্ষাতে।”

মাহাদ ওদের সুযোগ দিয়ে এ পা দু পা করে সামনে এগুলো। মালা আর নাজির রয়ে গেলো। শিউলি ও মাহাদের পিছু নিয়েছে। সামনের মানুষটার চলন চোখে পড়ছে। হুট করে সে থেমে গেলো। নাজির আর মালার থেকে যথেষ্ট দূরত্বে তারা। নদীর পাড়ে সেই আমগাছ টার নিচে দুজনে দাঁড়ালো। শিউলির বুক ধুকপুক করছে এখনো। তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। মনে হচ্ছে সেই ভরা নদীর ঢেউয়ের মতো বুকের ভেতরটা ঢেউ খেলছে। আর মাহাদ তাকিয়ে আছে তারই পানে। দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো খানিকক্ষণ। তার পর নিরবতা ভেঙে মাহাদ শুধালো,

“ কাঁপছো কেন? জ্বর কি আবার আসলো?”

শিউলি তাকায়। মাথা নাড়িয়ে বলে,

“ না।”

“ তাহলে?”

“ আপনাকে দেখে। ”

মাহাদ ঠোঁট চেপে হাসে। জানতে চায়,

“ আমাকে দেখে কেন?”

“ তা জানিনা তবে……

“ বলতে গিয়েও থেমে গেলো শিউলি। মাহাদ আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওর থেমে যাওয়াতে আগ্রহ আরো বাড়লো। শুধালে,

“ তবে কি বলো?”

শিউলি মাহাদের চোখের দিকে তাকালো। কালো মনি ও যেন আর্কষণ কাজ করলো। বুকের ভেতর কেমন যেন ঢোল পেটাচ্ছেন মনে হচ্ছে। মুহূর্তের জন্য দুজনে থমকে গেলো। কত সময় তাকিয়ে ছিলো কে জানে। তবে নাজিরের কন্ঠে তাদের দৃষ্টিভঙ্গ হলো।

“ মাহাদ চলে আসো।”

শিউলি ওর আগেই দৌঁড়ে পালালো। থামলো মালার কাছে। ওর হাত টেনে নিয়ে চললো গমগমিয়ে। ততক্ষণে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে।
কমলা রশ্মি পশ্চিম আকাশে ছড়িয়ে আছে। নাজির মাহাদের কাছে গেলো। মাহাদ শুধালো,

“প্রেমে পড়লে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়।
তোমার মধ্যে তা এখন লক্ষ্য করছি।”

“ ভালোবাসাই তো মিষ্টি অনুভূতি।”

“সে অনুভূতিকে সারাজীবন বজায় রাখতে হলে বিবাহ করে স্বকৃীত দিতে হবে।”

“ কিছুদিন যাক। জেলা শহুরে কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ করে এসে আব্বাকে বলবো।”

“ যদি না মানে?”

“ ভালোবাসা জিনিসটাই বাঁধার, সেসব নিয়ে ভয় করতে নেই। লড়াই করে হলেও জিতে নিতে হবে প্রিয়জনকে।”

________

মধ্য প্রহরে আরহামের ঘুম ভেঙে গেলো তৃষ্ণায়।
ঘরে কোথাও পানি পেলো না। বাঁধ্য হয়ে ঘর থেকে বেরোতে হলো। তার বেরিয়ে যাওয়ায় দরজা খোলার আওয়াজে মাহাদের ও ঘুম ভেঙে গেলো।
তারও পানি পিপাসা অনুভূত হলো। সেও ঘর থেকে বেরোলো। পুরো বাড়ি অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই। আরহাম অন্ধকারে কাউকে ওর দিকে গমগমিয়ে আসতে দেখে ভয় পেলো। জিজ্ঞেস করলো,

“ কে ওখানে? ”

ওর কাছে এসে ঘাড়ে হাত রাখতেই ভয়ে লাফিয়ে উঠলে আরহাম। নিজের কাছে ছায়ার মতো কাউকে দেখে চিৎকার করতে যাবে তখনই মাহাদ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। আরহাম রাগের ভান ধরে বলল,

“ সালা এমনিতেই পানি পিপাসায় গলা শুকিয়ে গেছে তার পর মধ্যে ভয় দেখিয়ে আরো মারতে চাস?”

“ আমার বোন নেই,থাকলেও দিতাম না ”

আরহাম মুখ বাঁকায়।

“ নিতাম ও না। যা সর কত মেয়ে আমার জন্য পাগল। কত চিঠি পড়ে আছে ঘরের কোনে অবহেলায়।”

একটু ভাব নিয়ে কথাটা বলল আরহাম। মাহাদ এবার ঠাড্ডা রেখে জিজ্ঞেস করলো,

“ পানি পাসনি?”

“ অন্ধকারে তো যেতেই পারলাম না পাবো কি করে?”

“ ঠিক আছে তুই ঘরে যা আমি নিয়ে আসছি।”

আরহাম ঘরের দিকে গেলো। মাহাদ কাসার গ্লাস হাতে নিয়ে আন্দাজে কিছুটা খেয়ালে চলতে শুরু করলো। অন্ধকার হলেও অল্প স্বল্প কাছাকাছি পথ দেখা যাচ্ছে। কলপাড়ে কোনে মতে পৌঁছালো। সঙ্গে আনা গ্লাসে ভরে এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস পানি খেয়ে নিলো। তার পর আরহামের জন্য নিলো। কলপাড় বাড়ির আঙ্গিনার পাশে। আঙ্গিনাও বিশাল বড়। ফেরার পথে কারো পায়ের শব্দ পেলো। একজন পশ্চিমে হেটে যাচ্ছে। সদর দরজার দিকে। এদিক সেদিক তাকাচ্ছে মাঝে মধ্যে। আচরণ সন্দেহজনক। মাহাদের সন্দেহ হলো। অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো মানুষটার পিছু নিলো। এবার আর সেদিনের মতো ভুল করা যাবে না ভেবে দৌঁড়ে গেলো। সামান্য পিছু থেকে শুধালো,

“ কে ওখানে?”

লোকটা থেমে গেলো। মাহাদ সামনাসামনি হাজির হলো। চারপাশ অন্ধকার হলেও কাছাকাছি দাঁড়ানো মানুষরাকে চিনতে অসুবিধা হলো না।

“ আপনি?”

_______

পরেরদিন সকাল বেলা মাতবর বাড়িতে হইহোল্লড় শুরু হলো। সিন্দুক থেকে গহনা এবং টাকা পসয়া চুরি হয়েছে। ভরা মাতবর বাড়ি। নুরুল আলম রাগে এবং হতাশায় ফুঁসছেন। হুঙ্কার ছাড়ছেন মাঝে মধ্যে। প্রথমে দোষ গেলো পাপিয়ার উপর। গরিব বাবার বাড়ি পয়সা কড়ি,গহনা দিয়ে এসেছে নাকি। এ নিয়েও এক দফা হলো।

পাপিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“ আব্বা আমি তো ঘর থেকে বেরোয়নি কতকাল। কিভাবে পাঠাবো অন্য কেথাও?”

সাহেল রেগে বলল,

“ কারো হাতে পাঠিয়েছিস।”

নুরুল আলম ওকে চুপ থাকতে বলল। এর পরে সন্দেহের নজর গেলো কাজের লোকদের উপর। রহমত আলী ভয়ে বার,বার মাহাদের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের সকলের ঘর বাড়ি তল্লাশি করেও পেলো না কিছু। সাহেল রেগে সকল কে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলো। পাপিয়া আরেক দফায় ব্যথা সহ্য করলো। এ ব্যথা শরীরের নয় মনের। জিহান উপস্থিত থাকলেও সবটা সহ্য করলো। মাহাদ কেবল সবটা সূক্ষ নজরে দেখে গেলো।হেসে গেলো অগোচরে। সাঈদ ওর হাসি দেখে ভ্রু উঁচু করে তাকালো। শুধালো,

“ হাসছিস কেন?”

মাহাদের হাসি চওড়া হলো। সামনের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,

“ রঙ্গমঞ্চ দেখছি তাই।”

“ মানে?”

“ একটু পর বুঝতে পারবি।”

সাঈদ তার এই ভনিতা কথার অর্থ বুঝতে পারলো না। মাহাদের দৃষ্টি রহমত আলীর পানে। তিনি ভয়ে ভয়ে বার,বার ওর দিকে তাকাচ্ছেন। সাঈদের একটু সন্দেহ হলো।

“ রহমত আলী তোর দিকে বার,বার তাকাচ্ছে কেন?”

“ কারণ কাল রাতে আমি উনাকে মাতবর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি মধ্য প্রহরে তাই।”

সাঈদ বিস্মিত কন্ঠে বলল,

“তাহলে উনি নেয়নি তো?”

মাহাদ উত্তর দেয় না। নুরুল আলম কে ডাক দেয়। তিনি আসলেই বলে,

“ আমি জানি বোধ-হয় গহনা আর টাকা কোথায় আছে। ”

সকলে অবাক হলো। সকালের কড়াক দৃষ্টি মাহাদের উপর। কেউ আবার অধিক বিস্মিত! নরুল আলম জিজ্ঞেস করলো,

“ কোথায় আছে? কে নিয়েছে বলো? তার শাস্তি হবে কঠিন।”

আঙ্গিনার শেষ প্রান্তে অবস্থান করা কাঁঠাল গাছের কাছে গেলো মাহাদ। সঙ্গে নুরুল আলম সহ সকলে আসলো। মাহাদ গাছের নিচে আলগা হয়ে থাকা মাটির দিকে দেখিয়ে বলল,

“এখানে খুঁড়ে দেখেন। হয়তো পেয়ে যাবেন কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো।”

নুরুল আলম রহমত আলী কে আদেশ দিলো খুঁড়তে। আলগা মাটি হওয়াতে খুন্তি দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মাটি সরিয়ে ফেললো। আশ্চর্যজনক ভাবে কাঙ্ক্ষিত গহনা,টাকা সব পাওয়া গেলো। একটা মাটির হাঁড়িতে ভরে সবগুলো পুঁতে রাখা ছিলো। মাহাদের কথা সত্যি হলো। সকলের প্রশ্ন এখন, ‘কে এই কাজ করলো? উত্তর জানতে সকলে মাহাদের দিকে তাকালো। তার চোখে মুখে রহস্যময় হাসি। সকলের টানটান দৃষ্টি। মাহাদের দিকে ছোঁড়া প্রশ্ন একটাই , ‘কে এই চোর?”

চলবে………..?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here