#বোকামন
#পর্ব_০৩
#Tahsin_Atoshi
সকলে মিলে অমিত অনিলে বাসায় বসে গল্প করছে। বিকেলের সময়টা বন্ধুদের আড্ডাখানা বলতে অমিত অনিলের বাসায়। তবুও মাঝে মাঝে যাওয়া হয় আহানের বাসায়। তাদের গল্পের টপিক মূলত হুমায়রা। তুলি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-হ্যারে তুহিন তুই এই মেয়েটা চিনিস কীভাবে? এটাই কি সেই মেয়ে যাকে পছন্দ করিস?
তুহিন একটু মাথা চুলকে হাসে। এরপর বলে,
-নাহ হুমু ওর ফ্রেন্ড।
-তা ফ্রেন্ডকে পটিয়ে সেটিং করাতে চাও নাকি মামা?
তুলির কথায় তুহিন এবার শব্দ করেই হাসে। এরপর বলে,
-আরে না। হুমুর সাথে পরিচিতিটা ভালো। গ্রামে অনেকবার সাহায্য করেছে। জানিসই গ্রামের ব্যাপারে আমি কাঁচা। এডজাস্ট করতে পারছিলাম না। পরে হুমু সাহায্য করেছে।
-ফ্যামিলির কেউ নাকি?
– সেরকমই বলতে পারিস। হুমু মূলত আমার খালার দেবরের মেয়ে। সেই হিসেবেই পরিচয়।
এরই মাঝে অর্নি বলে ওঠে,
-ওরে মামা! আমি দিদি নাম্বার ওয়ান খেলতে আসিনি। দূরে সর। এতো লতাপাতার আত্মীয়তা বুঝি না।
আহান বলল,
-তুই লাইফে মানুষকে বিরক্ত করা আর খাওয়া ছাড়া কি বুঝিস বল তো।
-তুই কি আমাকে ইনসাল্ট করলি দোস্ত? করলেও আমি গায়ে মাখি না।
এরই মাঝে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই সবাই বিস্ময়কর স্বরে বলল,
-তুমি এখানে?
হুমায়রা তাদের কথা পাওা দিলো না। চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। নীলা বেগম মাএই সবার জন্য নাস্তা তৈরী করেছে। হুমায়রাকে দেখে একটু উচ্চস্বরে বলল,
-মহারাণী উঠেছেন। তা খাবার যে খেতে হবে জানেন? সকালেও না খেয়ে বেরিয়েছিস। শরীরে কি রোগ বাজাতে চাস তুই?
-উফ মামনী খেতে ইচ্ছে করেনি তাই খাইনি। এখন খায়িয়ে দেও তো।
এরই মাঝে অমিত পেছন থেকে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
– মা ওকে একদম লাই দিবে না তুমি। আর খায়নি যে আমাকে বলোনি কেন? পিঠে দুটো পরলে না এমনিই সময় মতো খাবে।
হুমায়রা এবার রাগ দেখিয়ে টেবিলে থাকা চাকুটা অমিতকে দেখিয়ে ইশারা বুঝালো মেরে ফেলবে।
আর বাকিরা এখনো বোকার মতো তাকিয়ে আছে। তাদের কি বলা উচিত বা করা উচিত জানে না৷ সবার মাঝ থেকে কৌতুহল নিয়ে তুলি বলে উঠলো,
-অমিত! হুমায়রা তোমার বোন?
অমিত হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। অর্নি কৌতুহল নিয়ে বলল,
-তাহলে ভার্সিটিতে বলোনি কেন?
এরই মাঝে শুভ বলল,
-শর্ত দিয়ে বসে আছে না। বলবে কীভাবে?
-কিসের শর্ত?
আহান বলতে যাবে তার আগেই হুমায়রা তাদের সামনে এসে হাজির। কোনো কথা না বলে অনিলের ফোনটা নিয়ে ঘরের দিকে হাটা ধরলো। তা দেখে অনিল বলল,
-ফোন নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
-আব্বুকে কল দিবো।
-আব্বুকে দিবি নাকি অন্যকাউকে? এখানে বসে কথা বলে ফোন রেখে যা।
হুমায়রা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। তবুও একটা শ্বাস নিয়ে সেখানে বসেই কল করলো। দুইবার রিং হতেই রিসিভ হলো। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-আব্বু কেমন আছো? ওখানের কি খবর?
-ও পালিয়ে গেছে মা।
-মানে? কীভাবে আর কোথায় গেছে?
-জানি না বিয়ের রাতে পালিয়েছে। কেউ কোনো খোঁজ পায়নি।
-কিন্তু কোথায় গেলো ও! আমাকে আগে বললে ওকে আমার সাথে নিয়ে আসতাম। দূর ভাল্লাগে না।
-হুমম। আমাকেও কিছু বলেনি৷
-ওই দামড়া খাটাস বরটার কি খবর? ওকে খু*ন করতে পারলে শান্তি লাগতো।
-আছে কোনোরকম। তেমন একটা রাগ দেখলাম না। মনে মনে দোয়া কর যেখানেই যাক সুস্থ থাকে যেন।
-হুম। আচ্ছা রাখো।
বলেই কল কেটে উপরের দিকে হাঁটা দিলো। এরই মাঝে অনিল থামিয়ে বলল,
-কে কোথায় গেছে আর কার বর?
-আমার পারসোনাল ব্যাপার তুমি জেনে কি করবে?
-এহ আসছে পিচ্চি। ওনারও পারসোনাল ব্যাপার থাকে। বল কার কথা বলছিলি?
-তোমার বউয়ের হ্যাপি।
-আমার বউ? সে তো আমার পাশেই আছে।
-তো তাকে নিয়েই ভাবো।
বলেই রাগ দেখিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে রইলো হুমায়রা। কি করবে কীভাবে যোগাযোগ করবে তাই বুঝতে পারছে না। তুহিন কৌতুহল নিয়ে বলল,
-বল এখন। কেন বলিসনি ও যে তোদের বোন।
আহান এবার হেসে গতদিনের সকল ঘটনা খুলে বলল। অর্নি বোকার মতো তাকিয়ে বলল,
-সিরিয়াসলি অনিল? এটা কেমন কথা?
-আরে ওর ন্যাকামি ভালো লাগে না।
-তাই বলে বোনের পরিচয় দিবা না তুমি। কোনো সমস্যা হলে তোমার কাছে আসবে না তো কার কাছে আসবে?
-আচ্ছা হয়েছে।
-ওর কাছে চলো।
-কি দরকার?
-গল্প করবো সবাই মিলে চলো। না হলে ওকে ডেকে নিয়ে আসো।
অর্নির কথামতো অনিল এবার হুমায়রা ডাকলো। কিন্তু সে কড়া কন্ঠে বলে দিয়েছে আসবে না। তা দেখে সবাই মিলেই ওর ঘরের সামনে হামলা করেছে। আর থাকতে না পেরে হুমায়রা দরজা খুলে দিয়ে ঘরে গিয়ে বসে। অর্নি ঢুকতে ঢুকতে বলে,
-তা মিস ভার্সিটিতে সুন্দর মুখে মুখে তর্ক করছিলে। এখন এতো চুপ কেন হুম?
হুমায়রা এক নজর সবাইকে দেখে ঘর থেকে বের হবে এর আগেই অমিত রাস্তা আটকে দাড়ায়। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
– কি হয়েছে তোর?
হুমায়রা মাথা নাড়িয়ে না বললেও অমিত সেই কথা পাওা দেয় না। আবারো প্রশ্ন করে,
-কি হয়েছে বল।
হুমায়রা এবার ঠোঁট উল্টে কান্না করে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
-হাতে ব্যথা করছে অনেক।
এরই মাঝে পাশ থেকে শুভ চলে আসে। বলে,
-এর জন্য কান্না করতে হয় নাকি বোকা! পেইন কিলার খাননি গতকাল রাতে?
হুমায়রা মাথা নাড়িয়ে না বলে। অনিল ড্রয়ার থেকে ঔষধ ও পানি এনে হুমায়রার সামনে ধরে বলে খেয়ে নিতে। তাতেই হলো। জোর পূর্বক হেসে বলে,
-ব্য্ ব্যথা নেই। শেষ হয়ে গেছে। ঔষধ আর খেতে হবে না।
হুমায়রার কান্ডে সকলে একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকায়। মাএই কান্না করছিল হাতে ব্যথা তাই। এখনই ঠিক হয়ে গেল। এরই মাঝে অনিল অমিতকে বলে,
-ওকে ধর তো অমিত। ঔষধ না খাওয়ার বাহানা আমার সাথে চলবে না।
হুমায়রা এবার মামনি বলে চিৎকার করে দৌড় দেয়ার জন্য উদ্যোত হলে অমিত হাত ধরে ফেলে। আর পাশ থেকে অনিল মুখটা চেপে ধরে ঔষধ মুখে পুরে দেয়। কোনো উপায় না পেয়ে ঔষধ খেতেই হয় হুমায়রার। মনটা খারাপ হয়ে আছে তার। একা থাকবে সেই উপায়ও নেই। মন খারাপ করে বারান্দায় গিয়ে বসে রইলো। ভেতর থেকে শুভ একটু উচ্চস্বরে বলে,
-এই যে মিস আমরা আপনার ঘরে আপনার সাথে গল্প করতে এসেছি। আপনি ওখানে গিয়ে কেন বসে আছেন?
হুমায়রাও বারান্দা থেকে একটু জোরেই বলল,
-আপনাদের সাথে গল্প করার মুড নেই আমার। আর শর্ত কি ভুলে গেছেন নাকি?
-আরে সেটা তো ভার্সিটিতে বাসায় না।
অনিলের কথায় হুমায়রা এবার বারান্দা থেকে হালকা উঁকি দিয়ে ভেতরে দেখলো। সবাই ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোরের মতো হাসি দিয়ে এবার ভেতরে ঢুকে বলল,
-আমার সাথে আপনাদের কি গল্প থাকতে পারে? আমরা কি একে অপরকে চিনি নাকি?
এরই মাঝে তুহিন বলল,
-হুমু তুই আমাকে চিনিস না?
-তোমাকে,অমিত,অনিল ভাইয়াকে চিনি। আর বাকিদের নাম জানি। আর নাম জানলেই কি চেনা হয় নাকি?
শুভ একটু হেসে বলল,
-চেনার জন্য কথা বলার প্রয়োজন। তাই না?
-হুম। কিন্তু….
-কি?
-আমার এই মুহূর্তে গল্প করার মুড নেই ঘুম পাচ্ছে। আপনারা আমার রুম থেকে বের হন।
-এটা কেমন কথা সবাই গল্প করতে আসলাম। আর আপনি বের করে দিচ্ছেন!
-আমি আপনাদের থেকে ছোট তো তুমি করে বলতে পারেন। আপনি আপনি এসব আমার সাথে যায় না।
-ওকে তুমি করেই না হয় বললাম। এখন আসো গল্প করি। মাএই তো ঘুম থেকে উঠলে।
হুমায়রাও কথা না বাড়িয়ে বসলো ওদের আছে। কিন্তু ঔষধ খাওয়ার কারণে চোখের ঘুম আর যাচ্ছে না। শুভ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-আচ্ছা আপনি..আই মিন তুমি তো গ্রাম থাকতে তাই না? তাহলে শহরে এডজাস্ট করলে কীভাবে? না মানে আজ ভার্সিটিতে দেখলাম ভালোই সবকিছু জানো তাই আরকি।
-কেন গ্রামে থাকলে কি শহুরে কালচারের ব্যাপারে জানা যায় না, শেখা যায় না?
-জানি না। কখনো যাইনি তো।
-ঘুরে আসবেন। তুহিন ভাইয়া তো গিয়েছিল। ওনার সাথে ঘুরে আসবেন।
-আচ্ছা আপনার বাসায় যাবো না হয়?
-হুম যেতে পারেন।
এভাবেই চলতে থাকে সবার কথোপকথন। আড্ডা দেয়ার মাঝেই হুমায়রা ঘুমিয়ে যাওয়ায় সবাই চুপ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সকলেই স্থান ত্যাগ করে।
হুমায়রার সন্ধ্যার ঘুম ভাঙে রাত বারোটায়। এখন সে একা একা বসে বসে ঝিমাচ্ছে। এছাড়া কাজই বা কি। না চাইতেও গ্রামের সেই মুহূর্তগুলো মনে পড়ছে। যখন গ্রামের ছেলে-মেয়েরা সকলে মিলে খেলাধুলা করে, কোনো বন্দী দশা নেই না কারো থেকে দূরত্ব। ঠোটে চলে আসে মিষ্টি এক হাসি। দৌড়ে ছাদে চলে যায়। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ, তারা দেখতে থাকে। নিজের সময় কাটানোর জন্য আকাশের তারা গুনতে থাকে। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করতেই দ্রুত পেছনে তাকায়। মানুষটাকে দেখে বুকে হাত দিয়ে জোরে শ্বাস ছাড়ে।
-অনিল ভাইয়া তুমি! ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ঘুমাওনি?
-নাহ ঘুম আসছিল না। তোকে দেখলাম ছাদে আসতে তাই এলাম। এত রাতে ছাদে কি করিস?
-ঘুম ভাঙার পর আর ঘুম আসছিল না। তাই এলাম। কেন কেন?
-তোর যা চেহারা তোকে দেখে তো ছাদে থাকা জ্বীনরাও পালিয়ে যাবে।
-হুম তোমার সমস্যা? এখন ঝগড়া করার মুড নেই। যাও তো।
অনিল কোনো কথা ছাড়াই হুমায়রার হাত ধরে সামনে থাকা চেয়ারে বসালো। হুমায়রাও বোকার মতো তাকিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকার পর অনিল বলল,
-রেগে আছিস আমার উপর?
-রাগ করবো কেন?
-ভার্সিটির জন্য এত শর্ত দিয়েছি তাই।
-না।
-এখানে মানিয়ে নিতে পেরেছিস তো?
-একটু আধটু।
-রোদকে কীভাবে চিনিস?
-আমাদের গ্রামেই ওদের বাগানবাড়ি আছে। সেখানে গিয়েছিল সেই থেকেই। একদম অসভ্য।
-আচ্ছা ওর থেকে দূরে থাকবি। রাতের খাবার তো খাসনি। যা এখন খেয়ে ঘুমা আবার। কাল ভার্সিটি আছে না।
হুমায়রাও আর কথা না বলে চুপচাপ নিচে চলে এলো। একা একা বিরবির করে বলে,
“ অনিল ভাইয়া কি পাগল নাকি না। নিজেই বকে আবার নিজেই আদর করে। ভাই-বোনের ভালোবাসা কি এমনই? আমার নিজের কোনো ভাই নেই কেন?”
#চলবে…

