এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_১০

0
2

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_১০
#আনিকা_আফসা

আজ কাউকে না বলেই ভার্সিটির জন্য এসেছি। ক্লাসে স্যার লেকচার দিচ্ছেন। আমি গালে হাত দিয়ে সেটা শুনছি, বিরক্ত লাগছে। কেন লাগছে তা জানি না তবে আজ সবকিছুতেই বিরক্ত লাগছে। আজ আর রুদ্রের সামনে পড়িনি। আজ সবার চোখের আড়ালে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। খেয়েও আসিনি। আমার আবার প্রেশার লো , খেয়ে না আসলে তো আরো নেমে যায় এবং বাইরের খাবারও আমি খাবো না সকাল সকাল। তাই এখন ভালো লাগছে না। আমি ভাবলাম ভালো যেহেতু লাগছে না তাই চলে যাবো। আমার পাশে তৃষা ও সানভি বসা এবং পিছনে অয়ন ও রিয়াদ। আমাকে বই খাতা গুছিয়ে নিতে দেখে তৃষা বলল,

“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“বাসায়”

তৃষা অবাক হয়ে বলল,”এখন?”

“হুম”

অয়ন বলল,”কেন? এখন বাসায় যাওয়ার কি দরকার?”

আমি বললাম,”আছে কিছু দরকার। তোরা থাক আমি যাই, তৃষা আমাকে একটু বাকি নোটগুলো দিয়ে দিস”

তৃষা মাথা নাড়লো। অয়ন বলল,

“চল , আমিও যাচ্ছি তোর সাথে। ”

আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,”কেন?”

“তোকে এগিয়ে দিতে যাবো”

ততক্ষনে আমার ব্যাগ গোছানো শেষ, আমি বললাম,”দরকার নেই অয়ন, তোকে সবসময় আমাকে এগিয়ে দিতে হবে না”

বলে হালকা হেঁসে চলে এলাম পিছনের দরজা দিয়ে। ভার্সিটিতে এখনও অনেক ছেলেমেয়ে হাঁটাহাঁটি করছে, আড্ডা দিচ্ছে। আমি ওদের পেরিয়ে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার উদ্দেশ্য হলো এখন একটা রিকশা নিবো। নয়তো গাড়ি ডাকলে ওটা আসতে আসতে আমি নিজেই বুড়ি হয়ে যাবো। তাই ভাবলাম রিকশা নিবো, কিন্তু পথে তো একটাও রিকশা দেখছি না। তাই আমি হাঁটতে লাগলাম। ভাবলাম এইবার হেঁটে হেঁটেই চলে যাবো , যদি রিকশা পাই তখন আলাদা কথা। কথানুযায়ী হাঁটতে লাগলাম। রাস্তাটা ভিষণ নির্জন, দুপুরের কড়া রোদে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলেছি। সামনে একটা টঙের দোকান পড়লো। আমি ওড়না দিয়ে নিজেকে হালকা প্যাঁচিয়ে নিলাম। এইদিকটায় বাজে ছেলেদের আড্ডা চলে। তাদের সাথে আছে নয়া এমপির ছেলে নিহাল খান নিজেও। তাই তাদের কেও কিছু বলতে পারে না। এদিকে একটা কলেজও আছে। কলেজের সামনে সবসময় বসে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাই এদের প্রধান কাজ।

আমি টঙের দোকানের সামনে দিয়ে যেতে নিতেই সিটি বাজানোর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার বড্ড ঘৃণা লাগলো। পা চালিয়ে আরো জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম তাই। টঙের দোকান পেরিয়ে এলাম। আমি রাস্তা দিয়ে নিজের মতো হাঁটছি ঠিক তখনই নিহাল খানের লোকেরা আমাকে গোল করে ঘিরে ধরলো। আমি আঁতকে উঠলাম, আমার পিছু নিচ্ছিল এতোক্ষণ? আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম, এখানে আরো ফাঁকা। সবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবার মুখের বিশ্রী হাঁসি। আমার সোজাসুজি দাঁড়ানো নিহাল । আমি ধমকে উঠে বললাম,

“সমস্যা কি? এভাবে অসভ্যদের মতো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে কেন আছেন? ছা-ছাড়ুন, পথ ছাড়ুন”

নিহাল আমার আগাগোড়া বড় বাজে দৃষ্টিতে পরখ করলো। তা দেখে ঘৃণায় গা রি রি করে উঠলো। নিহাল বলল,

“নিহাল খানের নজর যেই মা/লের উপর পড়ে তাকে তো ছাড়া যায় না ডার্লিং। ”

আমি তেজি স্বরে বললাম,”এসব কোন ধরনের কথা? আমার পথ ছাড়ুন, নইলে কিন্তু চিৎকার করবো”

নিহাল কানে আঙ্গুল ঢলে দায়সারাভাবে বলল,

“চিৎকার করো, দেখি কে আসে আমায় আটকাতে। আজ তো তুমি আমাদের মনোরঞ্জন করবে। উফ্ সরি, তুমি কিছুই করবে না করবো তো আমরা”

এই বলে হাসতে লাগলো। ওর সাথে ওর বাকি চামচারাও হাসতে লাগলো গলা ফাটিয়ে। আমি মুখ কুঁচকে নিলাম । মাথায় আসছে না এদের থেকে পালাবো কি করে? নিজের জীবন, সম্মান বাঁচাতে হলে এখান থেকে পালানো জরুরি। আমি সামনে থাকা নিহালকে হাত দিয়ে বুকের মধ্যে এক জোরে ধাক্কা দিলাম। সে সরে যেতেই আমি এক দৌড় দিলাম। ওরাও আমার পিছু নিলু। আমি পিছনে তাকিয়ে আবার সামনে তাকিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। যেভাবে আমার পিছনে দৌড়াচ্ছে সহজে পিছু ছাড়বে মনে হয়না । কিন্তু নিজের সম্মান এখন নিজেকেই বাঁচাতে হবে। কেন যে ভার্সিটি থেকে বের হলাম? তারউপর কিছু খেয়েও আসিনি, শরীর দুর্বল লাগছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে অন্য রাস্তায় এসে পড়েছি। এদিকটায় একটা নয়া বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে। সামনে রড , বালি , ইট সব রাখা। আমি আবার পিছনে তাকালাম, এখনো তারা আমার পিছু করছে। এদিকে শ্বাসকষ্ট উঠেছে, বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারবো বলে মনে হয় না। সামনে তাকাতেই হঠাৎ একটা গাড়ি চলে এলো। আমি জলদি দাঁড়িয়ে পড়লাম। গাড়িও সঠিক সময়ে ব্রেক কষলো। হঠাৎ থেমে যাওয়ায় তাল ঠিক রাখতে আমি বনেটের উপর হাত রাখলাম। ততক্ষনে নিহাল ও তার লোকেরা আমার কাছে চলে এসেছে। আমার কাছে আসতেই দুজন লোক আমার হাত ধরে পিছনে নিয়ে গেল। আমি সাদা গাড়িটিকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

“হেল্প!!প্লিজ বাঁচান আমাকে”

নিহাল সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে বলল,”তুই চিল্লিয়ে গলা ফাটিয়ে দিলেও লাভ নেই। নিহালের সাথে কেউ পাঙা নিবে না জেনেশুনে, তাইনা? অনেক দৌড় করিয়েছিস, এবার চুপচাপ আমাদের সাথে চল”

নিহাল এই বলে আমার ওড়না টেনে নিলো। আমি চোখ খিচে বন্ধ করে নিলাম। তাও জামার গলা ছোট হওয়ায় ভালো হয়েছে। আমি দুই হাত মোচড়াচ্ছি। তখনই নিহালের কথা ভুল প্রমাণ করে গাড়ির ভেতরের লোকটি বেরিয়ে এলো। আমি দেখলাম এটা আর কেউ নয় রুদ্র। আমি থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। গরমে আমার অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। তারউপর এসব ঝামেলা যেকোনো সময় মাথা ঘুরে না পড়ে যাই। নিহাল পিছন ফিরে রুদ্রকে পরখ করলো। তখনই রুদ্র বলে উঠল,

“এসব কি ভাই? তোমাদের এসব আমার গাড়ির সামনেই করতে হলো? আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছিলাম, আমার মুডটাই খারাপ করে দিলে। আমার গাড়ির তলায় পড়লে দোষ তো আমার হতো , তাই না? যাও সরো তো, সরো”

রুদ্র এই বলে আবারো গাড়িতে উঠতে নিলো। আমি অবাক হলাম। আমাকে এদের থেকে না বাঁচিয়ে এদের আরো উস্কে দিচ্ছে। কাল এই লোকটা আমাকে বলেছিল আমাকে ভালোবাসে? ভাবতেও খারাপ লাগছে, মনটা আবারো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। চোখ নামিয়ে মাটিতে রাখলাম আমি, আমার আর কিছুই বলার নেই। ওদের থেকে নিজের সম্মান কিভাবে রক্ষা করবো সেটা ভাবতে হবে। এমন রাক্ষসের মতো হাত চেপে ধরেছে, কিভাবে ছাড়াবো? আমি শুকনো ঢোক গিললাম। তখনই রুদ্র আবারো বলল,

“কি হলো পথ ছাড়ছো না কেন?”

নিহাল তখন বলল,

“নিহালকে পথ ছাড়তে বলিস? কে রে তুই? আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো, মেয়েটার সাথেও এখানেই যা করার করবো। তুই কি করবি? নিহাল কারো জন্য পথ ছাড়ে না , নিহালের এক কথায় সবাই পথ ছেড়ে দাঁড়ায় ”

রুদ্র এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,”ওহ্, তাই?”

নিহাল বললো,”ইয়েস, এখন ঝামেলা না করে যা এখান থেকে। আমি কাজ করছি বিরক্ত করিস না”

নিহাল পিছু ঘুরে এবার আমার দিকে বিশ্রীভাবে তাকালো। আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার কোমড়ের দিকে হাত বাড়ালো। আমি চোখ খিচে বন্ধ করলাম। আল্লাহ এবারের মতো বাঁচিয়ে দেও। এই দোয়া করছি। হঠাৎ খুব জোরে নিহালের চিৎকার শোনা গেল। চোখ খুলতেই দেখলাম সামনে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে, নিহালের হাত মুচড়ে ধরে যে হাত আমার দিকে বাড়িয়েছিলো। আমি চমকে উঠলাম। রুদ্র নিহালের হাত মুচড়ে ঘুরিয়ে ফেলে দিলো। নিহাল রুদ্রের গাড়ির বনেটের উপর পড়ে গেল। নিহাল ওর নিজের হাত ধরে চিৎকার করে উঠলো। নিহাল ওর চামচাদের বলল,
“আমার মুখ কি দেখছিস? আমার হাত মুচড়ে দিয়েছে ,শালাকে মার। ”

ওরাও নিহালের কথামতো রুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল। একজন রূদ্রের উপর হাত উঠাতে নিলেই রুদ্র তার হাত ধরে অন্য হাত দিয়ে পেটে ঘুষি মারলো । রুদ্রের হাতের রগ ফুটে উঠেছে। আমার যে হাত ধরেছিল তাদের একজন আমাকে ছেড়ে রুদ্রের উপর হামলা করতে নিলো । পকেট থেকে এক চাকু বের করে রুদ্রকে মারতেই যাবে রুদ্র খপ করে ঐ লোকের হাত ধরে নিলো । হাতে হালকা চাপ দিতেই চাকুটা পড়ে গেল। রুদ্রের মুখ অসম্ভব কঠোর। সে ঐ লোকটার ঘাড় চেপে ধরলো। তারপর লোকটাকে টেনেহিঁচড়ে একটা দেয়ালের সাথে নিয়ে এসে ওর ঘাড় ধরে দেয়ালের সাথে ঐ লোকের মাথা একেরপর এক বাড়ি দিতে লাগলো। অন্য লোকেরা ধরেও আটকাতে পারছে না। রুদ্র ঐ লোকের ঘাড় চেপে বাড়ি দিতে দিতে মাথা ফাটালো। শেষে লোকটা জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। আমি মুখে হাত চেপে ধরলাম। লোকটা পাগলের মতো মারছে একেকটাকে। রুদ্র ঐ লোকটাকে মেরে বাকিদের দিকে তাকালো। তারা সবাই ভয় পাচ্ছে। নিহাল পিছনে দাঁড়িয়ে, ওদের এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,

“দাঁড়িয়ে আছিস কেন আহাম্মকের দল? মার ওকে!”

ওদের মধ্যে একজন এগিয়ে এলো। রুদ্র ঘাড় ঢলল এক হাত দিয়ে। লোকটা এগিয়ে আসতেই চরম এক লাথি বসালো লোকটির পেটে। লোকটি ছিটকে পড়ে গেল। রূদ্র এবার ঐ নয়া বিল্ডিংয়ের সামনে ইটের স্তূপ থেকে দুইহাতে দুইটা ইট নিলো। তারপর সেগুলো ভালোকরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। রুদ্রের পিঠের জন্য রুদ্রের পিছনে দাঁড়ানো লোকটা সেটা দেখতে পেল না। রুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতেই রুদ্র পিছু ফিরে দুইটা ইট দিয়ে একসাথে লোকটার মাথার দুইপাশে বাড়ি দিলো । লোকটার কান ফেটে মুহূর্তেই রক্তের স্রোত নেমে গেল। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। রুদ্র হিংস্র হয়ে উঠেছে। আর লোক বাকি ছিল দুইটা , আমার যে হাত ধরে রেখেছিল সেও যোগ দিয়েছে। আমি একাই দাঁড়িয়ে আছি। রুদ্র একটা ছোট রড হাতে তুলে নিলো। সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিলো। রডটা ছোট হওয়ায় বেতের আকার ধারণ করেছে। রুদ্র রড ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো বাকি দু’জনের দিকে। লোকদুটো এক পা এক পা করে পিছিয়ে গেল। রুদ্র হঠাৎ তেড়ে এসে রড দিয়ে বাড়ি মারলো একটি লোকের মুখে। লোকটা ছিটকে পড়লো পিচঢালা রাস্তায়। রুদ্র আরেকটা লোককেও এভাবে রাস্তায় ফেলে দুজনকে একসাথে রড দিয়ে বাড়ি দিতে লাগলো। রডের বাড়ি খেয়ে দুজনের অবস্থাই বেহাল।

রূদ্র থামলো হঠাৎ। রডটা জোরে আছাড় মারলো ঐ লোকগুলোর পাশে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সব লোক পড়ে আছে। কারো মাথা ফাটা তো কারো হাতে পায়ে কাঁটা ছেঁড়া। রুদ্র এবার তীক্ষ্ণ চোখে নিহালের দিকে তাকালো। নিহাল শুকনো ঢোক গিলল। রুদ্র ঘাড় ডানে-বায়ে মোড়ালো, শব্দ করে ফুটে উঠলো ঘাড়ের নাজুক হাড়। তারপর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিহালকে বলল,

“লাইটার আছে?”

নিহাল তো পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। রুদ্রের প্রশ্নে তুতলিয়ে বলল,

“হ-হ্যা?”

রুদ্র আবারো শান্তভাবে এগিয়ে এলো। বলল শান্ত স্বরে ,

“লাইটার আছে?”

নিহাল তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে লাইটার বের করে দিলো রুদ্রের দিকে বাড়িয়ে। রুদ্রের ঠোঁটে এখনও সিগারেট চাপা দিয়ে ধরা। রুদ্র লাইটার নিয়ে নিহালের গালে হালকা চাপড় দিয়ে হেসে বলল,

“এইতো গুড”

নিহাল তখন তড়িঘড়ি বলল,

“ভাই ! আমি আর জীবনে এমন করবো না। আপনি যান, আপনার পথ আর জীবনও আটকাবো না। আপনি আজ থেকে আমার বস। আমি আর জীবনও আপনার সাথে এমন ব্যবহার করবো না।”

রুদ্র সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে হাসলো। আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম। রুদ্র সিগারেট জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ ধোঁয়া নিহালের মুখে মেরে বলল,

“তোর কি মনে হয়? সামান্য পথ আটকানোর জন্য এতো কষ্ট করে এতো গুলোর উইকেট ডাউন করলাম?”

নিহাল অবাক হয়ে বলল,”তাহলে বস?”

রুদ্র আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। রুদ্র আমার দিকে আঙুল তুলে বলল,

“ওকে দেখছিস? ওর দিকে কেউ ভালো নজরে তাকালেও আমি বরদাস্ত করিনা আর তুই কু/ত্তা ওর দিকে কুনজরে তাকিয়েছিস? ওর ওড়না তোর হাতে?”

এই বলে আমার ওড়না এক আঙ্গুল দিয়ে উঁচিয়ে দেখালো। নিহাল আমার ওড়না ছেড়ে দিলো সহসা, নিজের সাফাই গাইতে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রুদ্র নিহালের হাতে টান বসালো আর বিলম্ব না করে সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ চেপে ধরলো নিহালের হাতের তালুতে। নিহাল এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমি আঁতকে উঠলাম এমন দৃশ্যে। রুদ্র শান্ত চোখে নিহালকে পরখ করলো। নিহালের কষ্ট বাড়াতে আরো জোরে চেপে ধরলো নিহালের হাতে সিগারেটটি । নিহাল বারবার ছাড়ার অনুরোধ করলো, ক্ষমাও চাইলো কিন্তু রুদ্র শুনলো না কিছু। যখন নিজের সাধ মিটলো তখন সিগারেটটা ফেলে দিলো। নিহাল ব্যাথায় ছটফট করছে। রুদ্র নিহালের কলার চেপে ধরে বলল,
“তোর সাহস হয় কি করে? এই হাত দিয়ে ধরতে চেয়েছিলি ওকে? ছুঁতে চেয়েছিলি? আমি এই হাতের এমন অবস্থা করবো যে আর কাউকেই না ছুঁতে পারিস”

এই বলে নিহালকে টেনে রাস্তায় ফেললো। ইটের স্তূপ থেকে আরো একটা ইট নিয়ে নিহালের কাছে এসে পায়ের উপর ভর রেখে বসলো। নিহালের হাত রাস্তায় চেপে ধরে বলল,

“তোর হাতের জন্য শুভকামনা”

এই বলে ইট দিয়ে একেরপর এক বাড়ি মারতে লাগলো নিহালের ঐ একই হাতে। বাড়ি দিতে দিতে থেঁতলে ফেললো হাত। আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, আটকালাম না। এইসব সমাজের কীটদের এমনই হওয়া উচিত। ভীষণ খারাপ লাগছে, মাথাটা টলমল করছে। তবুও মনের ভেতর কোথাও একটা ভালো লাগছে, এই জেনে রুদ্রের এসব পাগলামি আমার জন্য। আমি শুধু শুধু ভুল বুঝলাম।

রুদ্র নিহালের হাত সম্পূর্ণ থেঁতলে দিলো। হাত ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। ইটটা কিছুটা ভেঙ্গে গেছে আর তার সাথে নিহালের হাতের হাড়ও হয়তো। রুদ্র এবার নিহালের মাথায় বাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ ইট ভেঙে ফেললো। নিহাল মুখ থুবড়ে পড়লো রাস্তায়। কপালের পাশে ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।
রুদ্র ওকে আবার কলার ধরে টানতে টানতে দাঁড় করালো। তারপর তাকে ছুঁড়ে মারলো উত্তপ্ত বালির উপর। নিহালের লোকগুলো ব্যাথায় কাতারাচ্ছে এবং দেখছে নিজেদের সর্দারের পরিণতি।

কড়া রোদ পড়েছে তাই বালিও অসম্ভব রকমের গরম। নিহালকে সেখানে ফেলে পা দিয়ে নিহালের মুখ বালির সাথে চেপে ধরলো রুদ্র। নিহাল চিৎকার করতে লাগলো গরমে। বালি আগুন গরম হয়ে আছে। আশেপাশে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়েছে। সবাইকেই নিহাল জ্বালায় , তাই রুদ্রকে কেউ কিছু বললো না। অনেকে দেখে চলে গেল আবার অনেকে রুদ্রকে উৎসাহ দিলো। আমার পাশে দাঁড়িয়েছে তখন ১৫ কিংবা ১৬ বছর বয়সী একটা কিশোরী। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“লোকটা কি তোমার সাথেও অসভ্যতামো করেছে আপু?”

আমি একবার ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লাম। মেয়েটিকে দেখলাম স্কুল ড্রেস পড়ে আছে । মেয়েটা আবারো বলল,

“ভাইয়াটা লোকটাকে ইচ্ছেমতো ধোলাই দিয়েছে আপু। লোকটার নিশ্চয়ই জন্মের শিক্ষা হয়েছে। আর কাউকে জ্বালাবে না নিশ্চয়ই। আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারবো”

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,”তোমাকেও জ্বালায়?”

মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল,”হ্যাঁ জ্বালায় তো। আমাদের স্কুলের সবাইকে জ্বালায়। ভালো হয়েছে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকলে শান্তি হবে।”

আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম,”নাম কি?”

মেয়েটি বললো,”তানজান ইসলাম অনু”

আমি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,”সুন্দর নাম”

অনু উৎসুক নজরে তাকিয়ে বলল,”তোমার নাম কি? আর ভাইয়ার নাম কি?”

আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম রুদ্র একদম নিহালকে বালির সাথে চেপে ধরে আছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম,

“আমি আনিকা আর তার নাম রুদ্র। রুদ্র আফতাব চৌধুরী”

অনু মাথা নেড়ে বলল,”ওহ্ আচ্ছা, তাহলে আমি যাই। ভাইয়াকে কিন্তু তোমার সাথে অনেক মানিয়েছে আপু”

এই বলে মেয়েটি চলে গেল। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। রুদ্র হঠাৎ আমার দিকে তাকালো। আমার দিকে তাকাতেই নিহালের মুখের উপর থেকে পা সরালো। নিহালের হাল খারাপ, গালের চামড়া পুড়ে গেছে । হাত মনে হয় ভেঙে গেছে। রুদ্র আমার কাছে আসার সময় নিচে পড়ে থাকা ওড়না তুলে নিলো। তারপর সেটা আমার কাছে এসে ভালো করে ঝেড়ে আমার গায়ে পেঁচিয়ে দিলো। আমি শুধুই তাকিয়ে রইলাম। আমার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনে কোনোদিন পড়িনি তাই হয়তো এমন লাগছে। জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি। রুদ্র আমার গালে হাত রাখলেন এবং বললেন,

“তুই ভেবেছিলি তোকে ছেড়ে আমি সত্যি সত্যি চলে যাবো?”

আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ চোখে জলেরা হানা দিলো। আমি ভাবতে লাগলাম রুদ্র আজ না এলে আমার সাথে সত্যিই খারাপ কিছু হতো । কারণ কেউ আমাকে বাঁচাতে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনতো না নিশ্চয়ই। ফলে, পরবর্তীতে নিহাল ও তার দলবল আমার সাথে কি করতো তা ভাবতেই কান্নারা বাঁধ ভেঙে এলো। আমি আকষ্মিক সামনে থাকা রুদ্রের গলা জড়িয়ে ধরেই হু হু করে কেঁদে উঠলাম। রুদ্র অবাক হলো, থমকালো তার দৃষ্টি। হঠাৎ নিজের বুকের কম্পন টের পেলো। আমি মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছি। দিক দশা হারিয়ে রুদ্রের বুকে মুখ গুঁজেই কেঁদে চলেছি। রুদ্র এক হাত দিয়ে আমার কোমড় চেপে ধরে আরেক হাত আমার চুলে বুলিয়ে দিলো। আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিলো আমাকে নিজের সাথে। চোখ বন্ধ করে আমার কাঁধে নাক ডুবালো। এভাবেই জড়িয়ে রাখলাম দুজন একে অপরকে। আশেপাশের মানুষের খেয়াল কারোর নেই। নিহালের চামচারা যেগুলো কম আঘাত পেয়েছে তারা নিহালকে ও যাদের রুদ্র মাথা ফাটিয়েছে তাদের ধরে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে। রুদ্র হঠাৎ খেয়াল করলো আমি ধীরে ধীরে নিজের ভর ছেড়ে দিচ্ছি। রূদ্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার মাথাটা রুদ্রের বুক থেকে হেলে পড়ে গেল। রুদ্র দেখলো আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি। রুদ্র আমাকে চেপে ধরলো নিজের সাথে। তারপর পাঁজা কোলে তুলে গাড়ির দরজা খুলে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিলো এবং সিটবেল্ট লাগিয়ে দিলো। গাড়ির দরজা বন্ধ করে নিজে ড্রাইভিং বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো এবং আমার এক হাত চেপে ধরে গাড়ি চালাতে শুরু করলো।

#চলবে

আমাদের কুহেলিকায় জয়েন হয়ে জমিয়ে তুলুন আড্ডা।
গ্রুপ লিংক:-

https://www.facebook.com/share/g/18RPuWXLZB/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here