#বোকামন
#পর্ব_৪১
#Tahsin_Atoshi
একে একে সবাই এসেছে মিষ্টির সাথে দেখা করতে। বিয়ে করা নতুন বর কনেরাও বাদ যায়নি৷ তা দেখে খুশিই হয় মিষ্টি। কিন্তু না চাইতেও অবাধ্য মন খুঁজে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। সে কি একবারও দেখতে আসেনি? হুট করে হলুদের দিনের কথা মনে পরতেই আবার মনে মনে নিজেই নিজেকে বকে। কোন মুখে সে তুহিনকে খুঁজছে? তুহিন তো তাকে ভালোবাসে না। আর সবার সামনে অপমান করেছে। তাহলে কেন খুঁজবে সে। ভাবনার মাঝেই দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে চোখ থেকে। এরই মাঝে ডাক্তারও এসে হাজির হয়। মিষ্টির চোখে পানি দেখে ওমনি বলে ওঠে,,,
-এই যে মামনি নিজের শরীরের প্রতি মায়া দয়া নেই? গত দুই বছরে কতবার হাসপাতালে এসেছো তোমার কি মনে আছে?
সবাই চুপ থাকে। ডাক্তার এবার রেহেনা বেগমকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
-আপা আপনি একটা কাজ করুন হাসপাতালেই ওর জন্য একটা রুম বুক করে নিন। পারমানেন্ট থেকে যাক। কষ্ট করে বারবার আসতে হবে না।
ডাক্তারের কথায় এবার হাসে সবাই। একটা চেয়ার টেনে পাশে বসে মিষ্টির। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,,,,
– কতবার বলেছি এভাবে নিজেকে কষ্ট দিবে না। সবার সাথে মিশবে, কথা বলবে মনও ভালো থাকবে। তুমি যানো তোমার এতটা অসুস্থ হওয়ার জন্য বড় কোনো রোগও হতে পারে।
-মরে গেলেই তো হলো।
-মরে গেলে তো হলোই। আমার ঝামেলা শেষ হবে। কিন্তু আল্লাহ তো তোমাকে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন৷ তো জীবনটা নিয়ে সেভাবেই বাঁচো। মরে তো যাবে না৷ এভাবে হাসপাতালের বেডে সুয়ে থাকতে হবে।
কথাটুকু শেষ করেই তিনি চেক আপ করলেন মিষ্টিকে। দেখার পর বললেন,
-এখন ঠিক আছো। ঔষধগুলো কন্টিনিউ করবে। নেক্সট যদি আবার এখানে দেখি..! সত্যি বলছি আমি নিজ দায়িত্বে তোমাকে পাবনায় ভর্তি করে দিয়ে আসবো। পাগল নও তুমি। তবে যা করছো তা পাগলের থেকে কমও নয়।
উঠে দাড়ান এবার। এক নজর উপস্থিত সকলকে দেখে নেয়। এরই মাঝে হুমায়রা বলে,
-ডাক্তার সাহেব আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন৷ এরপর আর আপনার মিষ্টি আপুর মুখ দর্শন করতে হবে না। বিয়ে করে শশুড় বাড়ি গেলে ওর বরই ওকে সুস্থ করে দিবে।
হাসেন ডাক্তার। মিষ্টিকে এক নজর দেখে বলে,
-যাহ্ বাবা তোমাকে তো আমি আমার ভাগ্নের বউ করবো ভেবেছিলাম। সে যাই হোক। দোয়া করি সুখে থাকো।
এরপর হুমায়রার দিকে তাকিয়ে বলে,
-ওর বরের দিকেও নজর রেখো তোমরা। কে বলতে পারে এই মেয়েকে সুস্থ করতে গিয়ে সে নিজেই না পাগল হয়ে যায়।
ডাক্তারের কথায় আরেকদফা হাসির রোল পরে সবার মাঝে।
কেটে যায় প্রায় চারদিন। আজ মিষ্টির গায়ে হলুদ। দুদিন বাদে মিষ্টির বিয়ে। ঘরের সকলেই এই নিয়ে ব্যস্ত। হুমায়রা ও স্মৃতি প্রায় দেখা করতে আসে মিষ্টির সাথে। কিন্তু মিষ্টির মন পরে আছে অন্য কোথাও। না চাইতেও মনটা তুহিনকে দেখতে চায়। বিয়ের আগে একবার কি লোকটার চেহারা দেখতে পারবে না। মন চাইছে হুমায়রাকে বলতে৷ কিন্তু সেটাও পারবে না। সে তো তার দূর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না।
আবারো গম্ভীর হয়ে বসে। এর মাঝে ছেলের বাড়ি থেকে বিয়ের শাড়ি, গহনা সবই পাঠানো হয়েছে। তার জানা মতে সব বিয়ের আগেরদিন দেয়া হয়৷ কিন্তু তারা দুদিন আগে দিলো দেখে অবাক হলো। যার সাথে বিয়ে ঠিক তার সাথেও তেমন কথা হয়নি। মন খারাপ করেই বসে থাকে। ঘরের মধ্যেই ছোট্ট করে আয়োজন হয় হলুদের জন্য। শুধুমাত্র মেয়েরা মেয়েরা আনন্দ করবে। বড়রা সকলেই হলুদ ছুয়িয়ে স্থান ত্যাগ করে। এদিকে হুমায়রা,স্মৃতি, অর্নি,তুলি, বৃষ্টি ও খুশি মিষ্টির চারপাশ ঘিরে বসে আছে। গান বাজনা করতে দেয়া হবে না দেখে তারা নিজেরা নিজেরাই ঘরে ভেতর বসে গল্প করছে। কিন্তু মিষ্টির মাঝে নেই কোনো প্রাণোচ্ছলতা। তা দেখে খুশি বলে,
-মন মরা হয়ে আছিস কেন শুনি? তুই তো নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করছিস। তাহলে? খুশি হ। নাচ।
এবার হালকা হাসে মিষ্টি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। মনে মনে এইটুকু বিরবির করে,,,,,,
“কেউ কি আমাকে বুঝবে না? কেন বুঝতে চাইছে না কেউ যে আমি তুহিনকে কতটা ভালোবাসি? সবার সামনে অপমান করলেও ওই মানুষটাকেই তো ভালোবেসেছি। কীভাবে তাকে রেখে অন্যকারোদিকে মন দিবো? আদেও সম্ভব? ”
এইটুকু ভেবে আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে নিজেই বুঝ দেয়,,,,
“বুঝেও বা কি হবে? যাকে ভালোবাসি সেই তো ভালোবাসে না। তাহলে অন্যরা বুঝে কি করবে? এই বোকামনটা কেন বুঝতে চাইছে না? দু’দিন পর আরেকজনের বউ হবো। অথচ মনে অন্যকারো বসবাস। মনে একজন আর জীবনসঙ্গী আরেকজন হলে সুখী হবো তো আমি?”
কান্না পায় তার। উঠে বারান্দায় চলে আসে। কেউ পিছু যায় না। যাবে কেন? তারা তো বুঝিয়েছে৷ কিন্তু সে বুঝতে নারাজ। আকাশের পানেই তাকিয়ে রয়। উপরওয়ালার কাছে আবারো সেই আর্জি জানায়,,,,
“আল্লাহ কেন এমনটা হয় আমার সাথে? কেন কাউকে ভালোবাসলে তাকেই হারিয়ে ফেলতে হয়? কিসের এতো পরীক্ষা নিচ্ছো তুমি আমার। আর কত পরীক্ষা নিবে। আমি যে আর পারছি না। কষ্ট হচ্ছে আমার। এর থেকে যে মৃত্যু শ্রেয়..!”
___
অমিত,অনিল,তুহিন,আহান ও শুভ পাঁচজনই ছাদের কর্ণারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। আজ সকলে তুহিনদের বাসায় হাজির হয়েছে। অনেকদিন পর বন্ধুরা সকলে একসাথে হয়েছে। পাঁচ জনের হাতেই জলছে একটা করে সিগারেট। কিন্তু তাদের মনে কোনো ভয় নেই। কারণ তাদের বউয়েরা তাদের আশেপাশে নেই। পাঁচজনই দূর আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। জোছনা রাত চাঁদের আলোয় চারিপাশটা আলোকিত হয়ে আছে। আর একটু পরপর তাদের সিগারেটের ধোঁয়া এইটুকুই। নিস্তব্ধতা বেশিক্ষণ টিকলো না৷ নিস্তব্ধতা ভেঙে অনিল বলল,
-ভাই আগে ভাবতাম বিয়ে করা অনেক শান্তির। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি বিয়ে করা কতটা কষ্ট। কেন যে বিয়ে করলাম। তুহিন তুই কখনো বিয়ে করিসনা দোস্ত। সিঙ্গেল থাকাও ভালো।
হাসে সকলে। অমিত বলে,
-কেন অর্নির হাতে ঝাটার বারি খেলি নাকি?
-আরে বিয়ের দিন মজার ছলে একটু রাক্ষসী কি বলেছি সেটা নিয়েই পরে আছে।
-বেশ হয়েছে।
এরই মাঝে শুভ বলে,
-বিয়ে করা অতোটাও খারাপ না। কিন্তু একটাই আফসোস বিয়ে করেছি কত মাস হলো কিন্তু এখনো উপোসই থেকে গেলাম।
সবাই এবার অবাক হয়ে তাকায়। তুহিন বলে,
-কেন রে আমার বোনটা কি তোকে কাছে যেতে দেয়না?
-আর বলিস না ভাই প্রথম প্রথম বিয়ে করেছি…তখন নিজ থেকে যাইনি। ভাবলাম পরিস্থিতি ঠিক হোক ও সবটা মেনে নিলে তারপর না হয় যাবো। কিন্তু এরপর ঘটলো ওই সাঈমার কাহিনী…! এখন কিছু হলেই সবার আগে আসে সাঈমার নাম। ভাই বউয়ের হাতে মা’র খেলেও হয়তো এতোটা কষ্ট লাগতো না যতটা না সাঈমার নাম শুনলে কষ্ট লাগে। আর তো আর এখন বলছে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে। কিসের স্পেশাল ডে আছে৷ কিন্তু কিসের ডে তাই বুঝতে পারছি না৷
শুভর কথা শুনে সবার কৌতুহল হয় স্মৃতিকে নিয়ে। অমিত কৌতুহল নিয়ে বলে,
-আহান তোর কি অবস্থা? ঠিকঠাক?
-আমার অবস্থাও শুভর মতো। এতদিন পরীক্ষার দোহাই দিয়েছে। এখন তোদের বিয়ের দোহাই আর কি…?
হাসে অমিত। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তাহলে আমি আর তুহিন আপাতত সুখী মানুষ। আমি বউকে নিয়ে সুখী আর তুহিন সিঙ্গেল থেকে।
আবারো নিস্তব্ধতা কাটে সবার মাঝে। ভেতর থেকে বের হয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। হুট করে আহান জিজ্ঞেস করে,
-তুহিন তুই যাকে ভালোবাসতি ওই মেয়েটার নাম কি ছিল রে?
আহানের এমন প্রশ্নে সবাই বিস্মিত হয়ে তাকায়। শুভ কৌতূহল নিয়েই জিজ্ঞেস করে,
-তুই জানিস না?
– নাহ্। মায়রার ফ্রেন্ড সেইটুকু জানি। নামটা তো বলেনি কখনো। আর বললেও মনে নেই আমার।
শুভ বলতে যাবে তার আগেই তুহিন বলে,
-এখন জেনে কি লাভ? সে এখন অন্যের বউ। তবে যার বউ সেও হাসবেন্ড হিসেবে খারাপ নয়৷ সুখীই আছে। তা দেখেই খুশি।
কেউ আর কথা বাড়ায় না। অনিল বলে,
-তুহিন তুই মিষ্টিকে ভালোবাসিস তো?
চাঁদের পানে তাকায় তুহিন। মিষ্টির নামটা শুনে চোখটা একটু চকচক করে ওঠে। কিন্তু এর কারণ অজানা তার কাছে৷ আকাশের দিকে তাকিয়েই বলে,
-জানি না ভালোবাসি কিনা। শুধু এইটুকু জানি মেয়েটার বেপরোয়া স্বভাবটা ভালো লাগে। মায়া হয় ওর জন্য। সুখে থাকুক মেয়েটা।
শুভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-মানুষ যাকে চায় তাকে পায়না। আর যাকে পায় তাকে সে গ্রহণ করতে চায়না৷ কথাটা যে বলেছে খারাপ বলেনি তাইনা।
এরই মাঝে আহান বলে,
-ভালোবাসা কিছুর বাধা মানে না। তা হুট করেই হয়। আর ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পাওয়া? সেটা ব্যর্থতা কেবল। যে সহজে পায় সে মর্ম বোঝে না। আর যে পায়না তার আফসোস কমে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিল। চাঁদের আশেপাশে মেঘ জমেছে অনেক। সেদিক তাকিয়ে বলে,
-বোকামনটা আবেগী খুব। আবেগী না হলে হয়তো এই দুনিয়ায় হৃদয়ভাঙা মানুষ থাকতো না৷ এই দুনিয়ায় হৃদয় ভাঙা মানুষ আছে বলেই তো এতো যুদ্ধ। সহজে পেয়ে গেলে কে বুঝতো এর মর্ম।
হাসে অমিত। সেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-উপরওয়ালা এর জন্যই হয়তো বিয়ের আগে ভালোবাসাকে হারাম করে দিয়েছেন। যে ভাগ্যে নেই তাকে ভালোবেসে হৃদয় ভাঙবে সেটা কি তিনি চান? বান্দা যে তার খুবই প্রিয়।
সবার কথা শুনে তুহিনও হাসে। সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-বিয়ে করে বউয়ের পিটুনিতে তোরা দেখি হৃদয়ভাঙা কবি হয়ে যাচ্ছিস। এত দুঃখ নিয়ে থাকিস কীভাবে?
হাসে সকলে। অমিত বলে,
-কিসের দুঃখ। আমার ভালোবাসার মানুষ আমার কাছেই আছে। আমার সহধর্মিণী হয়ে আছে । আমি অনেক খুশি এতে।
আহানও বলে…
-হুম খারাপ বলিসনি। স্মৃতির সাথে সুখে আছি বেশ। মেয়েটা বুদ্ধিমতী৷ ওর আর হুমায়রার মাঝে কিছুটা তফাত আছে। একজন হাসি-খুশি আর আরেকজন চুপচাপ। একজন অল্পতেই নিজের আবেগ ব্যক্ত করে ফেলে। আর আরেকজনের পেট থেকে চাইলেও কথা বের করা যায় না। তবুও ওরা বেস্টফ্রেন্ড।
-হুমম। উপরওয়ালা বুঝেই বন্ধুত্ব করিয়ে দেয়।
বলেই সবার দিকে তাকায় তুহিন। আবার বলে,
– আজ আমাদের
ব্যাচলর পার্টির দিন শেষ…
বউয়ের হুকুমে চলবো বেশ।
না শুনলে তাদের কথা
হবে শুধু কথার খোঁচা…!
তুহিনের কবিতা শুনে সকলেই হেসে ওঠে। আহান বলে,
-তো আজ শেষবারের মতো ড্রিংক করা যাক কি বলিস?
ওমনি অমিত দূরে সরে দাড়ায়। বলে,
-সিগারেট খেয়েছি এটা জানলেই অর্ধেক জীবন শেষ হবে৷ আবার ড্রিংস উফ নো নেভার।
হাসে আহান। সেও উঠে বলে,
-তো কি মনে হয় আমাকে আস্ত রাখবে শুভর বোন। বাব্বাহ যে রাগ…!
ওমনি শুভ উঠে দাড়ায়৷ ভ্রুঁ কুঁচকে রাগ দেখিয়ে বলে,
-এই যে বোনকে নিয়ে কোনো কথা না হুম। আমার বোন বেস্ট।
হাসে অনিল। তুহিনের কাঁধে হাত রেখে বলে,
-এদের ভাই-বোনের বন্ডিং দেখলে হিংসে হয় খুব। এদিকে আমার বোনটা। এক নাম্বারের…
কথা শেষ করা আগেই কাঁধ সরিয়ে নেয় তুহিন। আঙুল তুলে অনিলের দিকে থ্রেড দিয়ে বলে,
-আমার বোনকে নিয়ে নো বাজে কথা। আমার বোন বেস্ট বোন।
-হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো হবেই৷ তোমার উপকার করেছে না। বেস্টই হবে।
ওমনি শুভ অনিলকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,
-কি বলতে চাইছিস আমার বউ তোদের সাহায্য করেনি? বিয়ের সময় যখন বউয়ের সাথে কথা বলার জন্য ছটফট করছিলে আমার বউই তোমাদের কথা বলিয়ে দিয়েছে।
সবার ঝগড়া দেখে এবার অমিত ভরকায়। দুই হাত জোর করে বলে,
-যথা আজ্ঞা আমার ভাইয়েরা। আপনাদের বউ,বোন সবই ভালো। এখন ওদের টপিক বাদ দিয়ে নিজেরা আড্ডা দিন। আজ ব্যাচলর পার্টির জন্য এসেছি৷ সেখানেও বউ আসলে কীভাবে হবে..?
সবাই সহমত পেশন করে এবার। আবার ঢুবে যায় নিজেদের অন্যান্য কথায়। তাদের প্রথম বন্ধুত্ব, এর পরের মুহূর্ত এসবেই। কাল থেকে শুরু হবে আবার অন্য জীবন। নিজেদের পরিবার,ব্যস্ততা সব মিলিয়ে একাকার।
#চলবে…..!

