এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_২৬

0
1

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২৬
#আনিকা_আফসা

সারা বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। হলুদ রঙের ফেইরি লাইটে সারা বাড়ি উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে মেকআপ আর্টিস্টরা সাজানো শুরু করে দিয়েছে। আয়নার সামনে জড়বস্তুর মতো বসে আছি। একটা জড়বস্তুর যেমন কোনো অনুভূতি নেই, তেমনই নিজেকে মনে হচ্ছে, পুরোপুরি অনুভূতি শূন্য। আমার কাজিনরা, সানভি ও ছোট্ট কেয়াও উপস্থিত আছে। তৃষা ও আনিশা আপু নেই। শোনা গেছে তৃষা আসবে না আর আনিশা আপু নাকি মেসেজে বলেছে তার একটু কাজ আছে আর পার্লারে যাবে। তৈরি হয়ে বিয়ের সময় একেবারে আসবে। এতে অবশ্য কেউ অবাক হয়নি, কারণ মাঝেমাঝে আপু এমন করে থাকেই। আর কেয়া মায়ের থেকে নানুর কাছে থাকতে বেশি পছন্দ করে। নানুকে পেলে দুনিয়া ভুলে যায়। আম্মু আপাতত আমার এখানেই দিয়ে গেছে তাকে। পাশ থেকে সবাই কত মজা করছে , আমাকে দুষ্টুমি করে কত কথা বলছে কিন্তু আমি চুপচাপ বসে আছি। সানভি হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি তাও চুপচাপ বসে রইলাম, কোনো সাড়া দিলাম না। সানভি আমার দিকে অসহায় চোখে তাকালো, সে তো জানে আমার মনে কি চলছে । এটাও জানতো আমি রুদ্রকে কতটা ভালোবাসি। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মন থেকে সানভীর। আমার দিকে তাকাতে ওর কষ্ট হচ্ছে।

মেরুন রঙের লেহেঙ্গাতে অপূর্ব লাগছে। ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে কৃত্রিম সাজগোজের ব্যাপারটা। আয়নায় নজর বন্দি করে রেখেছি । দেখছি নিজেকে। আজ এই সাজ, এই ক্ষন সব রুদ্র আর আমার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্য এটা কোথায় নিয়ে এসে দাঁড় করালো আমায়? রুদ্র আমার সাথে এসব করতে পারলো? ভাবতেই চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। কেয়া তা দেখে আধো আধো কন্ঠে বলল,

“মাম্মু, তুমি কাঁদছো?”

আমি দ্রুত টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে বললাম,”নাহ্, চোখে হয়তো পড়েছে কিছু। তোমার মা কখন আসব? ফোন করেছে?”

কেয়া বলল,”আমিতো জানিনা। ”

আমি আর কিছু বললাম না। হঠাৎ আয়নার দিকে নজর যেতেই আয়নার প্রতিবিম্বে নজরে এলো নিকি আপুকে। আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং পিছন ফিরে তাকালাম। সত্যিই নিকি আপু এসেছে। নিকি আপু এগিয়ে আসলেন আমার দিকে এবং বললেন,

“বিয়ে করছিস আনি?”

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিকি আপু এগিয়ে এসে আমার বাহু চেপে ধরলেন এবং বললেন,

“কি হলো? উত্তর দে।”

আমি মাথা নাড়লাম। নিকি আপু বললেন,

“তুই নিজের ইচ্ছায় এই বিয়ে করছিস?”

নিকি আপুর প্রশ্নে ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সবাই একবার আমার দিকে, একবার নিকি আপুর দিকে তাকাতে লাগলো। আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম। চোখের কোণে জমে থাকা কষ্টটা লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললাম,
“আমার চাওয়া-না চাওয়ায় কি আসে যায় আপু?”
নিকি আপুর চোখ দুটো হঠাৎ লাল হয়ে উঠলো। তিনি দাঁত চেপে বললেন,
“আসে যায় আনি। অনেক কিছু আসে যায়। তুই যদি না চাইতিস তাহলে কেউ তোকে জোর করে বিয়ে দিতে পারে না।”

আমি তিক্ত হেসে বললাম,
“সবাই পারে আপু। যখন নিজের মানুষরাই বিশ্বাস ভেঙে দেয়, তখন আর কিছুই করার থাকে না।”

আমার কথা শুনে নিকি আপু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন,
“তুই এখনও বিশ্বাস করিস রুদ্র তোকে ঠকিয়েছে?”

আমি চুপ করে রইলাম। নিকি আপু বললেন,

“দেখ আনি , আমি রুদ্রকে চিনি। ও এমন কাজ করবে কি , ও এসব বিষয়ে ভাবতে অব্দি পারে না। তারউপর তোর বাবার সাথে তো কক্ষনো না। ”

আমি চোখ নামিয়ে বললাম,”এখন এসব বলে লাভ নেই আপু, আজ আমার বিয়ে অয়নের সাথে। ”

নিকি আপু বললেন,”তুই বুঝতে চেষ্টা কর,,,

আমি আপুকে থামিয়ে বললাম,”আমি কিছু বুঝতে চাইনা , আমি নিজের চোখে দেখেছি সব। আর কিছু বোঝার নেই আমার।”

নিকি আপু হতাশ চোখে তাকিয়ে বললাম,”তারমানে তুই সবদিক দিয়েই রুদ্রকে দোষী মনে করছিস? কিন্তু মনে রাখিস চোখে দেখা জিনিস অনেক সময় সঠিক নাও হতে পারে।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। নিকি আপুর কথাগুলো কানে গেলেও মন যেন সেগুলো গ্রহণ করতে চাইছিল না। এতদিন ধরে নিজের ভেতর যে বিশ্বাসটা গড়ে তুলেছি, সেটা ভাঙার সাহস আমার নেই।
নিকি আপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আনি, আমি তোকে জোর করছি না। শুধু বলছি, একটা মানুষের বিচার করার আগে তার কথাটাও একবার শোনা উচিত।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
“কথা শোনার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে আপু। এখন আর কিছু বদলাবে না।”
নিকি আপু কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। আমি বললাম,

“আমার বিয়েতে এসেছো , খেয়ে অবশ্যই যেয়ো। এখন তুমি আসতে পারো। আমি আর কিছু শুনতে চাইনা। বিয়েটা আমার মতেই হচ্ছে। অন্তত নিজের বাবার খুনিকে আমি বিয়ে করতে পারবো না। ”

এই বলে আবারো নিজের জায়গায় বসে পড়লাম। নিকি আপু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বের হয়ে গেলেন। পরিবেশটা কেমন থমকে গেছিলো। সানভি পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলল,

“আচ্ছা, সবাই এমন মুখ করে আছো কেন? আজ কিন্তু আমাদের আনির বিয়ে। এমন করে থাকলে হবে?”

কথাটা বলেই ও জোর করে একটা হাসি দিল। কিন্তু সেই হাসি কারও মুখে ছড়ালো না। সবাই বুঝতে পারছিল, এই ঘরের ভেতরে এখন আনন্দের চেয়ে কষ্টটাই বেশি।

হঠাৎ নজর পড়লো জানালায় বসে থাকা লাচ্ছির উপর।হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলাম কিন্তু ও আমাকে অগ্রাহ্য করে জানালা দিয়ে পালালো। ও আমার বড্ড আদরের। আজ পর্যন্ত আমার সঙ্গ ছাড়েনি। কিন্তু হঠাৎ আজ কি হলো? আমার সঙ্গ কি ও ছেড়ে দিলো?

***********

রুদ্র বাইরে এসে যাকে দেখতে পেলো, তাকে দেখে বড্ড অবাক হলো। তার সাথে নিহানও। রুদ্র ধীরে ডাকলো,

“ড্যাড?”

রুদ্রের বাবা মুখ তুলে চাইলেন ছেলের দিকে, মুখে এক চমৎকার হাঁসি। রুদ্র এসে জড়িয়ে ধরলো তার বাবাকে। রুদ্রের বাবা ছেলের পিঠে আলতো ছোঁয়ায় চাপড় দিলেন। রুদ্র তাকে ছেড়ে বলল,

“তুমি এখানে? কিভাবে?”

রুদ্রের বাবা সামনের অফিসারের দিকে একবার চাইলেন এবং আবার রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন,”ছেলের বিপদের সময় বাবা আসবে না ? তা কি হয়?”

রুদ্র বলল,”তুমি জানলে কি করে?”

রুদ্রের বাবা চতুর হাসলেন এবং বললেন,

“তোমার সব বিষয়েই আমার জানা। কিন্তু এবারের খবর জানতে একটু দেরি হয়ে গেলো। তবে আই থিংক এখনো অতটা দেরী হয়নি। বাইরে গাড়ি আছে দ্রুত আনিকার কাছে যাও। আমার থানায় কিছু কাজ আছে, মিটিয়ে আসছি।”

রুদ্র কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। এতদিন পর বাবাকে সামনে দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট, হতাশা আর স্বস্তি একসাথে ভিড় করে এলো।
“ড্যাড, কিন্তু,,,,”
রুদ্রের বাবা তাকে থামিয়ে দিলেন।
“কোনো কিন্তু নয়। এখন প্রতিটা মিনিট মূল্যবান। তুই যদি সত্যিই আনিকাকে ভালোবাসিস, তাহলে আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করবি না।”

নিহান এগিয়ে এসে বলল,
“আঙ্কেল ঠিক বলছেন। আমরা যত দেরি করবো, তত পরিস্থিতি খারাপ হবে।”

রুদ্র মাথা নাড়লো এবং তার বাবাকে বলল,

“থ্যাংকস ড্যাড, ইউ আর এ ম্যাজিশিয়ান।”

এই বলে দৌড়ে চলল বাইরে, তার হাতে যে সময় অল্প। নিহানও দৌড়ালো বন্ধুর পিছুপিছু। রুদ্রর বাবা মাথা নেড়ে হাসলেন। হঠাৎ মনে পড়লো তার মৃত স্ত্রীর কথা। এই ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার স্ত্রী যদি আজ বেঁচে থাকত!!

_______

রুদ্র ও নিহান গাড়িতে বসলো। রুদ্র ড্রাইভিং সিটে আর নিহান পাশে। নিহান সিটে বসে নিকিকে ফোন দিলো। নিকি ফোন রিসিভ করেই বলল,

“আনি আমার কথা শুনছে না। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু ও কোনো কথা শুনতেই চাচ্ছে না।”

নিহান রুদ্রের দিকে তাকালো। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিহান বলল,

“সমস্যা নেই, রুদ্র আসছে। দেখি কি হয়! এই বিয়ে কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না।”

নিকি উচ্ছসিত মুখে বলল,”সত্যি!! রুদ্রর জামিন হয়ে গেছে? ”

নিহান বলল,”হুম, তুই একটা কাজ কর।”

“হুম, বল।”

“আনির রুমটা খালি করার চেষ্টা কর।”

নিকি বলল,”ঠিক আছে, আমি দেখছি।”

এই বলে কল কাটলো নিহান। রুদ্রর মনে ভয় করছে। আনি শুনবে তো তার কথা? নাকি শেষমেষ বিয়ে করবে অয়নকে?

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here