আমার আফতাবের পোলাডা ঐ ছেরির জন্য নষ্ট হইছে।আমার বংশের বাত্তিডা ওর লইগা আইছে না।
পুরাই কালমুখি।আমার সোনার সংসারটা নষ্ট করছে।
ওর কখনো ভালো হইবো না।আগের পিছা যেমনে যায়, পরের পিছাও তেমনে যায়।মা যেমন, তেমনি তো হইবো।ভালো তো আর হইতো না—
একনাগাড়ে চেঁচিয়ে বলছিলেন ঊর্মিলার দাদু।
মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনছিল কায়সার। হঠাৎ তার নজর গেল বাইরে। সেখানে এক নারী অবয়ব দাঁড়িয়ে। বুঝে ফেলল—কে হতে পারে। অজান্তেই ক্লান্ত এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার।
তীক্ষ্ণ স্বরে সে বলল,
আচ্ছা, যা হয়েছে—তাতে ঊর্মিলার ভূমিকা কতটুকু?
এই দায়ভার কি শুধুই ওর?শাসনটা কি আপনারা নিজেদের ছেলেকে করতে পারতেন না?আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে তো সম্পূর্ণ দোষ আপনাদের।
নিজেদের সন্তানের শিক্ষার যেখানে অভাব, সেখানে পরের মেয়েকে দোষ দেবেন কেন?
আর দিনের পর দিন একটা বাচ্চা মেয়েকে আপনি মানষিক যন্ত্রণায় পিসেছেন? ও কি একটু দাদী,বাবা-মায়ের আদর প্রাপ্য ছিলো না?
মেয়ে-জামাইয়ের কথায় আফতাব সাহেব মাথা নিচু করলেন। চোখের অক্ষিপটে ভেসে উঠতে লাগল নিজের করা কিছু জঘন্য কাজ।তার বাবার কাপড়ের ব্যবসা ছিল। সেটাই ছিল তার আয়ের উৎস। ভরা সংসার—স্ত্রী, মেয়ে সাগরিকা, মা-বাবা নিয়ে ভালোই কাটছিল দিন। জায়গা-জমিও মোটামুটি ভালো ছিল। কাজের সূত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো তাকে। ভালো কাপড় সংগ্রহের জন্য গ্রামের পর গ্রাম, ফ্যাক্টরি থেকে ফ্যাক্টরি—কখনো সেখানে কয়েকদিন থেকেও যেত।
হঠাৎ করেই যেন সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে ভর করল। হয়তো সয়তান তখন পুরোপুরি কাবু করেছিল তাকে। একদিন ব্যবসার কাজে নেত্রকোনা যেতে হলো। সেখানেই চোখে পড়ে ঊর্মিলার মা—কনিকা। বয়স বড়জোর আঠারো কি উনিশ। বাবা-মা যেন মেয়েটাকে বিয়ে দিলেই বাঁচে।কুদৃষ্টি পড়ল সেই মেয়েটির ওপর। নানা ছলাকৌশলে তাকে বিয়ে করতেও সক্ষম হলো সে। কাজের অজুহাতে প্রায়ই সেখানেই থাকত। কনিকার মনে হচ্ছিল—সে বুঝি সুখের সাগরে ভাসছে। কিন্তু সে সুখ ছিল ক্ষণস্থায়ী।
হঠাৎ আফতাবের মনে হতে লাগল—সে তার প্রথম স্ত্রীর প্রতি অবিচার করছে। ধীরে ধীরে কনিকার প্রতি আগ্রহ হারাতে লাগল। মাস শেষে কিছু টাকা পাঠিয়েই দায় সেরে ফেলত।
একদিন খবর পেল—কনিকা মা হতে চলেছে। এই খবরটাই যেন তার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠল। কোনোভাবেই সে চাইছিল না ঊর্মিলার এই পৃথিবীতে আসা। শুরু হলো মানসিক অত্যাচার। কিন্তু কনিকা তার সন্তানকে বাঁচাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নিজে মরলেও সে তার মেয়েকে বাঁচাবে।এর মধ্যেই খবর এলো—প্রথম স্ত্রীর সন্তান হবে। এই খবর ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ। সেই সংসার আর সেই সন্তানের সুখে কনিকা একেবারে হারিয়ে গেল। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা গেল—ছেলে হবে। আনন্দে যেন সীমা ছাড়িয়ে গেল তার।
অন্যদিকে কনিকার অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে উঠল। মাস শেষে যে টাকা আসত, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। বাবার বাড়ি থেকেও চাপ আসতে লাগল—বাচ্চাটা নষ্ট করার। কিন্তু তখন আর সময় নেই। কনিকার একটাই কথা—সে নিজে মরবে কিন্তু তার সন্তান মারবে না। গর্ভকালীন অবস্থায় মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনোমতে নিজের আর অনাগত সন্তানের খাওয়ার জোগাড় করত।
তারও তো স্বপ্ন ছিল। তার স্বামী তাকে নিয়ে আনন্দ করবে। ছোট্ট একটা সংসার হবে। কিন্তু বিধির লিখন ছিল ভিন্ন।
গর্ভকাল কাটল সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। একদিন কাজ করতে করতে পা পিছলে পড়ে যায়। মারাত্মক আঘাত পায়। সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। খোদা তাকে নিয়ে নিলেন, কিন্তু তার সন্তানকে এই পৃথিবীতে রেখে দিলেন। নিজে মরে সন্তান বাঁচানোর কথা হয়তো তিনি সিরিয়াস ভাবে নিয়ে নিয়েছিলেন।এর জন্যই তো তিনি তাকে নেওয়ার এই মাধ্যমটাই কাজে লাগিয়েছে।
আফসোস—যে সন্তানের জন্য এত সংগ্রাম, তাকে সে একবারও দেখতে পারল না। আর জানতে পারল না—যার সঙ্গে সে ঝগড়া করবে, মান-অভিমান করবে—সেই মানুষটাই তাকে এত নিষ্ঠুরভাবে ঠকিয়েছে।খোদার কী লীলা!
যাকে মারার পরিকল্পনা করেছিল, তাকেই আবার এত যত্ন করে সৃষ্টি করলেন কেন?কেন কনিকা এমনভাবে ঠকল?কেন সে তার মেয়ের “মা” ডাক শুনতে পেল না?
জীবন কি তাহলে শুধু “কেন”-এর উত্তর খুঁজতেই শেষ হয়ে যায়?
সেদিন প্রথমবার কনিকার মৃত্যুর খবর শুনে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চিনচিনে অনুভূতি হয়েছিল আফতাবের। কিন্তু সে পাত্তা দেয়নি। মেয়ে হয়েছে শুনেও দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
কিন্তু কনিকার মা-বাবা সেই শিশুকে রাখতে রাজি হননি। বহু কষ্টে ঠিকানা জোগাড় করে বাচ্চা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তারা। সেদিন সাগরিকার মা কখনো বাচ্চার দিকে, কখনো আফতাবের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। কোনো কথা না বলে চলে যেতে চেয়েছিলেন।কিন্তু আর যাওয়া হলো না। এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন অধিকার। সেই দুর্ঘটনায় বাচ্চাটিও নষ্ট হয়ে গেল। আর সাগরিকার মা হারালো আজীবনের জন্য মা হওয়ার অধিকার।
এই সব ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আফতাবের বাবা স্ট্রোক করলেন।
একটার পর একটা অঘটন যেন তাকে নাড়া দিয়ে গেল। সেদিন প্রথমবার মনে হলো—এ সবই তার পাপের ফল। কনিকা তো চলে গেল। এ যেন তার দীর্ঘশ্বাসের প্রতিফলন।
আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না। এখন বুঝে কী লাভ?কনিকা কি ফিরে আসবে?তার পায়ে জড়িয়ে কি ক্ষমা পাওয়া যাবে?ঐ ছোট্ট শিশুটি কি কোনোদিন মায়ের আদর পাবে?পাবে না।
আর সেও পাবে না ক্ষমা।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেই যেতে হবে তাকে।
ইশ! যদি ঐ বয়সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারত, তাহলে তো ঐ মেয়েটার কপালও পুড়ত না। তারও একটা সুখের সংসার হতো।
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জল।
মায়ের আহাজারিতে কল্পনা থেকে বেরিয়ে এলো আফতাব। দীর্ঘদিন পর জহুরা বেগম যেন জীবনের এক কালো অধ্যায় স্মরণ করছেন। তার কান্নায় ফুটে উঠছিল সেই অন্ধকার ইতিহাস।
জহুরা বেগমের আহাজারি, কান্না—সবই শুনছিল ঊর্মি। তবু তার চোখ ভিজছিল না। আশ্চর্য এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল তাকে। এই সময়ে তো—চিৎকার করে কাঁদার কথা। বুক ফেটে যাওয়ার কথা। অথচ চোখে একফোঁটা জলও নেই। এটাই কি তবে অতি শোকে পাথর হয়ে যাওয়া?
চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল একের পর এক স্মৃতি। মায়ের বিষণ্ন মুখ। অনাদর ছিল না, তবু আদরও ছিল না। ছোঁয়ায় ছিল না উষ্ণতা, কণ্ঠে ছিল না মমতা। চারপাশের মানুষের ফিসফাস, ইঙ্গিত, আধা-কথা। ছোটবেলায় কিছুই বুঝত না সে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোধ বেড়েছে। অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে।এমনটা না যে সে জানতো না।তবে এতটা নির্মম গল্প যে তার জন্মের পেছনে লুকিয়ে ছিল, তা জানা ছিল না।
কনিকার ভাগ্যটা এমন কেন হলো? কেন আফতাবের নজর পড়েছিল তার ওপর? যদি না পড়ত—তাহলে কি সে একটা স্বাভাবিক জীবন পেত না? তাহলে কি তার মা পেত না একটু শান্তির সংসার? বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে পুড়ে যেতে লাগল। মায়ের গন্ধ কেমন—জানতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল। একবার যদি অনুভব করতে পারত! কিন্তু সে উপায় নেই। তার মা তো এখন ঘুমিয়ে আছে। চিরঘুম। হয়তো ভালোই হয়েছে। বেঁচে থাকলে তার জীবনটা আরও কতটা শোচনীয় হতো—কে জানে।
হঠাৎ কায়সারের কণ্ঠে তার চিন্তার স্রোত থেমে গেল।
—এখানে ঊর্মিলার দোষ কতটুকু?
উত্তরে ভেসে আসলো জহুরার বিতৃষ্ণা ভরা কন্ঠ,
ঐ মাইয়ারই সব দোষ।
ঐ মাইয়া পেটে না আইলে আফতাবরে দিয়া ছাড়াছাড়ি করাইয়া ফেলতাম।
আমার বাড়িতে ওর ঢোকার কোনো উপায়ই রাখতাম না।
জন্মের লগে লগেই মারে খাইয়া বইয়া আছে।
তার লগে আমার স্বামী আর নাতিডারেও খাইছে।”
একটু থেমে গলা ভারী করে জহুরা বেগম বললেন,
আমার স্বামীরে যেইডা কাইরা নিছে—হেইডারে কেমনে আমি স্বামীর সোহাগে সুখে থাকতে দেই?
তার মানে… আপনি সবটা জানতেন?
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি।
হহ, জানতাম।গলায় কোনো অনুশোচনা নেই।
আমি আফতাবরে ঐহানে যাইতে দেই নাই ।
বেডা মানুষ—ঝোঁকের বসে ভুল করছে।ঐডা কি ধইরা রাইখা বইয়া থাহা যায়?বেডা মানুষ ভুল না করলে কেডা করবো?
এই কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ভেসে এলো আফতাব সাহেবের ভাঙা, ব্যথিত
চলবে,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৩
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

