সকাল থেকে ঊর্মির কোনো খোঁজ নেই। কোথায় গিয়েছে? কখন গিয়েছে? কারো কাছেই কোনো উত্তর নেই।
রাতে মিমির সঙ্গে ঘুমাতে গিয়েছিল। এতে কায়সার বিশেষ পাত্তা দেয়নি। সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে পাশে থাকা বা না থাকা নিয়ে ভাবলে কীই বা আসে যায়?
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, মিমি ঘুম থেকে উঠে পাশে ঊর্মিকে পায় না। অভ্যাসবশত সে বাবার ঘরে যায়, কিন্তু সেখানেও নেই। তখনই শুরু হয় কান্নাকাটি। বড়রা সামান্য সঙ্কিত হয়ে পড়ে। সকালে মেইন দরজা খোলা ছিল। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সবার অবস্থা শোচনীয়। সেদিনের ঘটনা নিয়ে সবাই কিছুটা লজ্জিতও।
তবে এত কিছুর মাঝেও তিনজন নিশ্চুপ—কায়সার দেওয়ান, এমদাদ দেওয়ান এবং স্বর্ণা দেওয়ান। এমদাদ ও কায়সার নীরবে সব দেখছে, কিন্তু কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছে না। তারা যেন আগেই সব জানত।
আর স্বর্ণা নিশ্চিন্ত—তার মাথা থেকে যেন এক বিশাল বোঝা নেমে গেছে।
_______________
হয়তো আমি তোমার আপন মা নই। কখনো সেভাবে আদর দিতে পেরেছি কি না, জানি না। তোমাকে বুকে টেনে না নিলেও ফেলে দিইনি। ভালো চাইতে সময় লাগলেও, খারাপ চাইতে পারি না।
আমার একটা কথা কি রাখবে?
ঊর্মি নীরবে সব শুনল। বাইরের শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল—
জানি তুমি কী বলবে। বলবে সংসারটা করতে। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে—সত্যিই কি তুমি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে? বাঁচানোর এ কী নিয়ম, মা?
জন্মের পর মায়ের আদর পাইনি। বাবার আদরও পাইনি। বাবা পাশে ছিল, তবু তার আদর জোটেনি। সাগরিকা আপুর সঙ্গে আমার আকাশ-পাতাল তফাৎ। সে পেয়েছে মায়ের আদর, বাবার আদর, দাদীর আদর।
আর আমি কী পেলাম? আমার দোষটা কী ছিল? আমি কেন পেলাম না?
দিনশেষে শুধু একটা জিনিস মন থেকে চেয়েছিলাম—নিজের একটা সংসার, নিজের একটা মানুষ।
আর তোমরা শাশুড়ি-বউমা মিলে কী সুন্দর পরিকল্পনা করে আমার স্বপ্নগুলো যত্ন করে মেরেছো।
তুমি বলছ আমার ভালো চাও। সত্যিই কি তাই? আদতে তুমি কী চেয়েছিলে জানো? আমার ধ্বংস। আমাকে বাঁচানোর কি আর কোনো উপায় ছিল না? ঐ একটাই ছিল—জেনে-শুনে এক বাচ্চার বাবার সঙ্গে বিয়ে, তার কাছে বিয়ের জন্য অনুরোধ। এসব কি তোমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না?
খানিকটা থামল ঊর্মি। চোখে জল আসছে না। কেন আসবে? সেটা তো অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। আকাশ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে আনল সে। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকায় চোখ যেন আলো নিতে পারছে না। কয়েকবার পলক ঝাপটে আবার বলল—
একটা প্রবাদ আছে না—গাছের গুঁড়ি কেটে ওপর দিয়ে পানি দেওয়া। তুমি ঠিক তেমন। কী সুন্দর করে গোড়া থেকে আমার অনুভূতিগুলো ধ্বংস করে এখন ভালো থাকার উপদেশ দিচ্ছো।
আয়েশা বেগম খানিকটা হকচকালেন। এই মেয়ের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলেন না। আসলেই তো—সে তো কখনো ওর ভালো চায়নি। যে মেয়ের জন্য তার ছেলের মুখ দেখতে পারেনি, মাতৃত্বের স্বাদ হারিয়েছে চিরতরে, তার ভালো চাইবে—এতটা উদার সে নাকি?
তাই পরিকল্পনা ছিল—যা হবে, আটকাবে না। দেওয়ান পরিবার তার পছন্দ হয়েছিল। ঐ মেয়ে যে জাতের, যেখানে বিয়ে দেবে, সেখানেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে। স্মার্ট মেয়েদের সমস্যা এখানেই। যেমনই ছেলে হোক, ছলাকৌশলে নিজের মতো করে ফেলে। কিন্তু এক বাচ্চার বাবার সঙ্গে বিয়ে—সেটা সে কখনোই মানবে না। তাই এই পরিকল্পনা। পরিকল্পনাও কাজে লাগল। সবার কাছে ভালো সাজাও হয়ে গেল।
কিন্তু এই বিচ্ছু মেয়ে সব ধরে ফেলেছে।
ভদ্রতার মুখোশ ছিঁড়ে আয়েশা বেগম নিজের আসল রূপে এলেন। তেজি কণ্ঠে বললেন—
ঠিক ধরেছিস। ছোটই তো ছিলি। কেন যে মারলাম না! বিবেক কেন যে তখন নাড়া দিল! তখনই যদি মেরে ফেলতাম, এত কাহিনি করতে হতো না। আমার ছেলেটাও শান্তি পেত। আমার সাগরিকাটাও বাদ যায়নি। ওকেও শ্বশুরবাড়ি থেকে নানান কথা শুনতে হয়েছে। নেহাত সোহাগ ভালো ছেলে—যেখানে আমার মেয়ের সুখ ক্ষণস্থায়ী, সেখানে তোর সুখ আমি কীভাবে দেখি বল!
ঊর্মি ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। আর কত অবজ্ঞা সহ্য করবে সে? কেন সবাই তাকেই দোষী ভাবে? এখানে তার মা বা তার দোষটা কী?
আয়েশা বেগমের আর কোনো কথা শুনতে ইচ্ছে করল না। ফোন কেটে দিল সে।
সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে ঊর্মি। সেখানে থাকতে তার আর ইচ্ছে করছিল না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তার কাহিনি শুনলে লোকে বলবে—মায়ের ভাগ্য পেয়েছে। কিন্তু সে এই কথা ভুল প্রমাণ করবে। সে কোনোভাবেই ঐ অভাগীর ভাগ্য হবে না।
কণিকা অবুঝ ছিল। মনের জোর ছিল না। তাই দিনের পর দিন ঠকেছে। সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু কী পেয়েছে? নিজের বাচ্চার মুখও দেখতে পারেনি। মরতে হয়েছে এক বুক হতাশা নিয়ে। না প্রিয় মানুষের মুখ, না সন্তানের স্পর্শ।
ঊর্মি ঐ কণিকা হতে চায় না। সে হবে ঊর্মিলা। তার মা যেখানেই থাকুক, দেখবে—তার মেয়ে অভাগী হয়নি। তার সুখ সে মন ভরে দেখবে।
ঘুম থেকে উঠে শ্বশুরের সঙ্গে পরামর্শ করে সে চলে এসেছে। তিনি সব ম্যানেজ করে দিয়েছেন। আরও কয়েকটা দিন সময় দিতে বলেছিলেন, ফ্ল্যাটে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঊর্মি ছিল অনড়। কোনো কথাই শোনেনি। শেষে তিনিও হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
বের হওয়ার সময় শুধু মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন—
যেখানেই যাও, ইজ্জত বাঁচিয়ে চলবে মা। মনে রাখবে, মেয়েদের সবচেয়ে বড় অলংকার তাদের ইজ্জত। তুমি বের হচ্ছ নিজেকে প্রমাণ করতে। আমার দোয়া রইল। তুমি সফল হও। তবে মনে রেখো—তোমার শেষ ঠিকানা এটাই।
ঊর্মি মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। কোনো উত্তর দেয়নি। লাগেজ হাতে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে দেওয়ান বাড়ি থেকে। কেন জানি বুকের ভেতর সূক্ষ্ম একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছিল। আমলে নেয়নি সে।
উপরে যদি একটু তাকাত, তবে দেখতে পেত—কারো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এতক্ষণ তাদের ওপরেই ছিল।
উপর থেকে সব দেখছিল কায়সার।
এ যেন তারই পরিকল্পনার অংশ।
ঊর্মিকে যেতে দেখে তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি।
_________________
আপু, আমাকে কয়েকটা টিউশনি জোগাড় করে দেবেন? আসার সময় শ্বশুর কিছু টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন। ওগুলো হাতে গোনা কয়েক দিনই চলবে। তারপর তো নিজেকেই চলতে হবে।
মনি কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল
শুনো, এখানে কিছু স্টুডেন্ট পাবে। তবে ছোট ক্লাসের। আর বেতনও কম। একেবারে বসে না থেকে ছোট থেকেই শুরু করো। তোমার পড়ানো ভালো লাগলে এমনিতেই সুযোগ আসবে।
ঊর্মি এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। কারো কাছে হাত পাতা তার ধাতে নেই। ছোটবেলা থেকেই এই গুণটা পেয়েছে। অনেক দিনের ইচ্ছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানো, সংগ্রাম করে বাঁচা। এখন যেহেতু সেই পথটা খুলে গেছে, আর পিছু হটবে না সে।
তবুও সবকিছুর পেছনে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—ঐ দেওয়ান বাড়িতে কিছু না কিছু রহস্য অবশ্যই আছে।
সবচেয়ে বেশি গোলমেলে কায়সার। প্রথমে মনে হয়েছিল, মিমি হয়তো তার সন্তান নয়। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভুল। মিমি তারই সন্তান। তাহলে কায়সারের ভেতরের রহস্যটা কী?
স্বর্ণার চরিত্রটাও অস্পষ্ট। মেয়েটার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘাবলা আছে। নাহলে নিজের মেয়েকে মারার জন্য কেউ এতটা মরিয়া হয়?
এতসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলল ঊর্মি। আর ভাবতে ইচ্ছে করল না। মিমির জন্য খারাপ লাগলেও নিজেকে আটকাল।
কথায় তো আছে—নিজে বাঁচলে বাপের নাম।
আমি যতই ভালো চাই, দিনশেষে সবাই আমার দোষটাই দেখবে। এমনও হতে পারে, কিছু না করেও ফেঁসে যাব।
মিমির সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল কায়সার। ঐ ইতরের মাঝেই কেউটের বাস। ওর কাছেই মেয়ে নিরাপদ। তাই আমি না ভাবলেও চলবে।
___________
স্বর্ণা অস্থির হয়ে কিছু একটা খুঁজছে। মুখের ভাব এমন, যেন জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটাই হারিয়ে ফেলেছে। ঘরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত এক নাগাড়ে পায়চারি করছে সে। সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে।
ঠিক তখনই ঘরে প্রবেশ করল—
চলবে,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৫
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরী
(এতো দিন অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত।তবে আপনারা পাশে ছিলেন আশা রেখেছেন এতেই আমি খুশি।আশা করি ভালো মন্দ অবশ্যই কমেন্টে উল্লেখ করবেন)

