বৈরি_হাওয়া #পর্ব_২৫

0
7

হঠাৎ সেখানে কায়সার উপস্থিত হলো। কায়সারকে দেখেও ঊর্মির কোনো ভাবান্তর নেই। কায়সারও তার দিক থেকে নির্বিকার।শুধু শান্ত, স্থির দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
ঊর্মি রেহেনা দেওয়ানকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বাড়িটা হঠাৎ যেন তার কাছে দমবন্ধ লাগে। প্রতিটা মানুষ জঘন্য। সবার ভেতরেই স্বার্থপরতার বাস। নিজের স্বার্থের জন্য এরা মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না।
এই মানুষগুলোর সঙ্গে থাকা—আদৌ কি সম্ভব?
না, কখনোই না।
এখন সে মুক্ত। নিজের জীবনটা নিজের মতো করে গুছাবে । ‍তবে সেটা হবে হিসাব চুকিয়ে, একেবারে শেষ করে।
এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না। ফিরেও তাকাল না। সোজা হেঁটে বেরিয়ে গেল।
কায়সার সবটাই দেখল। কিন্তু সে শান্ত। ধীরভাবে চোখ সরিয়ে চাচির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—আচ্ছা চাচি, সবার দায়ভার কি শুধু আমাকেই নিতে হবে? আমার অন্যায়টা কোথায়? কেউ কেন আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো জানতে চাইল না? তোমার মেয়েও না… এমনকি এই মেয়েটাও না।

একটু থেমে, গলাটা আরও ঠান্ডা করে বলল,

—তবে চাচি, প্রথমবারের মতো আমি আরেকবার ভুল করব না। জোর করে কাউকে আটকে রাখা যায় না। যেখানে বিয়েটাই একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো… সেই মিথ্যা সম্পর্কটাও আর রাখছি না।

কথা শেষ করতে না দিয়েই রেহেনা দেওয়ান তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন,

—কায়সার, সত্যি তুই ডিভোর্স দিবি? বিশ্বাস কর, আমি খুব খুশি এতে। তোর যোগ্য না ওই মেয়েটা। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস ।

রেহেনার কথায় কায়সার হালকা হাসল । একটা ক্লান্ত, তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি।
নিজ গন্তব্যের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

—ঊর্মি ঠিকই বলে… আমরা স্বার্থপর। নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা সব আমাদের রক্তে। তোমার কথা ভুল। আমিই ঊর্মির যোগ্য না… সি ডিজার্ভস বেটার।

কায়সারের কথায় রেহেনার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হলো না। বরং তিনি যেন খানিকটা নিশ্চিন্তই হলেন।

———————-

—আমার পোলাডা স্ট্রোক করছে রে! ও আল্লা, তুমি এইডা কী করলা! আমার পোলারে এই কী শাস্তি দিলা! আল্লাগো, আমার ছেলাডারে রক্ষা করো… একটা খাসি জবাই দিমু!

—উফ দাদি, তোমার বংশের উজ্জ্বল বাত্তি তো দেখি নিভু নিভু করছে। ইয়া খোদা, এ কী দিন দেখতে হচ্ছে! এই দিন দেখার আগে এই কুমাতাকে উঠায়া নিলা না কেন?

ঊর্মির উপহাসে চারপাশ থমথমে হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে আফতাব সাহেব স্ট্রোক করেছেন। ডাক্তার বলেছে, অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণেই হয়েছে। শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে। পুরোপুরি সেরে উঠবেন কিনা, তারও নিশ্চয়তা নেই।
খবরটা শুনেই ঊর্মি ছুটে এসেছে বাবার বাড়ি।
বাড়িতে ঢুকেই দাদির আহাজারি শুনে এই কথাগুলো বলেছে।

ঊর্মির কথা শুনে বুড়ির যেন গায়ে আগুন জ্বলে উঠল। লাফ দিয়ে এগিয়ে এল তার দিকে। হাত তুলতেই সেই হাত মাঝপথে আটকে দিল ঊর্মি।

শক্ত করে চেপে ধরে, বুড়ির চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলল,

—ডোন্ট ডেয়ার, ডার্লিং। দ্বিতীয়বার এই ভুল করলে… হাতটা তোমার সাথে থাকবে কিনা, গ্যারান্টি দিতে পারব না।

ঊর্মির হঠাৎ এই রূপ দেখে চিৎকার শুরু করলেন তিনি,

—ও আফতাবরে! এইডা তুই কী পাইল্লা বড় করলি! বড় হইয়া ঠিকই হাত্তির পাঁচ পাও দেখাইতেছে! আমার হাত ধরছে রে! এক মাগি আরেক মাগিরে জন্ম দিছে! ঐ হতিনের ঘরে হতিন! তুই হইলি বেজন্মা ছেরি! তর মা বিয়া ছাড়া আমার পুতের লগে শুইছে! হেই ঘরেরই তো তুই! ভালো হইবি কেমনে! খানকির জাত…
মার মতোই হইছস! জামাই ছাইড়া বাইর হইছস! বারো বেডার সাথে শুইবি! তোর চিন্তায় আমার পোলাডারে এই অবস্থা! জন্মের পর থেইকাই তুই সবার সর্বনাশ করছস! এখনো আমার সংসার ছাড়স নাই! তোর মুখে ছাই পড়ুক! তুই ধাপরাইয়া ধাপরাইয়া মরবি! যেই মাইয়া বাপরে লইয়া এইডা কয়, তার কপালে শান্তি নাই!

দাদির প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল ঊর্মি।
কিন্তু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না।
মূর্খের সঙ্গে তর্ক করা মানে নিজের সম্মান নষ্ট করা।
বুড়ির দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা বাবার ঘরের দিকে চলে গেল। মাঝপথে দাদি বাধা দিতে এলেও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

বিছানার পাশে হুইলচেয়ার পড়ে আছে।একসময় শক্ত-সমর্থ মানুষটার এই কী অবস্থা!
নিঃশব্দে শুয়ে আছে। চোখ দরজার দিকে—যেন কারও অপেক্ষায়।

ঊর্মি চুপচাপ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বিছানায় হাত রেখে, মাথা নিচু করে বলল,

—এখানে কেন এসেছি, জানি না। শুনলেন তো আপনার মায়ের কথা… আমি নাকি বেজন্মা। আমার জন্মের ঠিক নেই। আপনি নাকি বিয়ে ছাড়াই মায়ের সাথে শুয়েছিলেন।
একটু থামল। গলাটা ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু চোখ শুকনো।

—এই জীবনটাই কি দেওয়ার ছিল? কী দরকার ছিল বউ রেখে বাইরে তাকানোর? তাকিয়েছিলেন যখন, স্বীকৃতি দিলেন না কেন? কেন আমাকে এমন জীবন দিলেন? কেন আমি মা পাইনি? বাবা পাইনি? একটা পরিবার পাইনি?

শেষ পর্যন্ত একটা স্বামীও পাইনি, যার সাথে নিজের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করব। এই দিকটাও আপনারা নষ্ট করেছেন।

এই হাহাকার কি আপনাদের বাঁচতে দেবে?

ধীরে মাথা তুলে তাকাল।

—বিশ্বাস করেন, আপনার জন্য আমার এক ফোঁটা কষ্টও হচ্ছে না। বরং চাই… আপনার আরও ভয়ংকর পরিণতি হোক। তবেই হয়তো কণিকার সাথে ইনসাফ হবে।
আপনাদের শাস্তি খোদার ওপর ছেড়ে দিলাম।
আপনাদের সাথে যতবার দুর্ঘটনা হবে আমি যতবার আসবো। নিজের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ত করবো। আমি উদার মনের না। তাই মায়া দয়া আসবে না। আমি বরং এসে প্রতিবার উপহাস করবো। এবার আসি, পরেরবার দেখা হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

নিজের সাথেই কথা বলে উঠে দাঁড়াল ঊর্মি। বেরিয়ে গেল। একবার ফিরেও তাকায় নি।
পেছনে তাকালে দেখত—তার বাবার চোখে জল।

কিন্তু সেই জল দিয়ে কি পাপ ধোয়া যায়?

———-

—মিস, পাশের বাড়ির ওই উদ্ভট ভাইয়া আপনাকে লাইক করে মনে হয়।

টিউশনে এসে বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল ঊর্মি। কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল।
এইটুকু বাচ্চা এসব কী বলছে!

—আমি দেখেছি, আপনি আসলেই উনি অদ্ভুত অদ্ভুত জামা পরে দাঁড়ায়। আর প্রতিদিন ইনিয়ে-বিনিয়ে আপার কথা জিজ্ঞেস করে।

ঊর্মি কিছু বলার আগেই বাচ্চাটা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বেলকনির পর্দার আড়ালে।চোখ কপালে ওঠার উপক্রম।

পাশের ব্যালকনিতে একগাদা জামাকাপড় ছড়ানো। সাথে বিভিন্ন ময়েশ্চারাইজার, পারফিউম পুরো একটা দোকান বসানো যেন!

আর সেই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সাইজের ছেলে । একটা খুলছে, একটা পরছে, আবার খুলছে!

পারফিউমের গন্ধ এপার পর্যন্ত চলে এসেছে। মনে হচ্ছে কয়েক বোতল শেষ করে ফেলেছে।
ঊর্মি ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকাল।
চোখে প্রশ্ন।
বাচ্চাটা মাথা নেড়ে নিশ্চিত করল—হ্যাঁ, এই লোকটাই।

ঊর্মির এখন অবস্থা—ছেঁড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি!

চলবে…

#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২৫
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

( গল্পকার রিচ কমে গেছে । এর জন্য আমি খুব আশাহত। আশা রাখছি আপনারা আপনাদের মন্তব্য জানাবেন 🌸। ধন্যবাদ 🫶)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here