#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৬
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
শহরের আকাশে তখন ফাল্গুনের হাওয়া, কিন্তু সেন্ট জুড হাই স্কুলের ছাত্রদের মনে কালবৈশাখীর ভয়। এসএসসি পরীক্ষার আর মাত্র হাতে গোনা কয়েক দিন। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেক আগেই, এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। নানামি জায়দান-এর ছোট ঘরটা এখন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। চারদিকে বইয়ের স্তূপ, ম্যাপ, গ্রাফ পেপার আর নীল-কালো কালির ছড়াছড়ি।
জেনিন নুরশাদ এখন পাকাপাকিভাবে নানামিদের বাসায়। তার বাবার সাথে সম্পর্ক এখন শীতল যুদ্ধাবস্থায় থাকলেও নানামির বাবা-মায়ের স্নেহে সে যেন এক নতুন জন্ম পেয়েছে। জেনিন আগে পড়ার টেবিলের নাম শুনলে পালিয়ে বেড়াত, কিন্তু এখন সে নানামির পাশে বসে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঙ্ক কষে যায়। নানামির উপস্থিতি জেনিনের ভেতরে এক অদ্ভুত স্থৈর্য এনে দিয়েছে।
সেদিন রাত তখন প্রায় দুটো। পুরো শহর নিস্তব্ধ। নানামির টেবিলের ওপর একটা ছোট ল্যাম্প জ্বলছে। নানামি মন দিয়ে জীববিজ্ঞানের একটা ডায়াগ্রাম আঁকছে, আর জেনিন তার পাশে বসে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল।
“ধুর! এই সময়েই কারেন্ট যেতে হলো?” জেনিন বিরক্ত হয়ে কলমটা টেবিলের ওপর ছুড়ে মারল।
“শান্ত হ নুরশাদ। তোর এই অধৈর্য স্বভাবটাই তোর শত্রু,” নানামি অন্ধকারেও শান্ত স্বরে বলল। সে অন্ধের মতো হাতড়ে ড্রয়ার থেকে একটা মোমবাতি আর দেশলাই বের করল।
মোমবাতির শিখাটা যখন জ্বলে উঠল, দুই বন্ধুর ছায়া দেয়ালের ওপর বিশাল হয়ে ফুটে উঠল। সেই কাঁপা কাঁপা আলোয় জেনিনের মুখটা অদ্ভুত বিষণ্ণ দেখালো। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, যেখানে শুধু অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
“জায়দান, একটা কথা বলবি?” জেনিন মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। “তোর কি মনে হয় আমি সত্যিই পাশ করতে পারব? আমার মাথাটা তো শুধু গন্ডগোল আর মারামারি দিয়ে ঠাসা। তোর মতো এত বুদ্ধি আমার নেই রে।”
নানামি হাতের পেন্সিলটা রেখে জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “বুদ্ধি সবার থাকে, কিন্তু একাগ্রতা সবার থাকে না। তুই গত এক মাসে যা পড়েছিস, তা অনেকে এক বছরেও পড়ে না। তুই পাশ করার জন্য পড়ছিস না, তুই পড়ছিস তোর নিজের হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য। আর আমি তো আছিই। তুই যদি কোনোদিন ডুবে যাস, আমি কি তোকে টেনে তুলব না?”
জেনিন একটু হাসল। “তুই তো সবসময়ই টানিস। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় আমি অনেক ভারী হয়ে গেছি। আমার এই অতীতের বোঝাটা তুই কতদিন টানবি?”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজাটা ধীরে খুলে গেল। নানামির মা হাতে একটা থালা নিয়ে ঢুকলেন। থালায় গরম গরম লুচি আর সুজির হালুয়া। মোমবাতির আলোয় মায়ের মুখটা যেন এক দেবীর মতো দেখাচ্ছিল।
“ওমা! তোরা এখনো জেগে? কারেন্ট নেই, গরমে কষ্ট হচ্ছে তো তোদের। এই নে, একটু খেয়ে নে। পেট খালি থাকলে পড়াশোনা হয় না,” মা আদরে জেনিনের মাথায় হাত রাখলেন।
জেনিন মায়ের হাতটা ধরে ফেলল। “মা, আপনি এই মাঝরাতে আমাদের জন্য কষ্ট করলেন কেন? আমরা তো এমনিতেই শুয়ে পড়তাম।”
“কষ্ট কিসের রে পাগল? তোরা কষ্ট করছিস পরীক্ষা দিবি বলে, আর আমি এইটুকু পারব না? জেনিন বাবা, তুই একদম চিন্তা করিস না। আমার মন বলছে তোরা দুজনই খুব ভালো করবি। নানামি তো ভালো করবেই, কিন্তু তোর রেজাল্ট দেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে,” নানামির মা জেনিনের গালে একটা টোকা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
লুচি আর হালুয়ার সেই স্বর্গীয় স্বাদ মুখে দিয়ে জেনিনের চোখে জল চলে এল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা কী শক্তিশালী হতে পারে। যে জেনিনকে তার নিজের বাবা ‘অপদার্থ’ বলতেন, সেই জেনিন আজ এক ভিনজাতের মায়ের কাছে ‘সোনা মানিক’।
খাওয়ার পর দুই বন্ধু আবার বই নিয়ে বসল। মোমবাতিটা তখন অর্ধেকের বেশি শেষ হয়ে গেছে। নানামি জেনিনকে ফিজিক্স এর সূত্রগুলো মনে রাখার একটা সহজ কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছিল। জেনিন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
পরের কয়েকটা দিন তারা যেন এক আত্মায় পরিণত হলো। নানামি জেনিনকে ইংরেজি গ্রামার শেখাল, আর জেনিন নানামিকে শেখাল কীভাবে অতিরিক্ত মানসিক চাপ না নিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। পরীক্ষার আগের দিন বিকেলবেলা তারা শেষবারের মতো স্কুলের মাঠে গেল। সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে নোবারা আকারি অপেক্ষা করছিল।
নোবারার হাতে দুটো নীল রঙের কলম। সে খুব লাজুক হেসে কলম দুটো দুই বন্ধুর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“শুনেছি পরীক্ষার আগে প্রিয় মানুষের দেওয়া কলম দিয়ে লিখলে পরীক্ষা ভালো হয়। আপনারা দুজনই খুব ভালো করবেন, আমি জানি,” নোবারার গলার স্বরে এক অদ্ভুত মায়া।
জেনিন কলমটা হাতে নিয়ে নোবারার চোখের দিকে তাকালো। সে দেখল নোবারার চোখে তার জন্য একরাশ প্রার্থনা। জেনিন অনুভব করল, সে যদি আজ হেরে যায়, তবে এই মেয়েটি আর নানামি দুজনেরই বিশ্বাস ভেঙে যাবে।
“ধন্যবাদ নোবারা। এই কলম দিয়ে আমি আমার জীবনের নতুন এক ইতিহাস লিখব,” জেনিন খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
নানামি শুধু হাসল। সে জানত জেনিন আবার ফিরে এসেছে। তাদের সেই তুখোড় বন্ধুত্ব এখন এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। একে অপরের জন্য কেয়ার, একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, এসএসসি পরীক্ষাটা যেন তাদের এই বন্ধুত্বেরই এক অগ্নিপরীক্ষা।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে জেনিন নানামির কাঁধে হাত রেখে হাঁটছিল। সূর্যাস্তের লাল আলোয় তাদের ছায়া মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোনো শক্তিই এই দুই বন্ধুর মাঝে ফাটল ধরাতে পারবে না। তারা জানত না সামনের দিনগুলো কতটা কঠিন, তারা জানত না ভাগ্যের চাকা কোন দিকে ঘুরবে। তারা শুধু জানত, যতক্ষণ তারা একসাথে আছে, ততক্ষণ অন্ধকার তাদের ছুঁতে পারবে না।
পরীক্ষার আগের সেই রাতটি ছিল নিস্তব্ধতার। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল এক বিশাল সংকল্প। জেনিন নুরশাদ আর নানামি জায়দান, দুইটি নাম, এক ভালোবাসা আর সীমাহীন কেয়ার। তারা একে অপরের পরিপূরক। জেনিন যদি আগুনের শিখা হয়, তবে নানামি সেই শিখাকে আগলে রাখা চিমনি।
সেই রাতে জেনিন ডায়েরিতে শেষবারের মতো লিখল—”জায়দান, তুই শুধু পাশে থাকিস। আমি এই পৃথিবীকে জয় করে তোর পায়ের কাছে এনে দেব। আমাদের এই বন্ধুত্ব অমর হয়ে থাকবে।”
<><><><><><><><><>
এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন। পুরো শহরের আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই থমথমে। সেন্ট জুড হাই স্কুলের বাইরে অভিভাবকদের ভিড়, শেষ মুহূর্তের রিভিশন আর উৎকণ্ঠার গুঞ্জন। নানামি জায়দান আর জেনিন নুরশাদ সাতসকালেই বেরিয়ে পড়ার কথা ছিল। নানামি তার প্রবেশপত্র, কলম আর জ্যামিতি বক্স গুছিয়ে একদম তৈরি। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জেনিনের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
জেনিন ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে এক কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “জেনিন, তোর বাবা হার্ট অ্যাটাক করেছেন। উনি এখন সিটি জেনারেল হাসপাতালে। তোকে এখনই আসতে হবে।”
জেনিনের হাত থেকে প্রবেশপত্রটা পড়ে গেল। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। যে বাবার সাথে তার সব শত্রুতা, সেই বাবার এই খবর তাকে এক নিমেষে স্তব্ধ করে দিল। নানামি জেনিনের অবস্থা দেখে ফোনটা কেড়ে নিল। সব শুনে নানামির কপালে ভাঁজ পড়ল। সে জেনিনকে খুব ভালো করে চেনে, কিন্তু তার কেন যেন মনে হলো এই ফোনটা কোনো চক্রান্ত হতে পারে।
“জেনিন, শান্ত হ। পরীক্ষার আর মাত্র ৪৫ মিনিট বাকি। এখান থেকে হাসপাতাল উল্টো দিকে। তুই যদি এখন যাস, পরীক্ষা দিতে পারবি না,” নানামি জেনিনের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
“কিন্তু বাবা… উনি যদি মারা যান? আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না নানামি!” জেনিনের চোখে জল চলে এসেছে।
নানামি এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল, “তুই যা। আমি হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু মনে রাখিস, আঙ্কেল যদি সুস্থ থাকেন আর তুই পরীক্ষা মিস করিস, তবে উনি আরও বেশি কষ্ট পাবেন। তুই আগে সেন্টারে চল।”
ঠিক তখনই নানামির বাবা এগিয়ে এলেন। তিনি জেনিনকে বললেন, “বাবা, তুমি পরীক্ষায় যাও। আমি এখনই হাসপাতালে যাচ্ছি। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার বাবার কোনো খবর পেলে আমি সাথে সাথে জানাব। তুমি নানামির সাথে এখন সেন্টারে যাও।”
নানামির বাবার ওপর জেনিনের অগাধ বিশ্বাস। সে চোখের জল মুছে নানামির সাথে সাইকেলে চেপে বসল। নানামি সাইকেল চালাচ্ছে বাতাসের বেগে। কিন্তু ভাগ্য তাদের সাথে অন্য খেলা খেলছিল।
শহরের প্রধান মোড়ে বিশাল জ্যাম। একটা ট্রাক উল্টে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে চলছে। পরীক্ষার আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি।
“আমরা পৌঁছাতে পারব না! আজ আমার কপালই খারাপ,” জেনিন হতাশ হয়ে বলল।
“চুপ থাক তো! আমি থাকতে তোকে হারতে দেব না,” নানামি সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। সে
জেনিনের হাত ধরে গলি দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। সরু গলি, কাদা আর মানুষের ভিড় ঠেলে তারা ছুটছে। নানামির কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছে, তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সে জেনিনের হাত ছাড়ছে না।
হঠাৎ গলির এক কোণে চার-পাঁচজন বখাটে যুবক তাদের পথ আটকাল। এরা মানিকের গ্যাংয়ের ছেলে। জেনিনকে পরীক্ষায় বসতে না দেওয়াটাই তাদের লক্ষ্য।
“কিরে জেনিন! খুব তো পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিস? আজ তোর পরীক্ষা আমরা নেব,” রনি তার পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল।
জেনিন এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু নানামি তাকে এক ধাক্কায় পেছনে সরিয়ে দিল। নানামি, যে কি না সারাজীবন মারামারি থেকে দূরে থেকেছে, আজ সে এক বাঘের মতো গর্জে উঠল। সে তার হাতের ব্যাগটা দিয়ে রনিকে আঘাত করল।
“নুরশাদ, তুই দৌড়া! স্কুলের গেট এখান থেকে মাত্র দুমিনিট। তুই চলে যা, আমি এদের সামলাচ্ছি!” নানামি চিৎকার করে বলল।
“না! আমি তোকে ফেলে যাব না!” জেনিন আর্তনাদ করে উঠল।
“এটা বন্ধুত্বের আদেশ জেনিন! তুই যদি আজ পরীক্ষা না দিস, তবে আমাদের সবার পরিশ্রম বৃথা যাবে। তুই দৌড়া! তুই পাশ করলে আমি ভাবব আমিই পাশ করেছি!” নানামি রনির কলার চেপে ধরল।
জেনিন এক মুহূর্ত নানামির চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে ছিল এক অটল বিশ্বাস আর ত্যাগ। জেনিন আর দেরি করল না। সে তার ব্যাগটা নিয়ে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে নানামির ওপর রনিদের আক্রমণের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু সে আজ থামতে পারবে না। তাকে জিততেই হবে, নিজের জন্য নয়, নানামির সম্মানের জন্য।
স্কুলের গেট যখন বন্ধ হতে যাচ্ছিল, জেনিন ঠিক সেই মুহূর্তে ভেতরে ঢুকল। তার জামা ছেঁড়া, কপালে ঘাম আর বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। টিচাররা তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
“রোল নম্বর কত? এত দেরি কেন?” হল পরিদর্শক কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
জেনিন কোনোমতে তার প্রবেশপত্রটা টেবিলে রাখল। সে কোনো কথা বলতে পারছিল না। সে শুধু দেখল পাশের সিটটা খালি, ওটা নানামির সিট। জেনিনের বুকটা হাহাকার করে উঠল। সে কি নানামিকে বিপদে ফেলে একা পরীক্ষা দেবে?
ঠিক পাঁচ মিনিট পর নানামি হলে ঢুকল। তার ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, শার্টের হাতা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু তার মুখে এক বিজয়ী হাসি। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। জেনিন বুঝতে পারল, নানামি ওই গুণ্ডাদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আসতে পেরেছে।
পরীক্ষা শুরু হলো। জেনিন দেখল তার হাতে সেই নীল কলমটা, যেটা নোবারা দিয়েছিল। সে যখন লিখতে শুরু করল, তার মনে হলো কলমটা তার নয়, বরং নানামির ভালোবাসা আর ত্যাগের জোরে চলছে। সে লিখছিল এক অদ্ভুত উন্মাদনায়।
পরীক্ষা শেষে তারা যখন হল থেকে বের হলো, জেনিন নানামিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
“কেন করলি এমন? তোকে যদি ওরা মেরে ফেলত?” জেনিনের কান্নায় পুরো বারান্দা কেঁপে উঠল।
নানামি জেনিনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাসল। “আরে ধুর! আমাকে মারা কি অত সোজা? আমি তো জানতাম তুই একবার হলে ঢুকলে মাতিয়ে দিবি। পরীক্ষা কেমন হয়েছে সেটা বল?”
“ফাটিয়ে দিয়েছি! তুই না থাকলে আজ আমি শেষ হয়ে যেতাম,” জেনিন চোখ মুছতে মুছতে বলল।
স্কুলের গেটের বাইরে নানামির বাবা অপেক্ষা করছিলেন। তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। “জেনিন, তোমার বাবা একদম ঠিক আছেন। ওটা একটা ফেক কল ছিল। তোমার বাবার অফিসেরই কেউ হয়তো তোমাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। আমি হাসপাতালে গিয়ে খবর নিয়ে এসেছি, উনি একদম সুস্থ।”
জেনিন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝল আজ সে কেবল একটা পরীক্ষায় পাস করেনি, সে আজ ভাগ্যের ক্রুরতার বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে। আর এই জয়ের একমাত্র নায়ক তার বন্ধু নানামি।
বিকেলে তারা যখন নদীর পাড়ে গিয়ে বসল, আকাশটা তখন সিঁদুরে মেঘে ঢাকা। নোবারা আকারি সেখানে এসেছিল। সে নানামির ঠোঁটের কাটা দাগ দেখে খুব বিচলিত হয়ে পড়ল।
“একি! আপনার এই অবস্থা কেন নানামি ভাইয়া?” নোবারা তার ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করতে চাইল।
নানামি জেনিনের দিকে তাকিয়ে হাসল। “এটা কোনো চোট নয় নোবারা, এটা একটা মেডেল। জেনিনকে জেতানোর মেডেল।”
নোবারা জেনিনের দিকে তাকালো। সে দেখল জেনিনের চোখে এক নতুন দীপ্তি। জেনিন এখন আর সেই বিদ্রোহী কিশোর নয়, সে এখন এক কৃতজ্ঞ বন্ধু। জেনিন নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল, “নোবারা, আজ আমি বুঝেছি জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়, বরং এমন একজন বন্ধু যে নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে।”
সেই বিকেলটি ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তির। তারা তিনজন মিলে আইসক্রিম খেল, হাসি-তামাশা করল।
তাদের বন্ধুত্বের এই অধ্যায়টি ছিল ত্যাগের আর সাহসের। এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনটি তাদের বন্ধনকে আরও মজবুত করে দিল। কিন্তু ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা কি তারা টের পাচ্ছিল? সামনের দিনগুলোতে যে বড় সংঘাত অপেক্ষা করছে, তার জন্য কি তারা প্রস্তুত?
<><><><><><><><><>
এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিন। জীবনের প্রথম বড় বাধাটা পার হওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনই আছে একটা যুগের অবসানের বিষণ্ণতা। শেষ পরীক্ষার হল থেকে যখন জেনিন নুরশাদ আর নানামি জায়দান বেরিয়ে এল, তখন আকাশের রঙটা ছিল অদ্ভুত রকম ফিকে। স্কুলের সেই চিরচেনা করিডোর, যেখানকার প্রতিটি ধুলিকণা তাদের কৈশোরের সাক্ষী, আজ যেন একটু বেশিই নিস্তব্ধ মনে হচ্ছে।
অন্যান্য ছেলেরা যখন ইউনিফর্মে একে অপরের নাম লিখছে, হইহুল্লোড় করছে, জেনিন তখন চুপচাপ স্কুলের বড় বটগাছটার নিচে গিয়ে বসল। নানামি ধীর পায়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল। দুই বন্ধুর পরনের সাদা শার্টগুলো এখন ঘামে আর ধুলোয় মাখা। জেনিনের চোখে এক ধরনের শূন্যতা।
“পরীক্ষা তো শেষ হলো। এবার কী করবি?” নানামি পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে চশমাটা পরিষ্কার করতে করতে জিজ্ঞেস করল।
জেনিন একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। “জানি না। এতদিন তো পরীক্ষার একটা লক্ষ্য ছিল, পড়ার চাপ ছিল। আজ থেকে আমরা আর স্কুলের ছাত্র নই। ভাবতেই কেমন বুকটা খালি লাগছে। মনে হচ্ছে আমাদের শৈশবটা আজ এই গেটের ওপাশেই মরে পড়ে থাকবে।”
নানামি জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। জেনিন লক্ষ্য করল নানামির হাতটা একটু কাঁপছে। জেনিন জানে, নানামি যতটাই শান্ত হোক না কেন, তার ভেতরেও একটা ঝড় চলছে। নানামির কাছে জেনিন শুধু বন্ধু নয়, জেনিন ছিল তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার অভ্যেস।
“শৈশব মরে না। ওটা আমাদের ভেতরেই থেকে যায়। এখন আমরা বড় হচ্ছি, দায়িত্ব বাড়বে। কিন্তু আমাদের এই পাগলামিগুলো যেন কোনোদিন বদলে না যায়,” নানামি খুব নিচু স্বরে বলল।
জেনিন হঠাৎ করে নানামির হাতটা শক্ত করে ধরল। “কথা দে, কলেজে উঠে তুই আমাকে ভুলে যাবি না। তুই তো ভালো ছাত্র, তোর অনেক নতুন বন্ধু হবে। আমার মতো বখাটে ছেলেকে তখন তোর বোঝা মনে হবে না তো?”
নানামি জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে এক করুণ আকুতি। জেনিন নুরশাদ, যে পুরো শহরকে ডরাই না, সে আজ তার বন্ধুর কাছে ব্রাত্য হওয়ার ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। নানামি মৃদু হেসে বলল, “বোকা! তুই ছাড়া আমার পৃথিবীটা তো সাদা-কালো। তুই আছিস বলেই তো আমার জীবনে রঙ আছে। তুই আমার ছায়া রে নুরশাদ, আর নিজের ছায়াকে কেউ কোনোদিন ফেলে দিতে পারে না।”
ঠিক সেই সময় স্কুলের পেছনের ফটক দিয়ে নোবারা আকারি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। তার পরনে ক্লাস টেন-এর নীল স্কার্ট, চোখেমুখে উদ্বেগ। সে দুই বন্ধুর কাছে এসে হাঁপাতে লাগল।
“আপনারা এখানে? আমি পুরো স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছি! আজ তো আপনাদের শেষ দিন, একবারও আমার সাথে দেখা না করেই চলে যাচ্ছিলেন?” নোবারার গলার স্বরে অভিমান ঝরে পড়ল।
জেনিন পকেট থেকে সেই নীল কলমটা বের করল যেটা নোবারা দিয়েছিল। জেনিন সেটা নোবারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “দেখো, তোমার কলম দিয়ে আমি শেষ পরীক্ষাটা দিয়েছি। এটা এখন তোর কাছেই রাখো। এটা আমাদের বন্ধুত্বের একটা সাক্ষী হয়ে থাক।”
নোবারা কলমটা হাতে নিয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। তার চোখে জল টলটল করছে। “আপনারা দুজনেই কলেজে চলে যাবেন। আমি এই স্কুলে একা হয়ে যাব। কে আমাকে ম্যাথ বুঝিয়ে দেবে? আর কে আমাকে কথায় কথায় রাগিয়ে দেবে?”
নানামি নোবারার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিল। “আরে ধুর! আমরা তো পাশেই আছি। জেনিনকে তো তুমি চিনো, ও তো এই স্কুলের দেওয়াল টপকাতে ওস্তাদ। আর আমি তো প্রতিদিন তোমাকে নোটস পাঠিয়ে দেব।”
সূর্যটা যখন পাটে বসছে, তখন তিনজনে মিলে স্কুলের সেই পুরনো মাঠটা শেষবারের মতো ঘুরে দেখল। জেনিন হঠাৎ করে পকেট থেকে একটা চক বের করে বটগাছের গুঁড়িতে খোদাই করে লিখল— ‘ZN + NZ = Infinite’।
“এটা কী লিখলি?” নানামি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“জেডএন মানে জেনিন নুরশাদ, এনজেড মানে নানামি জায়দান। আর ইনফিনিট মানে আমাদের এই বন্ধন অসীম। কালকে যদি পৃথিবী ধ্বংসও হয়ে যায়, এই গাছটা সাক্ষ্য দেবে যে এখানে দুইজন পাগল বন্ধু ছিল যারা একে অপরের জন্য জীবন দিতে পারত,” জেনিন গর্বের সাথে বলল।
সেই বিকেলের রোদটা যখন জেনিনের মুখে পড়ল, নানামি দেখল জেনিনের চোয়ালটা আগের চেয়েও শক্ত হয়েছে। জেনিন যেন হঠাৎ করেই অনেকটা বড় হয়ে গেছে। নানামি মনে মনে প্রার্থনা করল, যেন জেনিনের এই আবেগটা কোনোদিন তার বিপদের কারণ না হয়।
তারা যখন স্কুলের গেট দিয়ে শেষবারের মতো বেরিয়ে এল, জেনিন একবার পেছন ফিরে তাকালো। বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘সেন্ট জুড হাই স্কুল’। জেনিন জানে, এখান থেকে বের হওয়া মানেই বাস্তবের কঠোর পৃথিবীতে পা রাখা। সেখানে কোনো নানামির মা থাকবে না যে পায়েস খাইয়ে দেবে, সেখানে কোনো ক্ষমাশীল শিক্ষক থাকবে না। সেখানে কেবল লড়াই।
“আজ আমার খুব ভয় লাগছে রে,” বাড়ি ফেরার পথে জেনিন হঠাৎ বলল।
“কিসের ভয়?”
“মনে হচ্ছে আমি কোনো এক চোরাবালির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তুই শুধু আমার হাতটা ছাড়িস না দোস্ত। তুই যদি হাত ছেড়ে দিস, আমি নির্ঘাত তলিয়ে যাব,” জেনিনের কণ্ঠস্বর অন্ধকারে কেঁপে উঠল।
নানামি জেনিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। “আমি থাকতে তোকে কেউ ছুঁতে পারবে না। আমরা একসাথে স্বপ্ন দেখেছি, একসাথেই বড় হবো।”
সেই রাতে নানামিদের বাসায় একটা উৎসবের আমেজ ছিল। মা অনেক আয়োজন করে রান্না করেছেন। কিন্তু জেনিনের মনটা ছিল অস্থির। সে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল। তার বাবার পক্ষ থেকে কোনো ফোন আসেনি। রেজাল্টের পর হয়তো তার জীবন আবার উত্তাল হয়ে উঠবে।
জেনিন খেয়েদেয়ে নানামির ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। নানামি তখনো পড়ার টেবিলটা গোছাচ্ছিল।
“শুয়ে পড়। আজ থেকে তো আর পড়াশোনার চাপ নেই,” জেনিন বিছানা থেকে ডাকল।
নানামি লাইট নিভিয়ে জেনিনের পাশে এসে শুলো। জানালার পর্দাটা সরানো ছিল। জোছনার আলো এসে পড়েছে তাদের বিছানায়। জেনিন নানামির দিকে ফিরে ফিসফিস করে বলল, “আচ্ছা জায়দান, তুই কি কোনোদিন পুলিশ হয়ে আমাকে অ্যারেস্ট করবি?”
নানামি অবাক হয়ে বলল, “এসব কী ধরনের বাজে কথা? তুই কি চোর-ডাকাত হবি নাকি যে আমি তোকে অ্যারেস্ট করব?”
“জানি না। আমার রক্তটা বড় গরম রে। তবে মনে রাখিস, যদি কোনোদিন তুই আমাকে অ্যারেস্ট করতে আসিস, আমি কিন্তু পালাব না। তোর হাতে হাতকড়া পরতে আমার আপত্তি নেই।”
নানামি হাহা করে হেসে উঠল। “পাগল! তুই বড় হয়ে আমার সাথে কাজ করবি। তুই হবি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ।”
সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল পবিত্র মায়ায় ঘেরা। জেনিন ঘুমানোর আগে নানামির চাদরটা টেনে দিল। নানামি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। জেনিন মনে মনে বলল—”তুই অনেক বড় হ ভাই। তোকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার।”
চলবে ইংশাআল্লাহ…….

