#Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১০

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১০
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ভিলার ভোরগুলো শহরের সাধারণ ভোরের মতো নয়। এখানে পাখির ডাকের চেয়ে বেশি শোনা যায় প্রহরীদের বুটের শব্দ আর সিকিউরিটি গেটের যান্ত্রিক গুঞ্জন। আকাশ তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি, কুয়াশার একটা পাতলা আস্তরণ পাইন গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে আছে।

ব্রেকফাস্ট টেবিল। জেনিন আর নোবারা মুখোমুখি। জেনিন লক্ষ্য করল নোবারা খুব কম খাচ্ছে। তার প্লেটে রাখা অমলেট আর পাউরুটি প্রায় অক্ষত।

“খাচ্ছেন না কেন? নূরশাদ ভিলার খাবার কি আপনার স্ট্যান্ডার্ডের নিচে?” জেনিন কফিতে চুমুক দিয়ে রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“ক্ষুধা নেই, স্যার।”

“ক্ষুধা না থাকলেও খেতে হবে। আপনার শরীর যদি দুর্বল হয়, তবে আমার কাজের ক্ষতি হবে। পুরোটা শেষ করুন। এক্ষুনি।”

জেনিনের গলার স্বরে কোনো অনুরোধ নেই, আছে আদেশ। নোবারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাঁটা-চামচ তুলে নিল। জেনিন তৃপ্তির সাথে দেখল নোবারা তার কথা মানছে। এই ‘মানিয়ে নেওয়া’ জেনিনকে এক ধরণের মানসিক আরাম দেয়। সে মনে করে এভাবেই সে নোবারাকে একদিন পুরোপুরি জয় করে ফেলবে।

কিন্তু এই রাজকীয় আভিজাত্যের আড়ালে নূরশাদ ভিলার অন্য এক চেহারা আছে যা নোবারার নজর এড়াচ্ছে না। জেনিন যখন লাইব্রেরিতে কাজের কথা বলে নিজের স্টাডি রুমে ঢুকল, নোবারা দেখল কিছু কালো পোশাকধারী মানুষ পেছনের বাগান দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। তাদের চোখে কালো সানগ্লাস, কানে ওয়্যারলেস সেট। জেনিন তাদের সাথে খুব নিচু স্বরে কথা বলছে। এটি কোনো সিইও-র সাধারণ মিটিং হতে পারে না।

বিকেল বেলা। জেনিন বিশাল সব নথিপত্র নিয়ে বসে আছে। নোবারা ক্যালকুলেটর আর ল্যাপটপ নিয়ে তার পাশে। হঠাৎ জেনিনের ফোনটা বেজে উঠল। জেনিন স্ক্রিন দেখেই গম্ভীর হয়ে গেল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল—
“বাইরে যান। পাঁচ মিনিট।”

নোবারা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সে পুরোপুরি গেল না। সে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল। জেনিনের গলার স্বর এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। সে এখন আর সেই কর্পোরেট সিইও নয়।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে নোবারার শরীর এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। নোবারা তার পকেটে হাত দিল। সেখানে তার গোপন একটি ডিভাইস রাখা। সে বুঝতে পারছে, সে যে রহস্যের সন্ধানে এখানে এসেছে, তার জট খুলতে শুরু করেছে।
জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নোবারাকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ সরু হয়ে গেল।

“আড়ি পাতছিলেন?” জেনিনের প্রশ্নটি চাবুকের মতো লাগল।

“না স্যার। আপনিই তো বললেন পাঁচ মিনিট পর আসতে।” নোবারার গলায় এক ফোঁটা কম্পন নেই।

জেনিন নোবারার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তার আঙুলের চাপ নোবারার নরম চামড়ায় বসে যাচ্ছে। “মিস আকারি, এই বাড়িতে যা দেখবেন বা যা শুনবেন, তার সবকিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। অতি কৌতূহল এই ভিলার মানুষের জন্য ভালো নয়। আপনি এখানে এসেছেন কাজ করতে, গোয়েন্দাগিরি করতে নয়।”

জেনিন নোবারাকে ছেড়ে দিল। সে বুঝতে পারছে না নোবারা কতটুকু শুনেছে। কিন্তু জেনিনের ইগো তাকে বলছে, ও যদি কিছু জেনেও ফেলে, ও কোথায় যাবে? ও তো আমার খাঁচায় বন্দী।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার প্রতিটি ইঞ্চি জেনিন নূরশাদের হাতের তালুর মতো চেনা। এখানকার সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কেবল বাইরের শত্রুর জন্য নয়, বরং ভেতরের মানুষগুলোর প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাস মাপার জন্য বসানো। নোবারা আকারি এই প্রাসাদে এক ধরণের অদ্ভুত শৃঙ্খলে আবদ্ধ। জেনিন তাকে বাইরে থেকে ঘর লক করে রাখার যে অপমান করেছিল, তা নোবারার ভেতরে এক শীতল প্রতিশোধস্পৃহা জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু সে জানে, জেনিন নূরশাদের মতো ধূর্ত মানুষকে হারাতে হলে আবেগের চেয়ে বুদ্ধির জোর বেশি প্রয়োজন।

সকাল দশটা। জেনিন আজ অফিসে যায়নি। সে তার ভিলার বিশাল লিভিং রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। তার পরনে কালো সিল্কের ড্রেসিং গাউন, হাতে একটি জ্বলন্ত চুরুট। সে বারবার সিড়ির দিকে তাকাচ্ছে। নোবারা এখনো নিচে নামেনি। জেনিন ইচ্ছা করেই তার দরজার লক খুলে দিয়েছে খুব ভোরে, সে দেখতে চায় নোবারা নিজ থেকে তার সামনে আসে কি না।

সিড়িতে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। নোবারা নেমে আসছে। তার পরনে সেই একই সাধারণ কামিজ, কিন্তু তার চলনবলনে এক ধরণের আভিজাত্য মিশে আছে যা এই প্রাসাদের দামী আসবাবগুলোকেও ম্লান করে দেয়। তাকে একপলক দেখেই জেনিন বলে উঠল,
“মিস আকারি, আজ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আছে। শহরের কিছু প্রভাবশালী মানুষ আসবে। আমি চাই আপনি আমার পাশে থাকবেন।”

“পার্সোনাল এক্সিকিউটিভ হিসেবে নাকি আপনার গৃহবন্দী হিসেবে?” নোবারা বিদ্রূপ করল।

“আমার ছায়া হিসেবে।” জেনিনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত এবং রুক্ষ। “এখন যান, তৈরি হয়ে নিন। আপনার ঘরের ওয়ারড্রোবে একটি নীল রঙের শাড়ি রাখা আছে। ওটিই পরবেন। আমি নীল রঙ পছন্দ করি।”

নোবারা যখন নিজের ঘরে ফিরে এল, সে দেখল সত্যিই একটি অপূর্ব নীল জামদানি শাড়ি বিছানায় রাখা। শাড়িটির সাথে রয়েছে হীরের একটি সূক্ষ্ম নেকলেস। জেনিনের পছন্দ যেমন দামী, তেমনই রাজকীয়। নোবারা শাড়িটি স্পর্শ করল না। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জানালার কাঁচের ওপাশে ঘন পাইন বন আর দূরে সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। সে তার গোপন ডিভাইসটি বের করল। সে বড় এক কাজ করতে চলেছে সামনে। কিন্তু এই ভিলার চারপাশে জ্যামার বসানো। জেনিন তার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে।

সন্ধ্যা নেমে এল। নূরশাদ ভিলা আজ আলোয় ঝলমল করছে। একের পর এক দামী গাড়ি পোর্টিকোয় এসে থামছে। জেনিন নূরশাদ আজ তার কর্পোরেট রূপের শিখরে। সে অতিথিদের সাথে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু তার নজর বারবার সিড়ির দিকে যাচ্ছে।

ঠিক সাতটার সময় নোবারা নেমে এল। নীল শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছিল এক টুকরো আকাশের মতো। নেকলেসটি তার গলার নিচে হীরের আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে। পুরো হলের মানুষের কথাবার্তা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। জেনিন নূরশাদ তার হাতের গ্লাসটা শক্ত করে ধরল। তার বুকের ভেতরে যে পজেসিভ দানবটা আছে, সে আজ গর্জে উঠছে। সে চায় না এই সৌন্দর্য অন্য কেউ দেখুক।

সে দ্রুত নোবারার কাছে গিয়ে তার হাতটা নিজের বাহুর সাথে জড়িয়ে নিল। তার চাপটা ছিল একটু বেশিই জোরালো।

“অত্যধিক সুন্দরী লাগছে তোমাকে,” জেনিন নোবারার কানে ফিসফিস করে বলল। “এতটাই যে আমার ইচ্ছা করছে এই অনুষ্ঠানটি এখনই পণ্ড করে তোমাকে ঘরে আটকে রাখি।”

নোবারা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে মায়া ছিল না। “ভয় পাচ্ছেন বুঝি? অন্য কেউ আমাকে দেখে ফেললে আপনার অধিকার কমে যাবে?”

অনুষ্ঠান চলাকালীন জেনিন এক মুহূর্তের জন্যও নোবারাকে নিজের চোখের আড়াল হতে দিল না। কেউ যদি নোবারার সাথে কথা বলতে এগিয়ে আসত, জেনিন তার চাহনি দিয়ে তাকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছিল। এই রুড ব্যবহার অতিথিরাও লক্ষ্য করছিল, কিন্তু জেনিন নূরশাদকে ঘাঁটানোর সাহস কারও নেই।

হঠাৎ ভিড়ের মাঝে জেনিন একজনের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। নোবারা এই সুযোগটি কাজে লাগালো। সে কৌশলে ব্যালকনির দিকে সরে গেল। সে দেখল বাগানের শেষ প্রান্তে, যেখানে অন্ধকার বেশি, সেখানে সেই কালো সানগ্লাস পরা লোকগুলো আবার একত্রিত হয়েছে। তারা কিছু বড় বড় বাক্স একটি ট্রাকে তুলছে।

নোবারা তার ফোন দিয়ে একটি ছবি তোলার চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার কাঁধে একটি ভারী হাত পড়ল। নোবারা চমকে ফিরে তাকালো। সামনে জেনিন। তার মুখটা এখন রাগে থমথমে।

“ব্যালকনিতে কী করছেন আপনি? আমি কি আপনাকে একা থাকতে বলেছি?” জেনিন নোবারার ফোনটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল।

“আমি শুধু একটু বাতাস খাচ্ছিলাম। ভেতরে খুব দম বন্ধ লাগছিল,” নোবারা আমতা আমতা করে বলল।

জেনিন ফোনের স্ক্রিনটা দেখল। সেখানে ছবি তোলার অপশন খোলা ছিল। জেনিনের ইগো আর সন্দেহ এবার চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। সে নোবারার কব্জি চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিজের পার্সোনাল স্টাডি রুমের দিকে নিয়ে গেল। মেহমানরা অবাক হয়ে দেখল, কিন্তু কেউ কথা বলল না।

স্টাডি রুমে ঢুকে জেনিন সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। সে নোবারাকে টেবিলের সাথে চেপে ধরল।
“কী দেখছিলেন আপনি? কী খুঁজছেন এই বাড়িতে?” জেনিনের চিৎকার বাঘের গর্জনের মতো শোনাল।

“আমি কিছুই খুঁজছি না! আপনি অকারণে আমার ওপর সন্দেহ করছেন!”

“মিথ্যে কথা!” জেনিন টেবিলের ওপর রাখা একটি দামী কাঁচের ফুলদানি আছড়ে ভাঙল। “আমি জানি আপনি কেন এসেছেন। আপনি কি ভাবছেন আমি পনেরো বছর আগের সেই বোকা জেনিন? আমি এখন শহরের শিরা-উপশিরা নিয়ন্ত্রণ করি। আপনি যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো চাল চালার চেষ্টা করেন, তবে এই নীল শাড়িটিই আপনার কাফন হয়ে যাবে!”

নোবারা এবার স্থির হয়ে দাঁড়ালো। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার এই পজেসিভনেস আসলে এক ধরণের অসুস্থতা জেনিন। আপনি নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করেন না। আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্যের নিচে কেবল ঘৃণা আর ভয়। ভালোবাসা নয়।”

‘ভালোবাসা’ শব্দটি শুনে জেনিন এক মুহূর্তের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ল। সে নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। তার আঙুলগুলো নোবারার গালে বসে যাচ্ছে।

“ভালোবাসা? ভালোবাসা তো এক মরীচিকা নোবারা। আমি শুধু জানি অধিকার।”

জেনিন নোবারাকে ছেড়ে দিয়ে আলমারি থেকে একটি নথিপত্র বের করল।
“এটি হলো এই ভিলার পরবর্তী এক সপ্তাহের শিডিউল। আর শুনুন” জেনিন নোবারার ফোনটা নিজের পকেটে রেখে দিল। “আপনার সাথে বাইরের জগতের যোগাযোগ আজ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন।”

জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং এবারও বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল। নোবারা মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার হীরের নেকলেসটা গলায় ভারী মনে হচ্ছে। সে দেখল টেবিলের ওপর জেনিনের একটা নোটবুক পড়ে আছে। সে চুপিচুপি ওটা খুলল। সেখানে একটি পৃষ্ঠায় লেখা, “Z rules the shadows, but Nobara rules Z.”

নোবারা বুঝতে পারল, জেনিন তাকে নিয়ে এক মরণনেশায় মেতেছে। এই নেশা যেমন তীব্র, তেমনই ধ্বংসাত্মক। জেনিন নূরশাদ আসলে এক নিঃসঙ্গ দানব, যে তার প্রিয়তমাকে সোনার শিকলে বেঁধে রাখতে চায়।

রাতের নিস্তব্ধতায় জেনিন তার বিশাল ডাইনিং টেবিলে একা বসে ড্রিঙ্ক করছিল। সে জানে সে নোবারার ওপর অত্যাচার করছে, কিন্তু তার এই রুডনেসই তার একমাত্র ঢাল। সে যদি একবার নরম হয়, তবে নোবারা তার সব রহস্য জেনে ফেলবে! জেনিন বিড়বিড় করে বলল,
“ক্ষমা করো নোবারা। তোমাকে বন্দি না রাখলে আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না। তুমি আমার সেই একমাত্র আকাশ, যেটাকে আমি মেঘ দিয়ে ঢেকে রাখতে চাই যাতে অন্য কেউ তোমার দিকে তাকাতে না পারে।”

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার রাতগুলো যেন এক থমথমে নীরবতার চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের প্রতিটি করিডোরে সিকিউরিটি গার্ডদের বুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জেনিন নূরশাদ তার বিশাল স্টাডি রুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে এক গ্লাস দামী স্কচ। তার নজর জানালার কাঁচের ওপাশে, যেখানে পাইন বনের ছায়াগুলো অন্ধকারের সাথে মিশে গেছে। জেনিন ভাবছে তার নতুন পিএ-র কথা। নোবারা আকারি। মেয়েটা তাকে অবাক করে দিচ্ছে। জেনিন যত বেশি তাকে শাসন করতে চাইছে, নোবারা তত বেশি শান্তভাবে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে। জেনিনের জীবনে কেউ কখনো তাকে সংশোধন করার সাহস করেনি, অথচ এই মেয়েটি কেবল কাজ দিয়েই জেনিনকে কোণঠাসা করে ফেলছে।

দরজায় তিনবার মৃদু করাঘাত। জেনিন ঘড়ি দেখল। ঠিক রাত ১০টা।

“আসুন।” জেনিন গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল।

নোবারা ভেতরে ঢুকল। পরনে তার সাধারণ সালোয়ার কামিজ, হাতে আইপ্যাড আর কিছু ফাইল। সারাদিনের ধকলের পরেও তার চেহারায় এক ধরণের কাঠিন্য মিশ্রিত কমনীয়তা আছে। সে সরাসরি জেনিনের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো।

“আপনার কালকের শিডিউলে কিছু পরিবর্তন এনেছি স্যার,” নোবারার কণ্ঠস্বর পরিষ্কার এবং দৃঢ়।

জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলল, “আমার শিডিউলে পরিবর্তন আনার পারমিশন আপনাকে কে দিল?”

নোবারা শান্তভাবে আইপ্যাডটা জেনিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “আপনার কাল সকালের প্রজেক্ট সাইট ভিজিটটা আমি দুপুর তিনটায় সরিয়েছি। কারণ সকাল দশটায় আপনার জাপানি ক্লায়েন্টদের সাথে যে কনফারেন্স কল আছে, তার জন্য আপনার নূন্যতম তিন ঘণ্টা প্রস্তুতির প্রয়োজন। আপনি যদি সকালে সাইটে যান, তবে ক্লান্তিতে আপনি মিটিংয়ে ফোকাস করতে পারবেন না। আমি নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের লস হোক তা চাই না।”

জেনিন স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে চেয়েছিল সকালে নোবারাকে রোদে দাঁড় করিয়ে সাইট ভিজিট করাতে, যাতে সে একটু ‘শিক্ষা’ পায়। অথচ নোবারা কোম্পানির লাভের কথা বলে জেনিনের সেই ইগোস্টিক প্ল্যান ভেস্তে দিল।

জেনিন গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনি কি আমাকে শেখাচ্ছেন আমার কী করা উচিত? মনে রাখবেন, আমি আপনার বস।”

নোবারা স্লাইড করে জেনিনের খুব কাছে এল। টেবিলের ওপর ভর দিয়ে সে জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। জেনিন অনুভব করল এক ধরণের অদ্ভুত উত্তেজনা। নোবারার চোখে ভয় নেই, বরং আছে এক ধরণের কর্তৃত্ব।

“আমি আপনাকে শেখাচ্ছি না স্যার, আমি কেবল আমার কাজ করছি। আপনি আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন আপনার সময় ম্যানেজ করার জন্য। আর একজন পারফেক্ট পিএ হিসেবে আমি জানি কোন সময়টা আপনার জন্য বেশি প্রোডাক্টিভ। আপনি কি নিজের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে কোটি টাকার ডিলটা নষ্ট করবেন?”

জেনিন চোয়াল শক্ত করল। সে হার মানতে রাজি নয়। সে নোবারার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তাদের মাঝখানে এখন কেবল টেবিলের ব্যবধান।
“জেদ আমার পরিচয়, মিস আকারি। আমি চাইলে কাল সাইটেও যাব, আবার মিটিংও সফল করব। আমি যা চাই, তা-ই হয়।”

নোবারা একটু হাসল। এক বিদ্রূপাত্মক ম্লান হাসি। সে জেনিনের কোটের কলারটা একটু সোজা করে দিয়ে বলল, “আপনি যা চান তা-ই হয় বলেই হয়তো আপনি এত একা। আপনার এই ইগো আপনাকে চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। তবে মনে রাখবেন স্যার, আমি আপনার অন্য পিএ-দের মতো নই যারা আপনার ভয়ে কাঁপে। আমি আপনার কাজ উদ্ধার করতে এসেছি। এখন সই করুন এই রিভাইজড শিডিউলে।”

জেনিন পেনটা তুলে নিল। সে সই করল ঠিকই, কিন্তু তার ইগোতে এক নিদারুণ দহন শুরু হলো। সে নোবারার কব্জিটা শক্ত করে ধরল।

“আপনি বড্ড বেশি কথা বলছেন। আপনি জানেন না আমি আপনার সাথে কী কী করতে পারি।”

নোবারা হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। সে জেনিনের চোখের গভীরে তাকিয়ে রইল। “আপনি আমায় বন্দী করতে পারেন স্যার, কিন্তু আমার মাথা নোয়াতে পারবেন না। আর হ্যাঁ, আপনার স্কচটা আজ একটু বেশি হয়ে গেছে। কাল সকালে মিটিংয়ের জন্য আপনার ফ্রেশ থাকা জরুরি। তাই ড্রিঙ্কটা এখানেই শেষ করুন।”

নোবারা ফাইলটা নিয়ে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। জেনিন একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সে শিকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু সে নিজেই যেন এক অদৃশ্য জালে আটকা পড়ছে। নোবারা তাকে ডমিনেট করছে, কিন্তু সেটা তার প্রোফেশনাল চরিত্রের আড়ালে। জেনিন বুঝতে পারছে না সে রাগ করবে নাকি এই নতুন চ্যালেঞ্জ উপভোগ করবে।

পরের দিন। জেনিন অফিসের কনফারেন্স রুমে বসে আছে। নোবারা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। প্রতিটি পয়েন্টে নোবারা জেনিনকে কানে কানে ইনপুট দিচ্ছে। জাপানি ক্লায়েন্টরা জেনিনের প্রিপারেশন দেখে মুগ্ধ। কিন্তু জেনিনের ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছে। সে বারবার নোবারার উপস্থিতিতে আনমনা হয়ে যাচ্ছে। নোবারার শান্ত পারফিউমের ঘ্রাণ তার মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে।
মিটিং শেষ হওয়ার পর জেনিন তার চেম্বারে ফিরে এল। সে নোবারাকে ভেতরে ডাকল।

“বসো।” জেনিন এবার তাকে বসার হুকুম দিল না, বরং ইশারা করল।

নোবারা বসল। জেনিন তার দিকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক বাড়িয়ে দিল।

“আপনার কাজের ধরনে আমি খুশি। এই চেকে আপনি আপনার ইচ্ছামতো অ্যামাউন্ট লিখে নিতে পারেন। তবে একটা শর্ত, আজ থেকে আপনি নূরশাদ ভিলার সব নিয়ম মেনে চলবেন। রাতে আপনার ফোন আমার কাছে জমা দেবেন এবং কোনো কারণে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।”

নোবারা চেকটা হাতে নিল। তারপর খুব ধীরে ধীরে সেটা দুই টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। জেনিন বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল।

“স্যার, আমি আমার যোগ্যতার দাম নেই, আপনার দয়া নয়। আমি আপনার কর্মচারী, কেনা গোলাম নই। নূরশাদ ভিলার নিরাপত্তা যদি আমার জন্য কারাগার হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমি সেই নিরাপত্তা চাই না। আর ফোনের কথা বললেন? আমি আপনার ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করি না, আপনিও আমার ব্যক্তিগত অধিকারে হাত দেবেন না।”

জেনিন চিৎকার করে উঠল, “আপনি কি জানেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন? এই শহর আমার ইশারায় চলে!”

নোবারা উঠে দাঁড়ালো। সে তার ডেস্কের ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, “শহর আপনার ইশারায় চলতে পারে স্যার, কিন্তু নোবারা আকারি চলে তার নিজের ইশারায়। আপনি যদি আমার কাজের ওপর সন্তুষ্ট না থাকেন, তবে এখনই আমাকে বরখাস্ত করতে পারেন। কিন্তু যতক্ষণ আমি আপনার পিএ, ততক্ষণ আমিই আপনার সব কিছুর খেয়াল রাখব, আপনার ইগোর নয়।”

জেনিন পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেল। সে আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করল, ক্ষমতা কেবল টাকার জোরে আসে না, ক্ষমতা আসে ব্যক্তিত্বের জোরে। নোবারা তাকে ছেড়ে যাচ্ছে না, কিন্তু সে জেনিনকে এমনভাবে ডমিনেট করছে যে জেনিন চাইলেও তাকে আক্রমণ করতে পারছে না।

বিকেল বেলা। জেনিন স্টাডি রুমে বসে তার ল্যাপটপ দেখছিল। হঠাৎ নোবারা কফি নিয়ে ঢুকল। জেনিন তাকে না তাকিয়েই বলল, “কফিটা রেখে যান।”

“স্যার, কফি নয়, আপনার গ্রিন টি। আজ সারাদিন আপনার ব্লাড প্রেশার হাই ছিল। আমি কফি সাজেস্ট করব না।”

“নোবারা!” জেনিন এবার টেবিল চাপড়ে দাঁড়ালো। “যথেষ্ট হয়েছে! আপনি কেন সব সময় আমার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন?”

নোবারা কফির কাপটা সরিয়ে রাখল। সে খুব ধীর পায়ে জেনিনের কাছে এল। জেনিনের চোখের চশমাটা সে খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
“আমি নিয়ন্ত্রণ করছি না স্যার। আমি কেবল আপনার যত্ন নিচ্ছি। আর কালকের বন্দিত্বের কথা বলছেন? ওটা আপনার ভয় ছিল। আপনি ভয় পাচ্ছেন পাছে আমি আপনার এই ইগোর দেয়ালটা ভেঙে ফেলি। আপনি নিজেকে রুড বলে জাহির করেন যাতে কেউ আপনার ভেতরে পৌঁছাতে না পারে। কিন্তু আমি তো পৌঁছে গেছি।”

জেনিনের রাগী সত্তাটি ভেতরে গর্জে উঠল। সে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। তার চোখ এখন আগুনের মতো জ্বলছে।
“ভেতরে পৌঁছে গেছেন? তবে কি আপনি জানেন না আমি কতটা ভয়ংকর হতে পারি?”

নোবারা এক ইঞ্চিও নড়ল না। সে জেনিনের বুকের ওপর হাত রেখে তার হৃদস্পন্দন অনুভব করল। “আপনি ভয়ংকর নন স্যার, আপনি কেবল আহত। পনেরো বছর আগে কেউ আপনাকে ছেড়ে গিয়েছিল বলেই আপনি আজ সবাইকে শৃঙ্খলে বাঁধতে চান। কিন্তু আপনি কি জানেন না, যে শিকলটা আপনি আমার পায়ে পরানোর চেষ্টা করছেন, তার চাবিটা আমার কাছেই আছে?”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত শিথিল হয়ে এল। নোবারা তার স্পর্শ থেকে মুক্ত হয়ে শান্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল,
—”গ্রিন টি-টা খেয়ে নেবেন। ওটা আপনার মেজাজ ঠান্ডা করতে সাহায্য করবে।”

জেনিন নূরশাদ সেই রাতে আর ড্রিঙ্ক করলো না। সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, সে নোবারাকে জয় করতে চায়, কিন্তু নোবারা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে নতুন করে গড়ছে। তার ইগো তাকে বলছে, ওকে শেষ করে দাও, কিন্তু তার মন বলছে, ওকে আরও কাছে টেনে নাও!

চলবে ইংশাআল্লাহ……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here