#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪১
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
বহুদিন পর নূরশাদ ভিলার ড্রয়িংরুমটা আজ অন্যরকম লাগছে, কেমন যেন আজ ভিলাটা বাড়ি বাড়ি লাগছে! জানালার ভারী মখমলের পর্দাগুলো সরানো, সেখান দিয়ে সোনালি রোদ এসে শ্বেতপাথরের মেঝেতে আলপনা আঁকছে। জেনিন নূরশাদ আজ তার ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেট কিংবা বুলেটের বেল্ট পরেনি। তার পরনে একদম নিখুঁত ইস্ত্রি করা নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট। সাদা শার্টের কলারটা একটু উঁচু, গলায় সিল্কের টাই। সে নূরশাদ গ্রুপের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার(CEO)। অনেকদিন এই পরিচয় এ অফিস যাওয়া হয় না তার! তার চুলগুলো জেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ানো, আর মুখে চিরাচরিত দাম্ভিক কিন্তু মোহনীয় গাম্ভীর্য।
ইউজি সোফায় পা তুলে বসে আছে। তার পেটের ক্ষত এখন প্রায় শুকিয়ে গেছে। তার সামনে একটা গেমিং ল্যাপটপ। তবে আজ সে কোনো সার্ভার হ্যাক করছে না, বরং সে অনলাইনে সানগ্লাস অর্ডার করছে। তার কানে হেডফোন, আর মুখে এক চিলতে দুষ্টু হাসি।
“বস, আপনাকে আজকে যা লাগছে না! যেন কোনো হলিউড মুভির হিরো সদ্য জেল থেকে ছাড়া পেয়ে রিভেঞ্জ নিতে যাচ্ছে,” ইউজি ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই টিপ্পনী কাটল।
জেনিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার কবজিতে প্যাট্রেক ফিলিপ ঘড়িটা পরছিল। সে আয়নার মাধ্যমেই ইউজির দিকে তাকাল। “জেল থেকে নয় ইউজি, নরক থেকে। আর হিরো না, আমি সিইও। আজ একটা ইম্পর্টেন্ট ডিল আছে, তাই এই বেশ।”
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল নোবারা। পরনে জলপাই রঙের একটা জামদানি শাড়ি। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ভোরের শিশিরে ভেজা কোনো বেলি ফুল। নোবারার হাতে জেনিনের ল্যাপটপ ব্যাগ আর একটা ফাইল।
“জেনিন, আপনার ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেওয়া হয়েছে। আর এই নিন আপনার ব্যাগ!” নোবারা মিষ্টি হেসে জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
জেনিন নোবারার হাত থেকে ব্যাগটা নেওয়ার সময় তার আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিল। নোবারা একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামাল। এই দৃশ্য দেখে ইউজি সজোরে একটা কাশি দিল। ঝামেলা এক প্রকার শেষ! এই দুইজনের আবার রঙ্গলীলা দেখা লাগবে ইউজির!
“উহুম! উহুম! আপনার এই ড্রামা দেখে আমার তো মনে হচ্ছে বস আজ অফিসেই যাবেন না। ঘরেই মিটিং ডাকবেন,” ইউজি বিদ্রুপের সুরে বলল।
নোবারা জেনিনের পাশ থেকে সরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। “ইউজি! তোমার এই কথার প্যাঁচ কি কোনোদিন কমবে না? জেনিন অনেকদিন পর অফিসে যাচ্ছে, আর তুমি ওকে ডিস্টার্ব করছো?”
ইউজি ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যদিও নাটকীয়ভাবে নোবারার কাছে এল। “আমি ডিস্টার্ব করছি? আমি তো বসের রাইট হ্যান্ড! বসের খেয়াল রাখার দায়িত্ব আমার।”
নোবারাও টিপ্পনি কেটে বললো,
“ঠিক আছে। অসুস্থ তোমার খেয়াল রাখার দায়িত্ব ভাইয়ের বউ হিসেবে আমি নিলাম। তোমার জন্য লাঞ্চ এ নরম খিচুড়ি রাখবো, কারণ তোমার পেটের সেলাই এখনো কাঁচা।”
“খিচুড়ি!” ইউজি আকাশ ফেটে পড়ার মতো শব্দ করল। সে জেনিনের দিকে করুণ চোখে তাকাল। “বস! দেখছেন? নূরশাদ ভিলায় গণতন্ত্র নেই! একনায়কতন্ত্র চলছে! আপনি অফিস চলে গেলেই ম্যাম আমার ওপর অত্যাচার শুরু করেন।”
জেনিন হেসে ফেলল। কতদিন পর এই ঘরে এই হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “ঠিকই তো বলেছে। ডাক্তার যা বলেছে তা-ই শুনবে।”
নাস্তা করতে করতে শুরু হলো আসল লড়াই। জেনিন টেবিলের মাথায় বসে কফি খাচ্ছিল আর ফাইল দেখছিল। তার দুই পাশে নোবারা আর ইউজি।
“জেনিন, আজ ফেরার সময় আমার জন্য লাইব্রেরি থেকে ‘কোথাও কেউ নেই’ বইটা নিয়ে আসবেন?” নোবারা খুব আদুরে গলায় আবদার করল।
“বস! ওটা বাদ দিন,” ইউজি সাথে সাথে ফোড়ন কাটল। “ফেরার সময় নীলক্ষেতের ওপাশ থেকে আমার জন্য একটা মেকানিক্যাল কিবোর্ডটা নিয়ে আসবেন। ওটা ছাড়া আমার হ্যাকিং-এ আর সেই ফিল আসছে না।”
নোবারা জেনিনের হাত ধরল। “আগে আমার বই!”
ইউজি জেনিনের ওপরের পকেট থেকে তার পেনটা সরিয়ে নিল। “আগে আমার কিবোর্ড!”
জেনিন মহা ঝামেলায় পড়ল। সে দুইজনের দিকে একবার করে তাকাল। “এক কাজ করি, আমি কিছুই আনব না। তোমরা দুজন মিলে মারামারি করে ঠিক করো কারটা আগে আসবে।”
“না!” দুজন একসাথে চিৎকার করে উঠল।
নোবারা ইউজির দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল, “ইউজি, তুমি কেন সবসময় জেনিনের কাছে আমার চেয়ে বেশি ডিমান্ড করো? জেনিন আমার জামাই!”
ইউজি বুক ফুলিয়ে বলল, “আর জেনিন বস আমার লিডার! আমার পার্টনার! আপনি যখন বসের লাইফে ছিলেন না, তখন থেকে আমরা একসাথে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছি। সো, বসের ওপর আমার রাইট আপনার চেয়ে দশমিক এক পারসেন্ট বেশি।”
নোবারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে প্রায় কান্নাকাটি শুরু করল। “জেনিন, দেখছেন ও কী বলছে? ওর মুখটা বন্ধ রাখতে বলুন।”
জেনিন কফিটা নামিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারল এই ঝগড়া থামানো কঠিন। সে ইউজিকে চোখ টিপ দিল, যা নোবারা দেখতে পেল না।
“ইউজি, তুমি কালকে সুস্থ হয়ে ল্যাবে ফিরে যাবে। তখন তুমি যা চাইবে তা-ই পাবে। আর নূরা, আমি ফেরার সময় আপনার বই আর আপনার পছন্দের চকোলেট, সব নিয়ে আসব। ঠিক আছে?”
নোবারা বিজয়ের হাসি দিয়ে ইউজির দিকে তাকাল। ইউজি মুখ কাচুমাচু করে নিজের খিচুড়ির প্লেটের দিকে মন দিল।
জেনিন যখন ভিলার গেট দিয়ে বেরিয়ে তার কালো রোলস রয়েসে উঠল, তার সাথে ছিল এলিট ফোর এর চারজন স্যুট পরা বডিগার্ড। তারা অস্ত্র লুকানো অবস্থায় ছিল। জেনিন সিটের গা এলিয়ে দিয়ে জানালার বাইরে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা দেখতে লাগল।
সে যখন তার বিশাল কর্পোরেট টাওয়ারে পৌঁছাল, রিসেপশন থেকে শুরু করে টপ ফ্লোর পর্যন্ত সবার বুক দুরুদুরু করছিল। জেনিন নূরশাদকে সবাই একজন স্ট্রিক্ট আর স্মার্ট বিজনেস টাইকুন হিসেবে চেনে। তার সামনে কিঞ্চিত পরিমাণ ভুল করা মানেই চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া!
লিফটে ওঠার সময় তার এইচআর জানাল, “স্যার, বোর্ড অফ ডিরেক্টরসরা আপনার জন্য ওয়েট করছে। আর জাপানি ইনভেস্টররা আজ অনলাইনে কানেক্টেড হবে।”
জেনিন তার কেবিনে ঢুকে নিজের রিভলভারটা ড্রয়ারের ভেতর লক করে রাখল। সে এখন একজন পেশাদার। সে ল্যাপটপ খুলতেই নোবারার একটা মেসেজ এল, সাবধানে থাকবেন। আর ইউজি বেজিটাকে আপনার কাছ থেকে দূরে রাখবেন।”
জেনিন মৃদু হাসল। সে ভাবল, এই সাধারণ খুনসুটিগুলোই তো জীবনের আসল প্রাপ্তি। যুদ্ধের ময়দানে সে রক্ত ঝরিয়ে জয়ী হয়, কিন্তু এই ঘরের লড়াইয়ে হারতেই তার বেশি আনন্দ।
<><><><><><><><><>
বিকেল চারটা। জেনিন নূরশাদ তার অফিস শেষে যখন বাড়ির পথে রওনা হলো, তখন তার মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ছিল। আজ জাপানি ইনভেস্টরদের সাথে ডিলটা সফল হয়েছে। সে তার রোলস রয়েসের পেছনের সিটে বসে ভাবছিল, নোবারা হয়তো এতক্ষণে সুন্দর করে সেজে তার জন্য অপেক্ষা করছে, আর ইউজি হয়তো কোনো নতুন গেমের কোড নিয়ে ব্যস্ত।
কিন্তু জেনিন নূরশাদ কি জানত, নূরশাদ ভিলার ভেতরে আজ এক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে?
জেনিন গাড়ি থেকে নেমে ভিলার ভেতরে পা রাখতেই নাকে এক অদ্ভুত গন্ধ পেল। এটি বারুদের গন্ধ নয়, তবে এর চেয়েও কোনো অংশে কম ভয়াবহ কিছু নয়। মনে হচ্ছে পোড়া মাংস আর মশলার এক খিচুড়ি পাকানো গন্ধ সারা ভিলার এসি নালী দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় জেনিন শুনল কিচেনের দিক থেকে বিকট চিৎকার।
“ইউজি! ওটা ধনেপাতা না, ওটা পুদিনা পাতা! তুমি সব নষ্ট করে দিলে!” এটি নোবারার গলা।
“ম্যাম, গুগলে লেখা আছে পুদিনা দিলে ফ্লেভার বাড়ে! আর তাছাড়া, আমার সিক্স সেন্স বলছে এই ঝোলে আরও দুই চামচ মরিচ লাগবে!” এটি ইউজির আত্মবিশ্বাসী জবাব।
জেনিন নিঃশব্দে কিচেনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যা দেখল তাতে তার চক্ষু চড়কগাছ। নোবারার গালে ময়দা লেগে আছে, শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা। আর ইউজি…সে তার হুইলচেয়ার ছেড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বড় একটা হাতা দিয়ে কড়াইয়ে নাড়া দিচ্ছে, তার মাথায় একটা অদ্ভুত কুকিং হ্যাট। পুরো কিচেন যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। মেঝেতে ডিমের খোসা, মশলার কৌটাগুলো এদিক ওদিক ছিটকে পড়ে আছে।
জেনিন দরজায় হেলান দিয়ে গলা পরিষ্কার করল। “উহুম! আমি কি ভুল করে কোনো রেস্টুরেন্টের ব্যাক ইয়ার্ডে ঢুকে পড়লাম?”
নোবারা আর ইউজি একসাথে চমকে ফিরে তাকাল। জেনিনকে দেখে নোবারা যেন হাতে আকাশ পেল।
“জেনিন! দেখুন আপনার এই রাইট হ্যান্ডের কাণ্ড! ও বলছে ও নাকি ইন্টারনেটে ইতালিয়ান শেফের রেসিপি শিখেছে, আর এখন দেখুন আমার সাধের ইলিশ মাছের কী হাল করেছে!” নোবারা নালিশের সুরে বলল।
ইউজি হাতাটা হাতে নিয়েই জেনিনকে স্যালুট দিল। “বস! ম্যাম আসলে পুরোনো দিনের রান্না পছন্দ করেন। আমি চেয়েছিলাম আপনার জন্য ‘
ইলিশ-পাস্তা বানাতে। কিন্তু ম্যাডাম মাঝপথে ইন্টারফেয়ার করে পুরো রান্না নষ্ট করে দিয়েছে।”
জেনিন এগিয়ে এসে কড়াইয়ের ভেতরে উঁকি দিল। সেখানে যা রান্না হচ্ছে, তা দেখতে কোনোভাবেই ইলিশ মাছের মতো লাগছে না। জেনিন এক হাত দিয়ে নিজের কপাল টিপে ধরল।
“নূরা, আপনি ওকে কিচেনে ঢুকতে দিলেন কেন?”
নোবারা মুখ ফুলিয়ে বলল, “ও তো জোরাজুরি করছিল যে ও নাকি আপনার জন্য স্পেশাল ডিনার বানাবে। আমি তো সাহায্যের জন্য এনেছিলাম, এখন দেখুন আমার অবস্থাও ওর মতো করে ছেড়েছে।”
এক ঘণ্টা পর। কিচেনের বিশৃঙ্খলা কোনোমতে সামলে তারা ডিনার টেবিলে বসল। জেনিন মাঝখানে, একপাশে নোবারা আর অন্যপাশে ইউজি। জেনিন দেখল টেবিলে দুই ধরণের রান্না। একপাশে নোবারার করা সাধারণ ভাত আর তরকারি, অন্যপাশে ইউজির বিস্ফোরক বিদঘুটে রান্না।
“বস, আগে আমারটা টেস্ট করুন,” ইউজি খুব আগ্রহ নিয়ে জেনিনের প্লেটে এক চামচ অদ্ভুত দেখতে ঝোল তুলে দিল।
নোবারা জেনিনের প্লেটে তার নিজের রান্না করা মুরগির মাংস তুলে দিল। “জেনিন, খবরদার ওটা খাবেন না। পেট খারাপ করবে। আমারটা খান।”
জেনিন মহা বিপদে। কিন্তু সে প্রথমে নোবারার রান্না করা মাংস খেল। “দারুণ হয়েছে নূরা। একদম মনের মতো।”
নোবারা বিজয়ের হাসি দিয়ে ইউজির দিকে তাকাল। ইউজি মুখটা কালো করে বসে রইল। জেনিন বুঝতে পারল ইউজি মনে কষ্ট পেয়েছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইউজির অদ্ভুত রান্নাটা এক চামচ মুখে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে জেনিনের কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। মরিচের ঝাল আর লেবুর টক মিলে এক পৈশাচিক স্বাদ। কিন্তু জেনিন শক্ত হয়ে বসে রইল। সে দেখল ইউজি খুব আশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“কেমন হয়েছে বস?” ইউজি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
জেনিন ঢোক গিলে বলল, “ইউজি…তোমার এই রান্নার নাম হওয়া উচিত ছিল সাইলেন্ট কিলার। স্বাদটা একদম… ইউনিক। মানে, এতোটাই সেরা যে জীবনে দ্বিতীয়বার কেউ এটা ট্রাই করার সাহস পাবে না।”
ইউজি খুশিতে গদগদ হয়ে গেল। “দেখলেন ম্যাম? বস আমার ইউনিক টেস্টের প্রশংসা করেছেন!”
নোবারা জেনিনের অবস্থা বুঝতে পেরে এক গ্লাস পানি তার দিকে এগিয়ে দিল। “আপনার মুখ তো একদম লাল হয়ে গেছে! ইউজি, তুমি আর কোনোদিন কিচেনে ঢুকবে না। এটা আমার অর্ডার।”
ইউজি পানি খেতে খেতে বলল, “ঠিক আছে, কিচেন আপনার। কিন্তু ভিলার এসি আর লাইটের কন্ট্রোল তো আমার কাছে। আজ রাতে দেখবেন এসি কীভাবে ১৮ ডিগ্রি থেকে হঠাৎ করে ৩২ ডিগ্রি হয়ে যায়!”
নোবারা জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। “দেখছেন জেনিন? ও আমাকে থ্রেট দিচ্ছে!”
জেনিন হাসতে হাসতে বলল, “ইউজি, যদি এসির টেম্পারেচার চেঞ্জ হয়, তবে কাল তোমার নতুন কিবোর্ড আর আসবে না। মনে রেখো।”
ইউজি সাথে সাথে শান্ত হয়ে গেল। “ওকে বস, সিস্টেম রিবুট করছি। আমি ভালো হয়ে গেছি।”
সাথে সাথে তিনজনই সমস্বরে হেসে উঠলো! বহুদিন পর জেনিন নূরশাদ যেন আজ মন খুলে হাসলো!
<><><><><><><><><>
দিন পাঁচেক পর! জেনিন নূরশাদ তার অফিস থেকে যখন ফিরল, তখন ঘড়িতে রাত দশটা। আজ তার হাতে কোনো ফাইল নেই, নেই কোনো ল্যাপটপ ব্যাগ। পরিবর্তে তার এক হাতে খুব সযত্নে ধরা এক তোড়া সাদা বেলি আর রজনীগন্ধার তোড়া, আর অন্য হাতে একটি ছোট কারুকাজ করা কাগজের ব্যাগ। যে ব্যাগের ভেতর থেকে টুংটাং শব্দ আসছে, কাঁচের চুড়ির চিরচেনা ছন্দ।
জেনিন খুব নিঃশব্দে ভিলার দোতলায় উঠে এল।সে তাদের শোবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত থামল। নিজের বুকের ধকধকানি সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। কতগুলো রক্তঝরা রাত পার করার পর আজ সে একজন সাধারণ প্রেমিকের মতো উপহার নিয়ে ফিরেছে।
সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরটা অন্ধকার, কেবল বারান্দা দিয়ে আসা চাঁদের আলো মেঝের ওপর এক মায়াবী চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নোবারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। জেনিনের পায়ের শব্দে সে চট করে ঘুরে তাকাল।
“এত দেরি কেন?” নোবারার কণ্ঠে অভিমান।
জেনিন কোনো উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। সে ফুলের তোড়াটা নোবারার দিকে বাড়িয়ে দিল। ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ মুহূর্তেই ঘরের তপ্ত অভিমানকে শীতল করে দিল। নোবারা অবাক হয়ে তোড়াটা হাতে নিল।
“এসব কী?” নোবারা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“ফেরার পথে দেখলাম এক বৃদ্ধা রাস্তার মোড়ে বেলি ফুল বিক্রি করছেন। হঠাৎ মনে হলো, আমার ফুলের তো বেলি ফুল খুব প্রিয়,” জেনিন মৃদু হেসে বলল।
নোবারা ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে হাসল, কিন্তু তার নজর গেল জেনিনের অন্য হাতে থাকা ব্যাগটির দিকে। “আর ওটাতে কী?”
জেনিন ব্যাগ থেকে একটি নীল রঙের বাক্সের ভেতর রাখা রেশমি কাঁচের চুড়িগুলো বের করল। নীল জ্যোৎস্নায় গাঢ় নীল চুড়িগুলো যেন হিরের মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
নোবারার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। জেনিন একে একে নোবারার কোমল হাতে চুড়িগুলো পরিয়ে দিতে শুরু করল। কাঁচের সাথে কাঁচের সেই রিনরিন শব্দ যেন এক নীরব সঙ্গীত তৈরি করল ঘরে। জেনিন যখন শেষ চুড়িটা পরানো শেষ করল, সে নোবারার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।
“আপনি আমার নূরা। কেবলমাত্র জেনিন নুরশাদ এর নূরা!” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
নোবারা জেনিনের বুকের ওপর মাথা রাখল। জেনিন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে আসা বাতাস নোবারার খোলা চুলগুলো উড়িয়ে জেনিনের মুখে আছড়ে পড়ল। জেনিন অনুভব করল, এই মানুষটিকে পাওয়ার জন্য সে হাজার বার মরতে রাজি আছে।
কিছুক্ষণ পর নোবারা মাথা তুলল। তার চোখে এখন দুষ্টুমি ভরা হাসি। সে জেনিনের স্যুটের বাটন নিয়ে খেলতে খেলতে বলল, “আচ্ছা জেনিন, আপনি কি সত্যিই এই চুড়িগুলো নিজে পছন্দ করেছেন? নাকি ইউজিকে দিয়ে আনিয়েছেন?”
জেনিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। “নিজে পছন্দ করেছি নূরা। ইউজিকে বললে তো ও নীল চুড়ির বদলে কোনো ইলেকট্রনিক তার নিয়ে আসত।”
নোবারা খিলখিল করে হেসে উঠল। “তা অবশ্য ঠিক। ও তো আবার আপনার রাইট হ্যান্ড। ও শুনলে নিশ্চয়ই হিংসায় জ্বলে যাবে যে আপনি আমার জন্য গিফট এনেছেন!”
“ওর কথা বাদ দিন তো,” জেনিন নোবারার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। “আজ শুধু আমরা।”
জেনিন নোবারাকে পাজ কোলে তুলে নিয়ে বারান্দার দোলনায় গিয়ে বসল। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ আজ যেন নূরশাদ ভিলার ওপর থমকে দাঁড়িয়েছে। জেনিন নোবারার চুলে মুখ গুঁজল। সে অনুভব করতে পারল নোবারার শরীরের সেই পরিচিত সুগন্ধ, যা তাকে সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
“জেনিন,” নোবারা খুব আদুরে গলায় ডাকল।
“হুম?”
“আপনি কি সারাজীবন এভাবেই সিইও হয়ে থাকবেন? মাফিয়া হওয়ার চেয়ে এই রূপটা আপনাকে অনেক বেশি মানায়,” নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
জেনিন একটু ম্লান হাসল। “আমি চেষ্টা করব নূরা। কিন্তু পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। তবে আমি কথা দিচ্ছি, এই ড্রেসের নিচে থাকা মানুষটা সবসময় আপনার জেনিন হয়েই থাকবে। শুধুই নোবারার!”
নোবারা জেনিনের ঠোঁটে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে দিল। জেনিন তাকে কাছে টেনে নিল। তাদের চারপাশের পৃথিবীটা আজ যেন এক পরম শান্তিতে ডুবে গেছে। বারান্দার এক কোণে থাকা টবে ফোটা হাসনাহেনার গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
রাত গভীর হচ্ছে। ভিলার ভেতরের বাতিগুলো নিভে গেছে। শুধু জেনিনের ঘরের জানালার কাঁচ দিয়ে নীল আলো ভেতরে এসে পড়ছে। জেনিন আর নোবারা দোলনা থেকে উঠে ঘরে এল। জেনিন নোবারাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার পাশে বসল। নোবারার হাতের চুড়িগুলো অন্ধকারেও টুংটাং শব্দ করছিল।
“ঘুমিয়ে পড়ুন নূরা,” জেনিন নোবারার কপালে হাত বুলিয়ে বলল।
“আপনি ঘুমাবেন না?” নোবারা জেনিনের হাতটা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল।
“আমি আপনাকে দেখবো। আমার আদুরে মিষ্টি বউয়ের মতো লাগছে আপনাকে!” জেনিন হাসল।
নোবারার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু সে জেনিনকে এত সহজে ছাড়ার পাত্রী নয়। সে জেনিনের হাতটা একটু ঝাঁকিয়ে আবদার করল, “আমাকে একটা গান শোনাবেন? খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।”
জেনিন অবাক হওয়ার ভান করে ভ্রু কুঁচকালো। “গান? নূরা, এখন না। আমার গলা বসে গেছে ঠান্ডায়।”
নোবারা ছাড়ল না। সে জেনিনের গলার কাছে মুখ নিয়ে একটু আদুরে স্বরে বলল, “না, আমি জানি আপনার গলা অনেক সুন্দর। প্লিজ জেনিন, একটা গান শোনান। না শোনালে কিন্তু আমি আজ আর চোখ বন্ধ করব না।”
নোবারার মিষ্টি জেদের কাছে জেনিন বরাবরই অসহায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। তারপর নোবারাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরে তার কানের কাছে খুব ভরাট আর নিচু স্বরে গাইতে শুরু করল। জেনিনের সেই মাদকতাময় কণ্ঠস্বর এই নিস্তব্ধ ঘরটাতে এক মায়াবী সুর ছড়িয়ে দিল,
“দখিনা মাতাল হাওয়া যখন বয়ে যায়
মনে হয় তুমি এসে জড়ালে আমায়
আর জ্বালা দিও না দুরে দুরে থেকো না
ভালবাসার আবেশে তুমি কাছে আসোনা
আর জ্বালা দিও না দুরে দুরে থেকো না
ভালবাসার আবেশে তুমি কাছে আসোনা!”
গান শেষ করে জেনিন নোবারার চোখের পাতায় একটা গভীর চুমু দিল। নোবারা অনুভব করল, জেনিনের এই সাধারণ গানের কলিগুলো তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুর। জেনিন ফিসফিস করে বলল, “শুনলেন তো? এবার চুপচাপ চোখ বন্ধ করুন। আমি জেগে আছি আপনার পাহারাদার হয়ে।”
নোবারা জেনিনের হাতে মাথা রেখে চোখ বুজল। জেনিন অনেকক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। সে দেখল নোবারার শান্ত মুখটা। সে মনে মনে প্রার্থনা করল, এই শান্তি যেন কোনোদিন শেষ না হয়। জেনিন নূরশাদ আজ নিজেকে পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ মনে করছে। সে তার অন্ধকার জগত থেকে বেরিয়ে এক আলোর বৃত্তে পা রেখেছে, যেখানে কেবল ভালোবাসা আর হাসির শব্দ!
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।
(ইউজি বেজিটার জন্য একটা রমণী আনতে হবে। এই ছেলেটা জেনূরার রোমান্স এ ডিস্টার্ব করতেছে!😒)

