Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৫১

0
1

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫১
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ এর অধীনে পরিচালিত একটি জুয়েলারি শোরুম। বাইরের ঝকঝকে কাঁচের দেওয়াল আর ভেতরে হাজারো আলোকচ্ছটায় উজ্জ্বল এই শোরুমটি সাধারণের প্রবেশাধিকারের বাইরে ছিল না ঠিকই, কিন্তু এর প্রতিটি পণ্যের দাম মধ্যবিত্তের কল্পনার অতীত। আজ বিকেলে শোরুমের ম্যানেজার ইমতিয়াজ সাহেব খুব অস্থির। তিনি জানেন, আজ শহরের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মহলের কয়েকজন নারী সদস্য এখানে আসছেন নতুন কালেকশন দেখতে। ইমতিয়াজ সাহেব স্টাফদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যেন কোনো খুঁত না থাকে।

ঠিক সেই সময় শোরুমের অটোমেটিক কাঁচের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। শোরুমের ভেতরে প্রবেশ করলেন এক নারী। পরনে সাধারণ সুতির একটি হালকা নীল রঙের শাড়ি, গলায় কোনো ভারী গয়না নেই বললেই চলে। তার চেহারায় কোনো প্রসাধন নেই, কেবল চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। শোরুমের নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে তাকে সাধারণ কোনো পথচারী ভেবে বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু নোবারার চোখের দিকে তাকানোর পর তার হাত আপনাআপনিই নেমে গেল।

নোবারার হাঁটার ভঙ্গি, তার চিবুক উঁচিয়ে রাখা আভিজাত্য, এবং তার সহজাত গাম্ভীর্য দেখে শোরুমের ম্যানেজার ইমতিয়াজ সাহেবকে মুহূর্তে উঠে দাঁড়াতে হলো।

নোবারা শোরুমে প্রবেশ করার সাথে সাথে স্টাফরা শশব্যস্ত হয়ে উঠল। যদিও তারা জানত না এই শাড়ি পরা সাধারণ নারীটি স্বয়ং জেনিন নূরশাদের স্ত্রী এবং এই সাম্রাজ্যের পরোক্ষ সিইও, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের সামনে মাথা নত না করে তাদের উপায় ছিল না। ইমতিয়াজ সাহেব দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন, “ম্যাম, স্বাগত। আপনি কী ধরণের জুয়েলারি দেখছিলেন? আমরা কি আপনাকে আমাদের ভল্ট রুম দেখাতে পারি?”

নোবারা খুব শান্ত গলায় বলল, “না, ভল্ট দেখার দরকার নেই। আমি জাস্ট একটু ঘুরে দেখছি।”

নোবারা শোরুমের প্রতিটি গ্লাস কেস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। তার মনে কোনো বিশেষ কেনাকাটার উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল একটি শান্ত বিকেল কাটানোই ছিল লক্ষ্য। জেনিন অফিসে র কাজের বাহানা দিয়ে গ্ৰামে গেলো না আজ। তার উপর নোবারা তনুজাকে কত করে বললো সাথে আসতে। কিন্তু মেয়েটাও শরীর খারাপ এর বায়না দিয়ে এলো না। আবার নীলিমা ও অফিসে এখন। ওকে নিয়ে আসলে ইউজি তার মাথাটায় খেয়ে নিত হয়তো! যা নীলিমা পাগল হয়েছে এই ক’দিনে! অগত্যা নিজেই চলে এসেছে নিজের কোম্পানি দিতে। ইদানিং সে বড্ড জেনিনের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছিল!

ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে নোবারার দৃষ্টি আটকে গেল একটি নেকলেসের ওপর। সেটি কোনো সাধারণ গয়না নয়…হীরা এবং নীলকান্তমণির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা সূর্যের আলোয় এক মায়াবী নীল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। নেকলেসটির ডিজাইন অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্ম, যেন কোনো দক্ষ কারিগর তার হৃদয়ের সবটুকু সময় দিয়ে এটি তৈরি করেছেন।

ঠিক সেই মুহূর্তেই শোরুমের অন্য পাশ থেকে আরও একজন নারী এগিয়ে এলেন। তিনি বেশ জমকালো পোশাক পরে আছেন, হাতে দামী ব্যাগ, শরীরে প্রচুর সোনার গয়না। তিনি সম্ভবত শহরের কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রভাবশালী কোনো নেত্রী বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ওয়াইফ হবেন। তার দৃষ্টিও একই নেকলেসটির ওপর পড়ল। তিনি ম্যানেজারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “ম্যানেজার, এই নেকলেসটা আমার জন্য প্যাক করো। এটা একদম আমার ইভিনিং গাউনের সাথে ম্যাচ করবে। দাম যা-ই হোক, কোনো সমস্যা নেই।”

ম্যানেজার ইমতিয়াজ সাহেব কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “ম্যাম, এটি আমাদের নতুন কালেকশন। আমাদের এই ম্যাডামও এটি দেখছেন।”

সেই নারীটি নোবারার দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকালেন। নোবারার সাধারণ শাড়ি আর তার নিজের দামী পোশাকের তফাৎটা তিনি খুব বড় করে দেখাতে চাইলেন। তিনি মুচকি হেসে বললেন, “ওহ, ইনি বোধহয় বাজেট খুঁজছেন। শোরুমে তো অনেকেই আসে সময় কাটাতে। ম্যানেজার, আমি চেক দিচ্ছি, তুমি এখনই এটা প্যাক করো।”

নোবারা, যে এতদিন নিজের ব্যক্তিত্বের আবরণে সব কিছু সহ্য করে এসেছে, আজ কেন যেন সেই নীলকান্তমণির নেকলেসটির ওপর এক অদ্ভুত অধিকারবোধ অনুভব করল। তাছাড়া তাকে এভাবে নিচু করে কথা বলার ও তো কোন মানে য়হ না! নোবারা শান্ত গলায় বলল, “এট২ আমার পছন্দ হয়েছে। আমি এটাই নেব।”

ম্যানেজার ইমতিয়াজ সাহেব এবার বড় বিপদে পড়লেন। ম্যানেজার তোতলাতে তোতলাতে বললেন, “ম্যাম… আসলে আমরা বিষয়টি কীভাবে সমাধান করব?”

নোবারা এবার একটু জেদী হয়ে উঠল। তার গলার স্বর কিছুটা তীক্ষ্ণ হলো, “আমি বলেছি এটি আমি নেব। আমি অন্য কাউকে এটি দেওয়ার অনুমতি দিতে পারছি না।”

সেই নারীটি এবার রুক্ষ হয়ে বললেন, “তুমি কে? আমার সাথে পাল্লা দিচ্ছ? আমি এই শহরের… তুমি জানো না আমি কে?”

নোবারা এবার একটু হাসল। “আমি কে সেটা আপনার জানার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু এটুকুই যে, এই নেকলেসটি আজ আমার শোরুমের ট্রের ওপর রাখা হয়েছে।

ম্যানেজার এবার নোবারা নুরশাদ কে চিনতে পারলেন। কারণ নোবারার বাম হাতে যে নীল রঙের হীরের আংটি জ্বলজ্বল করছে ওটা জেনিন নুরশাদই তার কাছ থেকে নিজের ওয়াইফ এর জন্য কিনেছিল। ম্যানেজার এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। মালকিন কে না বলার সাহস তার নেই। আবার নিজের পেশাদারিত্ব ও বজায় রাখতে হবে তার। তিনি দ্রুত তার আইপ্যাড বের করলেন এবং জেনিন নূরশাদকে সরাসরি ফোন দিলেন। তিনি জানতেন, জেনিন এই সময়ে অফিসে খুব চাপের মধ্যে মিটিং করছে, কিন্তু গয়না নিয়ে এই বিবাদ নিরসনে মালিকের হস্তক্ষেপ ছাড়া উপায় নেই।

অপরপ্রান্তে জেনিন তখন বোর্ডের মিটিংয়ে। তার সামনে পাঁচজন বিদেশি বিনিয়োগকারী। ফোনটা বেজে উঠতেই সে বিরক্তি নিয়ে দেখল শোরুমের ম্যানেজারের কল। সে বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করে বলল, “কী হয়েছে ইমতিয়াজ? আমি এখন ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে আছি। কল মি লেটার।”

ম্যানেজার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “স্যার… শোরুমে খুব বড় সমস্যা হচ্ছে। গয়না নিয়ে বিবাদ… স্যার, আপনি না আসলে সমাধান করা যাচ্ছে না।”

জেনিন ফোনটা রেখেই বিরক্তি নিয়ে ফাইলটা ছুঁড়ে ফেলল। সে ভাবল, “শোরুমেও দেখি আজীব সব ঝামেলা!” সে দ্রুত মিটিং থেকে উঠে দাঁড়াল।

বিনিয়োগকারীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “গিভ মি সাম টাইম। আই’ল কাম ব্যাক।”

জেনিন তার ব্ল্যাক মার্সিডিজটা নিয়ে যখন শোরুমের সামনে এসে থামল, তখন সে ভীষণ ক্ষিপ্ত। সে শোরুমে ঢোকার আগেই ভাবছিল সে কাকে কাকে আজ চাকরি থেকে বরখাস্ত করবে। এদের দিয়ে একটা কাজ ও হয়না। সবকয়টা কে চাকরি ছাড়া করেই যাবে আজ।

জেনিনের চোয়াল শক্ত, কপালে রাগের ভাঁজ। সে শোরুমে ঢুকেই চিৎকার করে বলল, “ইমতিয়াজ! কোথায় সেই ঝামেলা? কার এতো সাহস যে আমার শোরুমে এসে হট্টগোল করছে?”

জেনিন দ্রুত পায়ে শোরুমের ভেতরে ঢুকল। কিন্তু তার পদক্ষেপ মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল। সে দেখল ম্যানেজার দাঁড়িয়ে আছে কোণায়, আর নেকলেসের কেসটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরণী নোবারা, যে কিনা তার দিকে তাকিয়ে আছে খুব শান্ত ভঙ্গিতে, যেন সে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে না, বরং তার নিজের অধিকারের লড়াই করছে। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে সেই উদ্ধত নারী, যার চোখে তখন জয়ের হাসি।

জেনিন স্তব্ধ। সে আশা করেনি যে তার জীবনের সবচাইতে শান্তিপ্রিয় মানুষটি, তার নূরা, এই বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। জেনিনের বুকের ভেতরে ধক করে একটা শব্দ হলো। তার রাগ মুহূর্তের মধ্যে স্থিমিত হয়ে গেল, কিন্তু সে বুঝতে পারল পরিস্থিতিটা বেশ জটিল, একারণেই ম্যানেজার কর দিয়েছে। সে ধীর পায়ে নোবারার কাছে এগিয়ে গেল।

নোবারা জেনিনের দিকে তাকালো…দেখল জেনিন রেগে আছে। সে এবার বলেই ফেললো,
“জেনিন, এই নেকলেসটা আমার পছন্দ হয়েছে, কিন্তু উনি এটা নিতে চাইছেন। আপনি ম্যানেজার কে বলুন এটা আমাকেই দিতে।”

জেনিন এক পলক নোবারার চোখের দিকে তাকাল। সে জানে নোবারা সাধারণত খুব সামান্য জিনিসে জেদ ধরে না। কিন্তু আজ নেকলেসটির নীলকান্তমণি নোবারার নীল শাড়ির সাথে অদ্ভুত মানিয়ে গেছে, যা জেনিন খেয়াল করেছে। জেনিন লম্বা শ্বাস নিয়ে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “নূরা, এটা খুব চিপ একটা নেকলেস। আমি আপনাকে এর চেয়েও সুন্দর আরেকটা ডিজাইন বানিয়ে দেব।”

নোবারার জেদ আজ সাত চড়েও কমছে না। সে জেনিনের দিকে এক জোড়া জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে বলল, “না। আমি অন্য কোনোটা চাই না। আমি এই নেকলেসটাই চাই।”

জেনিন অসহায় হয়ে পড়ল। তার পাশের সেই ধনী নারীটি বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, “মিস্টার নূরশাদ? আপনার শোরুমেও এখন দামাদামি শুরু হয়েছে? কান্ট ইমাজিন ম্যান! আমি তো চেক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।”

জেনিনের মনে হলো তার সমস্ত ক্ষমতা যেন এক মুহূর্তের জন্য অকেজো হয়ে গেল। সে একদিকে তার ব্যবসা, তার প্রোটোকল, আর অন্যদিকে তার নূরা…যে আজ পৃথিবীর সবচাইতে বড় অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করছে। জেনিন ম্যানেজারকে ইশারা করল দূরে থাকতে। সে নোবারার হাতটা ধরল। কিন্তু এক ঝটকায় নোবারা হাত ছাড়িয়ে নিল।

“আমি আপনাকে বলছি তো নূরা, আমি এর চেয়েও সুন্দর নেকলেস বানিয়ে দেব,” জেনিন আবার বলল, এবার একটু কঠোর স্বরে।

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে জল নেই, কিন্তু এক প্রচণ্ড অভিমান। “আপনি কি আমাকে এখন সবার সামনে ছোট করবেন? আপনিই তো বলেছিলেন, এই শোরুমের সব কিছু আমার? আমি কি আমার নিজের শোরুম থেকে একটা নেকলেস নিতে পারি না?”

জেনিনের কানে এই কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, সে যদি আজ নোবারার জেদ রক্ষা না করে, তবে নোবারা যে আঘাত পাবে, তা কোনো দামী নেকলেস দিয়ে পূরণ করা যাবে না। কিন্তু ব্যবসায়িক নীতি? একজন সিইও হিসেবে কি সে তার নিজের নিয়ম নিজেই ভাঙবে? জেনিন এক মহাবিপদসঙ্কুল মুহূর্তের মুখোমুখি।

জেনিন পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারল। উপস্থিত সবার সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা কেবল ব্যবসার ক্ষতি নয়, বরং তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কেরও পরীক্ষা। সে শান্ত গলায়, অত্যন্ত মার্জিতভাবে সেই ধনী নারীটির দিকে ফিরল।
“ইক্সকিউজ মি” জেনিন শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “আনফরচুনেটলি, এই নেকলেসটি নিয়ে আমাদের কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতা তৈরি হয়েছে। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, এটি আজ আপনাকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আপনার পছন্দমতো অন্য যেকোনো জুয়েলারি আপনি এখান থেকে আজ বিনামূল্যে নিতে পারেন আমাদের পক্ষ থেকে।”

সেই নারীটি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জেনিনের শীতল চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি আর সাহস পেলেন না। জেনিনের ইশারায় ম্যানেজার বিনয়ের সাথে তাকে অন্য সেকশনে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। শোরুমের পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নোবারার চোখের কোণে তখনো জেদের আগুন।

জেনিন ধীর পায়ে নোবারার কাছে এগিয়ে এল। সে আশেপাশে থাকা স্টাফদের ইশারা করল দূরে সরে যেতে।

জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার সিইও সুলভ গাম্ভীর্য আজ নোবারার জেদের কাছে হার মানছে। সে জানে নোবারা অন্যায় করছে না, সে শুধু তার অধিকারটুকু চাইছে, কিন্তু পদ্ধতিটা ভুল। জেনিন তার হাতের আঙুলগুলো নোবারার কাঁধের ওপর আলতো করে রাখল।
“নূরা, আপনি কি আমাকে বুঝছেন না? আমি নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ এর সিইও। যদি আজ আমি সবার সামনে আপনার জেদ মেনে নিই, তবে আমি আমার স্টাফদের কাছে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করব? আমাকে তো নিরপেক্ষ থাকতে হবে,” জেনিন খুব কষ্ট নিয়ে বলল।

নোবারা জেনিনের ব্লেজারের কলারটা ঝেড়ে দিয়ে বিরক্তির সাথে বলল, “আপনার এই নিরপেক্ষতা আমি মানি না। আপনি যদি আমাকে না দিতেই পারেন, তবে আমাকে এখানে একা রেখে চলে যান।” নোবারা পাশ ফিরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল চিকচিক করছে।

জেনিন দেখল নোবারা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। এই নেকলেসটা তার কাছে গয়না নয়, বরং জেনিনের মনোযোগের একটি পরীক্ষা। জেনিন বুঝতে পারল, সে যদি এখন তাকে নেকলেসটা দিয়ে দেয়, সে তার নৈতিকতা হারাবে, আর না দিলে সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে হারাবে।

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তারপর সে শান্তভাবে ম্যানেজারকে ডাকল। ম্যানেজার ভয়ে ভয়ে কাছে এলেন।

“এই নেকলেসটি আমাদের স্টকের রেকর্ড থেকে আজই মুছে ফেলুন। এটি বিক্রি হবে না। আর হ্যাঁ, এটা ম্যামের একাউন্টে অ্যাড করে দিন, পুরো মূল্য ম্যামের ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে কাটা হবে।”” জেনিন গম্ভীর স্বরে বলল। তারপর সে নোবারার দিকে তাকিয়ে খুব কোমল স্বরে বলল, “নূরা, আপনি এটি নিতে পারবেন না, কারণ এটি এখন থেকে আর শোরুমের বিক্রয়যোগ্য গয়না নয়। এটি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেল। আর ব্যক্তিগত সংগ্রহের গয়না আমি কাউকে দিই না, শুধুমাত্র আপনাকে ছাড়া।”

জেনিন ম্যানেজারকে ইশারা করল গয়নাটি বক্স থেকে বের করে তার হাতে দিতে। নোবারা অবাক হয়ে দেখল জেনিন ক্ষমতা দেখাচ্ছে, কিন্তু সে নেকলেসটি অন্য কাউকে দিচ্ছে না। জেনিন বক্সটি হাতে নিয়ে নোবারার দিকে এগিয়ে দিল।

“আমি জানি এটা অন্যায়,” জেনিন নোবারার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু আমি আজ আমার ব্যবসায়িক নীতির চেয়েও আপনার জেদকে প্রাধান্য দিচ্ছি। এবার খুশি?”

নোবারা অবাক। সে ভেবেছিল জেনিন তাকে নেকলেসটা দেবে না, কিন্তু জেনিন সব আইন ভেঙে তার হাতে বক্সটি তুলে দিল। নোবারা মনে মনে ভীষণ খুশি হলো, কিন্তু তার মুখের ওপরের সেই মেকি রাগের আবরণটি সরানোর সুযোগ সে এখনই দিচ্ছে না। সে বক্সটি নিয়ে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না, আমি খুশি না। একবার বলাতে দিতে পারেননি কেন তাই।”

সে দ্রুত পায়ে শোরুমের বাইরে বেরিয়ে গেল। জেনিন দাঁড়িয়ে রইল সেখানে, মানে এই মেয়েটাকে কলিজা কেটে খাওয়ালেও বোধহয় বলবে এখানে লবণ কম হয়েছে! তবে জেনিন বরাবরই নোবারার পাগলামী উপভোগ করে। এমন রোবটিক জীবনে নোবারার মতো একটা বিচ্ছু বউ থাকলে জীবনটা এতোটাও বোরিং হয় না! সে মাথা চুলকে হালকা হাসলো। স্টাফরা সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখছে তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বস কীভাবে নিজের বউয়ের কাছে হেরে গিয়েও তা হাসিমুখে মেনে নিলেন। এ যেন অষ্টম আশ্চর্য!

জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যানেজারকে ডেকে নিচু স্বরে বলল, “আজকের এই ক্ষতিপূরণ আমার বেতন থেকে কেটে নিও। ম্যামের কাছ থেকে নেওয়ার দরকার নেই।”

এই বলেই সে দ্রুত নোবারার পিছু নিল। শোরুমের বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। নোবারা হনহন করে হাঁটছে, আর জেনিন তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে। এতো বড় সিইও হয়েও সে তার স্ত্রীকে মানানোর জন্য এই জনবহুল ফুটপাথে পেছনে পেছনে ঘুরছে। হাঁটতে অবশ্য অসুবিধে হচ্ছে বয়কি, তবে অতটাও খারাপ লাগছে না। কতবছর পর যেন স্কুলের মতোই নোবারার পিছু নিয়ে হাঁটছে সে। সবকিছু কেমন ফিরে আসছে আবার!

“নূরা, প্লিজ শুনুন! আপনি এভাবে হাঁটবেন না, পা ব্যথা হবে,” জেনিন কাতর কণ্ঠে চিৎকার করে বলল।

নোবারা থামল না। সে আরও দ্রুত হাঁটতে লাগল। জেনিন বুঝতে পারল নোবারার মনের রাগ কমাতে তাকে আরও বেগ পেতে হবে। সে নোবারার হাতটা ধরতে গিয়েও থেমে গেল, কারণ সে জানে নোবারা এখন কতটা স্পর্শকাতর। ধরলে নিশ্চিত রাস্তায় সবার সামনে একটা থাপ্পর মেরে দিবে! রাগের ব্যাপারে তার নিজের বউকে সে নিজেই বিশ্বাস করে না। রূমের ভেতর কত যে মাইর খেয়েছে। তা কি আর জনসম্মুখে প্রকাশ করা যায়?

“আপনি কি চান আমি সবার সামনে আপনার কাছে ক্ষমা চাই?” জেনিন একটু মজা করেই বলল।

নোবারা এবার থেমে গেল। সে পেছনে ঘুরে জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ক্ষমা চাওয়ার নাটক করে লাভ নেই। আপনি আমাকে সবার সামনে শাসন করলেন কেন?”

রাস্তার ধারের মৃদু আলোকছটায় নোবারার চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল। তার রাগটা ছিল মূলত জেনিনের কঠোর শাসনের ওপর, যা সে সবার সামনে প্রয়োগ করেছিল। শোরুমের ম্যানেজার এবং সেই প্রভাবশালী নারীর সামনে জেনিনের ওই ‘সিইও’ রূপটি নোবারার কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তার এখন প্রচুর অভিমান হয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি কালো এসইউভি তাদের ঠিক পেছনে এসে থামল। জানালার কাঁচ নামতেই দেখা গেল ইউজি বসা, তার চোখেমুখে উদ্বেগ। ইউজি গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এল।
“ম্যাম, বস! আপনাদের রাস্তায় এভাবে একা ঘোরাঘুরি করা ঠিক হচ্ছে না। আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনাদের ফলো করছি। চারপাশটা একটু বেশিই ঝামেলার মনে হচ্ছে,” ইউজি নিচু স্বরে বলল। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে দুহাত ক্রস করে একটা ইশারা করল, যার অর্থ…কোনো এক অদ্ভুত গাড়ি তাদের পিছু নিয়েছে।

জেনিন মুহূর্তের মধ্যে তার ব্যক্তিগত আবেগ সরিয়ে পেশাদার হয়ে উঠল। সে নোবারাকে এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে এনে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আপনি এখনই গাড়িতে উঠবেন। বাসায় গিয়ে ঝগড়া করুন, মারুন ধরুন কিছু বলবো না। প্রমিজ।”

নোবারা বুঝতে পারল জেনিনের গলার স্বর বদলে গেছে। সে কোনো প্রশ্ন না করেই ইউজির খুলে দেওয়া গাড়ির দরজায় উঠে বসল। জেনিন গাড়িতে ওঠার আগেই ইউজিকে নির্দেশ দিল, “পিছনের গাড়িটাকে ট্র্যাক করো। যদি তারা আমাদের অনুসরণ করে, তবে শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে আটকানোর ব্যবস্থা করো।”

গাড়ির ভেতরে জেনিন নোবারার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। নোবারা এখন আর রাগ করতে পারছে না, তার ভয় হচ্ছে জেনিনের জন্য। সে জেনিনের হাতটা নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, “আপনি কি কোনো বিপদে আছেন?”

জেনিন জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে শান্ত গলায় নোবারার হাতে চুমু দিয়ে বলল,
“বিপদে থাকলেও আমি আপনার সাথেই আছি। চিন্তা করবেন না।”

বাড়িতে ফেরার পুরোটা পথ জেনিন একটি কথাও বলল না। সে বারবার তার ল্যাপটপ আর ফোনে কথা বলছিল। তাদের পিছু কে নিতে পারে? এই নিয়েই মূলত তার আন্ডারগ্রাউন্ড অফিসার দল রিচার্জ করছে এখন।

নোবারা বুঝতে পারল, তার এই সামান্য জেদের কারণে জেনিনকে আজ বড় কোনো ব্যবসায়িক বা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। তার মনে এক ধরণের অনুশোচনা শুরু হলো। সে কেন জেনিনের ওপর এতোটা কঠোর হলো? রাস্তায় এভাবে সিনক্রিয়েট না করলেই হতো!

বাড়িতে পৌঁছানোর পর জেনিন নোবারাকে তার বেডরুমে পৌঁছে দিল। জেনিন নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। সাথে এও বললো যে, ‘যতক্ষণ না পর্যন্ত এই আমাদের মাঝে সব ঝামেলা ঠিক হচ্ছে, আমরা কেউই রুমের বাইরে যাবো না।’ নোবারা আর কিছু বললো না। তাদের মধ্যে ঝামেলা হলে, সবসময় এমন করে লোকটা। মিটমাট না হওয়ায় আগে ছাড়েই না! একারণেই তো নোবারার রাগ বেশিক্ষণ থাকে না। আবার জেনিনের ও ইচ্ছে করে না নোবারাকে এক মূহুর্তের জন্য ও রাগিয়ে রাখবে।

রুমের ভেতরে তখন এক পিনপতন নীরবতা। নোবারা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সেই নেকলেসটি রাখল। জেনিন তার পেছনে এসে দাঁড়াল। সে নোবারার কাঁধের ওপর নিজের থুতনি রাখলো।

“আপনার রাগ কি এখনো কমেনি, নূরা?” জেনিন খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

নোবারা ঘুরে দাঁড়িয়ে জেনিনের গলার টাইটা আলগা করে দিল। তার সবটুকু মেকি রাগ জল হয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু সে বলতে পারলো না। আজ সে নিজের কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করে ফেলেছে। নিজের উপর নিজেরই রাগ লাগছে তার।

“আপনি কি পারবেন আমাকে ক্ষমা করতে, সিইও স্যার?” নোবারা খুব আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল।

জেনিন মুচকি হেসে বলল, “আমি আপনার কাছে সবসময়ই হার মানতে রাজি, নূরা।”

নোবারা হাসল। তার সমস্ত অভিমান মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে গেল। জেনিন তার স্ত্রীর গলা থেকে শাড়িটা একটু সরিয়ে টেবিল থেকে নেকলেসটি পরিয়ে দিল। নীলকান্তমণিটি নোবারার নীল শাড়ির সাথে মিলেমিশে এক অপূর্ব শোভা তৈরি করল।

জেনিন নোবারার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেল। “চলুন আপনাকে জড়িয়ে ঘুমাবো। আমার এখন একটু শান্তি দরকার।”

নোবারা জেনিনের শার্টের হাতা ধরে বলল, “জানেন? আপনি যদি আজ আমাকে বকতেন, তবে আমি আরও বেশি খুশি হতাম। আমি তো ওসব রেগে থাকার নাটক করছিলাম। আপনি সবসময় আমাকে ছাড় দিয়ে দিয়ে খুব বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছেন।”

জেনিন হাসল। “প্রশ্রয় তো আমি আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্যই দিচ্ছি, নূরা। আপনার এই জেদগুলোই তো আমার একঘেয়ে জীবনে একমাত্র রঙের কাজ করে।”

নোবারা জেনিনের বুকের ওপর মাথা রাখল। জেনিন নূরশাদের মতো একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষও তার ভালোবাসার কাছে কত অসহায়। আর এই অসহায়ত্বটুকুই তাদের সম্পর্কের আসল সৌন্দর্য। সেই রাতে নূরশাদ ভিলার সব ঝগড়া, সব অভিমান আর সব উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটল এক নিবিড় ভালোবাসার উষ্ণতায়।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।

(আপনাদের হাত কি লোহার তৈরি? না মানে মরিচা পড়েছে নাকি যে হাতটা চালিয়ে আমার এত্তো বড় পর্বের জন্য এক লাইনো মন্তব্য করেছেন না যে!😾)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here