#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৪
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ভিলার ডাইনিং টেবিলে আজ প্রাতরাশ চলছে। টেবিলভর্তি খাবার, কিন্তু জেনিনের নজর কেবল নোবারার দিকে। সে খেয়াল করেছে, নোবারা আজ খাবারে একদমই মন দিতে পারছে না। তার হাতের চামচটা বারবার প্লেটের ওপর শব্দ করছে, আর তার চোখগুলো যেন ভিলার বিশাল জানালার বাইরের দিকে কোনো এক অজানা আশঙ্কার সন্ধানে স্থির হয়ে আছে। জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “কী ভাবছেন?”
নোবারা চমকে উঠল। সে জোর করে একটি ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। “কই কিছু না তো!”
জেনিন বিশ্বাস করল না, কিন্তু সে কিছু বলল না। সে জানে, এই সরলতার আড়ালে কোনো এক মেঘ জমছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিলার প্রবেশপথে কড়া নিরাপত্তাকে ফাঁকি দিয়ে এক অচেনা আগন্তুককে ঢুকতে দেখা গেল। ইউজি এবং অন্য গার্ডরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু আগন্তুকটি তার কোট থেকে একটি ফাইল বের করে উঁচু করে ধরল।
“জেনিন নূরশাদ! আপনার ভিলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি এতোটাই দুর্বল যে একজন সিআইডি অফিসারকে আপনার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়?”
জেনিন দ্রুত সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে তখন সেই চেনা মাফিয়া জেড-এর ঠান্ডা চাহনি। সে জানত সিআইডি তার পেছনে অনেকদিন ধরেই আছে, কিন্তু সরাসরি ভিলার ভেতরে ঢুকে পড়াটা চরম ধৃষ্টতা। জেনিন ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। নোবারা তার পিছু পিছু এল। আগন্তুকটির পরনে সাধারণ ছাই রঙের শার্ট, চোখে তীক্ষ্ণ এক চশমা। তার নাম মাহিতো। সিআইডির স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের একজন দুর্ধর্ষ এজেন্ট।
মাহিতো জেনিনের দিকে তাকিয়ে এক বাঁকা হাসি হাসল। সে নোবারার দিকে সরাসরি তাকাল না, কিন্তু তার চোখের কোণায় এক ধরণের শীতল দৃষ্টির ইঙ্গিত ছিল যা কেবল নোবারাই বুঝতে পারল।
“মি: নূরশাদ, আমি আপনাকে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাতে আসিনি,” মাহিতো ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখল।
“আমি এসেছি আপনার ঘরের ভেতরের একটা রহস্য সমাধান করতে। আমাদের টিমের একজন অফিসার গত চার মাস ধরে নিখোঁজ। আর কাকতালীয়ভাবে, সেই নিখোঁজ হওয়ার আগে তার শেষ লোকেশন ছিল এই নূরশাদ ভিলা।”
নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এই সেই উপদ্রব, যার ভয় সে গতকাল রাতের কলটা আসার পর থেকেই পাচ্ছিল। ব্যাস, জেনিনের মন মানসিকতা ভালো না থাকায় সে বলতে পারেনি! কিন্তু এখন!এখন কি বলবে সে?
জেনিন মাহিতোর দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তার ভ্রু কুঁচকে আছে।
“আপনার টিমের অফিসার কোথায় হারিয়েছে, সেটা খোঁজার দায়িত্ব আমার নয়। আর নূরশাদ ভিলা কোনো গোয়েন্দা সংস্থা নয়, এটা আমার বাড়ি।”
মাহিতো এবার জেনিনকে পাশ কাটিয়ে নোবারার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। সে ফাইলটা থেকে একটি ছোট ছবি বের করল..ছবিটি সেই হারিয়ে যাওয়া সিআইডি অফিসার এর ট্রেনিংয়ের সময়কার। মাহিতো ছবিটা নোবারার চোখের সামনে ধরল।
“মিসেস, আপনি কি এই অফিসারকে চেনেন? খুব দক্ষ ছিলেন তিনি। আমাদের টিমের সেরা অফিসার। কিন্তু জেনিন নূরশাদের প্রেমে পড়ার পর তিনি সিআইডির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন!”
নোবারার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে জেনিনের দিকে আড়চোখে তাকাল। জেনিনের দৃষ্টি তখন তীক্ষ্ণ হয়ে মাহিতোর মাঝেই স্থির হয়ে আছে। সে বুঝতে চেষ্টা করছে, এই অফিসার কিসের ছবি দেখালো নোবারাকে যে, নোবারা অস্থির হয়ে যাচ্ছে!
নোবারার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে কাঁপা গলায় বলল, “আমি… আমি তো একে চিনি না। আপনি ভুল করছেন।”
মাহিতো খুব ধীর গলায় বলল, “ওহ! একটা কথা মনে রাখবেন মিসেস, বিশ্বাসঘাতকতার দাম কেবল জেনিন নূরশাদই আদায় করে না, সিআইডিও আদায় করে।”
জেনিন মাহিতোর কথার পিঠে কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না, কারণ বাঘ কখনো শিয়ালের সাথে তর্কে জড়ায় না। সে মাহিতোর চোখের ঠিক গভীরে নিজের বরফশীতল দৃষ্টি গেঁথে দিল। জেনিনের হাতের আঙুলগুলো নোবারার কাঁধের ওপর আরও একটু চেপে বসল, এটা কেবল অধিকার নয়, বরং এক ভয়ংকর প্রহরীর সতর্কবার্তা।
খুব ধীরস্থিরভাবে, বিষাক্ত সাপের হিসহিসানির মতো নিচু স্বরে জেনিন মাহিতোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ফাইলটা নিয়ে এখনই আমার সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে যান। এরপর যদি আমার ডোমেইন এর ডার্ক এজেন্সি কথা বলা শুরু করে, সিআইডি কেবল আপনার ইউনিফর্মটাই ফেরত পাবে, শরীরটা নয়।”
মাহিতো জেনিনের চোখের দিকে তাকাল। সে জানে জেনিন নূরশাদ কী করতে পারে। সে একটা বিকৃত হাসি দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। যাওয়ার সময় সে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সময় শেষ হয়ে আসছে, অফিসার। বাঁচতে চাইলে পালান।”
নোবারা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার জেনিনের কাছে করা প্রতিটি মিথ্যা, প্রতিটি লুকোচুরি আজ যেন একটা বড় ভূমিকম্প হয়ে তার পায়ের নিচে আঘাত করছে। সে জানে, মাহিতো এখানেই থামবে না। তার আসল পরিচয় কি জেনিন আজই জেনে যাবে? জেনিনের সেই চেনা শীতল চাহনি তার দিকে ফিরছে। জেনিন কি কিছু সন্দেহ করেছে?
জেনিন স্থির দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল, যেখান দিয়ে মাহিতো বেরিয়ে গেছে। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে, চোখের কালো আভা এখন কুচকুচে কালো। মাহিতোর বলা প্রতিটি শব্দ জেনিনের মগজে বিষের মতো কাজ করছে। সে কি বুঝতে পারছে না নোবারা কেন এতোটা অস্থির হয়ে পড়েছে?
“নোবারা” জেনিন গম্ভীর স্বরে ডাকল।
নোবারা জেনিনের দিকে তাকাতে পারছে না। তার শরীরের প্রতিটি কোষ কাঁপছে। মাহিতোর দেওয়া হুমকি আর তার নিজের অতীত পরিচয়..এই দুয়ের চাপে সে পিষ্ট হচ্ছে। সে দ্রুত জেনিনের দিকে এগিয়ে গেল এবং জেনিনের দুহাত নিজের হাতে চেপে ধরে আর্তনাদের সুরে বলল,
“জেনিন, আমাদের এখনই কোথাও চলে যেতে হবে। এই মুহূর্তেই! আপনি সব কাজ গুটিয়ে নিন, আমরা আজই শহর ছেড়ে চলে যাই। প্লিজ, আমাকে কোনো প্রশ্ন করবেন না, শুধু চলুন আমার সাথে!”
জেনিন ভ্রু কুঁচকে নোবারার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল এক ধরণের অবাক করা নির্লিপ্ততা।
“হুট করে? নূরা, পরশু আমাদের বিয়ের সব আয়োজন কমপ্লিট। আমার হাতে চারটা বড় প্রজেক্টের সই করা বাকি। তাছাড়া, এই মাহিতো নামের লোকটার সামান্য একটা হুমকির কারণে আমি আমার সাম্রাজ্য আর আমার সংসার ফেলে পালাব? এটা কি জেনিন নূরশাদের স্বভাব হতে পারে?”
“জেনিন, আপনি আমাকে বুঝতে পারছেন না!” নোবারা চিৎকার করে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তার কণ্ঠস্বর ছোট হয়ে এল। “সবকিছু বিপদজনক হয়ে উঠছে। আপনি প্লিজ, আমার কথা শুনুন। ব্যবসা, টাকা…কিছুই আপনার চেয়ে দামী নয়।”
জেনিন নোবারার কাঁধটা আলতো করে ধরে শান্ত গলায় বলল, “আপনি বড্ড অস্থির হয়ে পড়েছেন। ওই লোকটা আপনাকে ভয় দেখিয়েছে, আমি বুঝতে পারছি। লোকটার কথা ভাববেন না, আমি ইউজি কে ওর খোঁজ নিতে বলছি। শান্ত হন।”
জেনিন যে ভাষায় কথা বলছে, তা একজন সিইও-এর। তার মধ্যে সেই নিষ্ঠুর মাফিয়া জেডের কোনো চিহ্ন নেই, কিন্তু তার সিদ্ধান্তগুলো লোহার মতো অনড়। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার স্ত্রী এমন অদ্ভুত জেদ ধরবে। জেনিনের এই অনড় অবস্থা নোবারার অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, জেনিনের সাথে থেকে সে এই পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না। জেনিন হয়তো তাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার ভেতরকার ‘মাফিয়া সত্তা’ যেকোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে। তখন যদি মাহিতো বা অন্য কেউ তার পরিচয় ফাঁস করে দেয়, তবে জেনিন তাকে ক্ষমা করবে না…বরং জেনিনের সেই আদিম রূপটি তার ওপরই আছড়ে পড়বে।
নোবারা নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। সে এখন জেনিনের কাছে এতোটাই দুর্বল যে, তার সামনে বেশিক্ষণ থাকলে সে নিজের আসল পরিচয় ফাঁস করে দেবে। তাকে এখন ভাবতে হবে। তাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে মাহিতো তার মুখ খুলতে না পারে।
“আ….আমি একটু একা থাকতে চাই” নোবারা নিচু স্বরে বলল।
“একা? কিন্তু—”
“প্লিজ, জেনিন। আমাকে একটু সময় দিন। আমার খুব অস্থির লাগছে,” নোবারা জেনিনের উত্তরের অপেক্ষা না করেই দ্রুত পায়ে ওপরের দিকে দৌড়ে গেল।
জেনিন নিচে দাঁড়িয়ে রইল, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে তার স্ত্রীর চলে যাওয়ার দিকে। সে বুঝতে পারছে না কী এমন ঘটেছে যা নোবারাকে এতোটা ভীত করে তুলেছে। সে ইউজিকে ইশারা করল।
“মাহিতো লোকটা ঠিক কী বলেছিল? নোবারার অস্থিরতার কারণ কি ও?”
ইউজি মাথা নিচু করে বলল, “বস, লোকটা কিছু একটা ছবি দেখিয়েছিল। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।”
জেনিন তার ডেস্কে গিয়ে বসল। তার ল্যাপটপটা খুলল। সে আজ সেই ফাইলটা খুঁজবে যা মাহিতো নিয়ে এসেছিল। সে জানে, এই ভিলার ভেতরে কেউ কিছু লুকোলে তা তার নজর এড়াবে না।
ওদিকে, নিজের বেডরুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়েছে নোবারা। সে মেঝেতে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে। আজ সে নিজে এক অপরাধীর প্রেমে পড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সে মাহিতোর মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে না, সে ভয় পাচ্ছে জেনিনকে হারানোর। জেনিন যদি জানতে পারে যে সে তার কাছে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে ছিল, জেনিনের ধ্বংসাত্মক রূপটি নোবারাকে বাঁচতে দেবে না।
নোবারা ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার লুকানো একটি ছোট ট্র্যাকার আর ফোনের সিম বের করল। তাকে মাহিতোর সাথে দেখা করতে হবে। একা। জেনিনকে বিপদে না ফেলে কীভাবে মাহিতোর মুখ বন্ধ করা যায়, সেটা তাকেই ভাবতে হবে। জেনিনের এই শান্তির নীড়টি রক্ষা করার দায়ভার এখন তারই।
সে জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকাল। বাগানে গার্ডরা টহল দিচ্ছে। সে জানে, এখন ভিলা থেকে বের হওয়া মানেই জেনিনের প্রশ্নের মুখে পড়া। কিন্তু সে যদি না বেরোয়, তবে মাহিতো হয়তো নিজেই জেনিনের সামনে সব সত্য বলে দেবে। নোবারার চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। সে এখন এক অদ্ভুত দোলাচলে…যেখানে ভালোবাসা আর পেশা একে অপরের গলায় ছুরি ধরছে।
নোবারা মেঝেতে বসে পড়লো, তার সামনে পড়ে আছে লুকানো ট্র্যাকার আর সিম কার্ডটি। তার হাত কাঁপছে। যদি সে এই সিম কার্ডটা অন করে, তবে সিআইডি সদর দপ্তর জানতে পারবে সে কোথায় আছে। আর যদি না করে, তবে মাহিতো জেনিনের সামনে তার সব মুখোশ খুলে দেবে। জেনিন নূরশাদ…যাকে সে ভালোবাসে, যার বুকে সে প্রতিদিন শান্তিতে ঘুমায়…সেই মানুষটি কি তাকে ক্ষমা করবে? নাকি মাহিতোর দেওয়া ওই ফাইলটা জেনিনের হাতে পৌঁছানোর আগেই তাকে সব শেষ করে দিতে হবে?
হঠাৎ দরজায় ভারি পায়ের শব্দ শোনা গেল। নোবারা দ্রুত সিম কার্ডটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।
“নূরা? আপনি কি ভেতরে আছেন?” জেনিনের কণ্ঠস্বর।
নোবারা দম বন্ধ করে রইল। সে জানে জেনিন এখন সব কিছু খুঁটিয়ে দেখবে। জেনিন যখন সন্দেহ করে, তখন সে পিশাচের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সে দ্রুত সিম কার্ড আর ট্র্যাকারটা বালিশের নিচে গুঁজে দিল এবং উঠে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে নিল।
“হ্যাঁ আমি আছি। একটু… একটু মাথাটা ধরেছিল, তাই বিশ্রাম নিচ্ছিলাম,” নোবারা দরজা খুলে দিল।
জেনিন ঘরে ঢুকল। তার পরনে পরিচিত কালো শার্ট, হাতে একটা কাঁচের গ্লাস। তার চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু তার চাহনি যেন এক্স-রে মেশিনের মতো নোবারার মনের গভীরে ঢোকার চেষ্টা করছে। জেনিন গ্লাসটা টি-টেবিলে রেখে নোবারার দিকে এগিয়ে এল।
“আপনি কি ওই লোকটার কথা ভেবে ভয় পাচ্ছেন?” জেনিন খুব শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল।
নোবারা জেনিনের বুকের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। “না… মানে, ও যেসব কথা বলছিল… আমার খুব অদ্ভুত লাগছিল। আপনার পেছনে তো সিআইডি কবে থেকেই পড়ে আছে। তা..তাই আরকি!”
জেনিন নোবারার চিবুক ধরে নিজের দিকে মুখটা তুলল। সে জেনিনের শীতল অথচ গভীর কালো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছে না। জেনিন খুব ধীরগতিতে নোবারার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।
“আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন, নূরা?”
নোবারার বুকটা ধক করে উঠল।
“কেন করবো না?”
“তবে আমার কাছে লুকোচুরি করার প্রয়োজন নেই। আপনি কি মাহিতোর সাথে আগে থেকেই পরিচিত?” জেনিনের স্বর এখন পাথরের মতো কঠিন।
নোবারা থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে কি সব স্বীকার করবে? জেনিনের এই প্রশ্নের উত্তরটা তার জীবন-মরণের প্রশ্ন। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“না। আমি তাকে চিনি না। আমি শুধু ভয় পাচ্ছি যে, ওই লোকটা আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো ঝামেলা করবে কি না।”
জেনিন একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। সে নোবারার হাতটা টেনে ধরল এবং খুব শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে নোবারা ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে।
“আমি জানি আপনি মিথ্যে বলছেন, নূরা। তবে আমি এটাও জানি, আপনি আমার ক্ষতি করার জন্য কিছু করবেন না। আপনার উপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।”
জেনিন নোবারার হাতটা ছেড়ে দিল এবং ঘুরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তার হাতে একটা ছোট্ট রিমোট, যা দিয়ে সে ভিলার সিকিউরিটি সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে। জেনিন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মাহিতোর লোকেশন ট্র্যাকিং অন করে দিল। সে জানে, এই ভিলার প্রতিটি কোণ তার নিজের তৈরি। কেউ যদি তার নূরাকে ভয় দেখিয়ে অস্থির করতে চায়, তবে সেই মানুষটির বাঁচার কোনো অধিকার নেই।
“আগামীকাল ভোরে আমি মাহিতোর সাথে দেখা করব,” জেনিন বলল।
নোবারা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “না! আপনি ওর কাছে যাবেন না! ও ডেঞ্জারাস হতে পারে!”
জেনিন ফিরে তাকাল। তার চোখে এখন চেনা মাফিয়া জেডের আগুনের ঝলকানি।
“ডেঞ্জারাস কে? আমি নাকি সে? কাল আমি দেখব, এই শয়তানটা আপনার কানের কাছে কী ফিসফিস করে বলে গেছে।”
জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নোবারা বুঝতে পারল, সে জেনিনকে মাহিতোর থেকে দূরে রাখতে গিয়ে বিপদটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জেনিন নিজেই এখন মাহিতোকে খুঁজতে যাচ্ছে, আর মাহিতো যদি ওই ফাইলটা জেনিনের হাতে দিয়ে দেয়?
নোবারা ডেস্কে রাখা জেনিনের ফোনের দিকে তাকাল। জেনিন ফোনটা এখানে ফেলে গেছে। নোবারা কোনোমতে ফোনটা খুলে তার পার্সোনাল নেটওয়ার্কে একটি মেসেজ পাঠাল,
“‘প্রজেক্ট Z’ ফেইল। আমি জেনিন নুরশাদের প্রেমে পড়েছি। মাহিতোকে এখনই এখান থেকে সরিয়ে নাও, নাহলে জেনিন ওকে মেরে ফেলবে।”
মেসেজটা পাঠিয়ে সে যখন ফোনটা জায়গায় রাখল, তখন দেখল দরজার পাশে জেনিন দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন কোনো কথা বলল না, সে শুধু এক দৃষ্টিতে নোবারার দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতের মুঠোয় একটা পিস্তল।
“আপনি মেসেজটা কাকে পাঠালেন, নোবারা?” জেনিন খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করল।
চলবে ইংশাআল্লাহ……
(মনে করুন পরবর্তী পর্ব এ জেনিন তার প্রাণপ্রিয় নূরাকেই সেই পিস্তল টা দিয়ে শ্যুট করলো…. কেমন হবে তখন?!)

