#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৮
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
আকাশের চারদিক আজ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। নূরশাদ ভিলার প্রলয়ংকরী আগুনের লেলিহান শিখা অনেক নিচে ফেলে জেনিনদের ব্ল্যাক হাই-টেক হেলিকপ্টারটি এখন মেঘের গহীন স্তরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু শান্তি নেই। ইঞ্জিনের একটানা গোঁ গোঁ শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে ধেয়ে আসছে পুলিশের তিনটি গানশিপ হেলিকপ্টার। ড্রোনের সার্চলাইটের তীব্র সাদা আলো বারবার জেনিনদের ককপিটে আছড়ে পড়ছে, যেন কোনো এক ক্ষুধার্ত দানব তার শিকারকে অন্ধ করে দিতে চাইছে।
জেনিন নূরশাদ কো-পাইলটের সিটে বসে আছে। তার কপালে ব্যান্ডেজ ভেদ করে আবার রক্ত ঝরছে। তার চোখে এখন আর কোনো ক্লান্তি নেই, সেখানে জেদ আর বাঁচার এক আদিম নেশা। সে তার কোল থেকে বেলী ফুলের টবটা সরিয়ে নোবারার সিটের পাশে রাখল। নোবারার মুখটা এখনো ফ্যাকাশে, তার নাকে অক্সিজেন মাস্কটা হালকাভাবে কাঁপছে তার প্রতিটি ক্ষীণ নিশ্বাসের সাথে।
ইউজির চোখ দুটো শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। নীলিমার বিশ্বাসঘাতকতা আর তার নিজের হাতে সেই ভালোবাসাকে শেষ করে দেওয়ার যন্ত্রণা তাকে এক জ্যান্ত লাশে পরিণত করেছে। তবুও সে নোবারার পাশে বসে তার এম-১৬ রাইফেলটা শক্ত করে ধরে জানালার বাইরে তাকাচ্ছে , যেকোনো সময় গান ফায়ার করতে হতে পারে।
হঠাৎ ইন্টারকমে পাইলটের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বস! ওরা আমাদের লক করে ফেলেছে! সিআইডির লিড হেলিকপ্টার থেকে হিট-সিকিং মিসাইল ফায়ার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের চ্যাফ ফ্লেয়ার খুব সীমিত!”
জেনিন দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, “ম্যানুভার করো! মেঘের আরও ভেতরে ঢোকো। ব্ল্যাক-আউট প্রোটোকল অন করো এখনই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশের বুক চিরে এক তীব্র আলোর রেখা দেখা গেল। সিআইডির গানশিপ থেকে প্রথম মিসাইলটি ছোঁড়া হয়েছে। জেনিনের হেলিকপ্টারটি এক ঝটকায় বাঁ দিকে কাত হয়ে গেল। জেনিন আর ইউজি সিটের সাথে আছড়ে পড়ল। জানালার বাইরে এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটল। মিসাইলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটি মেঘের স্তরে আঘাত করেছে, কিন্তু তার শকওয়েভে জেনিনদের হেলিকপ্টারটি খেলনার মতো কাঁপতে লাগল।
নোবারার দেহটি সিট থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, জেনিন এক হাত বাড়িয়ে তাকে শক্ত করে ধরল। “নূরা!” জেনিন চিৎকার করে ডাকলো, যদিও নোবারা তা শোনার অবস্থায় নেই।
বাইরে থেকে সিআইডি প্রধানের কণ্ঠস্বর আবার রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে হানা দিল, “জেনিন নূরশাদ! আপনার ইঞ্জিনের হিট সিগনেচার আমাদের রাডারে স্পষ্ট। আপনি যেখানেই যান, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করব। আত্মসমর্পণ করুন, নাহলে আপনার সাথে আমাদের অফিসার এনএ ও এই আকাশেই ছাই হয়ে যাবে!”
“বস, অর্ডার দিন! আমি ওদের একটা হেলিকপ্টার নামিয়ে দেব!” ইউজি চিৎকার করে অনুমতি চাইলো।
জেনিন মাথা নাড়ল। “না ইউজি, এখন লড়াই করার সময় নয়। আমাদের পালাতে হবে। ওদের তিনটা গানশিপের সাথে লড়া মানে আত্ম’হ’ত্যা। পাইলট, সাগরের ডার্ক জোনে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ?”
“আর মাত্র পাঁচ মিনিট, বস! কিন্তু ওরা আমাদের ঘেরাও করে ফেলছে!”
জেনিন এবার কিছু একটা ভাবলো। সে তার পকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোলটি বের করল। এটি ছিল নূরশাদ ভিলার শেষ প্রতিরক্ষা কবচ। ভিলার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যে ড্রোনগুলো সে উড়িয়েছিল, সেগুলো এখন জেনিনদের হেলিকপ্টারের পেছনে এক সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে। জেনিন স্ক্রিনে দেখল, ড্রোনগুলো পুলিশের হেলিকপ্টারের খুব কাছে পৌঁছে গেছে।
“সরি অফিসারস, কিন্তু জেনিন নূরশাদ আজ হার মানার মুডে নেই,” জেনিন বিড়বিড় করে বলল এবং রিমোটের ডেটোনেট বাটনটি প্রেস করল।
আকাশে একের পর এক ছোট ছোট বিস্ফোরণ হতে লাগল। ড্রোনগুলো আত্মঘাতী হামলায় পুলিশের হেলিকপ্টারগুলোর ভিশন সেন্সর আর জ্যামিং ডিভাইসগুলো নষ্ট করে দিতে শুরু করল। অবশেষে পুলিশের একটি হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচের দিকে নামতে বাধ্য হলো।
কিন্তু সিআইডির লিড হেলিকপ্টারটি তখনো অদম্য। সেটি জেনিনের ঠিক পেছনে আঠার মতো লেগে আছে। সেখান থেকে এখন সরাসরি মেশিনগান ফায়ার শুরু হলো। বুলেটের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছে হেলিকপ্টারের বডিতে। জানালার কাঁচের একাংশ চড়চড় করে ফেটে গেল।
ইউজি আর স্থির থাকতে পারল না। সে জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে নিজের রাইফেলের ব্যারেল বের করে পাল্টা গুলি চালাতে শুরু করল।
জেনিন দেখল নোবারার কপাল দিয়ে ঘাম চুইয়ে পড়ছে। সে বুঝতে পারছে নোবারার জ্ঞান ফেরার সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে সে যদি চোখ মেলে এই ধ্বংসলীলা দেখে, তবে সে কি তা সহ্য করতে পারবে?
হঠাৎ হেলিকপ্টারটি এক প্রচণ্ড ঝাকুনি খেল। “বস! আমাদের টেইল রোটরে গুলি লেগেছে! আমরা হাইট হারাচ্ছি!” পাইলটের আর্তনাদ।
হেলিকপ্টারটি বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে নিচের দিকে নামতে লাগল। নিচে অশান্ত সমুদ্রের কালো জলরাশি হা করে বসে আছে তাদের গিলে ফেলার জন্য। জেনিন দ্রুত নোবারার সিটবেল্ট আরও শক্ত করে বেঁধে দিল। সে ইউজির হাত ধরল।
“ইউজি! শক্ত হয়ে ধরো! আমরা ক্র্যাশ করছি!”
আকাশের নিথর নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে জেনিন নূরশাদের স্বপ্ন আজ সাগরের লোনা জলের দিকে আছড়ে পড়তে চলেছে। পেছনে সিআইডির হেলিকপ্টারগুলো জয়োল্লাসে নিচে নামছে। কিন্তু তারা জানে না, সাগরের এই অন্ধকার জোনটিতে জেনিন আগে থেকেই একটি সাবমেরিন ব্যাকআপ রেখেছিল। জেনিন যখন মাঠে নামে, তখন সে শত্রুপক্ষের চেয়ে দশগুণ চিন্তাভাবনা করেই নামে। দেখা যাবে হয়তো, এই হামলার কথা সে আগেই জানতো বলেই সব প্ল্যান এতো জলদিই এক্টিভভেট করে রেখেছে!
জেনিন নিজের সিটবেল্ট ছিঁড়ে কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে নোবারার কাছে পৌঁছাল। তার সারা শরীর কেবিনের দেয়ালে আছড়ে পড়ে ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু তার লক্ষ্য স্থির।
“ইউজি! লাইফ জ্যাকেটগুলো নাও! এখনই!” জেনিন চিৎকার করে বলল।
ইউজি তখন এক হাতে ক্যাবিন ধরে অন্য হাতে পেছনের স্টোরেজ থেকে জ্যাকেটগুলো বের করার চেষ্টা করছে। তার কপালে বিশাল এক ক্ষত, রক্তে তার এক চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরেরো সে দাঁত চেপে সহ্য করে একটা জ্যাকেট জেনিনের দিকে ছুঁড়ে দিল আর অন্যটা নিজে পরার চেষ্টা করল।
“বস! আমরা সাগরের খুব কাছে! আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড!” পাইলটের শেষ চিৎকার ইয়ারফোনে ভেসে এল।
জেনিন নোবারার অক্সিজেন মাস্কটা খুলে ফেলল। নোবারার চোখের পাতা সামান্য কাঁপছে। জেনিন দ্রুত নোবারার শরীরে লাইফ জ্যাকেটটা পরিয়ে দিল এবং নিজের শক্তিশালী বাহু দিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে ধরল। সে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “নূরা, নিঃশ্বাস চেপে ধরুন। আজ যদি সাগর আমাদের গিলে ফেলে, তবে আমি সাগরের বুক চিরে আপনাকে বের করে আনব।”
ঠিক সেই মুহূর্তে হেলিকপ্টারটি এক প্রচণ্ড শব্দে সাগরের উত্তাল লোনা জলরাশির ওপর আছড়ে পড়ল।
‘ধড়াম!’
পুরো পৃথিবীটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠাণ্ডা নোনা জল জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে তীরের মতো ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
হেলিকপ্টারের সামনের অংশটা সাগরের গভীরে ডুবতে শুরু করেছে। জেনিন অনুভব করল তার হাড়গোড় যেন চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পানির চাপে ক্যাবিনের ভেতরটা মুহূর্তেই ভরে উঠল। জেনিন নোবারাকে এক হাতে জাপ্টে ধরে অন্য হাতে ক্যাবিনের দরজা খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু পানির প্রচণ্ড চাপে দরজাটা লোহার মতো আটকে আছে।
ইউজি পানির নিচে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সে তার রাইফেলের কুঁদো দিয়ে জানালার বাকি কাঁচটুকু চূর্ণ করে দিল। পানির প্রবল স্রোতে তারা সবাই ক্যাবিনের বাইরে ছিটকে পড়ল। সাগরের অতল অন্ধকার তখন তাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। ওপর থেকে সিআইডির হেলিকপ্টারের সার্চলাইটগুলো পানির ওপরটা খুঁজে বেড়াচ্ছে, কিন্তু জেনিনরা তখন পানির অনেক গভীরে।
জেনিন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে পা ছুড়ে ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করছিল। তার এক হাতে নোবারার অবচেতন দেহ। নোবারার শরীরের ওজন পানির নিচে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। জেনিনের ফুসফুস অক্সিজেনের অভাবে ফেটে যাচ্ছে, বুকটা যেন কেউ তপ্ত কয়লা দিয়ে চেপে ধরেছে। সে ওপরে আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছিল।
অবশেষে জেনিন পানির ওপর মাথা তুলল। সে বড় বড় করে শ্বাস নিল। তার পাশে ইউজিও মাথা তুলেছে। চারদিকে বিশাল বিশাল ঢেউ তাদের আছড়ে ফেলছে। জেনিন দেখল নোবারার মুখটা নীল হয়ে গেছে। সে তাকে এক হাত দিয়ে পানির ওপর ধরে রাখল।
“ইউজি! ওদিকে দেখো!” জেনিন আঙুল দিয়ে এক কিলোমিটার দূরে সাগরের মাঝখানে একটি ভাসমান বয়ার দিকে ইশারা করল।
সেখানে কোনো জাহাজ নেই, কোনো নৌকা নেই। কিন্তু জেনিন জানে, ওই বয়াটি আসলে তার এনক্রিপ্টেট মেসেজ। বয়াটির নিচে তার নিজস্ব সাবমেরিন ব্ল্যাক শার্ক পজিশন নিয়ে আছে। কিন্তু এতোটা পথ এই উত্তাল সাগরে নোবারাকে নিয়ে সাঁতরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
হঠাৎ ওপর থেকে আবার সার্চলাইটের আলো তাদের ওপর এসে পড়ল। সিআইডির হেলিকপ্টারগুলো তাদের খুঁজে পেয়েছে। আকাশ থেকে মেশিনগানের গুলি বৃষ্টির মতো পানির ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। ‘টুপ টুপ’ শব্দে গুলিগুলো পানির নিচে ঢুকে যাচ্ছে।
“ওরা আমাদের ছাড়বে না বস!” ইউজি চিৎকার করে বলল। সে তার পিস্তলটা পানির ওপর উঁচু করে ধরল, যদিও সে জানে এই দূরত্বে ওটা অকেজো।
জেনিন দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, “ইউজি, ডুব দাও! পানির নিচ দিয়ে এগোতে হবে। ওরা ইনফ্রারেড ব্যবহার করছে, আমাদের শরীরের তাপ ঢাকা দিতে হবে।”
তারা আবার ডুব দিল। জেনিন নোবারার মুখটা নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল যাতে পানির ঝাপটা সরাসরি তার নাকে না লাগে। পানির নিচে জেনিন অনুভব করল এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। ওপরে যুদ্ধের তান্ডব, আর নিচে এক অনন্ত শান্তি।
হঠাৎ পানির নিচে এক অদ্ভূত কম্পন অনুভূত হলো। জেনিন চোখ মেলে দেখল, সামনে থেকে একটি বিশাল কালো ছায়া এগিয়ে আসছে। কোনো হাঙ্গর নয়, ওটা জেনিনের ব্ল্যাক শার্ক সাবমেরিন। সাবমেরিনটি নিঃশব্দে পানির নিচ দিয়ে এগিয়ে এসে তাদের কাছে স্থির হলো। এর একটি রোবটিক হ্যান্ড তাদের দিকে এগিয়ে এল।
জেনিন ইউজিকে ইশারা করল। ইউজি প্রথমে হাতটি ধরল এবং জেনিনকে সাহায্য করল নোবারাকে এয়ারলক চেম্বারে ঢুকিয়ে দিতে। জেনিন যখন নোবারাকে সাবমেরিনের ভেতরে নিরাপদ জায়গায় রাখল, তখন তার নিজের শরীরে আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। সে লোনা পানি আর রক্ত মাখা শরীর নিয়ে সাবমেরিনের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
এয়ারলক চেম্বারটি বন্ধ হয়ে গেল। পানির শব্দ থেমে গেল। ভেতরে এখন কৃত্রিম অক্সিজেনের সুবাস। জেনিন দেখল ইউজি এক কোণায় বসে হাঁপাচ্ছে। ইউজির চোখে তখনো জল। জেনিন উঠে দাঁড়িয়ে নোবারার কাছে গেল। নোবারা তখনো চোখ মেলেনি, কিন্তু তার হার্টবিট এখন স্থিতিশীল। জেনিন নোবারার ভিজে চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিল।
সাবমেরিনের কন্ট্রোল রুম থেকে মায়ার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বস! আমরা ডাইভ দিচ্ছি, এখন গভীর সমুদ্রের দিকে যাচ্ছি।”
জেনিন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন এক নতুন প্রতিজ্ঞা। সে নূরশাদ ভিলা হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জেনিন নূরশাদ ফুরিয়ে যায়নি। সে সাবমেরিনের বড় কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সাগরের তলদেশের নীল অন্ধকার তাকে যেন এক নতুন শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
“ইউজি,” জেনিন গম্ভীর গলায় ডাকল।
ইউজি মুখ তুলল। “জি বস?”
“তুমি আবারো প্রমাণ করে দিলে, তুমিই আমার ভাই। আমার এই চরম বিপদের দিনেও তুমি আছো আমার পাশে। এর চেয়ে জেনিন নুরশাদ এর আর কোনো বড় শক্তি নেই!”
ইউজি উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো দুর্বলতা নেই। সে নীলিমার দেওয়া সেই আংটিটা সাবমেরিনের ছোট্ট ডাস্টবিনে ফেলে দিল। “আমি তৈরি বস। আমি আমার জীবন দিয়ে হলেও আপনার সাথেই থাকবো।”
জেনিন আবার নোবারার পাশে গিয়ে বসল। সে নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। এতো কিছু হয়ে গেল। অথচ নোবারা এখনো অজ্ঞান! মেয়েটা যখন জেগে উঠবে, কত কিই না হারানোর শোক পাবে! তার মা, সংসার, তার বাড়ি, তার পেশা, সব, সব হারালো সে! তবে সবকিছুর চেয়ে কি জেনিন তার কাছে দামী নয়?
সাবমেরিনটি গভীর থেকে গভীরতর অতলান্তিকের দিকে ডুব দিতে শুরু করল। ওপরে সিআইডির হেলিকপ্টারগুলো তখনো সাগরের ঢেউয়ের ওপর বৃথা আলো ফেলছে। তারা জানে না যে, জেনিন নূরশাদ আজ তার ইতিহাসের সবচাইতে বড় পরাজয়কে তার জীবনের সবচাইতে বড় শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
কারণ সাবমেরিন ‘ব্ল্যাক শার্ক’ এখন সাগরের কয়েক হাজার ফুট গভীরে। বাইরের প্রচণ্ড পানির চাপে সাবমেরিনের টাইটেনিয়াম বডি থেকে এক ধরণের ধাতব গোঙানি শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে এখন এক অদ্ভুত পিনপতন নীরবতা। জেনিন তার ভেজা শার্টটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুত হাতে কাজ শুরু করল। সে কোনোভাবেই তার অর্জিত সম্পদ আর আবেগগুলোকে পানিতে হারিয়ে যেতে দেয়নি।
এয়ারলক চেম্বারটি যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হলো, তখন দেখা গেল জেনিনের কোমরের সাথে একটি ওয়াটারপ্রুফ চেইন দিয়ে বাঁধা ছিল নোবারার শখের বেলী ফুলের টবটা। টবটা একপাশে সামান্য ফেটে গেছে, লোনা পানিতে পাতাগুলো ভিজে জবজবে, কিন্তু গাছটা এখনো সজীব! জেনিন পরম মমতায় টবটা সাবমেরিনের একটি টেবিলের ওপর রাখল।
ঠিক তার পাশেই ইউজি অতি সাবধানে হালিমা মায়ের নিথর দেহটি একটি বিশেষ ড্রাই-ক্যাবিনে শুইয়ে দিল। লাশটা উদ্ধার করতে তাকে খেসারত করতে হয়নি, মায়া আবারো রোবটিক হ্যান্ড দিয়ে তুলে এনেছে গভীর সমুদ্র থেকে। হালিমা বেগমের চাদরটি ভেজা থাকলেও তার মুখমন্ডলে এক ধরণের পবিত্র শান্তি লেগে আছে। একটা মৃত লাশ কে নিয়েও আজ এই দুর্দশায় ও তাদের পার করতে হচ্ছে! নিজের স্ত্রী কে কতটা ভালোবাসলে, বিপদের সময়েও স্ত্রীর মায়ের মৃত দেহটা নিয়ে জীবণমরণ যুদ্ধ এ অংশ নিতে হয়?
জেনিন তার পিঠের ওয়াটারপ্রুফ সিল করা ব্যাগটি খুলল। ভেতরে নূরশাদ ভিলার অমূল্য ডকূমেন্টস, হীরা আর ব্যাকআপ চিপগুলো সম্পূর্ণ শুকনো। জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা ইউজির দিকে এগিয়ে দিল।
“এগুলো লকারে রাখো। আমাদের ফেরার পুঁজি এটাই,” জেনিন গম্ভীর গলায় বলল।
ইউজি ব্যাগটা নিয়ে চলে গেল। জেনিন এবার ফিরে তাকাল নোবারার দিকে। নোবারাকে একটি মেডিকেল বেডে শোয়ানো হয়েছে। মায়া দ্রুত এসে নোবারার ভেজা পোশাক বদলে দিয়ে তাকে শুকনো গরম কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দিল। জেনিন নোবারার ঠিক পাশে গিয়ে বসল। নোবারার মুখটা তখনো ফ্যাকাশে, কিন্তু তার বুকের ওঠানামা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক।
জেনিন নোবারার শীতল হাত দুটো নিজের গরম তালুর ভেতর নিল। কত ঘন্টা পার হয়ে গেল! তার নূরা কথা বলছে না, তার সাথে অভিমান করছে না। জেনিনের ভেতর থেকে চিৎকার করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু সে আজ শান্ত হয়ে আছে। এই যে এই খারাপ সময়টা, এটা তাকে শান্ত মাথায় তার আইকিউ কাজে লাগিয়ে পার হতে হবে। নয়তো তার পরাজয় নিশ্চিত! কিন্তু জেনিন নুরশাদ কখনো হারতে শেখেনি! সে লড়বেই।
হঠাৎ নোবারার আঙুলগুলো জেনিনের হাতের ভেতর সামান্য কেঁপে উঠল। জেনিনের হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে নিশ্বাস বন্ধ করে নোবারার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নোবারার চোখের পাতাগুলো অতি কষ্টে নড়ছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো এক বিশাল পাথরের ভার সরিয়ে সে আলোর দিকে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।
“নূরা? শুনতে পাচ্ছেন আমাকে?” জেনিনের কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল।
নোবারা ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো মেলল। সাবমেরিনের মৃদু নীল আলোয় তার দৃষ্টি প্রথমে ঝাপসা ছিল। সে জেনিনের মুখটা দেখতে পেল। জেনিনের মুখটা ধোঁয়ায় মাখা, কপালে রক্তের শুকনো দাগ, কিন্তু তার চোখে চিরচেনা তীব্র ভালোবাসা। নোবারার ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ল। সে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
জেনিন দ্রুত এক গ্লাস পানি নিয়ে নোবারার ঠোঁটে ছোঁয়াল। নোবারা এক ঢোক পানি গিলে এক অমানুষিক চেষ্টায় ফিসফিস করে বলল, “আমার মা… মা কোথায়?”
জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবতে পারেনি, মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে প্রথমে তার মায়ের খোঁজ করবে! জেনিন হালিমা মায়ের মৃতদেহের দিকে তাকাল, যা পাশের ক্যাবিনেই রাখা। সে কি এখন নোবারাকে এই সত্যটা বলবে? নোবারার শরীর এখনো অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু নোবারার চোখের সেই আকুতি জেনিনকে মিথ্যা বলতে দিল না। জেনিন শুধু মাথা নিচু করে রইল।
নোবারা বুঝতে পারল। তার চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় জল গড়িয়ে পড়ল। সে জেনিনের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠে এবার এক অদ্ভূত তেজ ফিরে এল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে টেনে টেনে বলল,
“জেনিন….. আপনার বাবার খুনি….ওটা… ওটা মাহিতো নয়… ওটা…”
নোবারার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাবমেরিনের রেড অ্যালার্ট বেজে উঠল। পুরো সাবমেরিনটি এক প্রচণ্ড ঝাকুনি খেল। মায়া চিৎকার করে উঠল, “বস! সাগরের নিচে অন্য একটা সাবমেরিন আমাদের টার্গেট করেছে! ওটা কোনো সরকারি সাবমেরিন নয়!”
জেনিন নোবারাকে ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন খুনের নেশা। নোবারা কী বলতে চেয়েছিল? জেনিনের বাবার খুনি অন্য কেউ? এই রহস্যের জট খোলার আগেই কি তারা আবার যুদ্ধের মুখে? জেনিন ইউজিকে ডাকল, “ইউজি! ব্যাটল স্টেশনে যাও!”
নোবারা আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার মুখে এক রহস্যময় আর্তনাদ। সে কী বলতে চেয়েছিল? জেনিন কি কোনো ভুল মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে?
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।
(কমেন্টে একটা ছবি দিয়েছি কিন্তু!🌚)

