Soulmate_to_Enemy |৬৫| লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

0
2

#Soulmate_to_Enemy |৬৫|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নানামির পৈতৃক বাংলোটি আজ এক মাস ধরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় ডুবে আছে। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত এই কাঠের তৈরি দোতলা বাংলোটির চারপাশ এখন ঘন সবুজে মোড়ানো। বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় লেকের টলটলে নীল জল আর দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি। কিন্তু এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যও বাংলোর ভেতরের সেই গুমোট বিষাদকে দূর করতে পারেনি।

এক মাস কেটে গেছে। এই তিরিশ দিনে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে ঠিকই, কিন্তু নোবারার জীবনের ঘড়ি যেন সেই কর্ণফুলী ব্রিজের রক্তমাখা সন্ধ্যায় থেমে আছে!

বাংলোর উত্তর দিকের ঘরটি নোবারার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। নানামি আর তনুজা মিলে ঘরটিকে নোবারার মনের মতো করে সাজানোর চেষ্টা করেছে। ঘরটি বিশাল, যার একদিকের পুরো দেয়াল জুড়েই বড় বড় কাঁচের জানালা। সেই জানালা দিয়ে সরাসরি লেকের পানি দেখা যায়। ঘরের ভেতরে হালকা নীল রঙের দেয়াল, কাঠের মেঝে আর এক কোণে রাখা একটা আরামদায়ক ইজি চেয়ার। তনুজা খুব যত্ন করে ঘরের কোণে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রেখেছে, মানিপ্ল্যান্ট আর কিছু ক্যাকটাস, যদি সবুজের ছোঁয়ায় নোবারার মন একটু শান্ত হয়।

কিন্তু নোবারা ওই ঘরের এক নির্জন দ্বীপের মতো। সে দিনের অধিকাংশ সময় জানালার ধারের ওই ইজি চেয়ারটায় বসে থাকে। তার বাম পাশের প্যারালাইসিসের প্রভাব এখন অনেকটাই কমে এসেছে, সে এখন একা একা হাঁটতে পারে, হাত নাড়াতে পারে। কিন্তু তার মুখের ভাষা যেন চিরতরে হারিয়ে গেছে। এই এক মাসে সে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি।

তনুজা ট্রেতে করে দুপুরের খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। নোবারা তখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার পরনে একটা সাদা সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছড়ানো। তার আগের চঞ্চলতা নেই, নেই সেই দাপুটে সিআইডি অফিসারের তেজ। সে এখন এক বিমূর্ত ছায়া।

“নোবারা, এসো… একটু খেয়ে নাও।” তনুজা খুব নরম স্বরে বলল।

নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে নড়লও না। তনুজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নোবারার পাশে এসে বসল। সে জানে, নোবারার এই মৌনতা আসলে এক ধরণের প্রতিবাদ। সে তার চারপাশের জগতকে অস্বীকার করছে। তনুজা ভাতের লোকমা নোবারার মুখের কাছে ধরল। নোবারা যান্ত্রিকভাবে মুখ খুলল, আবার চিবিয়ে গিলে ফেলল। সে খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খাবারের স্বাদের প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

ঠিক সেই সময় নানামি ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। তার পরনে সাধারণ টি-শার্ট আর ট্রাউজার। সে এখন আর পুলিশ ইউনিফর্মে নোবারার সামনে আসে না। নানামির চোখেমুখে এক অপরাধবোধের ছাপ স্পষ্ট। সে এক পা ভেতরে দিয়ে কাঁচুমাচু গলায় বলল,
“নোবারা, তোমার জন্য লেক থেকে টাটকা কিছু ফল নিয়ে এসেছি। খাবে?”

নানামির কন্ঠস্বর শোনামাত্রই নোবারার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে জানালার বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে সরাসরি নানামির দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো মায়া নেই, কোনো পুরনো বন্ধুত্বের স্মৃতি নেই; আছে কেবল এক পর্বতপ্রমাণ ঘৃণা। নোবারার জ্বলজ্যান্ত চোখের চাউনি নানামিকে বুঝিয়ে দিল, সে তাকে ক্ষমা করেনি, আর কোনোদিন করবেও না।

নোবারা ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে টলমল পায়ে ঘরের অন্য কোণে চলে গেল। তার এই নিশ্চুপ প্রত্যাখ্যান নানামির বুকে বুলেটের চেয়েও বেশি বিঁধল।

নানামি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে এল। তার হাত কাঁপছে। তনুজা কিছুক্ষণ পর খাবার শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এল। সে নানামির কাঁধে হাত রাখল।

“ওকে একটু সময় দিন। ওর ভেতরে যে ঝড় বইছে, তা থামতে সময় লাগবে,” তনুজা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।

নানামি তিতকুটে হাসল।
“সময়? এক মাস হয়ে গেল তনুজা। ও আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমি ওর কলিজা ছিঁড়ে নিয়েছি। আমি তো শুধু আমার ডিউটি করেছি। ও কেন বুঝছে না?”

“ডিউটি করেছেন ঠিকই, কিন্তু ওর কাছে আপনি এখন ওর স্বামীর খু’নি। আইন আর আবেগের লড়াইয়ে আবেগই সবসময় জেতে। শুধুমাত্র আমার অনুরোধ এ ও এই বাড়িতে আছে, আপনাকে মেনে নিতে সময় তো লাগবেই,” তনুজা গলার স্বর নিচু করে বলল।

<><><><><><><><><>

রাঙামাটির বিকেলগুলো যেন পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রক্তিম বিষাদ ঢেলে দেয়। নানামির এই বাংলোটির চারপাশ এখন পাখির কিচিরমিচির আর বুনো ফুলের গন্ধে ম ম করছে, কিন্তু নোবারার ঘরের জানালা দিয়ে যে হাওয়াটা ঢোকে, তাতে যেন কেবলই হাহাকার। নোবারা এখন আর বিছানায় পড়ে থাকে না। সে এখন উঠে দাঁড়াতে পারে, নিজের কাজগুলো নিজেই করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার ভেতরের যে অংশটা জেনিনের সাথে মরে গেছে, সেই শূন্যতা তাকে এক পাথুরে মূর্তিতে পরিণত করেছে।

তনুজা আজ অনেকক্ষণ ধরে নোবারার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। নোবারা স্থির হয়ে বসে আছে আয়নার সামনে। আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে তার নিজেরই অচেনা লাগে। গালের হাড়গুলো বেরিয়ে এসেছে, বাদামি চোখের উজ্জ্বলতা এখন মৃত সাগরের মতো নিস্তরঙ্গ। তনুজা চিরুনি চালাতে চালাতে খুব নরম গলায় বলল,
“আজ কাপ্তাইয়ের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর। নানামি বলছিল তোমাকে নিয়ে একটু লেকে নৌকাভ্রমণে যেতে। যাবে আমাদের সাথে?”

নোবারা আয়নার ভেতর দিয়ে তনুজার চোখের দিকে তাকাল। তনুজা সেই চাহনি দেখে শিউরে উঠল। নোবারার ঠোঁট নড়ল না, কিন্তু তার চোখ যেন চিৎকার করে বলছে, যে মানুষটার হাতে আমার জেনিনের রক্ত লেগে আছে, তার সাথে আমি নৌকায় চড়ব?

নোবারা হঠাৎ তনুজার হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব ধীরলয়ে নানামির একটা ছবি, যা ড্রেসিং টেবিলের একপাশে রাখা ছিল, সেটা উপুড় করে দিল। এই একটি অঙ্গভঙ্গিতেই সে তার উত্তর দিয়ে দিল।

তনুজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বারান্দায় নানামি অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। সে গত এক মাস ধরে নোবারার সাথে একটা বাক্য বিনিময় করার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে। কিন্তু নোবারা তাকে মানুষ বলে গণ্যই করছে না।

“কী বলল ও?” নানামি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

তনুজা মাথা নিচু করে বলল,
“ও যাবে না। ও তো আপনাকে এখনো সহ্য করতেই পারছে না। কেন জোর করছেন? ওর সামনে গেলেই ওর ট্রমাটা আবার ফিরে আসে।”

নানামি রাগে আর যন্ত্রণায় বারান্দার রেলিংয়ে একটা ঘুষি মারল।
“আমি ওর ভালোর জন্য করছি তনুজা! আমি কি চেয়েছিলাম নুরশাদকে মারতে? ও কেন বুঝছে না যে আমি শুধু আমার ডিউটি পালন করেছি? আমি ওকে এই নরক থেকে বের করে এনেছি, আর ও আমাকেই শত্রু ভাবছে!”

“ডিউটি দিয়ে তো আর হৃদয় জেতা যায় না নানামি,” তনুজা শান্ত গলায় বলল।
“ওর কাছে আপনি খু’নি। আর খু’নির হাতে দেওয়া জীবন ও কোনোদিন গ্রহণ করবে না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল। তনুজা আর নানামি দ্রুত দৌড়ে নোবারার ঘরে ঢুকল। তারা দেখল নোবারা বাথরুমের দরজায় ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সে প্রচণ্ডভাবে বমি করছে। তার সারা শরীর ঘামছে, মুখটা ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেছে।

তনুজা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নোবারাকে ধরল।
“নোবারা! কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে?”

নানামি ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“আমি কি ডাক্তার ডাকব? ও কি আবার প্যানিক অ্যাটাক করছে?”

নোবারা এবার নানামির দিকে তাকাল। তার চোখে ঘৃণার পাশাপাশি এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব। সে তনুজার হাতটা শক্ত করে ধরল। তনুজা নোবারাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নোবারার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। তনুজা অভিজ্ঞ চোখে নোবারার দিকে তাকাল। এই গত কয়েকদিন ধরে নোবারার খাবারে অরুচি, হুটহাট মাথা ঘোরা আর এই শারীরিক পরিবর্তনগুলো তনুজার মনে এক বিশাল সন্দেহের জন্ম দিল।

“আপনি একটু বাইরে যান তো,” তনুজা গম্ভীর গলায় বলল।

“কেন? কী হয়েছে?” নানামি ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল।

“বাইরে যান! আমি বলছি!” তনুজার ধমকে নানামি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইরে চলে গেল।

তনুজা দরজা বন্ধ করে নোবারার পাশে বসল। সে নোবারার কপালে হাত রেখে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কি পিরিয়ড মিস হয়েছে নোবারা? কয়দিন হলো?”

নোবারা স্তব্ধ হয়ে তনুজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল জেনিনের সাথে কাটানো সেই শেষ রাতগুলো। জেনিনের সেই উম্মত্ত ভালোবাসা, সেই নিবিড় আলিঙ্গন, যা ছিল একাধারে বিচ্ছেদ আর মিলনের এক করুণ সুর। নোবারা ক্যালেন্ডারের হিসাব মেলাতে গিয়ে বুঝতে পারল, দীর্ঘ দেড় মাস হয়ে গেছে সে তার স্বাভাবিক চক্র থেকে বিচ্ছিন্ন। জেনিন চলে গেছে, কিন্তু সে কি তার কোনো চিহ্ন রেখে গেছে নোবারার গভীরে?

নোবারার চোখ দিয়ে টলমল করে জল গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। এই স্পর্শে যেন এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার মৃতপ্রায় অস্তিত্বে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন সে অনুভব করতে পারল। জেনিন নুরশাদ তাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়ে যায়নি!

“তুমি…তুমি কি গর্ভবতী?” তনুজা অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল।

নোবারা তনুজাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। এই প্রথম এক মাসের মধ্যে নোবারার কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো। সে শুধু বলতে পারল, “তনু… ও… ও আমাকে ছেড়ে যায়নি। ও আমার ভেতরে আছে।”

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নানামি দরজার ওপাশ থেকে নোবারার কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সে জানত না এই কান্নার মানে কী। সে ভাবল হয়তো নোবারা আবার জেনিনের শোকে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সে জানত না, নোবারার এই কান্নার ভেতরে এখন এক নতুন জেদ জন্ম নিয়েছে। জেনিনের রক্ত এখন নোবারার ধমনীতে ধুকপুক করছে।

নোবারা চোখ মুছল। তার চাহনি এখন বদলে গেছে। সে আর সেই ভেঙে পড়া নারী নেই। তাকে বাঁচতে হবে। তার জেনিনের জন্য, তার অনাগত সন্তানের জন্য। আর এই রাঙামাটির বন্দিশালা থেকে তাকে মুক্ত হতে হবে।

তনুজা নোবারার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“চিন্তা করবে না একদম। আমি আছি তোমার সাথে। নানামিকেও আমি এখন কিছু বলব না। তুমি শুধু নিজেকে শক্ত কর।”

নোবারা জানালার বাইরে পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার মনে হলো কুয়াশার আড়াল থেকে কেউ তাকে ডাকছে। না, জেনিন মৃত। জেনিন আর ফিরবে না। কিন্তু জেনিনের বিসনেস, তার সাম্রাজ্য সবকিছুর উত্তরাধিকারী এখন নোবারার গর্ভে।

রাঙামাটির রাত নামল। তনুজা খাবার নিয়ে এল, এবার নোবারা নিজে থেকেই হাত বাড়িয়ে খাবার নিল। নানামি দরজার ওপাশ থেকে দেখে একটু আশ্বস্ত হলো। নোবারার বেঁচে থাকার ইচ্ছে টা অনন্ত নতুন করে জন্ম নিয়েছে!

<><><><><><><><><>

রাঙামাটির রাতগুলো বড্ড রহস্যময়। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যখন অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখন কাপ্তাই লেকের জল থেকে এক ধরণের শীতল কুয়াশা উঠে আসে, যা নানামির বাংলোটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। বুনো ঝোপঝাড়ে জোনাকিদের মেলা বসে ঠিকই, কিন্তু বাংলোর নিস্তব্ধতা যেন কোনো এক অলৌকিক উপস্থিতির ভারে নুয়ে থাকে।

এক মাস ধরে এই বাংলোতে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে, যা তনুজা বা নানামি কেউ টেরও পায়নি। নোবারা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন তার ঘরের জানালার পাল্লাটা কোনো এক জাদুকরী কৌশলে নিঃশব্দে খুলে যায়। রাঙামাটির এই দুর্ভেদ্য পাহাড় আর কড়া পুলিশি পাহারার ভেতরেও একজন মানুষ, কিংবা বলা ভালো এক ছায়ামানব প্রতি রাতে এই ঘরে প্রবেশ করে!

রাত তখন আনুমানিক দুটো। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝেমধ্যে দূরের পাহাড় থেকে কোনো বুনো জানোয়ারের ডাক ভেসে আসছে। নোবারার ঘরের ভেতরটা চাঁদের আলোয় আধা-অন্ধকার হয়ে আছে। ঠিক এই সময় জানালার খিলটা আলতো শব্দে সরে গেল। পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘদেহী ছায়ামানব। তার পরনে কুচকুচে কালো পোশাক, মাথায় একটা হুডি টানা। মুখটা ছায়ায় ঢাকা থাকলেও তার চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলজ্বল করছে।

ছায়ামানবটি খুব সন্তর্পণে বিছানার কাছে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এতটাই নিঃশব্দ যে মেঝের কাঠও কোনো অভিযোগ করল না। সে নোবারার শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল। ঘুমে নোবারার মুখটা খুব নিষ্পাপ আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

ছায়ামানবটি তার পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বের করল। শিশিটির মুখ খুলতেই এক ধরণের মিষ্টি অথচ কড়া ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। সে খুব সাবধানে নোবারার নাকের কাছে শিশিটি কয়েক সেকেন্ডের জন্য ধরল।

নোবারা ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠল, তারপর আবার গভীর তন্দ্রায় তলিয়ে গেল। এই বিশেষ ঘ্রাণটি তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য এক গভীর অচৈতন্য অবস্থায় নিয়ে যায়, যাতে তার পাশে কেউ বসলেও সে টের না পায়।

ছায়ামানবটি এবার বিছানার এক পাশে বসল। তার হাতটা কাঁপছে। সে খুব আলতো করে নোবারার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে দিল। এই স্পর্শে এক ধরণের আদিম তৃষ্ণা আর অগাধ মায়া মিশে আছে। সে নোবারার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গালের দিকে তাকিয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। তার বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, যা সে অনেক কষ্টে চেপে রাখল।

সে নোবারার পাশে শুয়ে পড়ল। খুব সাবধানে, যেন কোনো কাঁচের পুতুল ভাঙছে, সে নোবারাকে নিজের বুকের বাঁ পাশে জড়িয়ে ধরল। নোবারা অবচেতন মনেই সেই উষ্ণতার দিকে ঝুঁকে এল। এই আলিঙ্গনে কোনো লালসা নেই, আছে কেবল এক বিচ্ছেদ-বিধ্বস্ত আত্মার আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা।

ছায়ামানবটি তার চিবুক নোবারার মাথায় রাখল। গত এক মাস ধরে এই কয়েক ঘণ্টাই তার জীবনের একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ। বহু কষ্টে সে নোবারাকে কাছে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

আজ রাতে ছায়ামানবটির আচরণে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। সে হয়তো জানালার বাইরে থেকেই তনুজা আর নোবারার বিকেলের কথোপকথন শুনেছে। সে জানে, এক নতুন অঙ্কুর নোবারার গর্ভে বড় হচ্ছে। সে তার হাতটা খুব সন্তর্পণে নোবারার পেটের ওপর রাখল। তার হাতের তালু দিয়ে এক অদ্ভুত স্পন্দন সে অনুভব করতে চাইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে নোবারার কাঁধে পড়ল!

সে তার হুডির তলা থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স বের করল। বাক্সটা সে নোবারার বালিশের নিচে গুঁজে দিল।

বাইরে ভোরের পাখি ডেকে ওঠার আগেই ছায়ামানবটি বিছানা ছাড়ল। সে আবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো নোবারার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চাউনি বলছে, সে খুব কাছেই আছে, প্রতিটা মুহূর্তে সে নোবারাকে পাহারা দিচ্ছে।

সকাল হলো। সূর্যের আলোয় পাহাড়ের কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। নোবারা যখন চোখ মেলল, তার মনে হলো সে কোনো এক অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন দেখেছে। তার নাকে এখনো সেই অপরিচিত অথচ চেনা এক ঘ্রাণ লেগে আছে। সে আড়মোড়া ভেঙে উঠতে গিয়ে দেখল বালিশের নিচে কী যেন একটা শক্ত জিনিস বিঁধছে।

সে হাত দিয়ে বাক্সটা বের করল। তনুজা তখন ঘরে ঢুকছে চায়ের কাপ হাতে। নোবারা দ্রুত বাক্সটা খুলল। ভেতরে সোনার চেইনে ঝোলানো একটি লকেট। লকেটটি একটি ছোট ঢালের মতো, যার মাঝখানে খোদাই করা আছে, জেড!

নোবারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। লকেটটি থেকে সেই একই সুগন্ধ বেরোচ্ছে যা সে ঘুমের ঘোরে অনুভব করেছিল। সে জানালার দিকে তাকাল। জানালাটা বন্ধ, কিন্তু খিলটা যেন ঠিকমতো লাগানো নেই। কে এই লকেট টা তাকে দিল? কেউ কি এসেছিল তার ঘরে? প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার শরীর ব্যথা করে, মাথা ঝিমঝিম করে উঠে। কিসের লক্ষণ ছিল এসব! নোবারার তার অনাগত সন্তান নিয়ে এবার চিন্তা হতে শুরু করলো। নানামির বাংলো কি তার জন্য কোন ঝড় বয়ে আনছে?

চলবে ইংশাআল্লাহ……….

(নোবারা অন্তঃসত্ত্বা, এই সুখবর জানাতে অসময়ে পোস্ট করলাম। ওর একটা বাবু হবে। লিটল জেনিন নুরশাদ! নাকি লিটল নোবারা নুরশাদ?😭🫶)

(ওহহ! হু ইজ দিস ছায়ামানব? অ্যানি আইডিয়া গাইজ!? কমেন্টে জানান তো দেখি!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here