#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১২
আয়নার কানে বিয়ের খবর এলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। তবে তার তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। মনে মনে তার অন্য চিন্তা। এই বাড়ির পাশেই রেল স্টেশন। কোন ভাবে একবার বের হতে পারলেই হলো। ব্যস, সব সমাধান। এর মধ্যে বিয়ে হলো, না হলো, কার সাথে হলো এই নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। মাথা ব্যথা হলো মহিলারা কেউ একা ছাড়ছে না। মৌমাছির মতো জেঁকে ঘিরে আছে। অবশ্য এখন ঘর খালি। আজিজ চাচা এসেছে, এসেছে তার লোভী চাচাও। তারা’ই কিছুক্ষণের জন্য ঘরটা খালি করতে বলেছে।
খালি হলেও সবাই এদিক ওদিক দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। দেওয়ার অবশ্য কারণ আছে। তার চাচা তাকে দেখেই মাথা চাপড়ে বিলাপ শুরু করেছে। লোভী থাক, খারাপ থাক, নিজের রক্ত না থাক, বুকে আগলে বড় করেছে। সেই মেয়ের হাল দেখে ভেঙে চুরে বিলাপ আপনা আপনি’ই হয়ত বেরিয়ে এসেছে।
আজিজ কিছুক্ষণ বসে রইল চুপচাপ। চুপচাপ বসলেও তার দৃষ্টি আয়নার উপরে। আয়নার হাবভাব সে সবই খেয়াল করলো। সিধেসাদা গ্রামের মেয়ে। প্যাচ বোঝার মতো বয়স বা বুদ্ধি দু’টোর একটাও হয়নি। হয়নি বলেই আজিজ হাসলো! এই হাসি অবশ্য কারো চোখে পড়ার কথা না। এই হাসি নিজের, একান্তই নিজের। তাই হেসেই আক্কাসকে বললো, — আমি আয়নার সাথে একটু একা কথা বলবো। ঘর, আশ- পাশ খালি কর।
বশির চোখের পানি নিয়েই আজিজের দিকে তাকালো! তাকাতেই আজিজ বললো, — আয়নার বিয়ে হবে, আজ এক্ষুণি’ই হবে। শুধু বিশ্বাস রাখ বশির। তোর ভাতিজি হবে সারেং বাড়ির একমাত্র কর্ত্রী। আজিজ কখনো মিথ্যা আশ্বাস দেয় না।
বশির স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো, সাথে লোভী মন আবার চকচক করে উঠল। তার আয়না হবে সারেং বাড়ির কর্ত্রী! তিন ধানের ক্ষেত আর এমন কি? তাদের দুনিয়া’ই তো ঘুরে যাইবো। সে চোখের পানি মুছে নিশ্চিন্তেই বেরিয়ে গেলো। মহাজন যেহেতু বলছে, আর কোন চিন্তা নাই।
বেরিয়ে গেলো আক্কাসও। বেরিয়েই উঁকিঝুঁকি মারা মহিলাদের সাইড করলো। করতেই আজিজ কোমল সুরে ডাকলো, — আয়না..
দুমড়ানো মুচড়ানো ধুলোবালি মাখা শাড়ি, এলোমেলো চুল, কোন রকম ঝুলে থাকা গহনা, আর ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুখে আয়না বসে ছিল নির্জীব ভাবে। দৃষ্টি ঘরের মাটির মেঝের দিকে, এক পলকে। এই কোমল ডাকে আয়না একটু কেঁপে উঠল, তবে সেই পর্যন্ত’ই। না তাকালো, না উত্তর দিলো।
আজিজ উঠল! দাঁড়ালো ঠিক আয়নার সামনে। দাঁড়িয়ে বললো, — তোর জানতে ইচ্ছে করেনা , তোর বাবা – মায়ের সাথে কি হয়েছে?
আয়নার নির্জীব মুখের ভ্রু দু’টো একটু কুঁচকালো! সাদা ফ্যাকাশে মুখটা একটু যেন জীবন্ত হলো। আজিজ দেখলো, দেখে হাটু ভেঙে আয়নার সামনে বসলো। বসে আগের মতোই বললো, — তোর কি জানতে ইচ্ছে করে না, একই ভাবে দু’ দুটো মানুষ কি করে গায়েব হলো ? কেন হলো?
আয়না চোখ তুলে আজিজের দিকে তাকালো! তাকাতেই ক্লান্ত চোখদুটো পানিতে টইটম্বুর হলো। সেই টইটম্বুর চোখের দিকে তাকিয়ে আজিজ বললো, — সারেং বাড়ি শক্ত খোলসে ঢাকা। বাহির থেকে যতোই আঘাত করো, সেটা ভাঙা সম্ভব না। ভাঙতে হলে ভেতর থেকে ছিদ্র করতে হবে। আর ছিদ্র করতে হলে ভেতরে যেতে হবে।
আয়নার গাল গড়িয়ে পানি পড়ল! আজিজ আয়নার মাথায় হাত রাখলো। রেখে বললো, — যাবি আয়না?
শাহবাজ বিয়ের কথা শুনলো শান্ত ভাবেই। শুনে শান্ত চোখেই জাফরের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — শুধু তুমি বলে শুনলাম। আর কেউ আসুক, জিন্দা দাফন দেবো।
— তাহলে আয়নার কথা ভুলে যা। আমি নিজে তাকে তার খালার কাছে দিয়ে আসবো।
শাহবাজ তার মতোই বললো — না।
জাফর বিরক্ত হলো, বিরক্ত মাখা কন্ঠে বললো — মাথা খারাপ হয়েছে তোর। তুই বুঝতে পারছিস কি করেছিস তুই। মেয়েটার মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।
— আমার কিছু আসে যায় না।
জাফর হাল ছাড়ল! কি করবে এই ছেলেকে নিয়ে। মরে যাবে তবে নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়বে না। তখনি উঠানে আয়না এসে দাঁড়ালো। তার হাতে দিয়াশলাই । সেটা ঘষে আগুন জ্বালিয়ে নির্জীব কণ্ঠে কোন রকম ঠোঁট নাড়িয়ে বললো, — আমি সারেং বাড়ির বড় বউ হতে চাইনি। আমার আর সারেং বাড়ির ছোট নাতির সম্পর্ক ছিল। তাই পালিয়েছিলাম। এখন সবার ভয়ে পাল্টি মারছে। বিয়ে করলে দাদিকে মুখ দেখাবে কি করে। তাই আমার আর কোন উপায় নাই। এক উপায় মুত্যু। তাই আপনাদের সাক্ষী রেখেই মৃত্যুকে আপন করে নিলাম। বলেই লাল বেনারসি শাড়ির আঁচলে আগুন ধরিয়ে দিল।
শাহবাজ হতভম্ব হয়ে গেলো! তার ধারণারও বাইরে ছিল আয়না এমন কিছু বলবে। হতম্ভব হলো ফরহাদও। আর কেউ না জানুক সে তো সব জানে। ভাগিয়ে আনলোও তো সে নিজে। জাফর আঁতকে উঠলো। এলাকার মানুষ দৌড়ে গিয়ে’ই সাথে সাথে আগুন নেভালো। নেভাতেই রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। এতিম, গরিব ঘরের মাইয়া, যা মন চায় তাই করবো। হাত ধরে ঘর থেকে বের করে মাঝ রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া। ফাজলামি নাকি? ক্ষমতা থাক তাদের নিজের কাছে, তারা আর কাউকে মানবে না। এই ছেলেকে উচিত শিক্ষা দেবে। দ্বিতীয় বার কোন মেয়ের জীবন নিয়ে যেন ছিনিমিনি না খেলতে পারে।
এবার অবশ্য শাহবাজ এতোটুকুও ক্ষেপলো না। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠল সাথে সাথেই। নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে আয়নার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকালো! তারপর একটু হাসলো! তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে সোজা বললো, — বিয়ের ব্যবস্থা করেন ছোট চাচা। শাহবাজের কলিজা সম্পর্কে এর ধারণা নেই। যদি থাকতো ভয়, পাল্টি মারার মতো অপবাদ গায়ে দিতো না।
শাহবাজের বলতে দেরি বিয়ের ব্যবস্থা করতে দেরি হলো না। যেন এলাকার মানুষ এই অপেক্ষায়’ই ছিল। এলাকার মসজিদের ইমামকে সাথে সাথেই হাজির করা হলো। বিয়ের কার্যক্রম সব শাহবাজ নিজেই এগিয়ে করলো, করে কোন ভনিতা ছাড়া কবুল বললো, তেমনি পোড়া আঁচল গায়ে জড়িয়ে পোড়া কপালি আয়নাও কবুল বললো খুব স্বাভাবিক ভাবে। আর স্বাভাবিক ভাবেই সবাই মোনাজাত ধরলো। ধরে শেষ হতে খুব একটা সময় গেলো না। শাহবাজ এগিয়ে গিয়ে আয়নার গালে ঠ্যাটিয়ে একটা লাগালো।
সবাই বলতে গেলে আঁতকে উঠল। ভরা মজলিশে এমন কেউ করতে পারে, তাদের ধারণাও ছিল না। আয়নাকে বসানো হয়েছিল উঠানের এক কোণে চেয়ারে, মহিলাদের পাশে। দু’দিনের এতো এতো ধকলের পরে এই থাপ্পড় হজম করা তার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। সাথে সাথেই উল্টে পড়ল। পড়ে আর কোন হেলদোল হলো না। মহিলারা এগিয়ে গিয়ে ধরতেই দেখলো জ্ঞান হারিয়েছে।
শাহবাজ নির্বিকার, নির্বিকার ভাবে’ই বললো, — আমার বউ যা খুশি তাই করবো, কারো কিছু বলার আছে?
সবাই হতভম্ব! বশির শুধু বিলাপ দিয়ে কেঁদে উঠল। তার মেয়েকে জিন্দা রাখবে না গো, জিন্দা রাখবে না। আল্লাহ! কোন পাপের শাস্তি দিতাছো?
জাফর অন্য রকম। মারপিট তো ভালোই কখনোও উঁচু গলায় কথা বলে না। তবে আজ এগিয়ে গিয়ে ঠাস করেই এক থাপ্পড় শাহবাজের গালে মারলো। শাহবাজের তাও তেমন কোন পরির্বতন হলো না। সে আগুন চোখে আয়নার দিকে আরো একবার তাকালো। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই যেতে যেতে বললো, — পিরিতের বউ আমার, সাবধানে নিয়ে আইসো ছোট চাচা।
জাফর চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেললো! ফেলে আয়নার চাচার সামনে গিয়ে বললো, — আমি নিজে এই মেয়ের দায়িত্ব নিলাম। আমি থাকতে আর একটা ফুলের টোকাও এই মেয়ের গায়ে পড়বে না।
আজিজ হাসলো! হেসে এগিয়ে কাঁধ জড়িয়ে বললো, — এই তো আমার ভাইয়ের মতো কথা।
______
বসন্ত যে বিদায় নিচ্ছে এই শেষ বিকেলে রোদ’ই তার তেজে ভালোভাবেই জানান দিচ্ছে। সন্ধ্যা নামো নামো করছে তবুও চারিদিকে কেমন গুমোট একটা ভাব। পৃথিলা জুঁইয়ের হাত ছেড়ে আঁচল দিয়ে মুখটা মুছলো। মুছে আগের মতোই ছোট্ট চিকন হাতটা মুঠো করলো। মেয়েটা তার মতোই শান্ত। এই যে চুপচাপ কি সুন্দর হাঁটছে।
মিঠাপুকুর গ্রামটা আর পাঁচ দশটা গ্রামের মতোই। নদীর এই সাইডে হওয়ার সব কিছু থেকে একটু পিছিয়ে । কিছু কিছু জায়গায় ইট বিছানো রাস্তা হলেও, বেশিভাগই মেঠো পথ। মেঠো পথের এক সাইডে বসত বাড়ি। আরেক সাইডে ফসলের জমি। সেই জমির সাইড ঘেঁষে রাস্তায় পৃথিলা ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার এক হাতের মুঠোয় জুঁই আরেক হাতের মুঠোয় মাটির একটা কালো কলসি। সাবিহাও সাইডে।
সাইডে থাকলেও তার দু’হাতে মাটির হাড়ি। তারা বেরিয়েছিল একটু হাঁটতে। হাঁটতে হাঁটতেই এক কুমোর বাড়ি পড়ল। পৃথিলাকে টেনে নিলো দেখাতে। হিন্দু বাড়ি, কি সুন্দর ঝকঝকে তকতকে উঠান। উঠানের মাঝ বরাবর তুলসি তলা, সীমানা ঘেঁষে জবা, বেলী ফুলের গাছ। পৃথিলা ঘুরে ঘুরে দেখলো। দেখতে দেখতেই এই মেয়ে হাড়ি পাতিল কিনে একাকার। সেগুলোই এখন দু- হাতে ঝাপটে ধরে নিচ্ছে। নিতে গিয়ে নাজেহাল। তাই সে নিজেই এই কলসি টেনে নিলো। মেয়েটা পারেও বটে। সেই আগের মতোই আছে, কি করে না করে তার কোন হদিস নেই।
— এমন থম মেরে আছিস কেন?
পৃথিলার দৃষ্টি ছিল ফসলের ক্ষেতে। সেখানে দৃষ্টি রেখেই ধীরে ধীরে হাঁটছিল। সূর্যটা ডিমের কসুমের মতো নরম কোমল হয়ে নিচে নেমে এসেছে। ধানের ক্ষেতের ওপারে রং তুলির আঁকা ছবির মতো লাগছে। তাই দৃষ্টি ফিরিয়ে সাবিহার দিকে তাকিয়ে বললো, — আমিতো সব সময়’ই এমন।
— উঁহু। আগে কথা কম বলতি তবে এমন ছিলি না।
— বয়সও তো আগের মতো নেই।
— আমি কি বদলেছি?
— সবাই কি আর এক রকম হয়।
— তা ঠিক, এই যে দেখ আগেও কালির পাতিল ছিলাম, এখনো আছি। তার সাথে যোগ হয়েছে মাংস। চলতি ফিরতি আস্ত এক ধানের বস্তা।
পৃথিলা হালকা হাসলো! হেসে বললো, — এটা বস্তা না সুখ।
— বলেছে তোকে।
পৃথিলা আবারো হালকা হাসলো! হাসতেই খেয়াল করলো, আজ সারা দিন তারেকের কথা মনে পড়েনি।
সাবিহা নিচু হয়ে রাস্তায় হাড়িগুলো রাখলো। রেখে আঁচল ভালো ভাবে টেনে বললো, — মাথায় আঁচল তোল পৃথি। গাল ফেটে তো রক্ত বের হবে।
পৃথিলা টানলো না। শুধু আঁচল টেনে আরেকটু গায়ে জড়ালো। এক হাতে কলসি, আরেক হাতে জুঁই। একটু ঢিলে হয়েছিল। তাছাড়া ঘোমটায় সাবিহাকে বউ বউ লাগছে। যেটা সে আর কখনোও লাগতে চায় না।
তাই আঁচল টেনেই আবার ফসলের ক্ষেতের দিকে তাকালো। তাকিয়ে আবার ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। তার গায়ে জলপাই রঙের তাঁতের শাড়ি। মাথায় সাধারণ হাত খোঁপা। অধিকাংশ সময় তার এভাবেই কাটে। সাজ সজ্জায় আগে থেকেই আনাড়ি। সাধারণ কাজল টানতে গেলেও ছড়িয়ে ফেলে। তারেক খুব আফসোস করতো। তার চোখ নাকি অসম্ভব সুন্দর। কোণাটা কেমন যেন বাঁকা। যেন হরিণের চোখ।
তাই প্রায়’ই খুব আফসোস করে বলতো, — তুমি মেয়ে নামের কলঙ্ক পৃথি। এতো মায়াবি একটা মুখ, একটু গোছাতেও পারো না।
আসলেই সে মেয়ে নামের কলঙ্ক। কলঙ্ক না হলে তার জীবন এমন হয়। তখনি শিস বাজলো। পৃথিলা ফিরে তাকালো। এক বিশাল পাকুড় গাছের নিচে এক দল ছেলে গোল হয়ে বসে আছে। কি করছে কে জানে। সে ফিরে তাকাতেই সবাই খিকখিক করে হাসলো।
পৃথিলা দাঁড়িয়ে গেলো। অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলো না। সাবিহা বলতে গেলে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে নিয়ে এলো। যেতে যেতেও পৃথিলা আবার তাকালো। এতোক্ষণ কি করছে না বুঝলেও একজনের সাইডে কালো কাচের ঔষুদের বোতল দেখলো।
পৃথিলা ঘাড় ফিরিয়ে বললো, — এভাবে নিয়ে এলি কেন?
— ওরা ভালো ছেলে না। নেশা টেশা করে। তুই তো দেবি মহারানি। কি না কি বলে ফেলিস।
— এলাকার মানুষেরা কিছু বলে না?
— এই সব, সব এলাকায়’ই থাকে। এতো বলে লাভ কি? তাছাড়া এখন তোকে চিনছে না বলে শিস বাজিয়েছে, যখন চিনবে আর করবে না। আমি এরশাদ ভাইকে বলে দেবো।
— তাকে বলতে হবে কেন?
সাবিহা হাসলো! হেসে বললো, — বললে সমস্যা কি?
পৃথিলা সেই কথার উত্তর দিলো না, কথা ঘুরিয়ে বললো, — তুই আগেই কি চাকরির ব্যাপারে কথা বলেছিলি?
— না তো! আমি কি জানতাম তুই আসবি?
— তাহলে জাফর মানে ওনি এই ভাবে বললেন কেন?
সাবিহা থতমতো খেয়ে গেলো! সাথে সাথে’ই নিজেকে সামলে বলল, — আরে সকালে তো ইমরান গিয়েছিল। হয়তো সে বলেছে। তাছাড়া তখন পরিস্থিতি এমন ছিল তাই হয়ত একটু বাড়িয়ে বলেছে।
— আমার পরিস্থিতিতে তাদের কি?
সাবিহা ফ্যাকাশে মুখে বলল, — জাফর চাচা এমনি। নরম মনের মানুষ। ভেবেছে আমার বান্ধবী। আমাকেও তো খুব স্নেহ করে।
— তুই বন্ধুর মেয়ে, সেটা তো করবেই। তবে আমি কে?
সাবিহা অসহায় ভাবে ঢোক গিললো! মিথ্যা সে খুব একটা বলতে পারে না। বলতে গেলেও ধরা খায়। এখনো ঠিক খাবে। আল্লাহ রক্ষা করো।
পৃথিলা আর কিছু বলল না! তবে কিছু একটা ঠিক নেই। কি নেই, সে ধরতে পারছে না।
পৃথিলা চুপচাপ কিছুক্ষণ সাবিহার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ঘুরতেই চমকে উঠল! কথা বলতে বলতে একটা মোড়ে এসেছে খেয়াল করেনি। সেই মোড় থেকেই কয়েকজন লোক এক সাথে বেরিয়েছে। আরেকটু হলে ধাক্কা খেতো। সেই ধাক্কা থেকে বাঁচতে এতোটাই চমকেছে যে হাত থেকে কলসি ছুটে গেছে।
সাবিহা হা হয়ে গেলো। হা হয়েই বলল, — এতোদূর থেকে টেনে আনাই বিফলে গেলো রে পৃথি।
পৃথিলা নিজেও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে মোড় থেকে আসা মানুষগুলোও। শুধু তাকিয়ে না, তারা থতমতো খেয়ে গেছে । তারাও খেয়াল করেনি। আর তাদের পেছন থেকেই এরশাদ উঁকি দিলো । সে পেছনে ছিল। একটা লোকের সাথে কথা বলছিল। শব্দ শুনে উঁকি দিয়েই থমকালো। না থমকে উপায় কি? ভাঙা কলসি তার সামনে চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক রমণী।
আর এই শেষ বিকেলের কোমল নরম আলোয় এরশাদ শুধু বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমণী দেখলো না। দেখলো বিস্ময় মাখা অসম্ভব সুন্দর দু’টো চোখ। আর সেই চোখে তার সর্বনাশ।
তখনই এক ছেলে দৌড়ে এলো! এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, — শাহবাজ ভাই বিয়ে করছে। আয়নামতি কে। ছোট চাচা, ফরহাদ ভাই বউ নিয়ে বাড়িতে আইছে।
এরশাদ অবাক হলো না। তবে পৃথিলা অবাক হয়ে বলল, — এটা কি সেই নৌকার মেয়েটা?
— হ্যাঁ।
— আপনি তাকে ট্রেনে তুলেন নি?
— তুলেছি ।
— তো?
এরশাদ হাসলো! হেসে তার সাথের লোককে ইশারা দিলো সাবিহার হাতে হাড়ি গুলো নিতে। ইশারা দিয়ে বলল, — দুনিয়ার সব খন্ডানো যায় তবে ভাগ্য না। তার ভাগ্যে সারেং বাড়ির বউ হওয়া লেখা ছিল। তাই যে ভাবেই হোক হয়েছে, বা এমনও হতে পারে অন্য কাউকে তার সঠিক জায়গায় আনার জন্য তার ভাগ্য ঘুরে ফিরে গেছে।
পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো! এরশাদ সেই কুঁচকে যাওয়া চোখের দিকে আবারো তাকালো। তাকিয়ে চোখ রেখেই বাড়ির দিকে রওনা দিলো। জয়তুন আরা আগুন লাগিয়ে দেবে।
নিশ্চুপ সারেং বাড়ি সন্ধ্যার আগে আগে আবার জাঁকজমক হয়ে উঠল। উঠার কারণ সারেং বাড়ির ছোট নাতি বিয়ে করেছে। অন্য কোন মেয়েকে না, বড় ভাইয়ের পালিয়ে যাওয়া বউকে। সেই বউকে’ই সারেং বাড়ির ছোট ছেলে সসম্মানে বাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। ছোট নাতির খবর নেই। বউয়ের অবস্থাও খারাপ। গরুর গাড়ির এক কোণে বলতে গেলে মরার মতো পড়ে আছে।
সেই পড়ে থাকা বউকে এক ঝলক দেখার জন্যই সারেং বাড়ির উঠানে এলাকার লোক জমাট বেঁধে গেল। জয়তুন বসার ঘর থেকেই হুঙ্কার ছাড়লো। মাগরিবের আযান কানে আসার আগে আমার উঠান ফাঁকা চাই।
কালাম দৌড়ে গেলো! শুধু সে না, দৌড়ে বেরুলো সারেং বাড়িতে থাকা প্রতিটা মানুষও। শুধু বেরোলো না জয়তুন আরা। সে বসার ঘর থেকে জাফরের উদ্দেশ্য বললো, — এই মেয়েকে আমি ঘরে তুলবো না। যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যা, তবে সারেং বাড়িতে না।
জাফর বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে তার শান্ত কণ্ঠে’ই বলল, — সারেং বাড়ির বউ সারেং বাড়ির সম্মান। যেভাবেই হোক বিয়ে হয়েছে। আর হয়েছে বলেই সে এই বাড়ির অংশ। আর আমি থাকতে সারেং বাড়ির কোন অংশ পথে ঘাটে থাকবে না।
— তাহলে তুইও বেরিয়ে যা।
জাফর হাসলো! হিসেব অনুযায়ী পুরো সারেং বাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকারী সে। তাই হেসেই গরুর গাড়ির দিকে এগুলো। আয়না পড়ে আছে এক দিকে, ফরহাদ বসে আছে সামনের দিকে। তার নিজের অবস্থাও খারাপ। জ্বর আসবে কি না কে জানে? চোখে মুখে ঘোলা দেখছে। আরে জ্বালারে! একটায় বিয়ে করবে না, আরেকটায় আয়নামতি কোথায়, আয়নামতি কোথায় বলে বলে চোখ, নাক, মুখ ফাটিয়ে এখন বিয়ে করে গায়েব। আর এইদিকে এই আপদকে টানা ছেঁচড়া করতে করতে তার জীবন বরবাদ। ছ্যাহ্!
সে বিরক্ত মুখেই গাড়িয়াল কে ধমকে বলল, — যা বেটা মহাজনের বাড়ির দিকে যা।
গাড়িয়াল অবশ্য গাড়ি বেরও করতে পারলো না। তখনই এরশাদ এলো। এরশাদ সাথে সাথে পৃথিলাও এলো। পৃথিলাকে দেখে ফরহাদের চান্দি আরো গরম হলো। এই আপদ দেখি এখনো এরশাদের পেছন পেছন ঘুরছে। দেখতো! সূর্য এক দিকে উঠে আরেক দিকে ডুবে গেছে। আর এরা এখনো চম্বুকের মতো লেগে আছে। হাহ্! কপাল, সবই কপাল।
চলবে……

