প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ১১

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১১

সময় হলো অস্পর্শী এক মূল্যবান সম্পদ। কেউ অযত্নে অবহেলায় পার করে দেয়, তো কেউ ভীষণ যত্নে পার করে। আবার সময় কারোর জন্য ফুরাতে চায় না, তো কারোর জন্য নিমিষেই ফুরিয়ে যায়।

সিদ্দিকী সাহেবের ধৈর্য্য এবার নিঃশেষের পথে। বেলা তখন তিনটা! মেয়েটাকে নিয়ে এখনো আসছে না সমির; আর না কোনপ্রকার যোগাযোগ করা যাচ্ছে। অচিরেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে লাগল। বয়স্ক লোকটি ঘেমে উঠল অজানা চিন্তায়। অন্তঃস্থল কেন বারবার কু ডাকছে? তার সকল চিন্তারা দারুণ মাত্রা পেল যখন তহমিনার কাছে কোনপ্রকার খোঁজ না পেয়ে সমিরের বাড়িতে আর অফিসে খোঁজ নিলেন। সেই দারোয়ান আর বাড়ির মালিক নেই—নতুন দারোয়ান আর নতুন বাড়ির মালিক দেখে হতভম্ব হয়ে যায় সিদ্দিকী সাহেব। দারোয়ান একদিনে বদলানো গেলেও বাড়ির মালিক কি একদিনে বদলে যায়? তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো ঐ বাড়ির মালিক জানায়, সে তো বিগত দশ বছর ধরে ঐ বাড়ির মালিক। তবে সিদ্দিকী সাহেবের সাথে যেচে যেই লোকটা কথা বলল, বাড়ি ওয়ালার পরিচয় দিল—সে কে? তবে কি তাদের সাথে কোন ষড়যন্ত্র হয়েছে? পরিস্থিতি এমনভাবে গুছিয়ে রাখা ছিল যেন তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়! তারা ছিল সঙ্গবদ্ধ কোন চক্র!

উদ্বিগ্নতা, অস্থিরতা ছেয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। সিদ্দিকী সাহেব এবার সমিরের অফিসে গিয়ে খোঁজ নিলেন। তারা জানায় সেখানে সমির নামের কেউ কখনো কর্মরত ছিল না। এতো নিখুঁতভাবে ষড়যন্ত্রের স্বীকার সিদ্দিকী সাহেব এবার সর্বহারা পথিকের ন্যায় পুরো শহর হন্য হয়ে খুঁজতে লাগল মেয়েকে। পুলিশের কাছে গেলে জানায় তারা চব্বিশ ঘণ্টার আগে অভিযোগ গ্রহণ করলেও তদন্ত শুরু করবে না। কারণ নিখোঁজ ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী। সিদ্দিকী সাহেব হাত জোড় করে অনুনয় করে জানায় পুরো ঘটনা তবুও পুলিশ কর্মকর্তারা কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি।
এই কান্ডে তহমিনা একদম চুপসে গিয়েছে। স্বামীর থেকে যতটা পারছে মুখ লুকিয়ে নীরবে চলছে। কেননা এই সম্বন্ধ তার মাধ্যমেই এসেছিল। এখন তো তাকে মারতেও দুবার ভাববে না সিদ্দিকী সাহেব। তবে সিদ্দিকী সাহেবের সেদিকে কোন খেয়াল নেই, সে তো হন্য হয়ে যার তার দ্বারপ্রান্ত হচ্ছে মেয়েকে খোঁজার জন্য।

সাঁঝ নামার তরে! তহমিনা মুখ চেপে কাঁদছে আর মেকি আহাজারি করছে। মধুমিতা সেদিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে দ্রুত ছুটলো ঘরে। ঘরে ফিরতেই বুক চিরে আর্তনাদ সহ কান্নারা বেরিয়ে আসলো। এই একাকী জীবনে তার সকল সুখ দুঃখের ভাগীদার তার সখী যে! “বিয়ে” নামক শব্দটি মেয়েটির জন্য এতটা অভিশপ্ত! সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেকে ফোন লাগায়। ছেলে ফোন রিসিভ করছে না। মধুমিতা থামে না দিতেই থাকে। একবার ভাবলো ছুটে যাবে ঐ ঘৃণ্য মানুষটার কাছে; তার কাছে তো ক্ষমতা আছে সে নিশ্চিত পারবে তার ইন্দুবালাকে খুঁজে আনতে। কিন্তু সাহসে কুলায় না; যার মুখ ও দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না তার কাছে কি করে বিপদে হাত পাতবে?

তৎক্ষণাৎ সদর দরজা ঠেলে মোত্তাকিন ঘরে ঢুকলো। ঘেমেনেয়ে একাকার সুবিশাল দেহ! নিজ মনে গুনগুনিয়ে গান গাচ্ছে ছেলেটা। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“বাবু, তোকে কতবার ফোন দিয়েছি?”

মায়ের ক্রন্দনরত কণ্ঠে মোত্তাকিন চোখ তুলে তাকায়। কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“কি হলো তুমি এভাবে কাঁদছ কেন? আমি তো একদম সুস্থ সবল তোমার সামনেই আছি।”

মধুমিতা কঠোরতা ধরে রাখতে পারে না ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
–“বাবু, আমার ইন্দুবালা! ঐ সমির একটা ক্রিমিনাল। বিয়ের শপিং এর নাম করে আমার ইন্দুবালাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে। ও যেখানে থাকার কথা বলেছিল তাও মিথ্যে, চাকরির কথাও মিথ্যে। আমার ইন্দুবালাকে খুঁজে দে বাবু। তোর তো কত গুন্ডাদের সাথে ওঠাবসা আছে তাদের একটু বল না।”

আশ্চর্য ভাবে মোত্তাকিনের মাঝে কোন উদ্বেগ দেখা গেল না। সে মেকি আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“সে কি সত্যি ঘটনা? কখন? কি বলো, তোমাদের মত বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ মানুষের সামনে থেকে কেউ এভাবে ইন্দুবালাকে নিয়ে গেল? কেন তোমরা তো বলছিলে তোমাদের পাত্র না-কি দুধের ধোঁয়া তুলসী পাতা! তা তোমাদের সুপুরুষ হঠাৎ ঘন্টাখানেকের ব্যবধানে এভাবে ক্রিমিনাল হয়ে গেল?”

মোত্তাকিন ততক্ষণে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে খেতে বসেছে। মধুমিতা বুকভরা অস্থিরতা সামলে নম্র স্বরে বলল,
–“বাবু, এখন খোঁটা দেয়ার সময়? কত সময় হয়ে গিয়েছে, মেয়েটার যদি কিছু হয়ে যায় আমি আর বাঁচবো না বাবু। কিছু একটা কর। পুলিশ চব্বিশ ঘণ্টার আগে তদন্তে নামবে না। ততক্ষণে দেরি হয়ে যাবে। তুই তোর দলের লোকদের একটু ফোন দে। তারা কোন সাহায্য অবশ্যই করতে পারবে।”

মোত্তাকিন ভাতের প্লেট উল্টাতে উল্টাতে শ্লেষ্মাত্বক
হেসে বলল,
–“বিপদে পড়লে মানুষ আমায় ফোন দেয় মামনি, আমি কাউকে দেই না।”

মধুমিতা এবার রাগ ধরে রাখতে না পেরে তেতে উঠল।
–“তবে তুই খেতে বসলি কেন এখন? যা আমার ইন্দুবালাকে খুঁজে নিয়ে আয়। মেয়েটা কোন অবস্থায় আছে কেউ কিছু জানিই না। আদৌ ঠিক আছে কিনা! তোর মনে কি একটুও ভয় নেই?”

মোত্তাকিন তখনো নিরুদ্বেগ। শান্ত স্বরে বলল,
–“চিন্তা করোনা মামনি, তোমার ইন্দুবালাকে আমি খুঁজে আনবো। আনবোই আনবো—অন্তত দু’টো কানের নিচে দেয়ার জন্য হলেও আনবো। কিন্তু তার আগে খেতে হবে‌। ভীষণ খিদে পেয়েছে মামনি।”

মধুমিতা ছেলের একরোখা আচরণে যারপরনাই অস্থির হয়ে নিজেই দ্রুত ভাত মেখে জোরপূর্বক গেলাতে লাগলেন। মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বড় বড় লোকমা গিলছে। খাওয়া শেষ হতেই মধুমিতা তাকে এক প্রকার জোরজবরদস্তি করে ঘর থেকে বের করে অনুরোধ করে বলল,
–“আমার ইন্দুবালাকে যে করে হোক খুঁজে আনবি বাবু। আমি অপেক্ষায় থাকব, মায়ের এই আবদারটা ফেলিস না বাপ। ঐ মেয়েটা কম দুঃখ পায়নি জীবনে। ওর সাথে যদি খারাপ কিছু হয় আমি মরেও শান্তি পাব না। ওকে একটু সুখী দেখার স্বপ্ন বোধহয় আমার স্বপ্নই থেকে যাবে।”

মোত্তাকিন তখনো নিরুদ্বেগ ঘাড় চুলকাচ্ছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মায়ের কথার দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল যে নেই, তা স্পষ্ট! মধুমিতা ছটফট করে উঠল ছেলের এমন উদাসীনতায়। ওদিকে বেলা যে নেমে গেল। ইন্দুর যদি কিছু হয়ে যায়? সে কঠোর গলায় বলল,
–“বাবু, সারাজীবন তোর সকল উশৃঙ্খলতা আমি সহ্য করে নিয়েছি। আজ যদি আমার ইন্দুবালাকে ফিরিয়ে আনতে না পারিস তবে আমার মরা মুখ দেখবি কিন্তু!”

মোত্তাকিন এহেন কথায় রাগে ফেটে পড়ল।
–“আসলে কি জানো? তোমার আর তোমার ইন্দুবালার মত মানুষের বেঁচে থাকা উচিত-ই নয়, মামনি। সমির আর তোমার প্রেমিক স্বামীর মতো এক একটা মাদারবোর্ড আসবে আর তোমাদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে যাবে। তারপর তোমরা আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদবে। এটাই তোমাদের নেচার। রিডিউকিউলাস!”

–“বাবু, মুখ সামলে কথা বল।”, মধুমিতার ক্রুব্ধ কণ্ঠ। মোত্তাকিনের মেজাজ বেজায় খারাপ। সে বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,
–“কিছু টাকা দাও, খরচ আছে।”

মধুমিতা মোটেই দ্বিরুক্তি করল না। সে হড়বড়িয়ে বলে,
–“কত দেব।”

–“এসব কাজে খরচ আছে। দাও পাঁচ হাজার!”

–“পাঁচ হাজার?”, মধুমিতার হাতে টান থাকলেও সে ভ্রুক্ষেপ করল না। টাকা নিয়ে মোত্তাকিন বের হতেই তূর্য বাইক নিয়ে হাজির হয়। মোত্তাকিন তাতে উঠতে উঠতে বলে,
–“এ মাসের সিগারেটের খরচ উঠে গিয়েছে, তূর্য! আর চিন্তা নেই।”

তূর্য বাইক স্টার্ট দিতে দিতে গম্ভীর গলায় বলল,
–“ভাই, হালাল পয়সায় হারাম জিনিস খাওয়া ঠিক না।”

–“তুই আমায় জ্ঞান দিস না, তূর্য।”, মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল।
*****
শব্দহীন বদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন কামড়ায় ভ্যাঁপসা মরিচার গন্ধে বাতবরণ ভারী হয়ে আছে অস্বাভাবিক ভাবে। দিনের আলোতেও অন্ধকারে ডুবে থাকা গোডাউন ঘরটা যেন এক বিষণ্ন খাঁচা। ছাদের ফাঁক দিয়ে আসা দিনের আলো মাটিতে পড়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। কেননা এই আলো কোনো আশার ঠিকানা না বরং আঘাতের ছায়া বানায়। দেওয়ালে আঁচিলের মতো আঁচড়, লিখে রাখা হাড় কাঁপানো বিদঘুটে শব্দের স্মৃতি “আমাদের বাঁচাও” মেঝেতে অজশ্র কাঁদার দাগ, রক্তের দাগ—যেন অনেকেই যন্ত্রণাদ্বায়ক কিছু সাক্ষ্য রেখে গিয়েছে। ঝাঁপসা দৃষ্টি ক্রমশই স্পষ্ট হলে ইন্দুবালা থমকে গেল স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে খসে পড়া প্লাস্টার, আর কোণে জমে থাকা ধুলোয় ভরা বাতাসে শ্বাস নেয়া কষ্টকর। মেঝেতে পাতলা, ময়লা চট বিছানো, সেখানে কয়েকজন মেয়ে গুটিয়ে বসে আছে। প্রত্যেকের হাত পা মুখ বাঁধা। কারও চোখে আতঙ্ক, কারও চোখে ক্লান্তি—কিন্তু কারও ঠোঁটেই কোনো অস্পষ্ট শব্দ নেই। তন্মধ্যেই দরজার বাইরে পাহারাদারের পায়ের শব্দ কাঁপন তুললো ঘরের নীরবতায়।
কেউ দড় আওয়াজে জিজ্ঞাসা করছে,
–“এত তাড়াতাড়ি ওটাকে তুলে আনলি কেন?”

ইন্দুবালা আরেকদফা থমকালো সমিরের ক্ষিপ্ত কণ্ঠ ভেসে আসতেই।
–“ওটার সাথে অতো পিরিত করা আর আমার ধৈর্য্যে কুলাচ্ছিল না।”

–“ওর পরিবার যদি পুলিশ কেস করে?”

–“করবে না, করবে না, পরিবারের সকলের বোঝা ছিল মাইয়াটা। কালা কুচকুচে মাইয়া, সবাই বিদায় করতে পারলেই বাঁচে । বরং আমায় আরো দোয়া দেবে। হ্যাঁ, বাপটা একটু তিড়িং বিড়িং করতে পারে কিন্তু এত বছরেও আমাদের সাথে কেউ পেরেছে? আর এই সপ্তাহের মধ্যে আঠারো টা মেয়ে ডেলিভার করতে হবে, একটা মাইয়ার পেছনেই যদি দুই সপ্তাহ লাগিয়ে দেই তবে ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলতে দেরি নেই। আজগড় ভাইকে ফোন লাগিয়ে বল সতেরো টা মাইয়া রেডি, বাকি একটা কালকের মধ্যে জোগাড় হয়ে যাবে।”

–“কালকের মধ্যে একজন জোগাড় হবে কিভাবে?”

–“কালকে আরেকটাকে বিয়ের শপিং করাতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ফাইনাল হইছে।”, বলেই ফিচলে হেসে উঠল সমির। ইন্দুবালা বিশ্বাস করতে চাইলো না। ভ্রম মনে হলো। সবসময় ভাগ্য তার সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলতে পারে না। নিজের বাঁধা হাত পা মুখের সাথে জোরজবরদস্তি করতে লাগল। পাশের মেয়েগুলো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল যতক্ষণ না তার বিশ্বাস ভঙ্গ হলো। ইন্দুবালার জোরজবরদস্তি থেমে যায়, সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় নিজের বিশ্বাসকে বাজেভাবে ভেঙে যেতে দেখে। সমির ব্যস্ত কদমে কক্ষের ভেতরে ঢুকলো। ইন্দুবালা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্ষণ পরিচিত মানুষটার দিকে। সেই পরিপাটি বেশভূষায় নেই, বড্ডো উশৃঙ্খল পোশাকের ধরণ। সমির এক পলক স্থির নয়নের মেয়েটিকে দেখে আবার নিজকর্মে মগ্ন হয়। কাউকে কল দিয়েই ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“পোরশু দিন মাল ডেলিভারি হয়ে যাবে আজগড় ভাই। আপনি টাকা একাউন্টে ট্রান্সফার করেন তাড়াতাড়ি।”

অপরপ্রান্ত থেকে আজগড় নামের ব্যক্তি বলল,
–“সব মাল একদম নিখুঁত থাকতে হইবে কিন্তু, সমির।”

সমির তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলল,
–“সবগুলো ইনটেক মাল ভাই। মধ্যবিত্ত ঘরের সবকটা ভদ্রসভ্য মেয়ে, পুরুষ মানুষের তো ছোঁয়া তো দূরের কথা পিঁপড়ায় ও ছোঁয়নি জীবনে। তবে একটায় একটু ডিফেক্ট আছে ভাই। একটু কালা, কিন্তু কাস্টমাররা তো আর গায়ের রঙ দেখবে না, দেখবে ফিগার। ফিগার চমৎকার ভাই—শুধু একটু গায়ের রঙটাই কালা।”

ইন্দুবালার কর্নকুহর বিষিয়ে তুললো সেই ঘৃণ্য শব্দগুলো। ঘৃণায় দেহের কাঁটা জেগে গেল। নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য সমির হয়তো টাকার কাছে অনুভূতি আর মন বুঝতে নারাজ। কিন্তু ইন্দুবালা তখনো নিজের জীবনের গতিবিধি মাপতে ব্যস্ত। একটা মানুষ কতোটা দূর্ভাগা হলে তার জীবন এমন পর্যায়ে থাকে। জীবনের এই পর্যায়ে ইন্দুবালা বুঝেগেল তাকে কেউ জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়া কল্পনাতেও আনতে নারাজ। দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসে অচিরেই। বাঁচার আর কোন কারণ-ই খুঁজে পায় না ইন্দুবালা। মনে মনে খুশি হয়ে গেল এই দুঃসহনীয় জীবন থেকে ছুটি পাওয়ার ক্ষণ অতি নিকটে ভেবে। নিজেকে শেষ করার একটা চমৎকার কারণ পেয়ে গেল সে। কারোর কাছে সপার আগে সে নিজেকে শেষ করাই যে শ্রেয় তার কাছে।

সমির বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। অন্যকক্ষ থেকে আওয়াজ আসছে। ইন্দুবালা তাকায় মেয়েগুলোর দিকে। প্রত্যেকের চোখে বাঁচার আকুতি। ইন্দুবালার ভীষণ ভালো লাগে তাদের বাঁচার আকাঙ্ক্ষা দেখে। নিশ্চিত তাদের জীবন অনেক সুন্দর! তাদের প্রত্যাহিক জীবন অভিশাপ, লাঞ্ছনা আর অবজ্ঞার আড়ালে মিলিয়ে যায় না বোধহয়। তার মনে প্রবল ইচ্ছা জাগে মেয়েগুলোর আকাঙ্ক্ষা মূর্ছে যেতে না দেয়ার। নিজেকে নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই তবে এই মেয়েগুলোকে বাঁচতে দেখার ইচ্ছা প্রবলভাবে বাড়তে থাকে। সে চারিদিকে চোখ ঘুরায়, উপায় খোঁজে। কিন্তু হায়! কোন উপায় খুঁজে না পাওয়ার গ্লানি যখন ছুঁয়ে যেতে লাগল কৃষ্ণ বরন তখন হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হয় তার ছোট্ট পার্সটি। সেটা অনেকটা দূরে তার থেকে।
সে ব্যাগটার নিকটে থাকা মেয়েটিকে ইশারা করতে লাগলো, ব্যাগটি তার কাছে দেয়ার জন্য। মেয়েটি তার ইশারা খুব সহজে বুঝেগেল। সে এ মেঝে ঘষতে ঘষতে পার্সটির কাছে পৌঁছায়, বাঁধা হাতে যতটুকু শক্তিতে কুলোয় ধাক্কা দেয় পার্সটিকে। মেয়েটির দেখাদেখি অন্য মেয়েরাও একে একে পার্সটি ধাক্কা দিয়ে ইন্দুবালার নিকটে পাঠাতে সক্ষম হয়। ইন্দুবালা কব্জি বাঁধা হাতটি দিয়ে কোনমতে ব্যগটা খুলতেইড় তার চোখ চকচক করে উঠল নিজের ছোট্ট বাটন ফোনটি দেখে। তার কাছে সবসময় দু’টো ফোন থাকে একটা কথা বলার জন্য বাটন ফোন আরেকটা স্মার্ট ফোন। সমির ভেবেছিল তার কাছে একটাই ফোন।
ফোনটি বন্ধ ছিল। সে ফোনটি অন করতে গিয়ে দেখলো ফোনটিতে চার্জ নেই। সে অন করার চেষ্টা করতেই উচ্চশব্দ হলো। সকল মেয়েরা ঘাবড়ে গিয়ে তাকায় দরজার দিকে। না কেউ আসেনি। ভাগ্যবশত ইন্দুবালার ফোনটি অন হয়। সে দ্রুত মোত্তাকিনের নাম্বারে ফোন দেয়। তবে একবার রিং হতেই কেউ ক্ষিপ্র বেগে ফোনটি ছিনিয়ে নিলো তার থেকে। ইন্দুবালা মাথা তুলে তাকাতেই সপাটে এক চড় পড়লো তার বাম গালে। ইন্দুবালা মুখ থুবড়ে পড়লো মেঝেতে। সমির রাগে ফেটে পড়ে তার চুলের গোজা মুচড়ে ধরে। হিসহিসিয়ে বলে,
–“খা**মা** চালাকি করো আমার সাথে? দুইটা ফোন চালাইয়াও তো একটা নাগর জোগাইতে পারলি না।”

সমির রাগ ঝেড়ে ছুঁড়ে মারে তাকে মেঝেতে। ফোনটা তৎক্ষণাৎ ভেঙে চুরমার করে ফেলল। সমিরের সহকর্মী ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“ভাই, কাউরে ফোন দিতে পারছে? এহন যদি লোকেশন ট্রাক কইরা ফালায় কেউ?”

সমির চিন্তায় পড়ল। সে চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
–“রাইতের মধ্যে লোকেশন বদলাইতে হবে। তুই তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা কর, মিলন।”

–“আচ্ছা ভাই।”, মিলন ছুটে বের হয়। সমির ও বের হয় তার পিছুপিছু। আর একজন কম বয়সী ছেলেকে বলল মেয়েগুলোকে দেখতে।
সমির কাউকে ফোন দিতে দিতে গোডাউন থেকে ব্যস্ত কদমে বের হতেই আচমকা তার দৃষ্টি হকচকায়। গোডাউনের গেট সংলগ্ন বাইকের উপর আরামসে বসে সিগারেটে সুখটান দিতে থাকা মানুষটাকে দেখে অচিরেই ঘেমে উঠল সমির। মিলন ভ্রু কুঁচকে সেদিকে একপলক তাকিয়ে সমিরকে জিজ্ঞাসা করে,
–“এই ভাই, এইডা কেডা? এইখানে কি করতাছে? আপনি চেনেন?”

সমির ঘেমে ওঠা বদন খানি উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে চাপা আতঙ্ক মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“এটা ঐ ইন্দুবালার এলাকার পাতি গুন্ডা। কিন্তু এটা এখানে কি করছে? তার চেয়েও বড় কথা এই জায়গার খোঁজ পেল কি করে? ছেলেদের ডাক তাড়াতাড়ি। ”

মোত্তাকিন অস্থির চিত্তে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বাঁকাচোখে তাকায় সমিরের দিকে। হালকা হেসে শুধায়,
–“কাজ শেষ?”

সমির দরদর ঘেমে উঠল! উদ্বিগ্নতায় হুঁশ হারিয়ে কোন পদক্ষেপ নেবে তার আগেই মোত্তাকিন ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“থাম, শান্ত হ! একটু পর শুরু করি। মাত্র সিগারেটটা ধরিয়েছি, অপচয় করা যাবে না। এমনিতেই পকেট টানটান! মামনির কষ্টের উপার্জনে কেনা! তার উপর কি দাম বেড়েছে জানিস তো, বিশ টাকা! মামনির থেকে বিশ টাকা বের করতে জান বের হয়ে যায়, মেজাজ তো ঠিক থাকেই না!”

মোত্তাকিন এক পল থামে। পরপরই শান্ত স্বরে বলল,
–“আমি সিগারেটটা শেষ করছি, তুই ততক্ষণে গিয়ে ঐ বেয়াদব মেয়েটাকে আমার নাম নিয়ে দু’টো কানের নিচে দিয়ে আয়, জনমের বিয়ের স্বাদ মিটবে তবে! আমি দিতে গেলে দু’টোতে মন ভরবে না।”

সমিরের চোখেমুখে হিংস্রতা ফুটে উঠল।
–“কে তুই, এখানে কেন এসেছিস? তুই আমায় চিনিস আমি কে? বেশি বাড়াবাড়ি না করে সময় থাকতে এখান থেকে পালা নয়তো জানে মেরে ফেলব।”

মোত্তাকিন হাসলো—কিন্তু হাসিটা ছিল ঠিক ছুরি ঘষে তোলা ধারালো ভয়ঙ্কর। সমীরের চোখে অচেনা বাড়ন্ত ভয়। সে বুঝতে পারল—মোত্তাকিনের কথার আড়ালে কিছু কুৎসিত পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে।ছেলেটা কোন পাকাপোক্ত পরিকল্পনা ছাড়া আসেনি। কি করবে ভেবে পেল না, এই মুহুর্তে নিজেকে সেইফ করা গুরুত্বপূর্ণ। সমীরের রক্ত চোখে উঠে এলো। সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহুর্তও অপচয় করলে তাকে মারা পড়তে হবে। দ্রুত হাত বাড়িয়ে একটি হকিস্টিক-এর মত কঠিন একটা লাঠি টেনে নিল। কিন্তু মোত্তাকিন যেন তখনো শান্ত,নীরব! ঠিক হিংস্রতার পূর্বমুহূর্তে অবস্থানরত মোত্তাকিনের শরীরে ছিল এক অপরিশোধিত জবরদস্ত শক্তি। ক্ষিপ্র বেগে এগিয়ে এএস মোত্তাকিনের মাথা বরাবর আঘাত করতে গেলে ক্যাঁচ করে সূক্ষ্ম আওয়াজ হলো।
সমির আচমকা আর্তনাদ করে উঠল। সে থমকে গেল তার ডান হাতের ফিকনি সহ দেহের বিভিন্ন জা গা থেকে সরু স্রোতের ন্যায় রক্ত ছিটকে বের হতেই। সমিরের ডান হাতটা সহসা নিজের শক্তি হারায়। সমির অবাকপানে তাকায় মোত্তাকিনের দিকে। ঠোঁটের এক কিনারায় চেপে রাখা সিগারেট সমেত মোত্তাকিন স্মিত হাসলো। সমিরের প্রশ্নের উত্তর দিতে দুই হাত স্যারেন্ডার এর ন্যায় জাগিয়ে তুলল। ছেলের হাতের গ্লভসের সাথে এঁটে আছে দু’টো ধারালো শানিত সার্জিক্যাল নাইফ। সমিরের দেহ অচিরেই ভেঙে আসল। তবুও প্রতিঘাত করার জন্য আবার শক্তি জোগাতে চাইলে মোত্তাকিন উগ্র হাতে সমিরের গলা চেপে ধরে বাইকের সাথে চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বলল,
–“শালা সিগারেটটা শেষ করতে দিলি না! কু”ত্তা”র বা”চ্চা! তুই কি সত্যি সত্যি আমায় পাতি গুন্ডা ভেবে বসেছিলি না-কি? আমি শুধু অপেক্ষায় ছিলাম তুই কখন একটা বোকামি করবি! ও আজীবন আমার পাশে কোন মেয়ে ঘেঁষতে দেয়নি, সেখানে তুই কি করে ভাবলি—যে আমার সামনে থেকে তুই ওকে বিয়ে করে নিয়ে যাবি? তোর হেডম দেখে আমি অবাক! তোকে এই এক সপ্তাহ সহ্য করেছি সেটা তোর সাত কপালের ভাগ্য!”,বলেই মোত্তাকিন মুখ বরাবর ঝপাঝপ মুষ্টিঘাত করে সুন্দর মুখটা থেতলে দিলো। মোত্তাকিনের হাত থেমে গেল পিঠে সপাটে হকিস্টিকের আঘাত পড়তেই। আঘাতটা এতটাই তীব্র যে তার শরীর এক ঝটকায় সামনের দিকে ঢলে পড়ল। মোত্তাকিন পিছু ফিরে তাকায় দশ বারোজন ছেলে তাদের ঘিরে ফেলেছে। সে চেতনাহীন সমিরের হাত থেকে লাঠিটা তুলে নেয়। অতঃপর ক্ষেপা ষাঁড়ের ন্যায় একে একে প্রত্যেককে প্রতিহত করতে করতে এগিয়ে যায় গোডাউনের দিকে। ততক্ষণে পুলিশের ও আগমন ঘটে।

মোত্তাকিন পিঠের ব্যথায় আড়মোড়া ভেঙে গোডাউনের ভেতরে ঢুকে যায়। ঢুকতেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় মেঝেতে লেপ্টে থাকা নেতিয়ে পড়া দূর্বল দেহটির দিকে। গালের একপাশ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, সে কি বিধ্বস্ত দশা! সে লম্বা লম্বা পা ফেলে মেয়েটির সমানে হাঁটু গেড়ে বসে। ক্ষিপ্ত চাহনি ফেলে রুক্ষ হাতে মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে হাত পা খুলতে লাগল। রাগে ক্রমশই ছেলেটির মুখ লালচে বরন ধারণ করছে। ইন্দুবালা তিরতির করে কেঁপে ওঠা ঠোঁট চেপে নরম চাহনিতে ছেলেটির দিকে তাকায়। রাগে দিশেহারা মোত্তাকিন আরো রেগে গেল সেই অসহায়ত্ব ভরা চাহনি দেখে। ঠোঁটের কোনা ফেটে এক ফোঁটা রক্ত কনা গড়িয়ে পড়ছে। সে ক্ষিপ্র হাতে সেই রক্তের কনাটুকু মুছে নিয়ে চোয়াল চেপে ধরলো। রাগে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে বলে,
–“বিয়ের শখ মিটেছে?”

ইন্দুবালা জবাব দেয় না শুধু নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে। চোখের কার্নিশ অনবরত সিক্ত হচ্ছে নোনা জলে। মোত্তাকিন ফুঁসতে ফুঁসতে চোয়াল ছেড়ে নেতিয়ে পড়া দেহটিকে পাজকোলে তুলে নেয়। দরজার দিকে পা বাড়াতেই মেয়েটি আর্তনাদ করে পিছু ফিরে তাকায়। মোত্তাকিন তা দেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“ওদের চিন্তা করতে হবে না, ওদের পুলিশ পরিবারের হাতে তুলে দেবে। তুই তোর চিন্তা কর, বেয়াদব মেয়ে! তোকে যে জীবিত নিয়ে যাচ্ছি এটা তোর ভাগ্য ভালো, ও আবার অন্যের চিন্তা করে। বিয়ের শখ না মিটলে এখনো বল কোন ক্রিমিনালের হাতে তুলে দিয়ে আসি। আমার চেনা পরিচিত অনেক আছে।”

ইন্দুবালা নিরুত্তর এবার নিজের অভিব্যক্তি গুটিয়ে নেয়। ক্লান্ত, ভঙ্গুর নিঃস্ব অবয়ব ছেড়ে দেয় ছেলেটির বাহুডোরে। ভার হয়ে আসা মাথা ঠেকিয়ে দেয় প্রশস্ত বক্ষে। যেটা রাগের তোপে ক্রমশই ফুলেফেঁপে উঠছে।
মোত্তাকিনের অন্তঃস্থল শীতল হয়ে আসে বক্ষে নরম একটি মুখ এঁটে যেতেই। রাগ, জেদ কখন যে অন্তঃস্থল থেকে মিলিয়ে গেল তা টেরই পেল না ছেলেটি।
গোডাউন থেকে বের হয়ে পুলিশের প্রধান কর্মকর্তার সামনে এসে দাঁড়ায়। গমগমে স্বরে বলে,
–“স্যার, বাম পকেটে হাত দিন।”

পুলিশটি তার কথা মোতাবেক বাম পকেটে হাত দিয়ে একটি কাজ পেলো। মোত্তাকিন গেটের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
–“এখানে এই নারী পাচার চক্রের সব ঘাঁটি আর মূল তথ্য আছে। আশাকরি কেউ পার পাবে না।”

–“অবশ্যই মোত্তাকিন। তোমায় অনেক ধন্যবাদ এত বড়ো চক্রের সন্ধান দেয়ার জন্য। আগামীকাল পুলিশ স্টেশনে এসো একবার কথা আছে।”,পুলিশ কর্মকর্তার কথার প্রেক্ষিতে মোত্তাকিন ঘাড় দুলিয়ে বেরিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতেই বক্ষমাঝে দৃষ্টি রাখলে দৃষ্টি ম্লান হয় নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা নিস্তেজ মেয়েটিকে দেখে। এই একটা সপ্তাহের অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব, রাগ জেদ হিংসা যেন অচিরেই মিলিয়ে গিয়েছে। আঁছড়ে পড়া প্রবল শক্তিশালী লহরীর ন্যায় প্রশান্তি আঁছড়ে পড়েছে উত্তপ্ত বক্ষজুড়ে। আর কোন সংশয়ের অবশেষ থাকে না মোত্তাকিনের মাঝে। সে বুঝে যায় তার শান্তি কোথায়। মেয়েটিকে আঁকড়ে ধরা হাতদুটো আরো দৃঢ় হয়ে আসল নিজের অনুভূতির পরিচয় পেতেই।

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here