#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০২
সিদ্দিকী সাহেব মেয়ের শিরদাঁড়া কখনো ভাঙতে দেননি। মেয়েকে অতটুকু সাবলম্বী বানিয়েছে যেনো নিজের দুঃখের উপশম নিজে হতে পারে। সে সবসময় মেয়েকে শুধু এতোটুকু বলে,
–“সৌন্দর্য সবকিছু নয়। যে তাকে মূল্য দেবে সে সবভাবেই দেবে। যে মূল্য দেবে না—সে কোনভাবেই দেবে না। তাই অন্যের জন্য নয় নিজের জন্য বাঁচতে হবে। নিজেকে চিনতে হবে, নিজের খুশির কারণ নিজেকে হতে হবে। কারোর থেকে কোন প্রত্যাশা রাখা যাবে না।”
ঠিক এই কথাগুলোকে সম্বল বানিয়ে চলতে চলতেই হঠাৎ করে ইন্দুবালা পথ হারিয়ে ফেললো সমাজের নিয়মের কাছে। সমাজে বাঁচতে হলে একা বাঁচা যাবে না। অদ্ভুত এই নিয়ম আর এর যন্ত্রনা থেকে বাঁচতে ইন্দুবালা মরিয়া হয়ে উঠলো। ছোট বোন যে অচিরেই বিয়ের উপযুক্ত পাত্রী হয়ে উঠেছে। বড়ো বোন অবিবাহিত থাকাকালীন ছোট বোনের বিয়ে দেয়া দৃষ্টিকটু ব্যপার। তাই কোনমতে একজনের হাতে তুলে দিতে পারলেই হলো! মায়ের এই কথাগুলো ইন্দুবালার কর্নকুহরে যাতনা সৃষ্টি করে। এগুলো শুনতে শুনতেই ইন্দুবালা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাঁচতে ভুলে যায়। মানুষের মাঝে যেতে তার দ্বিধাবোধ হয়। ঘরের এক কোনে বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে থাকতেই বড্ডো শান্তি! কিন্তু…. কিন্তু সেই শান্তি মায়ের চোখের বিষ! তাই একদিন বাবার কথামতো নিজের জন্য বাঁচার সিদ্ধান্ত নিলো। এক ঘুঁটঘুঁটে রজনীর অমানিশার মাঝে ইন্দুবালা নিজেকে মিলিয়ে দিলো। রাতের আঁধারে সংকীর্ণ মনা এই মানুষগুলো থেকে বহুদূরে যাওয়ার পরিকল্পনায় বাসের সিটে মাথা এলিয়ে দিয়েছিলো। মুক্ত পাখির ন্যায় ওড়ার স্বপ্ন ডানা মেলতে না মেলতেই ফের সেটি দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিলো। যার একমাত্র কারণ মোত্তাকিন ইরতেজা! শহর চষে বেড়ানোই হলো তার কাজ। সিদ্দিকী সাহেবের দায়িত্ববান গুপ্তচর হয়ে সে ইন্দুবালাকে আধা ঘন্টার মাঝে খুঁজে নেয়। ফের নিয়ে আসে ঐ যন্ত্রনাদ্বায়ক সমাজ, পরিবারের মাঝে। আটকে পড়ে বাবাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কাছে। মেনে নিলো, বাবার মৃত্যু অবধি তার ছায়াতলেই বাঁচবে ইন্দুবালা। বাস্তবতা, সংগ্রাম থেকে পালাবে না বরং মোকাবেলা করবে।
তবে কেউ ধারণা করে না বাইরের এই শক্ত খোলসের ভেতরে একটা নরম নারী মন রয়েছে। যে দিনশেষে প্রেমময় বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজতে চায়, যখন প্রেমিকের ফিসফিসানি কণ্ঠে প্রেমিকা লাজেরাঙা মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে তখন ইন্দুবালাও মিটিমিটি হাসবে। দিনশেষে ইন্দুবালাকেও কেউ এমনি মিষ্টিমধুর ফিসফিসানি কণ্ঠে লাজে জর্জরিত করবে আর সে বিরক্ত হয়ে তার দিকে কড়া চোখে তাকাবে। প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে ইন্দুবালাকেও কেউ দায়িত্বসহকারে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসবে। যেমন তার কলিগদের হাজবেন্ড দেয়!
ভাবনার অতলে ডুবে যাওয়া ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। এই ঘটনার পর থেকেই, ইন্দুবালার খুব একটা ভালো সম্পর্ক যায় না এই বখাটে পড়শীর সাথে। সম্পর্কে মিষ্টতা তো দূরের কথা! শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলতে তুলতে ইন্দুবালা কঠোর গলায় ঠেস মেরে বলল,
–“কেনো, যাদের পেছনে দিনরাত কুকুরের মতো ঘুরিস তারা খাবার দেয়নি?”
বিছানায় শুয়ে থাকা মোত্তাকিন তড়াক কড়া চোখে তাকালো অত্যন্ত বেয়াদব নারীটির দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“কেনো, আমার পেটে কি ওরা লাথি মেরেছে না-কি তুই মেরেছিস? ওরা কেনো খাবার দেবে, বেয়াদব মেয়ে! বেশি কথা না বলে খাবার আন। মেজাজ খারাপ এমনিতেই।”
শেষের কথাখানা ধমকে উঠে বলল মোত্তাকিন। ইন্দুবালা চুলে পেঁচানো গামছা খুলতে খুলতে তাচ্ছিল্য করে বলে,
–“অপদার্থ ছেলে! যেই ছেলের নিজের এক বেলা খাবার জোগাড় করার সাধ্য নেই, সে যায় ইনায়া, মনিকা, কনিকা, খনিকাকে ডেট করতে! তাদের কখনো বড়ো মুখ করে বলবি যে, ওগো শোন, আমি আমার আন্ডারওয়্যার টাও আমার মায়ের টাকা দিয়ে কিনি!”
মোত্তকিন পায়ের ফাঁক দিয়ে সরু চোখে তাকায় নিজ কর্মে ব্যস্ত মেয়েটির দিকে। আক্ষেপ জড়িত কণ্ঠে বলে,
–“তোর মতো নিন্দুক পড়শী আমার শত্রুর ও না জুটুক, ইন্দু! না জেনে কথা বলবি না। আমার আন্ডারওয়্যার গিফট পেয়েছি আমি। জন্মদিনে বন্ধুরা গিফট দিয়েছিল। মায়ের টাকা দিয়ে কখন কিনেছি, বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! তোর জন্য এই ঊনত্রিশ বছরের জীবনে একটা প্রেম আমি করতে পারিনি। এখন ভালোয় ভালোয় বলছি ভাত দে! সকালেও কিছু খেয়ে বের হইনি। কে জানতো, আজ আমার কপালে ইন্দুবালা নামক গ্রহন লাগবে? জানলে সকালে পেটপুরে খেয়ে বের হতাম!”
মাথা মুছতে থাকা কপট ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে পা দোলাতে থাকা ছেলেটির পানে। চোখে চোখ মিলে যায়। কথার বানে আঘাত পাওয়া আর সহ্য করা তার অভ্যাস হওয়ায় কোনো প্রভাব ফেলল না সূক্ষ্ম কটুক্তি টুকু। ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে শুধায়,
–“তোর লজ্জা করে না, এই কথাগুলো আবার এতো গর্বের সাথে বলছিস?”
–“লজ্জা নারীর ভূষণ। ওটা দিয়ে আমার কি কাজ?”, মোত্তাকিনের নিরুদ্বেগ কণ্ঠে ইন্দুবালা ডানে বামে মাথা নাড়লো। মেয়েটিকে ফের নিজের কাজে মগ্ন হতে দেখে, মোত্তাকিন ফের চেঁচিয়ে উঠলো,
–“কি হলো খাবার দিচ্ছিস না কেনো?”
ইন্দুবালা নিরবে মোত্তাকিনের মুখের ওপর গামছা ছুঁড়ে মেরে বেরিয়ে গেলো কক্ষ হতে। মোত্তাকিন তেতে উঠে মুখের ওপর থেকে ভেজা গামছাটা সরালো। ইন্দুবালার গমনের পথের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
–“বেয়াদব মেয়ে!”
ইন্দুবালা ফিরে আসলো এক প্লেট ভরপুর খাবার হাতে। সেটি বিছানায় রাখতেই মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠলো,
–“পানি কোথায়? পানি আনবে কে?”
ইন্দুবালা তার দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে থমথমে মুখে সেন্টার টেবিলের উপর থেকে পানির বোতলটা আনলো। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ সরু চোখে তাকিয়ে পানির বোতলটা ছিনিয়ে নিয়ে ভাত খাওয়া শুরু করলো। ইন্দুবালা আরশির সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গম্ভীর গলায় বললো,
–“তিন বেলা পেটপুরে তো পশু-ও খায়। কিন্তু এগুলো জোগানের পেছনে যে একজনের কতো কসরত থাকে তার ধারণা তাদের থাকে না।”
মোত্তাকিনের খাওয়া থেমে গেলো পশু শুনেই। ইনিয়ে বিনিয়ে কি মেয়েটা তাকে পশু বললো না? সে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
–“তুই কি আমায় পশু বললি?”
–“বলেছি না-কি? কেনো তোর গায়ে লেগেছে বুঝি? গায়ে লাগলে আদৌ ঐ অসুস্থ মাকে দিয়ে কাজ করাতে পারতি?”, ইন্দুবালার শক্ত কণ্ঠে মোত্তাকিন ত্যাক্ত সুরে শুধায়,
–“তোর সমস্যা কি? তুই এভাবে হাত ধুয়ে আমার পেছনে লেগেছিস কেনো? মাকে ইনায়ার ছবি দেখিয়ে কি পেলি? আমি একটা প্রেম করলে তোর এতো সমস্যা হয় কেনো?”
ইন্দুবালা তাকায় তার দিকে। শান্ত দৃষ্টি তার। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“আমার সমস্যা তোর প্রেম নিয়ে নয় বরং তোর ঐ বুড়ো মাকে নিয়ে। যার টাকা দিয়ে তুই এসব ফূর্তি করে বেড়াস। আর তোর যখন এতোই বিরক্ত লাগে, তবে তুই আমায় ফেসবুক থেকে ব্লক করলেই পারিস।”
–“হ্যাঁ, আমি ব্লক করবো তারপর তুই আমার চোখের আড়ালে প্রেম করে বেরাবি, তাই না? ভালো বুদ্ধি তোর!”
ইন্দুবালা হাসলো মোত্তাকিনের কথায়। মোত্তাকিন খেতে খেতে সেই হাসি দেখে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“সত্যি করে বলতো, সেই রাতে তুই কার সাথে পালাচ্ছিলি?”
ইন্দুবালা নিরবে হাসে তার কথায়। কোন জবাব দিলো না। জবাব না পেয়ে মোত্তাকিন খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করে,
–“এই খাবার কার?”
–“আমার খাবার!”, ইন্দুবালার শান্ত স্বরে মোত্তাকিন শুধায়,
–“তবে তুই খাবি কি?”
–“সেটা তোর না ভাবলেও চলবে।”
–“তুই এতো রগত্যাড়া ক্যান, ইন্দু?”, মোত্তাকিনের বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠ।
–“আন্টি কিছু বলবে না?”, পুনশ্চঃ মোত্তাকিনের প্রশ্নে ইন্দুবালা মৃদু হাসলো। তার মা পারলে জামাই আদর করে! পড়শী এই বখাটে ছেলে যে মায়ের মনঃপুত ছোট জামাই হিসেবে এঁটে আছে। ইন্দুবালা নামক আপদ বিদায় হলেই ঝোপ বুঝে কোপ ফেলবে তহমিনা। ছোট মেয়েকে সিটি মেয়রের ছেলের বউ করার খুব ইচ্ছা তার। তাকে খাবার দিয়েছে জানলে মা বেজায় খুশি হবেন। মেয়েটি নিরুত্তর আবার মগ্ন হয় আরশির সামনে বসে বসে চুল শুকাতে।
মোত্তাকিন খেতে খেতে মেয়েটির আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“এতো সাজগোজ করছিস কেনো? আজো কি পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে না-কি?”
–“হুঁ।”, ইন্দুবালার ছোট্ট জবাব।
–“পাত্র করে কি?”
–“জানিনা।”
–“জানিস না মানে? যার-তার সাথে চলে যাবি?”
–“ক্ষতি কি? ঝামেলা বিদায় হওয়াটা মূখ্য! চুরি না করলেই হলো!”, ইন্দুবালার মলিন কণ্ঠ।
–“এই পাত্রদের সমস্যা কি? তোর মধ্যে কমতি টা কোথায়? দেখতে শুনতে বেশ, সরকারি চাকরিজীবী, ভদ্র কোন ব্যাড রেকর্ড নেই। তবুও তারা বারবার কেনো মুখ ফিরিয়ে নেয়?, মোত্তাকিনের বিরক্ত মিশ্রিত কণ্ঠ। এই আপদ বিদায় হলে তার জীবনটাও খানিক আনন্দঘন হয়ে উঠবে যে! মা যে ইন্দুবালা বলতে অজ্ঞান। ইন্দুবালা যা বলবে তাই চোখ কান বন্ধ করে মা বিশ্বাস করে। ইন্দুবালার আঁচড়াতে থাকা হাতটি থেমে গেলো “দেখতে শুনতে বেশ” কথাটি শুনে। সে মৃদু কন্ঠে বলল,
–“দেখতে শুনতে বেশ কোথায়? পৃথিবীতে এতো এতো অলটারনেটিভ এর মাঝে কেউ আমার মতো কালো মেয়েকে কেনো বউ হিসেবে চাইবে? সবার সামনে বউ নিয়ে বের হতেও তো লজ্জা লাগবে।”
মোত্তাকিন আশ্চর্য হলো বর্ণ বিভেদের কথায়। মৃদু অসন্তোষের সাথে বলল,
–“বিয়ে আমি আমার জন্য করবো না-কি সমাজকে দেখানোর জন্য? আমার সংসার সুখের হলেই হলো, সমাজকে দেখিয়ে কি লাভ? আর তুই কালো বলেই কি অসুন্দর?
সুন্দরের বর্ণনা জানিস? তুই যখন গজ দাঁত বের করে হাসিস তখন তোর ফোলা ফোলা দুই গালে গভীর টোল পড়ে, তখন তোকে দেখতে কি আদুরে লাগে জানিস? তোর যে এই হাঁটু সমান ঘন চুল—এটা ক’জন মেয়ের আছে খুঁজে দেখ তো!”
নেহাৎ ই কথার কথা! কিন্তু ঐ স্বল্প বর্ণনাটুকুতে ইন্দুবালা লাজে রাঙা হলো। কখনো কারোর কোনপ্রকার প্রশংসা না পাওয়া মেয়েটি অপ্রস্তুত এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। কম্পিত এলোমেলো হাতে সেন্টার টেবিল এলোমেলো করে কানের দুল খুঁজতে লাগলো। দৃষ্টি লুকিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“এগুলো কথার কথা! হাতে অজশ্র অপশন’স থাকলে কেউ কেনো আমার মাঝে নিজেকে মানিয়ে নিতে যাবে? প্রতিটা ছেলেই চায় পড়াশুনা করে, একটা ভালো চাকরি পেয়ে, একটা সুন্দর দেখে বউ আনবে।”
মোত্তাকিন জবাব দিলো না। এই সংকীর্ণ মনোভাব গুলো তার মতবাদের সাথে মিলে না। সে খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে বিছানা ছেঁড়ে উঠে দাঁড়ায়। বড্ডো অভদ্রতার সাথে ইন্দুবালার আঁচল টেনে হাত মুখ মুছতেই ইন্দুবালা কঠোর দৃষ্টিতে তাকায়। বলে,
–“অসভ্য ছেলে! নতুন শাড়ি এটা।”
মোত্তাকিন চোখ ছোট ছোট করে বলে,
–“আমি কি বলেছি এটা পুরোনো শাড়ি?”
–“তুই শাড়িতে হাত মুছলি কেনো, অভদ্র?”
–“অভদ্র তুই! কাউকে খাবার দিলে সাথে পানি, লবন, তোয়ালেও দিতে হয়। সেই জ্ঞানটুকু তোর নেই। তাই শিখিয়ে দিলাম। আজকের পর থেকে যেনো মনে থাকে। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তুই শশুর বাড়ি গেলে তোকে দুদিনের মাথায় আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাবে।”
–“ফিরিয়ে দেয়া তো দূরের কথা, কেউ ঘরেই তুলতে চায় না।”, ইন্দুবালা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল। ফের তাকালো আরশিতে ভেসে ওঠা কালো অবয়বটির দিকে। যেখানে চতুর্দিকে কোন সৌন্দর্যের ছোঁয়া নেই, নেই লাবণ্য, নেই কোন গঠন—আছে শুধু বিদীর্ণ কুৎসিত ময়লাচ্ছন্ন আবরন।
মোত্তাকিন তখনো মেয়েটির পেছনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরশির সামনে বসে থাকা ইন্দুবালা তাকে তখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খেকিয়ে উঠলো,
–“কি, খাওয়া শেষ না? এখন বের হ।”
মোত্তাকিন সূচালো দৃষ্টিতে মেয়েটিকে নিগুঢ় চোখে পর্যবেক্ষণ করে নিরবে বারান্দায় চলে গেলো। এসেছেও বারান্দা থেকে। তাকে যেতে দেখে ইন্দুবালা ফের মগ্ন হলো নিজের কাজে। মা তার রূপচর্চায় কতোশত নিয়ম জারি করে রেখেছে। এগুলো না মানলে আবার আরেক অশান্তি ঘরজুড়ে। সে শান্তিপ্রিয় এক মলিন সত্ত্বা!
কানের পিঠে কারোর ছোঁয়া পেতেই ইন্দুবালা হতচকিত চোখ তুলে তাকায় আরশিতে ভেসে উঠলো মোত্তাকিনের অবয়ব। যে কি-না মনোযোগ সহকারে তার কানে ফুল গুঁজে দিচ্ছে। অপ্রস্তুত হতভম্ব হয় ইন্দুবালা। অস্ফুট স্বরে শুধায়,
–“কি করছিস?”
কনের পিঠে সাদা রঙের গোলাপ ফুলটি গুঁজে দিয়ে মোত্তাকিন চমৎকার হাসলো। অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলল,
–“এভাবে পাত্রপক্ষের সামনে যাবি দেখবি এক দেখায় পছন্দ হয়ে যাবে।”
কালো মুখশ্রী, কালো কেশের মাঝে সেজে বসা সাদা ফুলটি সত্যিই ক্ষীণ সৌন্দর্যের সঞ্চার করলো ইন্দুবালার মাঝে। ঠিক যেনো কোন উপন্যাসের অবহেলিত সৌন্দর্য! ব্যাগের চেইন খোলার শব্দ কর্নকুহরে প্রবেশ করতেই ইন্দুবালা আরশি থেকে নম্র, উদাসীন দৃষ্টি সরালো। মুহুর্তেই দৃষ্টি থেকে নম্রতা সরে গেলো মোত্তাকিনের হাতে নিজের ব্যাগ দেখতেই। ইন্দুবালা চেঁচিয়ে উঠলো,
–“আমার ব্যাগ রাখ, মোত্তাকিন।”
মোত্তাকিন ফিচলে হেসে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে নিয়ে, ব্যাগটা ছুঁড়ে মারলো ইন্দুবালার কোলে। ইন্দুবালা ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে ফোঁস ফোঁস করে উঠলো। মোত্তাকিন বারান্দা টপকে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলল,
–“এটা আমার পেছনে লাগার শাস্তি। তোর জন্য আজ আমার ঘরে জায়গা হবে না। সারাদিন কি আমি না খেয়ে থাকবো? সিগারেট খাওয়ার পয়সাটুকুও নেই পকেটে।”
মোত্তাকিনের গমনের পথে ক্রুব্ধ চোখে তাকাতে তাকাতে ইন্দুবালা বিড়বিড় করে বলল,
–“নির্লজ্জ, অপদার্থ, অথর্ব!”
~চলবে~

