প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ২১

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ২১

মোত্তাকিনের জন্য কখন রাত, কখন সকাল, কখন দুপুর তার কোন ঠিক নেই। দুপুর বারোটা নাগাদ তার ঘুম ছুটলে সে অলস পায়ে হেঁটে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিয়ৎকাল ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে পেতে রাখা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। অসুস্থতার কারণে মিরসাদ তাকে ছুটি দিয়েছে কিছুদিনের। সে সেভাবেই ঘুম জড়ানো দৃষ্টি প্রিয় প্রতিবেশীর বাড়ির উঠোনে ফেলে ঝিমাতে থাকে। সদ্য অসুস্থতা থেকে রেহাই পাওয়া তার ঘুম জড়ানো অসাড় দেহে মৃদু আড়ম্বরতা এসে ভীড় জমায় প্রতিবেশীর বাড়া থেকে ডাক্তার বের হতে দেখে। চকিতে অলসতা ভেঙে সে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল পাশের বাড়ির নিন্দুক আন্টিদের মতো। ঘুম ছুটে যায়, ভয় জমাট বাঁধে অন্তঃস্থলে; তার বাচ্চাটা ঠিক আছে তো? ডাক্তার কেন এসেছে? ঐ ইন্দুবালা কিছু করেনি তো? সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে নিচে নামতে যাবে দেখল মধুমিতা ভাঙা হাত নিয়ে বিলাপ করতে করতে ইন্দুবালাদের ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের দালানে ঢুকছে।

মধুমিতা ঘরে ঢুকতেই মোত্তাকিন হন্তদন্ত হয়ে তার পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধায়,
–“কি হয়েছে, মামনি? ঐ বাড়িতে ডাক্তার কেন এসেছিল? ইন্দু ঠিক আছে? আমার বাচ্চা ঠিক আছে?”

মধুমিতা থমথমে মুখে শান্ত দৃষ্টি ফেলল ছেলের দিকে। থমথমে মুখে বলল,
–“তোর চোখেমুখে এত দুশ্চিন্তা মানাচ্ছে না, বাবু। যেখানে সব দুশ্চিন্তার কারণ তুই নিজেই।”

–“কথা না পেঁচিয়ে সোজাসাপ্টা বলো, মামনি। তোমাদের মতো প্যাঁচালো মহিলাদের পাল্লায় পড়ে আজ আমার জীবনটা ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে। ইন্দুবালা ঠিক আছে?”, মোত্তাকিন সরব বিগড়ে যাওয়া মেজাজে বলল।

–“হাই প্রেশার! মানসিক চাপ আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে গতকাল রাত থেকে প্রেশার বেড়ে গিয়েছে। ডাক্তার বলেছে মাকে স্বস্তি না দিলে বাচ্চা সুস্থ সবল থাকবে না। ডাক্তার তো আর জানে না ঐ মেয়েটাকে এই শরীরে কত কি সহ্য করতে হয়। যেই সময়ে থাকবে স্বামীর যত্নে, দুশ্চিন্তা মুক্ত, হাসিখুশি খাবে আর ঘুরবে ফিরবে— সেই সময় তার উপর মানসিক চাপ দেয় তার নিজের স্বামী! এখনো যদি বোধবুদ্ধি না হয় তবে ঐ ছোট্ট প্রাণটাও তোর উশৃঙ্খলতার বাজে শিকার হবে।”

মোত্তাকিনের মুখে আঁধার নামে। অস্থির কণ্ঠে শুধায়,
–“ডাক্তার কি বলেছে? এখন কেমন আছে দু’জন?”

–“আপাতত সুস্থ আছে। এক ডোজ ঘুমের ওষুধ দিয়েছে চিন্তামুক্ত রাখতে। বলেছে কোনপ্রকার মানসিক চাপ না দিতে‌। ঐ কুটনী মা-নানী উঠতে বসতে কথা শোনায়, স্বামীর নেই চাল চলনের ঠিক—মানসিক চাপ পড়বে না তো কি করবে? আমার তো মনে হয়না এভাবে বেশিদিন সুস্থ থাকবে।”, মধুমিতা আড়চোখে চেয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল। মোত্তাকিন ঘেমে ওঠে মায়ের ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে। সে তো জানে ঐ বাড়ির লোকেরা ঠিক কেমন আচরণ করে ইন্দুবালার সাথে। সন্তানকে মারার কথা বলায় মেয়েটির প্রতি আকাশসম যে রাগ জন্মেছিল তা ক্ষণকালের জন্য ভুলে যায় মোত্তাকিন। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
–“যাও, ওদের নিয়ে আসো গিয়ে।”

–“কাদের?”, মধুমিতা কপাল কুঁচকে নেয়। মোত্তাকিন বিরক্ত হয় তার নাটকীয়তায়। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“কাদের আবার? ইন্দু আর বাবুকে।”

মধুমিতার হাসি পায় ছেলের কথার ধরণে। তবে সেই হাসি ক্রমেই অবহেলিত থেকে‌ যায় ছেলের উপর থাকা রাগের কাছে। অনাদরে বলল,
–“বিয়ে আমি করেছিলাম না-কি আমার থেকে একবার অনুমতি নিয়েছিলি? আর না বাচ্চা নেওয়ার সময় আমার অনুমতি নিয়েছিলি? তোর বউ, বাচ্চা তুই যেভাবে পারিস গিয়ে আন। আমি এর চারিধারে নেই।”

–“এই বুড়ো বয়সে ভাঙা হাত নিয়ে সংসার সামলাও, চাকরি করো, রান্না করো আবার ছেলের সংসার গুছিয়ে দাও। কত দ্বায়ভার আমার!”

মধুমিতা বিদ্রুপ করে ভাঙা হাতে ফ্রিজ থেকে সবজি মাছ বের করে। মোত্তাকিন চিন্তায় ঘরে এসে পায়চারী করতে লাগল। ইগো, রাগ আর তার রগত্যাড়া স্বভাব মিলিয়ে চতুর্দিক থেকে না যাওয়ার উস্কানি দিলেও সন্তানের কাছে সদ্য জাগ্রত পিতৃসত্ত্বা ক্রমেই দূর্বল হয়ে পড়েছে। সে ব্রাশ করে দ্রুত টিশার্ট গলিয়ে বের হয় ঘর থেকে। সোজা গিয়ে ইন্দুবালাদের ঘরে ঢুকে গেল। মধুমিতা বারান্দা থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে এহেন দৃশ্য দেখে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল।
–“আহা, কি আনন্দ! আমার ইন্দু আর দাদুভাইয়েরা এখন আমার ঘরে এসে যাবে। যাই যাই রান্না বসাই!”

মধুমিতা উড়তে উড়তে রান্নাঘরে ছুটলো। সিদ্দিকী সাহেব মেয়ের ঘর থেকে সদ্যই বের হয়েছিলেন তন্মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে মোত্তাকিনকে ঢুকতে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। কোন কথাবার্তা নেই মোত্তাকিন তাকে এড়িয়ে চলে যায়।

ইন্দুবালা শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়তে নিয়েছিল। কারোর ঘরে ঢোকার শব্দে ফিরে তাকালে মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে আসে। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ কাবার্ডের উপর থেকে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ নামায়। ঐ বাড়ি থেকে আনা ইন্দুবালার প্রয়োজনীয় সবকিছু সেই ব্যাগে ঢুকাতে লাগল। ইন্দুবালা কোনোরূপ বিঘ্ন সৃষ্টি করে না আর না কিছু বলে। মোত্তাকিন পুরো ঘর খালি করে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয়। এমনকি যেতে যেতে ইন্দুবালার হাতে থাকা বইটাও ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ইন্দুবালা তবুও দাঁতে দাঁত চেপে শুয়ে রইল।
সিদ্দিকী সাহেব অপেক্ষায় ছিলেন মোত্তাকিনের বের হওয়ার। বের হতেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
–“এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”

মোত্তাকিন এক দন্ড নিজের গতি থামায়। চোখে চোখ রেখে গমগমে স্বরে বলে,
–“এগুলোর সঠিক জায়গা যেখানে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। আপনার মেয়েকেও বলবেন নিজের সঠিক জায়গায় চলে আসতে।”

বলেই মোত্তাকিন পা বাড়ালে সিদ্দিকী সাহেব গুরুগম্ভীর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
–“আমার মেয়ে তখনি সঠিক জায়গায় যাবে যখন তুমি সঠিক পথে আসবে। তার আগে ও এক পা’ও নড়বে না এখান থেকে।”

মোত্তাকিন চোয়াল শক্ত করে নেয়। ইগো, রাগ কোনমতে গলাধঃকরণ করে বলল,
–“ও যা চায় তাই হবে, ওকে পাঠিয়ে দেবেন।”

বলেই সে গটগট করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। সিদ্দিকী সাহেবের বক্ষস্থল থেকে লম্বা এক নিঃশ্বাস নিঃসৃত হয়। জীবন মানেই তো মৃদুমন্দ কোলাহলের মধ্য থেকে শান্তি খুঁজে নেয়া। সে মেয়ের ঘরে যায়। বিছানায় পা গুটিয়ে থম মেরে বসে থাকা মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই, ইন্দুবালা মাথা তুলে তাকায়। সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
–“জীবন মানেই সংগ্রাম, আম্মা। একজন ধনী , সুন্দরী নারীর জীবনে দেখ গিয়ে এর থেকেও কঠিন সংগ্রাম লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমরা সবটা শুনিনা, জানিনা। প্রত্যেকের জীবনে সংগ্রাম থাকে তাই বলে আমাদের তা থেকে পালিয়ে বেড়ালে হবে না। শক্ত হাতে সামনা করতে হবে। মোত্তাকিনকে তুই আর আমার অনাগত নানুভাই পারবে সঠিক পথে আনতে। ফিরে যা আর শক্ত হাতে নিজের স্বামী সংসার আগলে ধর, দেখবি একদিন ঠিক সংসারের মায়ায় জড়িয়ে যাবে ছেলেটা।”

বাবার কথায় ইন্দুবালা স্মিত হাসল। বাবার হাত ধরে বলল,
–“হাল তো কখনোই ছেড়ে দেইনি আব্বু। শুধু ওকে আমাদের অনুপস্থিতি বোঝাতে চেয়েছিলাম। বোঝাতে চেয়েছি আমাদের তাকে কতটা প্রয়োজন।”

সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হেসে চলে যায়। বাবা চলে যেতেই ইন্দুবালার ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই মধুমিতার চঞ্চল কণ্ঠ ভেসে আসে,
–“কিরে? কি বলল? আসতে বলেছে?”

ইন্দুবালা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“একটা কথাও বলেনি, মধু। অমন ত্যাড়া ছেলে পেলে কোথায়? ভাঙবে তবুও মচকাবে না। আমি যাচ্ছি না যতক্ষণ পর্যন্ত ও নিয়ে যাচ্ছে।”

মধুমিতা কপাল কুঁচকে বলল,
–“কিছু বলেনি? তবে গিয়ে কি করল? জামা কাপড় নিয়ে চলে এসেছে?”

–“হু।”

–“কেমন অজাত! না আনলে না আনুক। তুই ও আসবি না যতক্ষণ না সামনে গিয়ে কিছু বলছে, বুঝলি? একদম খুঁটি গেড়ে বসে থাকবি।”

কথা বলতে বলতে পিছু ফিরতেই মধুমিতার বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠল রান্নাঘরের দরজায় ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে। সে তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে বোকাসোকা হেসে বলল,
–“কিছু লাগবে, আব্বা?”

মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে মায়ের পানে। এসেছিল খাবারের জন্য কিন্তু এমন কুটনী মায়ের হাতের খাবার এখন আর তার মুখে রুচবে না। রান্না ঘরের দরজায় সপাটে এক লাথি মেরে মোত্তাকিন ঘরে চলে যায়। মধুমিতা মুখ বাঁকিয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দেয়। এসেছে তার সাথে রাগ দেখাতে!

সারা দিন পেরিয়ে রাত হয়ে গেল তবুও ইন্দুবালার কোন খোঁজ খবর নেই। ঘরময় পায়চারী করতে থাকা মোত্তাকিন থমথমে মুখে ঘড়ির পানে তাকায়। দশটা বাজে। চোয়াল শক্ত করে ফের হাঁটতে লাগল ঘরজুড়ে। মধুমিতা এক হাতে পপকর্ন মুখে পুরতে পুরতে ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলের ঘরের দিকে তাকায়। ছেলেকে পায়চারী করতে দেখে ঠোঁট টিপে হেসে আবার সিরিয়াল দেখতে মনোযোগ দিল। যার ঝামেলা সে বোঝ! সে এবার আরাম করবে। এই ছেলেকে এত পাত্তা দেয়া যাবে না, তাহলেই দেখা যাবে ঘাড়ের উপর চড়ে তান্ডব করছে।

দশটা পেরিয়ে এগারোটা বেজে গেলে মোত্তাকিনের ধৈর্য্য ভাঙে। সে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়। সদর দরজার দিকে যেতে যেতে সিরিয়াল দেখতে মগ্ন মায়ের দিকে তাকায়।‌ পা দুলিয়ে দুলিয়ে গুনগুন করতে থাকা মাকে দেখে রাগে‌ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে বলল,
–“অন্য মানুষের মায়েরা ছেলের বউকে জ্বালায়, তাদের সাথে কূটনামী করে। আর এদিকে আমার আপন মা আমার সাথে কূটনামী করে। আমার জীবন ছাড়খাড় করে দেয় ছেলের বউয়ের সাথে মিলে।”

মোত্তাকিন আঙুল তুলে হিসহিসিয়ে বলল। মধুমিতা কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“তোর মতো অপদার্থ ছেলে থাকলে কুটনী ছেলের বউ আর লাগে না। আমার আপন ছেলে আমায় যা জ্বালায়, তার এক ভাগ ও আমার ছেলের বউ জ্বালায় না।”

মোত্তাকিন রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
দশটা নাগাদ ভাত খেয়ে ওষুধ খাওয়ার পরপরই ইন্দুবালার চোখে ঘুম নামতে লাগল। তখন কেবল বিছানা গুছিয়ে বিছানায় ঢুকেছিল ইন্দুবালা তন্মধ্যেই ঝড়ের গতিতে মোত্তাকিন তার ঘরে ঢুকলো। কঠোর দৃষ্টি ঝলসে দেয় ইন্দুবালার সরু কৌতুহলী দৃষ্টি। কোনপ্রকার বাক্য ব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে ঝট করে কোলে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তহমিনা আর তার মায়ের চোখ চড়কগাছ! তারা চেঁচিয়ে ওঠে,
–“লজ্জা শরমের মাথা খাইছে দু’টোয়। রাত বিরাতে শুধু তাদের নাটক। তা এত প্রেম যখন বাপের বাড়ি দিয়ে গিয়েছিলে কেন? এই জড়াজড়ি করে, এই থাপ্পড় দেয় আবার এই কোলে তুলে নেয় — নাট্যমঞ্চ বানিয়ে রেখেছে আমার ঘরটাকে!”

তহমিনার কথাগুলো অবহেলিত ই থেকে গেল। ঘর তখন শূন্য। সোজা নিজের ঘরে এসেই মোত্তাকিন মেয়েটিকে কোল থেকে নামায়। মধুমিতা চকচকে দৃষ্টি ফেলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সেই দৃশ্যে। খুশিমনে ফের সিরিয়াল দেখতে মগ্ন হয়। মাঝে আবার গলা উঁচিয়ে বলল,
–“এই ইন্দু রাতের খাবার খেয়েছিস নাকি দেব?”

বিছানায় পা গুটিয়ে থমথমে মুখে বসে থাকা ইন্দুবালা গলা উঁচিয়ে বলল,
–“খেয়েছি।”

কোনা দৃষ্টি বারান্দায় ফেলে ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে পড়ল। ওষ্ঠকোনে অপ্রকাশিত হাসি। এখন ভালো লাগছে, এই ঘর তার আপন আপন লাগে। এখানকার সবকিছুতে শুধুই আরাম আর প্রশান্তি! সে আরামে চোখ বুজে ঘুমানোর প্রয়াস করে। দু’মিনিট যেতেই ওষুধের প্রভাবে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। রাত গভীর হলে মোত্তাকিন ঘরে উঁকি দেয়। বেঘোরে ঘুমাতে থাকা মেয়েটিকে এক পলক শান্ত দৃষ্টিতে দেখে ধীরপায়ে ঘরে ঢোকে। পিঠ এলিয়ে দেয় মেয়েটির থেকে দুই হাত দূরত্বে। একটু নৈকট্যে অভিযোগ গাঢ় হতে থাকে। সন্তানকে ছুঁতে চাওয়ার জড়তা অনুভব হতেই। কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় কিভাবে তার সন্তানকে মারার মতো জঘন্য কথা বলেছিল! তাকে তার সন্তানকে ছুঁতে দেয়নি।

আপাতদৃষ্টিতে দুই হাত দূরত্বে থাকলেও তাদের মাঝে বহাল থাকে অদৃশ্য লম্বা এক দূরত্ব। জানা নেই সেই দূরত্ব কবে কমবে! জানা নেই আদৌ চাপা ছেলেটি কখনো প্রকাশ করতে পারবে কি-না যে সে নেশাখোর নয়! নাকি এভাবেই আভিমানের আড়ালে হারিয়ে যাবে মারকুটে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক!

আইসিইউ থেকে পান্তুর মুখে বের হয় বশির। মনের সুখের জন্য হলেও আরেকবার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে,
–“তপনের জ্ঞান ফিরতে কতদিন লাগতে পারে ডাক্তার?”

–“কত দিন, কত মাস তা কিছুই বলা যাচ্ছে না, মিঃ বশির। মাথায় মারাত্মক আঘাত পাওয়ার কারণে সে কোমায় গিয়েছে। আমরা ধারণা করছি জ্ঞান ফিরতে অনেক দেরি হবে কিংবা সারাজীবন এভাবেই থাকবে।”

ডাক্তার যখন শেষ আশ্বাসটুকু দিতেও ব্যর্থ হলো তখন চাপা হিংস্রতায় সর্বশান্ত হয়ে যায় বশির। উত্তরের সিটি মেয়র প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
–“এটা মোত্তাকিন করেছে তাই না? ওপস্ স্যরি স্যরি মোত্তাকিন ইরতেজা! ইরতেজা তো আর একজনের নাম নয়।”

বলেই তাচ্ছিল্য হাসল সে। পরপরই হিসহিসিয়ে শুধায়,
–“তুই এখনো ওটাকে তুলুতুলু করবি?”

বশির গভীর ভাবনায় বিভোর হয়ে বলল,
–“আর তো তিন মাস, ভাইজান। এরপরেই টেন্ডারের সকল পাওনা টাকা আমার কাছে চলে আসবে। তারপর দেখে নেব সবকটাকে। জীবনে অর্জিত সম্মান আর জান দু’টো থেকে এমন ভাবে বিচ্ছেদ করব তিন বাপ ছেলেকে যে গোটা জীবন দুঃস্বপ্ন হয়ে থেকে যাবে তাদের জন্য!”

বলেই সে ফিচলে হেসে উঠল। মোত্তাকিন কি ভাবে তারা ঘাসে মুখ দিয়ে চলে? মোত্তাকিন ইরতেজার জ্ঞাতীগোষ্ঠী তার নাগালের মধ্যে আরো পাঁচ মাস আগে থেকে। সে শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষারত।
*****
পিতৃত্বের অনুভূতি কতটা তীব্র হয় তা জানা নেই তবে মোত্তাকিন সেই ক্ষণ থেকে নিজেকে কারোর বাবা মনে করে—যেই ক্ষণ থেকে শুনেছে, সে বাবা হচ্ছে। এই অনুভূতি টুকু কতটা তীব্র সে সত্যিই জানে না, শুধু এতটুকু জানে ঐ অংশটুকুকে সহিসালামত নিজের কোলে পেতে পুরো দুনিয়া এদিক ওদিক করে দিতে কার্পণ্য বোধ করবে না। সেখানে তার নিজের স্ত্রীর মুখ থেকে নিজের সন্তানের মৃত্যুর কথা সে সহজে মানতে পারেনি।

সেই বিষয়টা উড়িয়ে দিয়ে একটা স্বাভাবিক লাইফ লিড করা তার জন্য এতটাই কঠিন ছিল—যে আজ তিন মাস হয়ে গেলেও সে ইন্দুবালার সাথে ঠিক করে কথা বলেনি। সেই দুই হাতের দূরত্ব আজো তাদের মাঝে বিদ্যমান। ইন্দুবালার স্বস্তি নিশ্চিত করা পর্যন্তই সে পাশে থাকে। এটা ব্যতীত স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে তেমন একটা মধুরতা দেখা যায়না। ইদানিং ইন্দুবালা অনুতাপে ভোগে, মরিয়া হয়ে ওঠে ছেলেটার উগ্র আচরণ অনুভব করার জন্য। যেই ছেলেটার কাছে রাগ এক ঘন্টাও টিকে না সেই ছেলেটা তিন মাস যাবৎ রাগ জমিয়ে রেখেছে—এটা তার জন্য দুঃসহনীয়। মোত্তাকিনকে আগের মতো রাত করে বাইরে‌ থাকতে‌ দেখা যায় না, সিগারেট খেতে দেখা যায় না, বেশি কথা বলতে দেখা যায় না। ভীষণ গুরুগম্ভীর ছেলেটাকে দেখে মধুমিতা আর ইন্দুবালাও ইদানিং হাসতে ভুলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছেলেটার সাথে উগ্রতাই মানানসই আচরণ!

পড়নের ব্লকপ্রিন্টের সুতির শাড়ির সাথে গায়ের চাদরটা আরেকটু জড়িয়ে নিল ইন্দুবালা। উনিশ সপ্তাহের স্ফিত উদর আলতো হাতে আঁকড়ে স্কুল শেষ করে ধীরপায়ে বের হয়। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই শ্বাস উঠে যায়! নভেম্বরের হালকা শীতেও সে ঘেমে গিয়েছে। তবুও চাদর খোলার উপায় নেই, স্ফিত উদর ঢাকতে এটা উত্তম মাধ্যম। সে সিঁড়ির গোড়ায় দুই মিনিট জিরিয়ে নিল। কলিগরা সহানুভূতির দৃষ্টি ফেলে যার যার গন্তব্যে বেরিয়ে গেল। তার মাতৃত্বকালীন শুরু হবে ডেলিভারীর বিশ দিন আগে থেকে। ততদিন এভাবেই হয়তো একটু কষ্ট করে চলতে হবে।
দীর্ঘ দম নিয়ে পুনরায় পা বাড়াতে গেলে কেউ তার অস্বস্তিতে স্বস্তি হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। ইন্দুবালা চোখ তুলে তাকায় গম্ভীর মুখপানে। মুখে হাসি ফুটে উঠল অন্যত্র নিজের দৃষ্টি তাক করে রাখা ছেলেটিকে দেখে। সে হাতটির আঁকড়ে ধরে নিজের যতটুকু ভার দিতে পারল ছেড়ে দিল। ধীর কদমে চলতে চলতে শুধায়,
–“এই সময় কোত্থেকে এলি?”

তবে মোত্তাকিনের কোনরূপ জবাব পাওয়া যায় না। সে হাত উঁচিয়ে রিকশা ওয়ালা কে ডাকলো। ইন্দুবালাকে হাত ধরে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে রিকশা ওয়ালার উদ্দেশ্যে বলল,
–“অসুস্থ, দেখেশুনে ধীরে চালাবেন।”

ইন্দুবালার মুখ মলিন হয়ে গেল। রিকশা চলতে শুরু করলে মোত্তাকিন তার পাশে ধীরে ধীরে বাইক চালিয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছে দেয়। আবার অফিসের উদ্দেশ্যে বাইক ঘুরিয়ে নিলে ইন্দুবালা পিছু ডাকল,
–“যাচ্ছিস কোথায়?”

–“অফিসে।”,অন্তত গুরুগম্ভীর গলায় ছোট্ট এক জবাবে ইন্দুবালা বলল,
–“ভাত খেয়ে যা।”

–“কিছু প্রয়োজন হলে বল, নয়তো যাচ্ছি।”, ত্যাড়া কণ্ঠে ইন্দুবালা আবদারের সুরে বলল,
–“আসার সময় একটু পানি পুরি আনিস।”

–“আর কিছু?”

ইন্দুবালা ভাবতে সময় নিল। ভেবে বলল,
–“জলপাই, তেঁতুল, আলু বুখারা, আঙুর আর অনেক গুলো চানাচুর আনিস। আর কিছু কালো জাম মিষ্টিও আনিস।”

–“আর?”

থমথমে কণ্ঠে ইন্দুবালা না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“আর কিছু লাগবে না।”

মোত্তাকিন নিরুত্তর বাইক ছুটিয়ে চলে গেল। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরস্থির উপরে যায়। মধুমিতার হাতের‌ প্লাস্টার খোলা হয়েছে। এখন সে সুস্থ! বিকালের মধ্যেই ইন্দুবালার বলা সকল খাবার এসে যায়। তূর্য ব্যাগ ভরতি খাবার এগিয়ে দিয়ে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“ভাবি, এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত পানি পুরি এনেছি। খেয়ে আঙুল চাটতে থাকবেন। আরো খেতে চাইলে বলবেন।”

ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে দেখে এক পলিথিন পানি পুরি। সে বলল,
–“এত কেন এনেছ? এত কে খাবে? মধু খায় না, আমায় একাই খেতে হবে।”

–“আমি কিছু জানি না, ভাবি। ভাই কিনে দিছে।”

ইন্দুবালা কথা বাড়ায় না। মাথা নেড়ে তাকে কিছু খাইয়ে বিদায় দিল। অতিথি আপ্যায়নে ইন্দুবালা পটু! তার ভালোলাগে মানুষকে খাওয়াতে, আপ্যায়ন করতে। মোত্তাকিন ফিরল রাত দশটা নাগাদ। ইন্দুবালা তাকে দেখেই দ্রুত কাপড় চোপড় তোয়ালে বের করে দিল। ছেলেটার অদ্ভুত অভ্যাস! এই শীতের রাতে বাড়ি ফিরে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা। অথচ ইন্দুবালার রাতে পানির নাম শুনলেও শীত করে। মোত্তাকিন গোসল করে বের হতেই সে খাবার বেড়ে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে রইল। মোত্তাকিন নীরবে বাকবিতন্ডাহীন খেয়ে ঘরে চলে যায়। মধুমিতা আর ইন্দুবালা একে অপরের পানে চেয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মধুমিতা ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“এগুলো তুই ছাড়া আর কেউ ঠিক করতে পারবে না, ইন্দু। একে অপরকে বোঝ, খোলামেলা কথা বল, অভিযোগ অভিমান একে অপেরর কাছে রাখার মতো একটা সহজ সম্পর্ক বানাতে হবে।”

ইন্দুবালা বাধ্যগত মেয়ের মতো মাথা নেড়ে ঘরে চলে যায়। ভাবতে লাগল কি করে ছেলেটার মনের রাগ বের করবে। সে চলতে চলতে দাঁড়িয়ে গিয়ে সোফা থেকে শুকনো কাপড়গুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোছাতে লাগল। তন্মধ্যেই উদরে কারোর ক্ষিপ্র স্পর্শ অনুভব হতেই সে লাফিয়ে উঠল। ঢিলেঢালা ফ্রক পড়া ইন্দুবালা কাপড় ছেড়ে অবাক চোখে তাকায় নিজের স্ফিত উদরের পানে। এটা একবার নয় গত এক সপ্তাহ থেকেই সে অনুভব করছে। সে হাঁটা থামালেই এমন লাথি মারে। সে বিস্ময় নিয়ে বলল,
–“কি হলো মা হাঁটা থামালে তুমি রেগে যাও? মা হাঁটলেই কি তুমি দোল খেতে পার?”

ইন্দুবালা হেসে উদরে হাত ছুঁইয়ে দিল। পুনরায় কাপড় গোছানোর জন্য কাপড় তুলে নিতে গেলে চোখে বাঁধে মোত্তাকিন অদ্ভুত নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়,
–“কি দেখছিস?”

মোত্তাকিন জবাব দেয় না। স্ফিত উদরের দিকে এক পলক তাকিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। ইন্দুবালা হাতের কাজ শেষ করে বহুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে লাগল ঘরময়। হাঁটতে হাঁটতেই ব্যাংকের কিছু কাগজপত্র হাতে বাঁধে। সেগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে দেখল সেথায় মোত্তাকিনের নাম। সে মনোযোগ সহকারে সবগুলো পর্যবেক্ষণ করে। অবাক হয় মোত্তাকিনের একাউন্ট থেকে মোটা অংকের টাকার লেনদেন দেখে। সে কৌতুহলী গলায় ফোন ঘাঁটতে থাকা ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করে,
–“তোর একাউন্ট থেকে এত টাকার লেনদেন হয় কেন? তোর কাছে এত টাকা কোত্থেকে এসেছে?”

মোত্তাকিন ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়। গমগমে স্বরে বলে,
–“ওগুলো যেখানে ছিল সেখানে রাখ!”

–“এত টাকা তোর কাছে কোত্থেকে এসেছে?”, ইন্দুবালা ফের শুধায়। মোত্তাকিন নির্বাক উঠে এসে কাগজগুলো ছিনিয়ে নিয়ে নেয়। সেগুলো গুছিয়ে রেখে লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। দুই হাত দূরত্বে পিঠ এলিয়ে দিতেই ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। কক্ষ জুড়ে গা ছমছমে নীরাবতায় আচ্ছন্ন হতেই মোত্তাকিন মেয়েটির দিকে কাত ফিরে ঘুমায়। আবছা আলোয় দৃষ্টি রাখে ঠিক স্ফিত আদর পানে। ওষ্ঠকোনে স্মিত হাসি তার অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চাটা এখন অনেক বড় হয়েছে। সনোগ্রাফি রিপোর্টে তার মানব আকৃতি বোঝা যায়‌। সে মোহাবিষ্ট হয়ে যায় মাতৃত্বের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে। তার সম্মোহিত দৃষ্টি আচমকা হকচকায় ইন্দুবালা ঘুমের মাঝে কঁকিয়ে উঠতেই। সে তড়াক উঠে বসে ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হলো চিৎকার করলি কেন? এই ব্যথা করছে কোথাও?”

ইন্দুবালা উদর আঁকড়ে ধরে সাময়িক ব্যথাটুকু সহ্য করে নেয়। দম ফেলে চোখ মেলে তাকায় উদ্বিগ্ন মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“কাছে আয়।”

মোত্তাকিন অবুঝ দৃষ্টি ফেলে দ্রুত এগিয়ে যায়। সন্তানের থেকে দীর্ঘ তিন মাসের দূরত্ব মিটিয়ে ইন্দুবালা তার হাত টেনে নিজের উদরের মাঝ বরাবর রাখে। মৃদু হেসে বলে,
–“দেখ তোর বাচ্চা তোর মতো মারামারি শিখছে। এখন থেকেই প্রাকটিস করছে!”

–“কিহ?”, মোত্তাকিন অবুঝ কণ্ঠে বলতেই তার হাতে মৃদু এক ধাক্কা অনুভব হলো। চমকালো মোত্তাকিন! বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠে বলে,
–“এই এখানে কেউ নড়েছে! এই ইন্দু, বাবু লাথি মেরেছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি। আমার হাতে ধাক্কা লেগেছে।”

মোত্তাকিনের উত্তেজিত কণ্ঠে ইন্দুবালা হেসে বলে,
–“অনেক দিন ধরে এমন লাথি দেয়। হাঁটা বন্ধ করলেই এমন রেগে লাথি দেয়।”

–“কেন কেন, রেগে যায় কেন?”, মোত্তাকিনের চঞ্চল কৌতুহলী কণ্ঠ।

–“কারণ মা যতক্ষণ হাঁটে বাচ্চারা ততক্ষণ দোল পায় আর দোল পেয়ে আরামে ঘুমায়। আর যখনি মা ঘুমাতে আসে তাদের ঘুমে বিঘ্ন ঘটে আর এমন লাথি দেয়।”

–“ওহ্, তবে তুই শুয়ে আছিস কেন?”, মোত্তাকিনের ভাবুক কণ্ঠ। ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বলল,
–“সারাক্ষণ হাঁটলে আমার কোমড় ব্যথা করে না?”

–“সেটাও তো ঠিক! তবে কি আমি একটা দোলনা কিনে আনব? তাতে বাবু আর তুই দোল খাবি। মা ও শান্ত, বাচ্চা ও শান্ত।”, মোত্তাকিনের ফের ভাবুক কণ্ঠে ইন্দুবালা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। বলল,
–“কিছু লাগবে না, ঘুমা।”

–“আবার কি লাথি দেবে?”

–“জানিনা, তুই অপেক্ষা করতে পারিস। আবার দিতে পারে।”, ইন্দুবালা মোত্তাকিনের হাত নিজের উদরে চেপে ধরে চোখ বুজলো। দীর্ঘ তিন মাস পর নিজের অস্তিত্বকে ছুঁতে পারার আনন্দে মোত্তাকিনের নেত্রদ্বয় চকচক করে ওঠে। সুযোগটুকু হাতছাড়া করে না, দৃঢ়তার সাথে ছুঁয়ে থাকে। এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির পাশ ঘেঁষে ঘুমায়। ইন্দুবালা বহুদিন বাদ উষ্ণতাটুকু লুফে নিয়ে বক্ষমাঝে সেঁটে যায়। মেয়েটিকে জাপ্টে ধরে মোত্তাকিন অনেকক্ষণ সেভাবেই চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করে নিজের অংশের আরেকটু অস্তিত্ব অনুভব করতে। বাবার ইচ্ছা অচিরেই পূরণ করে দিল সবেগে আরেকটি লাথির প্রকোপে ইন্দুবালা চেঁচিয়ে উঠতেই। মোত্তাকিন ধড়ফড়িয়ে উঠে মেয়েটিকে বুকে চেপে ধরে আলতো হাতে পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“হয়েছে হয়েছে আর লাগবে না, বুঝেছি তুমি অনেক পারো। কিন্তু মা ব্যথা পাচ্ছে, আর দেয়া যাবে না। এখন অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাও।”

ব্যথাতুর চিৎকার করা ইন্দুবালা হেসে ওঠে সেই অবুঝ কণ্ঠে। মোত্তাকিন অতটুকু আনন্দে ভুলেবসে রাগের প্রখরতা। ব্যথায় কাতর মেয়েটির পেটে অনবরত হাত বুলাতে বুলাতে ব্যথা উপশম করার চেষ্টা করে। রাতের অর্ধপ্রহর তখন কেটে যায়। ইন্দুবালা আধো তন্দ্রায় বিভোর! গর্ভাবস্থায় তার ঘুম কমে গিয়েছে অনেক। মোত্তাকিন বদ্ধ নেত্রের ক্লান্ত মেয়েটির দিকে এক পলক চেয়ে আগের‌ মতো তার গালে গাল ঠেকিয়ে শুয়ে রইল। ইন্দুবালার তন্দ্রা ভাঙে। জড়ানো কণ্ঠে শুধায়,
–“ঘুমাবি না? আর লাথি দেবে না, এখন ঘুমা।”

মোত্তাকিন নীরবে শোনে। কিয়ৎকাল বাদ বড্ডো সাহস জুগিয়ে নিজের চাপা অভ্যাস থেকে বেরিয়ে বলে,
–“আমি কখনো মদ খাইনি, ইন্দু।”

ইন্দুবালা চমকায়। চকিতে ফিরে তাকায় মোত্তাকিনের পানে। অবুঝ কণ্ঠে বলে,
–“সত্যি? কিন্তু ডাক্তার বলেছিল তুই ড্রাঙ্ক ছিলি।”

মোত্তাকিন তার বাহুতে মাথা এলিয়ে মিহি স্বরে বলল,
–“আমার দলে একটা হারামি আছে। আমার সাথে ওর দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। সেটা মেটাতেই সেদিন রাতে কোল্ড ড্রিঙ্কসের সাথে নেশাদ্রব্য মিশিয়ে দিয়েছিল। তারপর ওরাই মেরেছিল।”

ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বোকার ন্যায়। অচিরেই বোকাসোকা চেহারা অপরাধীর ন্যায় ধারণ করে। থুতনি ঠেকে বক্ষে। মোত্তাকিন নিঃশব্দে হাসল সেই নিভে যাওয়া আদল দেখে। আফসোসের সুরে বলল,
–“কিন্তু তুই আমার উপরে একটুও বিশ্বাস করিসনি বরং পাষাণের মতো আমার বাচ্চাটাকে মারার কথা বলেছিলি। আমার এখনো তোর উপর অনেক রাগ হয় ইন্দু! আমি সারাজীবন এই কথাটা মনে রাখব।”

অপরাধবোধে জর্জরিত ইন্দুবালা সেই কঠিন কথার প্রেক্ষিতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্যাসফ্যাসে সুরে বলল,
–“তুই আর মধু ছাড়া এই পৃথিবীতে কেউ আমার গায়ের রঙ উপেক্ষা করে এমন নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসেনি। তোর থেকে আমার অনেক এক্সপেক্টেশন, মোত্তাকিন। আমি তোকে সবসময় নিজের পাশে চাই, কখনো হারাতে চাই না। আমি তো মধুর কাছে আগেও শুনেছি যে তুই নেশা করতি। তাই, আমি ভুল বুঝেছি। আমি চেয়েছিলাম হয়তো এভাবে ভয় দেখালে তুই সঠিক পথে আসবি।”

কৈফিয়ত ও যেন আজ চরম অবহেলিত মোত্তাকিনের নির্লিপ্ততার কাছে। ইন্দুবালা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলল,
–“দুঃখিত!”

–“তুই দুঃখিত বললেও আমি ঐ কথা কোনদিন ভুলব না। তাই ঘুমা, তোর উপর আমার কোন অভিযোগ নেই। তুই তোর জায়গায় ঠিক, আর আমি আমার জায়গায়। তুই ও কম্প্রোমাইজ করিস, আমিও কম্প্রোমাইজ করি। ব্যাস! ঘুমা।”
মোত্তকিন জোরপূর্বক মেয়েটিকে বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মান অভিমান শেষে একসাথে একটা নতুন ভোরের আশায় চোখ বোজে। যদিও অনিশ্চিত জীবনে আদোতেও আগামী সকাল ভাগ্যে জুটবে কি-না তার নিশ্চয়তা নেই। তবুও আশা রাখে আগামী সকালের এবং অবশ্যই একটা সুন্দর সকালের।

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here