#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৫
মেয়ের ঘরের চাপিয়ে রাখা দরজাটি সাবধানে খুলে ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকলেন সিদ্দিক সাহেব। কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে, বৃষ্টিভেজা শীতল বিকেল যে! বাতাস বেশ ঠান্ডা! একটু পরেই মাগরিবের আজান পড়বে। তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে ডাকলেন,
–“ইন্দু, আম্মা ওঠ! সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।”
দুইবার ডাকেই ইন্দুবালা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ফোলা ফোলা এলোমেলো নেত্রে বাবাকে দেখে সে। সিদ্দিক সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে আশ্বস্ত করলেন,
–“এতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই।”
ইন্দুবালা ওড়নায় কপালের ঘাম মুছল। ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“আব্বু, কখন এসেছো? খেয়েছো?”
সিদ্দিক সাহেব মেয়ের বিছানায় পা গুটিয়ে বসলেন। মৃদু হেসে বললেন,
–“খেয়েছি তো কতো আগে, তুই তো ঘুমাচ্ছিস আর ঘুমাচ্ছিস। কথা বলার ছিল, সেই দুপুর থেকে অপেক্ষা করছি।”
ইন্দুবালা ম্লান হাসলো। স্কুল থেকে এসে কোনরকমে গোসল করে ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো গোসলের পানির সাথে বয়েছে কিছু নোনাজল যেগুলো অবহেলাতেই সুন্দর লাগে! সে পা গুটিয়ে বসে জিজ্ঞাসা করে,
–“কি বলবে, বলো!”
–“এ মাসের তো শেষ সপ্তাহ চলছে অথচ এ মাসে কোন টাকা ব্যাংকে রাখিসনি। এতো টাকা কি করেছিস?” ইন্দুবালা গোল গোল দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“সব টাকা ভাঙিনি তো আব্বু, আমার কাছে এখনো সাত হাজার টাকা আছে।”
–“বাকি এগারো হাজার টাকা কি করেছিস?”
এবেলায় ইন্দুবালা জবাব দিতে কিছুটা সময় নিলো। কিছুক্ষণ পর নম্র স্বরে বলল,
–“আমি কিছু বই কিনেছি আব্বু।”
–“এগারো হাজার টাকা তো আর কিছু বই কেনায় শেষ হয়ে যায় নি ইন্দু! খোলাখুলি বল কোথায় কোথায় খরচ হয়েছে।”
ইন্দুবালা শান্ত চোখে তাকায়, মিহি স্বরে বলে,
–“বইতে এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মা কারেন্ট বিলের জন্য তিন হাজার টাকা নিয়েছে, নানুর ওষুধের জন্য এক হাজার টাকা নিয়েছে, ইনু নিয়েছে এক হাজার টাকা। মোস্তাকিন তিন হাজার টাকা ধার নিয়েছে। দর্জির অনেক দিন থেকে নাকি কিছু বকেয়া ছিল তার জন্য মা আরো এক হাজার টাকা নিয়েছিল আর ইমন নিয়েছে পাঁচশো টাকা। বাদ বাকিটা আমি বাসার জন্য কিছু খাবার কিনেছিলাম তাতে খরচ হয়েছে।”
সিদ্দিক সাহেব শান্ত দৃষ্টিতে অবলোকন করে মেয়েকে। ঠিক তার স্ত্রীর প্রতিরূপ এক মাটির পুতুল। নেই কোন চাটুকারিতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আর না আছে ঝুলিভরা অভিযোগ! সে শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন,
–“এগারো হাজার টাকার মধ্যে মাত্র দুই হাজার টাকা নিজের জন্য খরচ করেছিস? আর বাকি সব টাকা এমন মানুষগুলোর পেছনে যারা জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে তোকে দুঃখ দিয়ে আসছে। আমি এটাকে কি হিসেবে নেব ইন্দু? বোকামি নাকি অতিরিক্ত বিশ্বাস?”
ইন্দুর দেহ ম্লান হয়ে আসে। অবসাদের সুরে বলে,
–“ভালোবাসা, আব্বু! তারা আমার পরিবার আমার ভালোবাসার অংশ, তাদের পেছনে খরচ করার জন্যই তো আমি ইনকাম করছি। এগুলো তো প্রয়োজন আব্বু। মা টাকা পাবে কোথায় এই খরচগুলোর জন্য?”
সিদ্দিক সাহেব স্মিত হাসলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
–“ইন্দু, জরুরি নয় যে—তুই নিজে যেমন ভালো, পরিষ্কার মনের মানুষ তেমন সবাই ভালো হবে। তারা এই যা কিছু বলে তোর থেকে টাকা নিয়েছে না? সেই সবকিছুর টাকা আমি বহু আগেই দিয়ে দিয়েছি।”
ইন্দুবালা ম্লান চোখে তাকায়। ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
–“হয়তো অন্য কোন প্রয়োজনে টাকা প্রয়োজন, আব্বু। তুমি তো প্রয়োজনের বাইরে মাকে কোন টাকা দাও না। থাক না এসব কথা। আমি আমার পরিবারের জন্য খরচ করব এটা দোষের তো কিছু নয়।”
–“নাহ, দোষের কিছু নয়। কিন্তু মিথ্যা বলে কেনো? তাদের উদ্দেশ্য তো ঠিক না ইন্দু! তাদের উদ্দেশ্য হলো তোকে নিঃস্ব করা, অপদস্থ করা। আজকের পর থেকে আমি যেন আর একটা কানাকড়িও এদের পেছনে খরচ করতে না দেখি ইন্দু! তাদের যেখানে যা প্রয়োজন তা আমি পূরণ করছি। এই ইনকামের টাকাগুলো তোর ভবিষ্যতের জন্য জমাতে হবে। টাকা না থাকলে একটা মেয়ের কোন মূল্য নেই। আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, টাকা থাকতে হবে। টাকা থাকলে তোকে মানুষ সম্মান করবে নয়তো সৌন্দর্যের সাথে সাথে পুরো সত্তাটাকেই পায়ে পিষে ফেলতে দুবার ভাববে না। তাই তোকে এইদিক থেকে মজবুত হতে হবে।”
স্পষ্ট গলায় বলেই সিদ্দিক সাহেব বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ঘর থেকে বের হতে হতে বজ্রকণ্ঠে হাঁক ছেড়ে ডাকলেন তহমিনাকে।
রান্নাঘর থেকে বসার ঘরে ছুটে আসলো তহমিনা। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞাসা করে,
–“কি হয়েছে ভর সন্ধ্যায় এমন চেঁচাচ্ছো কেনো?”
–“তোমার ছেলে মেয়ে কোথায়? ইনসিয়া…ইমন বসার ঘরে এসো।”, সিদ্দিক সাহেব গমগমে স্বরে ডাকলেন। তহমিনা কপাল কুঁচকে বলে,
–“আমার ছেলে মেয়ে আবার কেমন কথা? ওরা তোমার ছেলে মেয়ে না?”
–“ওরা আমার ছেলে মেয়ে হলে তো আস্ত বেয়াদব হতো না, তহমিনা। তাই আমার সন্তান বলতে আমার লজ্জা হয়।”
–“কেনো আমার নাতি, নাতনিরা কি বেয়াদবি করছে?”, শাশুড়ির কিঞ্চিৎ খোঁচা দেওয়া কথায় সিদ্দিক সাহেব থমথমে মুখে বললেন,
–“তা তো আপনি নিজের চোখেই দেখবেন আম্মা।”
ইনসিয়া ইমন আসলে সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞাসা করেন,
–“গতকাল রাতে আমার থেকে তোমারা কি বলে টাকা নিয়েছিলে?”
ইনসিয়া শুকনো ঢোক গিলে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“কেনো আব্বু, তোমায় বলেছিলাম না কলেজে প্রয়োজনীয় কিছু কাজে এক হাজার টাকা লাগবে?”
–“তবে ইন্দুবালার থেকে টাকা নিলে কেনো?”
ইনসিয়া চুপ হয়ে গেল। অন্তরে অন্তরে ফুঁসে উঠল। মোত্তাকিন বলেছিল ইন্দুবালা নাকি তাদের দেখে নিয়েছে। বাড়িতে বলে দেবে, কিন্তু বলেনি। তারমানে এইভাবে প্রতিশোধ নিয়েছে ও। তহমিনা মেয়েকে বাঁচাতে ফোড়ন কাটল।
–“কলেজে এক হাজার টাকায় হবে না দেখেই তো ও ইন্দুর থেকে আরো এক হাজার টাকা নিয়েছে। তাই বলে এভাবে ওকে জেরা করার মানে কি ইনসুর আব্বু?”
সিদ্দিক সাহেব ভ্রু টানটান করে বললেন,
–“ওহ্, আচ্ছা। আমি তো জানি আজ তোমার মেয়ের কলেজে কোন ক্লাসই ছিল না আর না ছিল কোন প্রয়োজন। ঐ যে জাফর ভাইয়ের মেয়েটা আছে না, ওর সাথে পড়ে? ও বলল। আর তোমার ছেলে যে গতকাল রাতে পাঁচশো টাকা নিলো হাত খরচের জন্য, তারপরেও আবার ইন্দুর থেকে পাঁচশো টাকা কেনো নিয়েছে? কারেন্ট বিল সেদিন আমি পরিশোধ করে আসলাম, তোমার মায়ের জন্য ওষুধ কিনে আনলাম আর দর্জি? কোন দর্জির কাছে বকেয়া আছে তহমিনা? চারজন মিলে আমার মেয়েটার ভালোমানুষীর সাথে ব্যবসা করছো? ইন্দু, পাছে কোন প্রশ্ন করে না, কৈফিয়ত চায় না বলে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াবে ওর সাথে?”
তহমিনার গলা শুকিয়ে গেল। ইমন বাবার লালচে মুখ দেখে অগোচরে কেটে পড়ল। ইনসিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় মায়ের দিকে। তার নানু এবার ক্ষেপে গেল। সে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
–“দেখো জামাই, তোমার বাড়িতে থাকছি, খাচ্ছি বলে তুমি যা ইচ্ছা তাই বলতে পারো না। ইন্দুবালা কি একা তোমার মেয়ে? এই ঘরের ও কিছু না? এই ঘরে থাকছে পড়ছে, তাই বলে ঘরের জন্য একটু খরচ করেছে দেখে তুমি সবাইকে এমন জেরা করতে পারো না। মানলাম তহমিনা মিথ্যা বলে টাকা নিয়েছে কিন্তু তুমি কি জানো হিসাব করে টাকা দেওয়ার পরেও অনেক খরচ থাকে? ঘরের কর্ত্রীই জানে একটা ঘরে কতো খরচ হয়।”
মায়ের কথায় তহমিনা ঘন ঘন মাথা নেড়ে সায় জানায়। মনে মনে প্রসন্ন হয়। সিদ্দিক সাহেব কঠোর গলায় বললেন,
–“নিজের বাবার ঘরে থাকতে, পড়তে খেতে টাকা দিতে হলে তো ইনসিয়া আর ইমনকেও টাকা দিতে হবে আম্মা। এমনকি আপনার আর তহমিনারও এখন থেকে টাকা দিতে হবে এই ঘরে থাকতে হলে।”
–“কি বললে তুমি? মুরুব্বিকে এভাবে অপমান করছো?”, ভদ্রমহিলা বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞাসা করে।
–“আমার ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি করলে আমায় কথা বলতেই হবে আম্মা। আমি আপনার ছেলের সাথে কথা বলব আজ, শিঘ্রই এসে আপনাকে নিয়ে যাবে। ঘরে একজন বাড়তি মানুষ থাকলে খরচও বাড়ে বুঝলেন!”
সিদ্দিক সাহেবের স্পষ্ট কণ্ঠে সহসা প্রৌঢ় ভদ্রমহিলা হু হু করে কেঁদে উঠলেন। তহমিনা বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“তুমি নিজের ঐ অপয়া মেয়ের জন্য আমাদের সাথে এমন করছো? আমার মাকে কাঁদাতে পারলে? আমায় আর আমার ছেলে মেয়েদের এই বাড়িতে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে? তবুও তুমি ঐ মেয়ের কোন বন্দোবস্ত করবে না তাই তো? সারাজীবন খুঁটি বানিয়ে পূজো করবে? ও এই ঘরে পড়ে পড়ে আরাম করে খাচ্ছে ঘুমাচ্ছে অথচ ওর জন্য আমার মেয়ের একটা ভালো সম্বন্ধ আসছে না, আমি বিয়ে দিতে পারছি না। ওর বাড়তি খরচ না থাকলে আজ এই বাড়ি টিনশেড থাকতো না, ছাদ থাকতো। সেখানে ও একটা টাকা ঘরে খরচ করলে তোমার গায়ে ফোস্কা পড়ে? তবে তুমি থাকো তোমার ঐ অপয়া মেয়ে নিয়ে, আমরা চলে যাবো।”
ক্ষিপ্ত স্বরে কথাগুলো বলতেই একটি অনমনীয় হাত ক্ষিপ্র বেগে তহমিনার গাল ছুঁয়ে গেল। ব্যথায় চিড়বিড়িয়ে উঠল সাথে সাথে। তহমিনা থমকে যায় সম্মুখে রণমূর্তী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর ক্ষিপ্ত মুখটি দেখে। ইনসিয়া ঘরের এক কিনারায় সেঁটে গেল বাবার এই রূপে। ইন্দুবালা এতক্ষণ চুপ থাকলেও আর পারলো না। সে আর্তনাদ করে ওঠে,
–“আব্বু!”
সিদ্দিক সাহেব গর্জে উঠলেন,
–“একটাও কথা বলবে না ইন্দু! ঘরে যাও, যাও বলছি।”
ইন্দুবালা যায় না ঠায় দাঁড়িয়ে রয়। টলটলে নেত্রে বলে,
–“আমি আমার ঘরের মানুষের জন্য খরচ করতে পারলে খুশি হই, আব্বু। তুমি তার জন্য এমন আচরণ করতে পারো না মায়ের সাথে।”
–“তোমায় আমি যেতে বলেছি ইন্দু! ওদের এগুলো প্রাপ্য! মানুষরূপী কটা অমানুষ আমার ঘরে বাস করে। ঐ মেয়েটাকে এতো কষ্ট দিয়েও তোমাদের মন ভরে না হ্যাঁ? প্রতি সপ্তাহে যে যার তার সামনে দাঁড় করিয়ে দাও, উঠতে বসতে অপমান করো এগুলো আমি জানি না? চুপ করে থাকি কারণ ও চায় না আমি ঘরে কোন ঝামেলা করি। অথচ তোমাদের বেশি ভালো সহ্য হয় না। আজকের পর থেকে তোমাদের কোন হাত খরচ নেই। যা লাগবে আমি সেখানে গিয়ে পরিশোধ করে আসবো। আর কোনদিন যদি আমি শুনেছি ওর থেকে একটা কানাকড়িও তোমরা নিয়েছো তবে সেদিন তোমাদের শেষ দিন হবে এই ঘরে।”
পরপরই দৃঢ় গলায় বলে,
–“আমি জানি আমার মেয়ের আহামরি কোন রূপ নেই। তাই এই কঠিন দুনিয়ায় সম্মানের সহিত বাঁচতে হলে এই টাকাটুকুই ওর সম্বল! আমি না থাকলে ওকে মানুষ এই টাকার জোরে হলেও সম্মান করবে, ওর বেঁচে থাকা সহজ হবে। আর এই বিষয়ে কোন কম্প্রোমাইজ আমি কখনো হতে দেব না, তহমিনা।”
বলেই সিদ্দিক সাহেব গটগট করে ভেতরে চলে গেলেন।
তহমিনা জ্বলন্ত চোখে ভস্ম করে দিল টলটলে নেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্দুবালাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“বাপের কান পড়ায়ে শান্তি হয়েছে? নিজের মতো আমাদেরও কখনো সুখী হতে দিবি না তাই তো? দেখ ইন্দু, তোর জন্য যদি আমি আমার মেয়ের বড়ো কোন জায়গায় বিয়ে না দিতে পারি তবে আমি গ/লা/য় দ/ড়ি দিয়ে ম”র”ব।”
তহমিনা চলে যায়। ইনসিয়া ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
–“অন্যকে সুখী দেখলে গা জ্বলে তাই না? ডাইনি!”
ইনসিয়াও চলে যায়। ইন্দুবালা কাঠের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাকায় তথাকথিত নানুর দিকে। প্রৌঢ় মহিলা এক পলক অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে দেখে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“এই বুড়ির এক একটা চোখের পানির অভিশাপ লাগবে তোর, দেখিস।”
সেও লাঠিতে ভর করে ধীরপায়ে চলে যায়। পড়ে থাকে ইন্দুবালা একা। সাথে থাকে অজস্র ঘৃণা, লাঞ্ছনা, অবজ্ঞা অপমান আর এখন সদ্য যুক্ত হলো অভিশাপ! পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীবটি বোধহয় সে! মাঝেমধ্যে তার ইচ্ছা হয় এই দমবন্ধকর পৃথিবীর পরিবেশ থেকে নিজের এই ভাগটুকু ছেড়ে দিতে। ইচ্ছে হয় এই কালো অভিশপ্ত বোঝা মেয়েটির অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে কিন্তু ঐ বাবা নামক মানুষটার ওয়াদার কাছে সে হেরে যায়। সে যে কথা দিয়েছে দুর্বল মেয়েটি এই কঠিন দুনিয়ায় বাঁচার চেষ্টা করবে দৃঢ়তার সাথে। অথচ বারংবার সে মুখ থুবড়ে পড়ে নিজের মধ্যে লালন করা নমনীয়তার কাছে। কেউ কি নেই যে বাবার পরে তার নমনীয়তার খোঁজ করবে? পৃথিবীর সবাই কি সৌন্দর্যের জন্য মরিয়া? তার মধ্যে যে একটা চমৎকার মন আছে তার খোঁজ কেউ কি করবে? এগুলো ইন্দুবালার স্বপ্নের খাতায় থাকা কিছু দুর্লভ বাক্য! যেগুলো মতিভ্রষ্ট হলে জিহ্বায় ভর করে!
*****
রাত তখন খুব একটা না। শহুরে বুকে রাত বারোটা নিছকই সন্ধ্যা রাত! এখনো গাড়ির হর্ন, টুকটাক শব্দে মাতোয়ারা বাতাস! তবে আবাসিক এলাকা জুড়ে বেশ নিস্তব্ধতা নেমেছে।
লাগাতার ফোনের পর যখন ‘টুং’ করে ছোট্ট একটা মেসেজ টোন বেজে উঠল মধুমিতা তখন অনাগ্রহে নিজের স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। দৃষ্টি থেকে উদাসীনতা সরল না মেসেজটি দেখে। দাঁতে দাঁত চেপে ফোন হাতে নিজের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। নিচে তাকাতেই একটি অতিপরিচিত ঘৃণ্য মুখ ভেসে উঠলো। কোর্ট প্যান্ট পরা আভিজাত্যে মোড়া বয়স্ক লোকটি স্মিত হাসলো বহুদিন পর কাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখে। মধুমিতার ফোনটি পুনরায় বেজে উঠল। এবার রিসিভ করে মধুমিতা। অপরপ্রান্ত থেকে আদুরে গলায় ডেকে ওঠে,
–“মধু!”
–“এই নামে ডাকবেন না। এই নামে ডাকার অধিকার আপনার নেই।”, মধুমিতা টলটলে নেত্রে দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
লোকটি হাসলো। বলল,
–“এই নামে ডাকার একমাত্র অধিকার আমারই মধু!”
–“কি চান? কেনো আমার পিছু ছাড়েন না? আমি আপনার এই ঘৃণ্য মুখটি দেখতে চাই না আপনি বুঝতে পারেন না?”
–“যেদিন আমার শ্বাস প্রশ্বাস আমার সঙ্গ ছেড়ে দেবে সেদিন আমি তোমায় ছেড়ে দেব, মধু।”
–“তবে মরে যান।”
লোকটির মুখ মলিন হয়ে যায়। আক্ষেপ জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–“এতো ঘৃণা?”
–“আপনি ঘৃণারই যোগ্য!”
–“ক্ষমা করা যায় না?”
–“খু”নিকে ক্ষমা করা যায় কিন্তু একজন চরিত্রহীনকে নয়।”
–“তোমায় ভালোবাসা যদি চরিত্রহীনতা হয় তবে আমি চরিত্রহীন মধু! তবুও আমি তোমায় চাই।”
–“আর আমি আপনার মুখও দেখতে চাই না।”
লোকটা স্মিত হেসে বলল,
–“আমি চাইলেই তোমায় বাধ্য করতে পারি রোজ এই মুখটি দেখতে কিন্তু করিনা। কারণ আমি তোমার সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিতে চাই।”
–“আমার সিদ্ধান্ত? হাসালেন! আমার সিদ্ধান্তের প্রাধান্য দিলে আপনি আমার জীবন, শখ আহ্লাদ এভাবে পায়ে পিষে ফেলতে পারতেন না।”, মধুমিতা তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
–“ভালোবাসি মধু!”
–“ঘৃণা করি!”
লোকটা পুনরায় হাসলো। মিহি স্বরে বলল,
–“রাগলে তোমায় ভীষণ সুন্দর লাগে মধু!”
পরপরই অবসাদের সুরে বলল,
–“আজকাল ভীষণ শরীর খারাপ হয়, মধু! ইচ্ছে করে ছুটে আসি তোমার কাছে কিন্তু তুমি কখনো দরজাই খোল না। ভীষণ কষ্ট হয় মধু! অন্তত একটু জায়গা দাও তোমার জীবনে মৃত্যুটা সহজ হবে হয়তো।”
–“আপনার দুমুখো কথা শেষ হয়েছে? হলে এখান থেকে চলে যান। আর এই মুখ নিয়ে আমার দুয়ারে আসবেন না।”
–“যতোদিন দেহে সামর্থ্য থাকবে ততোদিন তোমার দুয়ারে আমায় দেখবে।”
লোকটির ম্লান হেসে বলে। প্রতিবারের মতো এবারেও শূন্যতা নিয়ে ফিরতে হয় তাকে। কালো গাড়িটি চলে যেতেই মধুমিতা আটকে রাখা দম ফেলে। টলটলে নেত্র বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। অন্ধকারে উদাসীন দৃষ্টি ফেললে দৃষ্টি আটকায় ফুলে ফুলে বেষ্টিত বারান্দার মাঝে বসে থাকা ইন্দুবালার দিকে। ইন্দুবালা চলে যাওয়া গাড়িটির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মধুমিতার দিকে তাকায়। হাতে থাকা ফোনটি বেজে উঠলে মধুমিতা কানে ঠেকায়। ইন্দুবালা মৃদু হেসে চিরচেনা একই সুরে ডেকে ওঠে,
–“মধু!”
–“এই নামে ডাকবি না, ইন্দু। আমার ঘৃণা হয় এই ডাক শুনলে।”, মধুমিতা শাসিয়ে বলল।
–“আমি তো তোমায় এই নামে ডাকতেই ভালোবাসি, মধু!”, ইন্দুবালা স্মিত হেসে বলল।
–“তোদের এই ভালোবাসা আমার সহ্য হয় না।”
–“লোকটা এখনো তোমায় ভীষণ ভালোবাসে মধু!”
–“কিন্তু তার এই ভালোবাসা দেখলে আমার গা ঘিন ঘিন করে, ইন্দু!”
–“এতো অভিমান কেনো, মধু?”
–“আমার জায়গায় তুই থাকলে বুঝতি!”
–“ক্ষমা করা যায় না, মধু?”
–“তুই একদম ঐ লোকটার মতো কথা বলিস, ইন্দু!”
–“আমি কারোর মতো কথা বলছি না, মধু! আমি শুধু তোমায় সুখী দেখতে চাই। লোকটার চোখেমুখে অগাধ তৃষ্ণা তোমায় সুখী করার।”
–“ঐ লোকটার সাথে আমার কোন সুখ নেই ইন্দু! আমি সুখী সেদিন হবো যেদিন তুই সুখী হবি।”
–“আমার সুখ? আর তোমার ছেলে?”
–“ঐ অপদার্থ, কুলাঙ্গারকে নিয়ে আমার কোন আশা ভরসা নেই, ইন্দু! বাপটার মতো হয়েছে রগত্যাড়া! ওকে দেখলেও আমার এখন মেজাজ খারাপ হয়।”
–“তুমি বড্ড অভিমানী, মধু!”, ইন্দু নির্নিমেষ তাকিয়ে বলল। মধুমিতা বাঁ হাতে চোখের পানি মুছে বলল,
–“ঐ লোকটার জন্য আমি আজ নিজের চোখে ঘৃণিত, ইন্দু! আমি তাকে ক্ষমা করতে পারব না।”
ইন্দুবালা মলিন মুখে তাকিয়ে থাকে মধুমিতার মুখের দিকে। ঐ যে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া মানুষটা মুহিত ইরতেজার প্রিয় সহধর্মিণী মধুমিতা। আজ বহুবছর সে এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে আসছে। দেখে আসছে এক কঠোর নারীকে। সে ম্লান হেসে বলল,
–“রাগলে তোমায় ভীষণ সুন্দর লাগে, মধু!”
–“আবার ঐ লোকের মতো ছ্যাঁচড়া কথা বলছিস, ইন্দু?”
মধুমিতা এবার রাগে ফেটে পড়লো পুনরায় একি কথার ধরণে। রাগে গজগজ করে ফোনটা কেটে দিলো।
~চলবে~

