#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ০৮
দানবীয় চিৎকারে রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙলো ক্ষিপ্র বেগে। খাবার টেবিলে খাবার খেতে মগ্ন ইন্দুবালা আর ইনসিয়া চমকালো সেই চেঁচামেচিতে। ইন্দুবালা ওড়নাটা কোনমতে মাথায় জড়িয়ে টেবিল ছেড়ে এঁটো হাতেই ছুটলো। তহমিনার কপালে অজশ্র ভাঁজ পড়ে। সে ঠেলে ইনসিয়াকেও পাঠিয়ে দিলো ইন্দুবালার পিছে। ইন্দুবালা ছুটতে ছুটতে এসে বারান্দায় থামে। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে ঠিক উপরে বারান্দায় তাকায়। তেজি কণ্ঠে বলে,
–“কি হলো এমন ষাঁড়ের মত চিৎকার করছিস কেন?”
রেলিং আঁকড়ে ধরে নুইয়ে থাকা মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠল।
–“তুই মরে গিয়েছিলি না-কি প্রেম করছিলি?”
–“যেটাই করি না কেন, তাতে তোর কি? এমন চিৎকার চেঁচামেচি কোন ধরণের আচরণ, মোত্তাকিন?”
মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চাপলো। দৃষ্টি সরিয়ে তাকায় পেছনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা ইনসিয়ার দিকে। দাঁত খিচে বলে,
–“তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কিসের জন্য?”
ইনসিয়া কপাল কুঁচকে নিলো সবেগে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
–“আমি দাঁড়িয়েছি তো কি হয়েছে? ওর সাথে তোমার কি কথা, মোত্তাকিন? তোমার সাথে আমার কথা আছে ফোন দাও। সারাদিনে একবার ফোন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করোনি।”
–“ওরে চুন্নি! তোকে হাফ প্যান্ট পরে পাড়া চড়িয়ে বেড়াতে দেখেছি তুই আবার আমার নাম ধরে ডাকছিস? কানের নিচে দুটো খেয়েছিস, না-কি খাবি?, সহসা ইনসিয়ার নাক কান লাল হয়ে গেল লজ্জায়, অপমানে। সে ফুঁসে উঠে বলে,
–“মোত্তাকিন এটা কোন ধরনের আচরণ? তুই তোকারি করছ কেন?”
–“আবার নাম ধরে ডাকছিস! ভাই বল বে’য়া’দ’ব মেয়ে! যেখানে তোর বড় বোনকে এখনো আমি তুই তোকারি করি, সেখানে তুই কোন গোয়ালের গরু—যে তোকে আপনি আপনি করতে হবে? যা ফুট এখান থেকে, নয়তো এসে দু’টো দেব কিন্তু!”
ইনসিয়া অবাক হয়ে যায় তার আচরণে। সপ্তাহ দুই আগে যেই ছেলে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল, সেই ছেলে হঠাৎ এমন রূপ বদলে নিচ্ছে কি করে? সে রাগে দিশেহারা হয়ে গেল। আক্রোশের সাথে বলে,
–“তুমি আমার ভাই হও, মোত্তাকিন? আমরা এতদিন ভাই-বোন সম্পর্কের জোড়ে কথা বলেছি?”
মোত্তাকিন মুখ বিকৃত করে নেয়। এতদিনের মিচকে প্রেমের অভিব্যক্তি সেকেন্ডের মধ্যে বদলে ফেলল।
–“কথা বললেই কি ওগো, জান, সোনা, হানি ব্লা ব্লা হয়ে যায়? তখন ইচ্ছে হয়েছিল কথা বলেছি, এখন ইচ্ছে হচ্ছে তোকে কানের নিচে দুটো দিতে। খেতে চাইলে আয় তর্ক করতে।”
ইনসিয়া তব্দা হয়ে গেল মোত্তাকিনের এহেন আচরণে। ইন্দুবালা দু’জনের কথোপকথনের নিরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। অতঃপর মুখ খুলল,
–“মোত্তাকিন এগুলো কোন ধরণের ব্যবহার? তুই ওর সাথে এমনভাবে কথা বলতে পারিস না।”
–“ওকে তবে যেতে বল এখান থেকে, এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে আছে।”
–“তোর মেজাজের কাঁথা পুড়ি, তুই কোন অবস্থাতেই ওর সাথে এমন আচরণ করতে পারিস না।”, ইন্দুবালা চোয়াল শক্ত করে বলল। ইনসিয়া আর অপমান নিতে পারে না ধপধপ করে বারান্দা থেকে চলে যায়। মোত্তাকিন দাঁত কেলিয়ে হাসলো এবার। খোঁচা মেরে বলে,
–“বাহ্! কথায় কি জোর! এই জোর নিশ্চিত ঐ মাদারবোর্ড জোগাচ্ছে?”
–“মাদারবোর্ড?”, ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে শুধায়।
–“হ্যাঁ, এখন তো চিনবি না। সেই ছাগলের কথা বলছি যার সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
–“মুখ সামলে কথা বল, মোত্তাকিন।”
–“মুখ সামলাতে দিলে তো তুই আর তোর মাদারবোর্ড! সম্বন্ধ আসতে দেরি আছে কিন্তু বেয়াদবের রাজি হতে দেরি নেই। এই তুই জানিস ঐ ছেলে ভালো না খারাপ, বেকুব মেয়ে! পাত্রের নাম্বার আর সব তথ্য দিবি এখুনি। আর ফেসবুক থেকেও ব্লক ছাড়বি।”, দোতালার বারান্দায় বসে ছেলেটা ষাঁড়ের মত চেঁচিয়ে যাচ্ছে। ইন্দুবালা মেজাজ হারায় সম্মুখের প্রতিবেশীরা কেউ জানালা দিয়ে মুখ বের করে আছে তো কেউ বারান্দায় এসে বসে আছে। সকলে তাদের কথোপকথন মনোযোগ দিয়ে শুনছে। সে দাঁত খিচে বলল,
–“সবাইকে নিজের মত ছাগল লাগে? ঐ ছেলে অন্তত তোর থেকে হাজার গুণে ভালো। সে একজন সুপুরুষ! যে সামনের জনের মন বুঝতে পারে, সম্মান করে, যত্ন করতে জানে তার বুড়ো মাকে দিয়ে খাটিয়ে নিজে গুন্ডামি করে বেড়ায় না। তার কোন তথ্য দিচ্ছি না আর না তোকে ফেসবুক থেকে আনব্লক করব। এরপর থেকে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাবি না আমার ব্যপারে! যা ফুট!”
মোত্তাকিনের পাল্টা অভিব্যক্তি না দেখেই গটগট করে ঘরে চলে যায় ইন্দুবালা। মোত্তাকিন বড় বড় নেত্রে তাকায়। রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে বলে,
–“এই বেয়াদব মেয়ে তুই আমার ডায়লগ আমার উপর ঝাড়লি কোন সাহসে? এই তুই আমার কথা শেষ না করতে দিয়েই চলে গেলি? তোর এতো তেজ আসে কোত্থেকে, ইন্দু? নিশ্চিত ঐ মাদারবোর্ডের ফোন এসেছে, তাই না?”
রাতের অন্ধকারে ছেলেটা একা একাই চেঁচিয়ে যাচ্ছে। শোনার মত যখন আর কেউ রইল না তখন একটা সময় থেমে যায় সে। ফোঁস ফোঁস করে বিড়বিড় করে,
–“এই দুই বোন তো দেখছি আমার জীবনটা ঝাঁঝড়া করে দিচ্ছে! কি বেয়াদব দু’টো! ভালো পেইন দিতে জানে। একটা গলায় ঝুলে থাকতে পারলে খুশি, আরেকটা চোখের সামনে থেকে দূর করতে পারলে খুশি! দু’টোকে যদি শায়েস্তা না করেছি!”
সারা ঘরের কাজ শেষ করে মধুমিতা মাত্র ই এসে দাঁড়ায় ছেলের বারান্দায়। কোমড়ে এক হাত আরেক হাতে ঝাড়ু। থমথমে মুখে শুধায়,
–“ষাঁড়ের মত চেঁচামেচি শেষ, বাবু?”
মোত্তাকিন তখনো উত্তপ্ত মেজাজের তোপে অস্থির হয়ে আছে। মায়ের দিকে না তাকিয়ে অস্থির কণ্ঠে বলল,
–“মামনি, ইন্দুর বিয়ে হলে কি হবে?”
–“কি হবে? ও ওর শশুর বাড়ি চলে যাবে।”, মধুমিতার থমথমে কণ্ঠ।
–“তারপর?”
–“তারপর সংসার করবে।”
–“তারপর?”
ছেলের লাগাতার এমন প্রশ্নে মধুমিতা এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তারপর একটাসময় বাচ্চাকাচ্চা হবে আর ওরা তাদের নিয়ে ভরা সংসারে মগ্ন হবে।”
সরব মোত্তাকিন বড় বড় নেত্রে তাকায় মায়ের দিকে। মুখ বিকৃত করে আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“বাচ্চা? বাচ্চা কিভাবে হয় মামনি?”
প্রশ্নের জবাব আর আসলো না, আবুঝ নেত্রে তাকিয়ে থাকা মোত্তাকিন হঠাৎ ঝাড়ুর আঘাতে কঁকিয়ে উঠল। মধুমিতা ঝপাঝপ তিন চারটা পেটান দিয়ে তেতে উঠে বলে,
–“গুন্ডামি করতে করতে আদব কায়দা সব ভুলে গিয়েছিস।”
–“আহ্, মামনি। থামো, মেজাজ এমনিই খারাপ হয়ে আছে। ঐ ইন্দু! বেয়াদব মেয়ের আবার বাচ্চা হবে! শুনতেই কি অদ্ভুত লাগে।” , মোত্তাকিন টিশার্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বিরক্তি নিয়ে বলল। চোখমুখ কুঁচকে একাকার হয়ে আছে ছেলেটির। সে কি বেহাল দশা! মধুমিতা ঝাড়ু হাতে কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“তোর এত সমস্যা কেন ইন্দুর বিয়ে নিয়ে?”
–“ঐ ছেলে ভালো না খারাপ তা না জেনেই, ইন্দু বিয়েতে রাজী হলো কেন মামনি?”, মোত্তাকিন বেশ গুরুগম্ভীর গলায় বলল। মধুমিতা তার কথা পাত্তা না দিয়ে বলল,
–“সিদ্দিকী ভাইজান খোঁজ নিয়েছে ছেলের ব্যপারে। তারপরেই তারা রাজী হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ছেলে অন্তত তোর মত কু’লা’ঙ্গা’র না!”
–“কথায় কথায় আমার সাথে সবার তুলনা দাও কেন তোমরা?”
–“কারণ আমার তোর থেকে অনেক প্রত্যাশা ছিল, বাবু! কিন্তু তা তুই পায়ে পিষে ফেলেছিস।”, থমথমে মুখে বলে মধুমিতা ঘরে ঢোকে। মোত্তাকিন মায়ের পিছু পিছু ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করে,
–“কেমন প্রত্যাশার কথা বলছো তুমি?”
মধুমিতা চলতে চলতে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বলল,
–“তুই একটু জাতের ছেলে হলে ইন্দুকে তোর জন্য আমি বউ করে আনতাম।”
মায়ের আশ্চর্য রকমের অকল্পনীয় এই কথায় মোত্তাকিন বিস্মিত হয়ে গেল। চলতে থাকা পা থামিয়ে উপচে পড়া আগ্রহ নিয়ে বলল,
–“এটা তো বেশ ভালো কথা বলেছ, মামনি। এই কথা আমার মাথায় কোনদিন আসেনি কেন? তা প্রত্যাশা হারিয়ে ফেললে কেন? খারাপ লাগছে না তো শুনতে।”
মধুমিতা কপাল কুঁচকে তাকায় ছেলের পানে। তিরস্কারের সাথে বলে,
–“তোর মত অপদার্থের জন্য আমি ইন্দুর মত লক্ষ্মী মেয়েকে এনে মাটিচাপা দেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারি না, বাবু!”
মোত্তাকিন ব্যর্থ জীবনের সবচেয়ে হতাশাজনক নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“তোমার মত মা আমার শত্রুর ও না জুটুক, মামনি।”
–“কিন্তু তোর মত ছেলে যেন আমার শত্রুর জুটুক। তাহলে বুঝবে আমার কত কষ্ট!”
–“আমি তোমার একমাত্র শত্রুর-ই ছেলে, মামনি।”, মোত্তাকিন বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল। মধুমিতা সরব ঘাড় ঘুরিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকায়। মোত্তাকিন মায়ের দৃষ্টি দেখে ভ্রু নাচায়। মধুমিতা গমগমে স্বরে বলে,
–“তার কোন কথা যেন আর মুখে না আসে।”
–“তার কথা আমার মুখে না-ই বা আসলো কিন্তু সে আমার বারান্দায় এসে ঠিকই দাঁড়িয়েছে।”
মধুমিতা কপাল কুঁচকে নেয় ছেলের বিভ্রান্তিকর কথায়। তার বিভ্রান্তি মিলিয়ে গেল নিজস্ব ফোনটি বেজে উঠতেই। সেই চিরচেনা ঘৃণিত নাম্বারটি। মোত্তাকিন মায়ের উতরে যাওয়া মুখ দেখে হাসতে হাসতে চলে যায়। মধুমিতা নির্বিকার ছেলের ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালে রোজকার মত ঘৃণাভরা মুখটি ভেসে ওঠে। কানের কাছে ঠেকিয়ে রাখা ফোনটিতে ভেসে আসলো উদাসীন কণ্ঠ।
–“আমার আয়ু ফুরাবার তরে কিন্তু তোমার অভিমান যেন আজো সেই সদ্য জন্মানো অভিমানের ন্যায় অমলিন আর প্রবল।”
মধুমিতা জবাব দেয়না শুধু তাকিয়ে থাকে অমানিশায়, কোন এক অলক্ষ্যে! তবুও ঐ মুখটির দিকে দৃষ্টি রাখে না।
আজ বহুদিন বাদ মধু আর বাবা ব্যতীত কেউ ঘন্টা সময় নিয়ে ইন্দুবালার সাথে কথা বলেছে, হেসেছে, একটা নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনেছে। যেখানে ছোট ছোট বাসন থেকে বিশাল বাড়ি কেনার স্বপ্ন বুনেছে। সেখানে থাকবে তাদের ছোট ছোট অংশ, যারা তাদের অংশ হবে। কালো মেয়েটি জীবনে প্রথমবার লাজে রাঙা হয়। কালচে বরণটুকু অদ্ভুত উজ্জ্বলতার সাথে চকচক করতে লাগলো। যেই জীবনে সবাই শুধু তিরস্কার করত—এত কালো মেয়েকে কে বিয়ে করবে? সেই জীবনে এমন একজন মানুষ এসেছে যে কি-না তার সাথে গোটা এক সংসার জীবনের স্বপ্ন বুনছে। ইন্দুবালার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে এই অনুভূতি গুলো! কেউ তার মত কালো মেয়েকে নিয়ে কি করে এত মধুর স্বপ্ন দেখতে পারে? তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো কি তবে? না-কি আবার কোন ঝড়ের সাথে মিলিয়ে যাবে সৌভাগ্যের ময়ূখ দ্যুতি?
ঘড়িতে তখন একটা বেজে আটান্ন মিনিট! ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ বন্ধ করে ইন্দুবালা মিহি স্বরে বলল,
–“ঘুমাই?”
অপরপ্রান্তের মানুষটা হেসে ফেলল। হাসির রেশ ধরেই বলে,
–“গোটা এক জীবনের স্বপ্নের কথা শুনেই ক্লান্ত হয়ে গেলেন অথচ আমার সাথে এই গোটা সংসার জীবনটা আপনাকে পাড়ি দিতে হবে ইন্দুবালা ! ক্লান্ত হলে চলবে না, আমার আপনাকে ভীষণ প্রয়োজন!”
ইন্দুবালা স্মিত হাসলো। মিহি স্বরে বলল,
–“ক্লান্ত হচ্ছি না, শুধু স্বপ্ন বুনতে ভয় পাচ্ছি। যদি সবটা দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়?”
–“আপনার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন সবটা এখন থেকে আমি জুড়েই হবো, ইন্দুবালা! চিন্তা করবেন না আমি আপনার পিছু ছাড়ছি না। সেই প্রথমদিন থেকে আপনাকে একনজর দেখা আমার রুটিন হয়ে গিয়েছে।”
পরপরই সে বলল,
–“আচ্ছা, এখন তবে ঘুমান। কাল তো স্কুল আছে। আমি আপনার বাবার সাথে কথা বলেছি ইন্দুবালা। কাল আমি আপনাকে নিয়ে যাব স্কুলে আবার বাড়িতে দিয়ে যাব।”
–“এগুলোর কোন প্রয়োজন নেই, সমির।”, ইন্দুবালা দ্বিরুক্তি করে বলল। সমির বাঁধা দেয়।
–“বাঁধা দেবেন না ইন্দুবালা। এখন থেকে আপনি আর আপনি জুড়ে সবকিছুতে আমি থাকব। আর শিঘ্রই আপনাকে আমার কাছে নিয়ে আসব। কাল আপনার বাবার সাথে আলোচনায় বসব।”
–“এতো তাড়াহুড়ো কেন?”
–“আপনাকে নিজের করার আমার ভীষণ তাড়া ইন্দুবালা। আপনি ছাড়া আমার কাজ আর পেট একটাও চলবে না।”
–“মানে?”, ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে শুধায়। সমির হেসে বলে,
–“কাজে মন বসাতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আপনার অভিমানী মুখ; খেতে বসলেই মনে হয়, কবে ইন্দুবালার হাতের সুস্বাদু রান্না! এ নিঃসঙ্গ জীবন বড্ড বেদনাদায়ক।”
ইন্দুবালা শুষ্ক মুখে হাসি ফুটলো খানিক। এগুলো শুনতে কেমন অদ্ভুত লাগে তার। হয়তো জীবনে কোনদিন এহেন অপ্রত্যাশিত কথা না শোনার অভ্যাস তীব্র! সে প্রত্যুত্তর করে না। হুট করে আগমনী এই প্রেমময় মানুষ আর তার ফোনালাপে সে বড্ডো অপ্রস্তুত হয়! আবেগী কথাবার্তা যেন কোন ছল মনে হয়। অথচ সম্মুখের মানুষটি তার জীবনসঙ্গী হতে যাচ্ছে। মনকে স্থির করতে চায় ইন্দুবালা।
দীর্ঘ ফোনালাপের চ্ছেদ ঘটিয়ে যখন একটু ঘুমানোর জন্য চোখ বুজলে পুনরায় ফোনটি বেজে উঠল। ইন্দুবালার ইচ্ছে হলো ফোনটাকে ছুঁড়ে মারতে। আননোন নাম্বার! সে রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই ভেসে আসে ত্যাড়া আদেশ মিশ্রিত কণ্ঠ।
–“এই বেয়াদব মেয়ে! তুই বিয়ে করিস না। না করে দে তাড়াতাড়ি!”
ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
–“কেন?
মোত্তাকিন উদ্বেগের সাথে বলে,
–“আরে কেন মানে, বিয়ে করলে দূরে চলে যেতে হবে, সংসার করতে হবে আবার বাচ্চা কাচ্চাও হবে।”
–“তো?”
–তো মানে?
–“বিয়ে করলে দূরে চলে যেতে হবে, সংসার করতে হবে, বাচ্চা কাচ্চা হবে এটাই স্বাভাবিক!”
–“ছিঃ তুই একদিনে এত খারাপ হয়ে গেলি কি করে ইন্দু? তোর মুখে বাঁধল না এগুলো বলতে? তুই জানিস না বাচ্চা কিভাবে হয়?”, মোত্তাকিনের বিস্ময় ভরা কণ্ঠ।
অপরপ্রান্ত থেকে বিরক্তি মাখা ত্যাক্ত নিঃশ্বাসের ক্ষীণ শব্দ শোনাগেল। এরপর আর কোন শব্দ শোনাগেল না। মোত্তাকিন হতবাক হয়ে যায় কেটে দেয়া ফোনটি দেখে। অভদ্র মেয়েটা তার ফোন কেটে দিয়েছে। মোত্তাকিন ডিসকানেক্টেড ফোনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
–“বাহ্! বিয়ে ঠিক হতে না হতেই এতো উপেক্ষা! বিয়ে হলে নিশ্চিত আর ওকে ভাগে পাওয়া যাবে না।”
সে রাতটুকু অজানা অস্থিরতার টানাপোড়েনে কাটিয়ে দিলো মোত্তাকিন। আকস্মিকতা হজম করতে তার বেজায় বিড়ম্বনা!
*****
–“ইন্দু, তাড়াতাড়ি এসো; ছেলেটাকে বসিয়ে রেখো না। ওর অফিস আছে।”
বাবার পুনশ্চঃ তলবে ইন্দুবালা তড়িঘড়ি করে শাড়ির আঁচলটা টেনেটুনে আরেকটু ঠিক করল। আরশিতে নিজেকে শেষবারের মতো ভালোকরে দেখে নেয়। কোথাও কোন খুঁত আছে কি? নাকি অতিরঞ্জিত লাগছে। চোখেমুখে তার দ্বিধা! কেননা আজ প্রথমবার সে বাবা আর মোত্তাকিন ব্যতীত কোন পুরুষের সঙ্গে বাইরে বের হচ্ছে! সে একটু সেজেছেও! সাজ বলতে ঐ একটা নতুন শাড়ি আর খোঁপায় গুঁজেছে একটা সাদা গোলাপ। এটাই বোধহয় অতিরঞ্জিত হয়ে গিয়েছে। পড়শী ছেলেটা যে বলে, তার খোঁপায় ফুল বড্ডো শোভা পায়! তাই দিয়েছিল।
–“ইন্দু!”
–“আসছি আব্বু।”, ইন্দুবালা হাঁক ছেড়ে বলেই কাঁধের ব্যগটা নিয়ে ছুটে বের হয়। সমির বাইক নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে গেট থেকে বের হতেই হুট করে অতিপরিচিত একটি বাইক এসে তার পথ রোধ করে। মোত্তাকিন গাল ভরে হেসে ব্যকসিটে ইশারা করে বলল,
–“উঠে বস, স্কুলে দিয়ে আসি।”
ইন্দুবালা চোখমুখের উজ্জ্বলতা লুকিয়ে নিয়ে থমথমে মুখে বলল,
–“নিজের মাকে গিয়ে একটু স্কুলে দিয়ে আয়। আমার সাথে ফাজলামি করবি না।”
–“তোকে স্কুলে দিয়ে আসতে চাচ্ছি তা ফাজলামি হয়ে গেল?”
ইন্দুবালা জবাব দিতে পারল না তার আগেই সমিরের বাইকটি এসে থামলো তার ঠিক পাশে। সমির এসেই ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
–“এত দেরি হলো কেন ইন্দুবালা? তাড়াতাড়ি আসুন, আমি কতক্ষন ধরে অপেক্ষা করছি।”
সমির বলতে বলতেই মোত্তাকিনের দিকে দৃষ্টি রাখে। ইন্দুবালার কুঁচকানো মুখের দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–“উনি কে ইন্দুবালা?”
ইন্দুবালা মোত্তাকিনের বাইক পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে থমথমে মুখে জবাব দেয়,
–“পাড়ার পাতি গুন্ডা! চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
সমির আর ইন্দুবালা নিরবে ঝড়ের গতিতে চলে গেল। আর গেটের সামনে তখনো তব্দা হয়ে বসা
মোত্তাকিনের চোখেমুখে আশ্চর্যের রেশ! কেননা এটা সেই লোকটা যাকে সেদিন রেস্তোরাঁয় দেখেছিল। তার কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় ইন্দুবালার সদ্য বলা কথাটি। রাগে গজগজ করে উঠে নিজ মনে আওড়ালো,
–“পাতি গুন্ডা! আমি পাতি গুন্ডা?”
অতি সাধারণ এক সংবাদ মোত্তাকিনের স্বাভাবিক জীবনের গতিবিধি দারুণভাবে ব্যাহত করে দিলো।
ক্লাবে আজ আর যাওয়ার মন মানসিকতা হলো না। নিজের আড্ডার স্থানেই ঘাপটি মেরে আছে মোত্তাকিন। অন্যদিকে লাগাতার বেজে চলেছে পকেটের ফোনটি। পকেট থেকে ফোনটা বের করলে ইচ্ছে করল ফোনটা ভেঙে ফেলতে। ইনসিয়ার আঠাশটা কল। ভাইয়ের রাগান্বিত মুখ দেখে এতক্ষণ তূর্য বিড়ালের রূপ ধরে থাকলেও এবার সতর্ক কণ্ঠ খুলল।
–“কি হয়েছে ভাই এত ক্ষেপে আছেন কেন?”
মোত্তাকিনের রাগে ঘি ঢেলে দিল এতটুকু। সে তেতে উঠে বলল,
–“ক্ষেপবো না? সারাজীবনে কোনদিন প্রেম করতে দেয়নি ঐ বেয়াদব মেয়ে! মেয়ে জড়িত কোনকিছু দেখলে হয়েছে সাথে সাথে মামনির কানে দিয়ে দিত। ফেসবুকেও মেয়ে ফ্রেন্ড দেখলেই মামনিকে স্ক্রিনশট পাঠাতো। অথচ এই কুচক্রীনিকে আর ওর চোখের সামনে ডেট সে টু শব্দ অব্দি করল না। কেন তুই গিয়ে মামনিকে বলতে পারলি না? মামনির দু’টো জুতোর বারি খেতাম তবুও এটা এমন জোঁকের মত পিছে লাগতো না!”
তূর্য পুনরায় সতর্ক কণ্ঠে শুধায়
–“ভাই, ইন্দুবালা আপার কথা বলছেন?”
–“আর কার কথা বলব? ঐ একটা মেয়ে আমার জীবন ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে।”
–“কেন ভাই?”
–“এই যে অশনি আমার ঘাড়ে উঠতে দেখেও—ও কিছু বলল না। ও মামনির কাছে বলে দেবে না? বলেনি, আর এখন আবার সে নাচতে নাচতে বিয়ে করছে। সে কি খুশি! আমায় বলে, আমি না-কি পাতি গুন্ডা! আর ঐ মাদারবোর্ড কে জানিস? সেদিন যে ওর আঁচল নিজের ঘড়িতে ইচ্ছাকৃত ভাবে আটকে ছিল, সেই মাদারবোর্ড! আমার সেদিনই সন্দেহ হচ্ছিল। আমি নিশ্চিত এখানে কোন গড়মিল আছে।”
মোত্তাকিন গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে বলল। দলের সকল এবার একে অপরের দিকে তাকায়। তূর্য এবার ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“ভাই আমার মনে হয়, আপনার মনে ইন্দুবালা আপার জন্য কোন সফট কর্নার আছে।”
তূর্য পকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে রুক্ষ কণ্ঠে বলল
–“মেজাজ খারাপ করবি না। ওর জন্য আমার কোন সফট কর্নার টর্নার নেই। আমার সমস্যা শুধু আমার ওকে সবসময় এভেইলেবল চাই, যখন আমি চাইবো। আমি ফোন দিলে সাথে সাথে ধরবে, আমার বাইকে যেতে বললে যাবে। আমায় ইগনোর করতে পারবে না, আর আমার সামনে অন্য কোন মাদারবোর্ডের সাথে মিশতে পারবে না। সেখানে আজ ও ঐ মাদারবোর্ডের সাথে একসাথে বাইকে চিপকে সেজেগুজে তারপর স্কুলে গিয়েছে। মাথায় আবার ফুল ও দিয়েছে জানিস? মনে রঙ লেগেছে! মেজাজটা আবার খারাপ হচ্ছে, ওটাকে হাতের কাছে পেলে ..”
তূর্য এবার ত্যাক্ত সুরে বলল,
–“তাহলে আপনার উচিত ইন্দুবালা আপাকে নিজের বউ করে ঘরে নিয়ে আসা, ভাই। কারণ এগুলো ঘরের বউ ছাড়া আর কেউ এলাউ করবে না।”
মোত্তাকিন চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। চাপা স্বরে বলল,
–“সে চিন্তা আসার আগেই, মামনি আর সিদ্দিকী মাষ্টার সেই চিন্তায় আউট অব স্টক এর ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছে।”
–“কেন ভাই, আন্টি কি করেছে?”
মোত্তাকিন ঘাড় কাত করে তাকায় তূর্যর পানে। বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলে,
–“আমি যদি ইন্দুকে বিয়ে করার কথা বলি— তবে মামনি হবে সেই বিয়ের ভাঙানোর একমাত্র কারণ আর নিন্দুক পড়শী। উঠেপড়ে লাগবে কি করে বিয়ে ভাঙা যায়!”
–“ভাই আমার মনে হয় আন্টি আপনারে কুঁড়ায় পাইছে, নয়তো এটা কোন আসল মায়ের কাজ হইতেই পারে না।”
মোত্তাকিন গরম চোখে তাকায় ছেলেটার পানে। তারা ঝিমাচ্ছিল তখন পুনরায় মোত্তাকিনের ফোনটি বাজতে লাগলো। পারভেজ ফোন দিচ্ছে, ক্লাবে ডাকছে। মোত্তাকিনের একটুও শক্তি আর ইচ্ছে নেই কোন জায়গায় যাওয়ার। সে চুপ রইল। অন্যদিকে পারভেজ লাগাতার ফোন দিয়েই যাচ্ছে!
*****
–“সিটি মেয়রের কি এমন দ্বায় বদ্ধতা থাকবে যে—সে তার সারাদিনের কাজকর্ম ছেড়ে তোকে জেল থেকে ছাড়ানোর পেছনে ছুটবে? এটা আমায় একটু পরিষ্কার করে বল!”
ক্লাবের হরেক রকমের লাল নীল সবুজ রঙের চোখ জ্বালানো আবছা আলোর মাঝে রমরমা মজলিসে আড্ডায় মগ্ন তপন সতর্ক দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞাসা করলো। প্রত্যেকের ধ্যান গিয়ে পড়ল সিগারেটে সুখটান দিতে থাকা মোত্তাকিনের উপর। তবে তার মাঝে কোন উদ্বেগ দেখাগেল না এহেন প্রশ্নে। সে আধভাঙা সোফায় হেলান দিয়ে সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে নিরবে। দিনে না আসলেও রাতে আসে ক্লাবে।
–“এখন এটা বলিস না—যে এটা কাকতালীয়!”, তপন পুনরায় বলল।
–“কোন কাকতালীয় টাকতালীয় না। আমি তার ছেলেকে বাঁচিয়েছি, সে আমায় বাঁচিয়েছে, ব্যস! মামলা ক্লিয়ার, আর কিছু শুনতে চাস?”, মোত্তাকিন তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বলল।
–“আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু সিটি মেয়রের ছেলেকে তুই কেন বাঁচাতে গেলি এই প্রশ্নের উত্তর দে আগে।”, পারভেজ এবার বেশ গুরুগম্ভীর হয়ে শুধায়। সেদিন-ই তার খটকা লেগেছিল, মিরসাদ ইরতেজাকে মারার কথা শুনে ছেলেটা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
মোত্তাকিনের চোখেমুখে অস্বস্তি, রাগ, বিতৃষ্ণা ছড়িয়ে যেতে লাগলো অচিরেই। তবুও অভিব্যক্তি দমন করে শান্ত স্বরে বলল,
–“তাকে মারার কোন যৌক্তিকতা আমি দেখি না। যেই মানুষটা রাজনীতির চারিধারেও নেই তাকে কেন এই বিষয়ে জোরপূর্বক টেনে মারা হবে? বউ বাচ্চা আছে, বিনা দোষে কাউকে আমি কখনো মারিনি আর না মারতে দেখতে পারি।”
মোত্তাকিন বেশ ধৈর্য্য সমেত জবাব দিলেও মজলিসে সেই জবাব মোটেই গ্রহণযোগ্যতা পেল না। তপন সিগারেটে ঠোঁট চেপে ডানে বামে মাথা নেড়ে বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“তুই কি লুকাচ্ছিস? তোর নামের শেষে ‘ইরতেজা’ নাম আর তোর এই কর্মকাণ্ড অন্য কিছু নির্দেশ করে। তোর কি সত্যিই তাদের সাথে কোন কানেকশন নেই?”
–“এসেছি থেকে এগুলো নিয়ে পিছে পড়ে আছিস কেন? এগুলোর জন্য ডাকছিলি? আমার যদি কোন কানেকশন থেকেও থাকে তবে তোদের কি? তোরা তোদের কাজ কর, আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাবি না।”, মোত্তাকিন গর্জে উঠল। তপন তার গর্জনে পাল্টা শান্ত স্বরে বলল,
–“ব্যক্তিগত আদৌ আছে? তোর দ্বন্দ্ব আমাদের সকলকে শত্রুপক্ষ বানিয়ে দিয়েছে উত্তরের সিটি মেয়রের। তাই সোজাসাপ্টা জিজ্ঞাসা করছি মুহিত ইরতেজার সাথে তোর কি সম্পর্ক? নাকি তোর মা তার অঘোষিত প্রেমিকা আর তুই তার অবৈধ সন্তান? এর জন্যই কি তোর মা একা থাকে?”
তপনের কথা শেষ হতে দেরি আছে কিন্তু মোত্তাকিনের তাকে আঘাত করতে দেরি লাগলো না। সবেগে ঘুষির আঘাতে তপন আধভাঙা সোফা ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মোত্তাকিন উন্মত্ত ষাঁড়ের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। ক্ষিপ্র হাতে কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
–“আমি মোটেই পছন্দ করিনা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। সেখানে তুই আমার মাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলার সাহস কই পাস কু**বা**?”
বলেই ঝপাঝপ আরো দুই চারটা ঘুষি মেরে দিলো তপনের মুখ বরাবর। তপন তখন রক্তাক্ত বিধ্বস্ত মুখে অচেতন হওয়ার পথে। পারভেজ, তূর্য সহ সকলে মোত্তাকিনকে জোরপূর্বক টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। মোত্তাকিন তখনো রাগে গর্জে যাচ্ছে!
–“আমার সাথে তোদের সম্পর্ক শুধু দল আর কাজ নিয়ে , আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে যেন আর কোনদিন নাক গলাতে না দেখি!”
সময় অতিবাহিত আপন গতিতে। ফারাক শুধু কারোর সময় যায় তার অনুকূলে আর কারোর সময় যায় তার প্রতিকূলে। মোত্তাকিনের সময় ও তার প্রতিকূলে যাচ্ছে অথচ সে জানেই না তার এই প্রতিকূলতার আসল কারণ!
পুরো আবাসিক এলাকাজুড়ে অন্ধকার! কারেন্ট গিয়েছে মিনিট পাঁচ হবে। বারান্দার চাপিয়ে রাখা জানালাটা এক টোকা দিতেই খুলে গেল। শিক ভেদ করে ঘরের ভেতর দৃষ্টি রাখলে চন্দ্র স্নানরত এক পরিপূর্ণ নারী অবয়ব ভেসে উঠল। ক্রুব্ধ, অস্থির দৃষ্টিতে জড়তা ছুঁয়ে সুতির শাড়ি আবৃত আধো উন্মুক্ত নারী বদন দেখে। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সন্তপর্ণে! কালো আর ফর্সা— নারী তো নারী! বরাবরের ন্যায় আবেদনময়ী এক সত্ত্বা! বিব্রত দৃষ্টি সরিয়ে সে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“অশ্লীল! শাড়ি পড়ে ঘুমাচ্ছে।”
পরমুহূর্তেই তার চোখদুটো ফের ধপ করে জ্বলে উঠল মায়ের কথা মনে পড়তেই। সংসার করবে, বাচ্চা হবে—তারমানে ঐ মাদারবোর্ডের সাথেও এমন থাকবে? বক্ষস্থল অস্থির হয়ে পড়ল। সে পা গুটিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয় দেয়ালে। আকাশপানে দৃষ্টি রেখে বারান্দার দরজায় টোকা দেয়।
–“এই বেয়াদব মেয়ে দরজা খোল!”
নম্র কণ্ঠে কোন সাড়াশব্দ আসলো না। এই পর্যায়ে সে খেকিয়ে উঠল। ইন্দুবালা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। আওয়াজে বুঝতে বাকি থাকে না, কে ডাকছে? সে এলোমেলো বস্ত্র ঠিক করে ঘুম জড়ানো নেত্র মেলে বিছানা ছেড়ে নামে। শঙ্কিত মনে বারান্দার দরজা খুললে বারান্দায় উদাসীন চিত্তে বসা শান্ত ছেলেটিকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। অশান্ত ছেলেটির শান্ত রূপ তার হজম হয় না। রুক্ষ স্বরে শুধায়,
–“এখানে কি করছিস? কখন এসেছিস?”
মোত্তাকিন জবাব দেয় না, নিজের পাশে মেঝেতে হাত চাপড়ে বলল,
–“বস!”
ইন্দুবালা চোখমুখ কুঁচকে বলল,
–“তুই কোন কাজ করতে পারিস না, মোত্তাকিন? এসব কি হ্যাঁ? আমি এখন বসব কেন এখানে? রাত বাজে কয়টা? জীবনযাপনের একটা নিয়ম শৃঙ্খলা তো আছে?”
–“বসতে বলেছি।”, গমগমে স্বরে ইন্দুবালা হাল ছেড়ে পা গুটিয়ে বসে ঠিক তার থেকে এক হাত দূরত্বে। পরমুহুর্তগুলো বড্ডো নিরব নিরর্থক কাটে ইন্দুবালার জন্য। ছেলেটা নিরবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের সর্বোচ্চ সৌন্দর্যের অধিকারী চাঁদের পানে। সে ঘুমে ঢুলুঢুলু ঝিমুতে লাগলো। মোত্তাকিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মেয়েটির পানে। চাঁদের আলোয় দারুণ মায়াময় লাগে মেয়েটিকে। মেয়েটির গায়ের বরণটাই শুধু পোড়া! বাকি যে ছোট ছোট সৌন্দর্যগুলো তা কারোর চোখে পড়ে না। এইযে টানা টানা বৃহৎ দু’চোখ ঘন কালো পল্লবে ঘিরে আছে। টোল পড়া গালের হাসি, গজ দাঁত, খাঁড়া খাঁড়া নাক আর ঐ লম্বা কালো কুচকুচে কেশ! সৌন্দর্য বলতে এর থেকে অধিক কিছু সে বোঝে না। অথচ মানুষের চোখে গায়ের রঙ ব্যতীত কিছু চোখে বাঁধে না। মেয়েটিকে অজশ্রবারের জন্য নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে করতেই মোত্তাকিন অনৈতিক আবদারের সুরে বলে,
–“বিয়ে করার কি প্রয়োজন? না করলে হয় না?”
ছেলেটির উদাসীন কণ্ঠে আকাশপানে চেয়ে ঝিমাতে থাকা ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। অনমনীয় কণ্ঠে শুধায়,
–“কেনো? আমার বিয়ে করা, না করা নিয়ে তোর এতো মাথা ব্যথা কেনো?”
–“তোর বারান্দা থেকে কেউ যদি একটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়—তবে তোর ভালো লাগবে?”
–“ঠ্যাং ভেঙে দেব তার।”, ইন্দুবালা সরব রুক্ষ কণ্ঠে বলল।
–“আমারো ইচ্ছে করে তোর হবু বরের ঠ্যাং ভেঙে দিতে।”, ছেলেটির গা ছাড়া কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তায়
মেয়েটির ললাটে অজশ্র ভাঁজ পড়লো। অস্ফুট স্বরে শুধায়,
–“আমি কি তোর বাগানের ফুল?”
এযাত্রায় মোত্তাকিন নিরব হয়ে গেল জবাব বিহীন প্রশ্নে। কিয়ৎকাল বাদ অবুঝ কণ্ঠে বলল,
–“জানিনা শুধু ইচ্ছে করে তোর হবু বরের হাত পা ভেঙে কোন আঁস্তাকুড়ে ফেলে আসি।”
–“গুন্ডা!”, ইন্দুবালা কপট রেগে আওড়ায়।
~চলবে~

