ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব- ২১

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ২১

আবদুল আজিজ সারেং বাড়িতে পা রাখলো অনেকটা বছর পরে। অনেক মানে প্রায় চৌদ্দ, পনেরো বছর তো হবেই। তখন অবশ্য সারেং বাড়ি এমন ছিল না। এখন বলতে গেলে অনেকটা বদলে গেছে। বদলে গেছে সম্পর্ক, বদলেছে মানুষ, বদলেছে চেনা মুখের আদলে অচেনা মুখোশ।

আজিজের কথা শুনেই জাফর দৌড়ে বেরুলো। বেরিয়ে জড়িয়ে ধরলো। আজিজ হাসলো! প্রাণ খোলা মনের হাসি। এই হাসিতে কোন খাদ নেই, কোন ভেজাল নেই। কেননা মানুষের মুখের হাসির অনেক রুপ আছে, রং আছে। একটা মানুষের মুখের হাসিই বলে দেয়, সামনে দাঁড়ানো মানুষটা তার জন্য কতোটা গুরুত্ব, কতোটা ভালোবাসার, কতোটা স্নেহের। তাই জাফরও বুঝে অনায়াসে’ই, এই যে মানুষটা, তার হৃদয়ে সে কতোটা জড়িয়ে আছে।

আজিজ হেসে নিজেও এক হাতে জড়িয়ে ধরলো। তার জোছনা ফুপুর ছেলে। মায়ের পরে যদি আজিজের কারো জন্য মন পুড়ে সেটা ছিল জোছনা ফুপু। সেই ফুপুর ছেলে জাফর। তাকে দেখলেই তার মনে হয় জোছনা ফুপুকে দেখছে। অথচ ছেলেটা মায়ের ছিটেফোঁটাও পায়নি।

জয়তুন চুপচাপ’ই দুই ভাইয়ের গলাগলি দেখলো। নতুন কি? এদের লেপটা লেপটি চলতেই থাকে। চোখে গিয়ে না দেখুক, কানে সবই আসে। তাই তার তেমন ভাবান্তর হলো না। বরং সে হাক ছেঁড়ে আম্বিয়াকে ডেকে বললো, — ওই আম্বিয়া বাড়িতে কুটুম আইছে, নাস্তা পানির ব্যবস্থা কর। আর নয়া বউরে শরবত দিয়া পাঠা। এ তো আবার মহাজনের মহব্বতের মানুষ। দেখা না করাইলে আবার গ্রামে সালিশ বসিয়ে বলবে, ” আমরা নাত বউরে চৌদ্দ শিকের ভেতরে আটকে রেখেছি”।

আজিজ হাসলো! হেসে বললো, — আপনাদের নাত বউ। এখন চৌদ্দ শিকের ভেতরে রাখবেন, না মাথায় তুলবেন সেটা আপনাদের বিষয়। এখানে কি আর মহব্বতের মানুষদের নাক গলানো চলো?

জয়তুনও তার মতোই বললো, — সেটা সময় বলবে। তো দাঁড়ায় আছো ক্যা? বসো বাপু। ভাইয়ের গলা ধরেই বসো। হাজার হলেও মায়ের রক্ত। আমরা যতোই বুকে তুলে রাখি। মায়ের গন্ধতো মুছতে পারবো না।

জাফরও হাসলো! মহব্বতের ক্ষেত্রে জয়তুন আরার বড়’ই হিংসে। তার যেগুলো সেগুলো তার’ই। অবশ্য জাফরকে কখনোও কোন কিছু বলেনি। তবুও আজিজ ভাইয়ের সাথে এই ঘনিষ্ঠতা তার চোখের বালি’ই। তাই আজ সুযোগ পেয়েছে খোঁচা দিতে হাত ছাড়া করবে কেন? সে হেসেই আজিজকে ধরেই এগিয়ে বসালো। বসে নিজেও বসলো। অবশ্য এতো দিন পরে আজিজ ভাই কেন এখানে এসেছে সে জানে না।

আজিজ আরাম করেই জয়তুনের সামনে বসলো। সামনা সামনি দেখা হয় না অনেকটা দিন। এক গ্রামে থাকলেও আজিজ এদিকে আসেনা, জয়তুনও বাড়ি থেকে বেরোয় না। তাই সবার সাথে দেখা সাক্ষাত হলেও, জয়তুন আরার সামনে আসা হয় না। বয়স হয়েছে, শরীর পড়ে গেছে। তবে কণ্ঠে তেজ যেন সেই আগের মতোই। সে হেসে তার স্বভাব মতে কোমল সুরে বললো, — ভালো আছেন বড় ফুপু?

জয়তুন আবার হাসলো! না কোন খাদ, ভেজাল, হিংসের হাসি না। বরং মনের হাসি। তার আর জোছনার বয়সের ফারাক আছে। আছে মানে অনেকটাই আছে। বিয়ে হয়েছে, সংসার করেছে। দেখতে দেখতে বছর পেরিয়েছে তবে কোল ভরে নি। বলতে গেলে একেবারে শেষ সময়’ই বাবা, মার মুখের দিকে তাকিয়ে আলতাফ দ্বিতীয় বিয়ের সম্মতি দিয়েছিল।

জোছনার তখন সবে মাত্র চৌদ্দ নাকি পনেরো। বিয়ের সব করেছে তার শ্বশুর- শাশুড়ি। তারা রুপ খুঁজেনি, খুঁত দেখেনি। দেখেছে শুধু বংশের বাতি দিতে পারে এমন একজন। জোছনা সেই রকম’ই ছিল। শান্ত, কোমল। তাকে ডাকতো বড় বুবু বলে। আর এই যে আজিজ সে তো ফুপুর আঁচল ধরে ঘুরতো। নিজের বাড়ির খবরও থাকতো না। দিন রাত সারেং বাড়িতেই। কতো মানুষ দুষ্টুমি করে কতো কিছু বলতো। তবে সে নির্বিকার। সে তো তার ফুপুর সাথেই থাকবে। জোছনাও ছিলো তেমন। এই ভাইয়ের ছেলে’ই তার সখী। দিন নেই, রাত নেই গুটুরগু। আলতাফ তো সাদা দিলের মানুষ। তাই সেও সবাইকে বলে দিয়েছিল, — তার যখন খুশি আসুক, যাক। কেউ যেন তাকে কিছু না বলে।

কেউ বলতোও না। কার এমন ঠেকা। সে তার ফুপুর সাথে জোঁকের মতো লেগে থাকতো। এই বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতো। তাকে দেখলে ডাকতো, বড় ফুপু বলে। জোছনা তার প্রিয় ফুপু। প্রিয় ফুপুর বড় বুবু, তার বড় ফুপু। আর জয়তুন, সে তো ভালোবাসার কাঙ্গাল। কেউ তাকে ভালোবেসে ডাকবে, আর সে মুখ ঘুরিয়ে থেকেছে এমন ঘটনা জয়তুন আরার এই দীর্ঘ জীবনে ঘটেনি।

সে হেসেই বললো, — বড় ফুপুরে চেনছো তাহলে। আমি তো ভাবলাম দিক ভুলে সারেং বাড়িত আইছ।

— আমি দুনিয়ার সব ভুলতে পারি বড় ফুপু। তবে এই বাড়ি না।

— তো এতোদিন এদিকে পা পড়লো না কেন?

— সেটা আপনি ভালো করেই জানেন।

— আমরা বুঝি কিছু না। যার সময় হইছে গেছে। আমরা, আমাদের বাড়ি কি দোষ করলো?

আজিজ শান্ত চোখেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। একেবারে শান্ত, নিশ্চুপ। তারপর বললো, — কষ্ট হয় বড় ফুপু, তাই আসি না।

— বুঝি, বুঝি! সবই বুঝি। চুলতো আর বাতাসে পাকে নাই। তা কি মনে কইরা?

আজিজ হাসলো! হেসে দরজা দিকে তাকিয়ে ডাকলো, আক্কাস।

ডাকতে দেরি আক্কাসের ভেতরে আসতে দেরি হয়নি। সে একা আসে নি। সাথে এসেছে আরো তিন চার জন।সবার দু’ হাত ভরে মিষ্টি, ফল থেকে দুনিয়ার কিছু । জাফর, জয়তুন দু’জনেই অবাক হয়ে তাকালো। জয়তুন তো চোখ, মুখ কপালে তুলে বললো, — ওরে বাবা! এসব কি রে আজিজ?

আজিজ আগের মতোই হেসে বললো, — আমার ছেলের জন্য আপনার নাতনিকে চাইতে এসেছি বড় ফুপু। খালি হাতে আসি কেমনে?

তখনই ঠাস করে এক শব্দ হলো। তারা সবাই সাইডে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। বীণা চোখে, মুখে বিস্ময় নিয়ে, হা করে তাকিয়ে আছে। পায়ের কাছে শরবতের ট্রে। যেগুলো বর্তমানে ভেঙে চুরে মাখামাখি হয়ে আছে। তার পাশেই আয়না। তার মুখের অবস্থা আরো খারাপ। কারণ, সে কিছু করেনি’ই। আম্বিয়াবুবু তার হাতেই শরবতের ট্রে দিয়েছিল। তখনি কোথা থেকে এই মেয়ে দৌড়ে এলো। সারেং বাড়ির সবাই তার চোখের বিষ। তবুও এই মেয়েটা ভালো। এসেছে পর থেকে কি সুন্দর আপন করে নিয়েছে।

তাই দৌড়ে এসেই হাত থেকে ট্রে টেনে নিতে নিতে বললো, — সারা দিন তো জ্বরে বেঁহুশ ছিলে। কোন দরকার নেই নেওয়ার। আমার কাছে দাও। বলেই নিয়ে নিলো। নিয়ে হাসি মুখেই নেচে নেচে এগুলো। হঠাৎ করে কি হলো, কে জানে? থমকে দাঁড়িয়ে গেলো, শুধু কি গেলো। ট্রেও ছেড়ে দিলো। এখন না সবাই আবার তার ঘাড়ে’ই দোষ ফেলে।

জয়তুন বিরক্ত মাখা সুরে বললো, — একটা কাজও যদি ঠিকমতো পারিস। সর, সর ওখান থেকে। ও নয়া বউ, দেখতো পায়ে লাগছে নি।

আয়না আস্তে করেই দু’পাশে মাথা নাড়ালো। পায়ে পড়েনি, তবে মাখামাখি হয়েছে। সেই মাখামাখি নিয়েই বীণা দৌড়ে রুমের দিকে গেলো। না লজ্জায় না, তার মাথা ঘুরছে। বিয়ে! তাও আবার ফরহাদ ভাইকে? এই কথা কি তার কানে গেছে? আল্লাহ!

আয়না কি করবে বুঝতে পারলো না। তার দিন গেছে জ্বরের ঘোরে। এইতো দুপুরের পরে একটু মাথাটা ঠিক লাগছে। ডাক্তার এসেছিল, মাথার ব্যান্ডের বদলেছে, নতুন করে কিছু ঔষুধ দিয়েছে। সেগুলো খেতেই একটু ভালো লাগছে।

জয়তুন আবার সোজা বসতে বসতে বললো, — সঙের মতো দাঁড়ায় আছো ক্যা। যাও, এগুলো পরিষ্কার করতে বলো, নতুন করে শরবত আনো। আর হ্যাঁ, কালামরে মুরগি ধরতে বলো, মান্নারে নদীরে ঘাটে পাঠাও। কতলা, বোয়াল কিছু মেলে কি না দেখুক। কুটুম রাতের খাবার আমাদের সাথে’ই খাইবো।

আজিজ ঠোঁট টিপে হাসলো, হেসে বললো, — এসবের দরকার নেই বড় ফুপু। কথা বার্তা ঠিক হোক, তার পরে না হয় সব হবে।

— কথা বার্তার জায়গায় কথা বার্তা। সেখানের সাথে খাবারের সম্পর্ক কি? আসছো সাঁঝ বিয়ানে। দু’হাত ভরে জিনিস নিয়ে। জয়তুন পিছিয়ে থাকবে কেন? আর তাছাড়া নাতনি চাইতে আইছো ভালো কথা। তবে ছেলে তো উড়ু উড়ু। না ফরহাদরে আমি খারাপ বলছি না। বরং ভালো ছেলে। দেখতে সুন্দর, নাম ভালো, কামও ভালো। খারাপ কোন কিছুর অভ্যাস তার নেই। তবে এর আগেও তো দু”বার বিয়ে ঠিক করলা। হইছে বিয়ে?

— এর আগে ঠিক করেছি বড় ফুপু, তবে এবার সোজা বিয়ে করাবো।

— তা তোমার ছেলে, করাতেই পারো। তবে আমার নাতনি ভাসাইয়া তো দিতে পারি না। মাইয়া দেখলেই তো ছ্যাত কইরা উঠে। আমার নাতনি ভাই আমার বড় প্রিয়।

— প্রিয় বলেই তো চাচ্ছি বড় ফুপু। বলেই আজিজ ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো।

জয়তুন ভ্রু কুঁচকে বললো, — কি কইবার চাও?

— আমি কিছুই বলতে চাই না বড় ফুপু। আমি আমার ছেলেকে চিনি। আমার মুখের কথার উর্ধ্বে সে যাবে না। শুধু চাই আমার জোছনা ফুপুর পরিবারের সাথে একটু জুড়ে থাকতে। তাছাড়া মেয়ে হইয়ে জন্মাইছে, আগে পরে বিয়ে তো দেবেন’ই। তবে সেটা ভাগ্য কোথায় নিয়ে ফালায় ঠিক আছে। ছেলে কেমন হইবো সেটারও তো ঠিক নাই। তবে একমাত্র নাতনি আপনার, চোখের সামনে থাকলো। যখন মন চাইলো আইলো, গেলো। আমার বাড়ি কি পরের বাড়ি? সে এই বাড়িতে যেমন , সেই বাড়িতেও তেমন। তবে অন্য কোথাও গেলে, এই রকম হইবো না আপনি ভালো করেই জানেন বড় ফুপু। যতো আদরের’ই হোক! বাড়ির বউ পরের মেয়ে’ই।

জয়তুন নিশ্চুপ বসলো! কথা ফালাইনা না। বসে জাফরের দিকে তাকালো। সে বসে আছে চোখ, মুখ অন্ধকার করে। সে এমন’ই! কিছু পছন্দ না হলে, এভাবেই বসে থাকে। আর এই বিয়ের প্রস্তাব তার পছন্দ হয়নি। জয়তুন ঠোঁট টিপে হেসে বললো, — ওমা জাফর, চোখ মুখ অন্ধকার কেন? প্রিয় ভাই তোমার। সেই ভাইয়ের প্রস্তাব পছন্দ হয়নি?

আজিজ হাসলো! হেসে জাফরের কাঁধে হাত রেখে বললো, — আমিতো বললাম’ই জাফর। সে এই বাড়িতে যেমন, আমার বাড়িতেও তেমন।

— সেটা আমি জানি আজিজ ভাই । তবে বীণা এবার মাধ্যমিক দেবে। তার মাথা ভালো। মেয়েটার লেখা পড়ারও খুব আগ্রহ।

জয়তুন মাছি তাড়ানোর মতো করে বললো, — মাইয়াগো আবার কিসের এতো লেখা পড়া। সেটা তো ওর খুব ইচ্ছে বলে তাই আমি পড়াচ্ছি। সেই পড়া নিয়া কোন গিট্টু ধরবি না জাফর। তাছাড়া লেখা পড়া বেশি করাইলে, মেয়েগো চোখ ফুইটা যায়। সংসারে মন টেকে না। ও যে দেখস না, নয়া মাস্টারনি। বিদ্যার জাহাজ হয়ে বসে আছে। তবে সংসার করতে পারে নাই। এখন বনে বাদারে ঘুরো। আমি বাপু আমার নাতনি নিয়া এমন কারবার করতে পারবো না। চিঠি লিখবার পারে, বাংলা, ইংরেজি পড়তে পারে। আর কতো? তাই আজিজ, তুমি প্রস্তাব রাখছো। আমি সাদা মনেই নিলাম। তবে আমি বুইঝা নেই। তারপর জানাচ্ছি।

আজিজ হেসে মাথা নাড়লো! তবে পৃথিলার কথা আসায় জাফর হাসতে পারলো না। বরং আগে চোখ, মুখ অন্ধকার হলেও এখন কঠিন হয়ে আছে। যেমনটা জাফরকে কখনোও দেখা যায় না। আর সেটা জয়তুন যেমন খেয়াল করলো, তেমনি আজিজ ও। তবে কারণ কেউ’ই অনুমান করতে পারলো না।

তখনই আয়না আবার শরবত নিয়ে এলো। আজিজ হেসে কোমল সুরে বললো, — ভালো আছিস মা। মাথার খবর কি? যন্ত্রনা কমছে?

যন্ত্রনা কমছে শুনেই আয়নার মুখ শুকিয়ে গেলো। এই শব্দটাকেই তার এখন ভয় করে। তবুও ভালো এখনো বাড়ি ফিরে নি। তার মাথায় যন্ত্রনা নেই, বলতে গেলে ভালো আছে। এসে নিশ্চয়’ই এই ভালো দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। সে শুকনো মুখেই আস্তে করে বললো, — ভালো মহাজান চাচা।

— দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বয়। মুখটা শুকনা করে রেখেছিস কেন? শোন, এই দুনিয়া যতো শক্ত হোক। মেয়েরা চাইলে সব গলাতে পারে। শক্তের সাথে শক্ত না, নরম হইতে হয় রে মা। বিয়েটাতো আর স্বাভাবিক না। এটা তোমার মানতে হইবো। মেনে বুঝে শুনে বুদ্ধি করে এগুতে হইবো।

আয়না ভ্রু কুঁচকে আজিজের দিকে তাকালো! আজিজ হাসলো। হেসে জয়তুনের দিকে তাকিয়ে বললো, — আমি ভুল বলেছি বড় ফুপু?

— না, ভুল বলবা কেন? গ্রামের মহাজন হলো গ্রামের মাথা। সে ভুল তো পুরো গ্রাম ভুল। ভালো কথা চেয়ারম্যান হঠাৎ নদীর পাড়ের ক্ষেত নিয়ে এতো ক্ষ্যাপলো ক্যা?

আজিজ ঠোঁট টিপে হালকা হেসে বললো, — আমি জানি না বড় ফুপু। সেটা আপনার চেয়ারম্যানকে’ই জিজ্ঞেস করতে হবে। তার ক্ষেত, আমার ক্ষেত, আপনার ক্ষেত। তার হাতে ক্ষমতা আছে। তবে গ্রামের দুই মাথা এক, তো তার ক্ষমতা কি? যাই হোক, ঢিলে পড়া সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই হলে খারাপ হয় না বড় ফুপু।

জয়তুন তার স্বভাবমতো খিকখিক করে হাসলো। আজিজের ইশারা কোন দিকে তার বুঝতে অসুবিধে হলো না। সে হেসে’ই হাক ছেড়ে বললো, — আম্বিয়া কই গেছিস রে, পানের পাতা আন। কখন খেয়েছি, মুখটা আনচান করে।

সন্ধ্যার আযান কানে যেতেই পৃথিলা মাথায় ঘোমটা টানলো। টেনে হাত ঘড়িটার দিকে তাকালো। তার কিছু টুকটাক কেনাকাটা ছিল। কিছু বই, খাতা। প্রথম ছাত্র- ছাত্রীদের পড়াচ্ছে। তার নিজেরও একটু প্রস্তুতি আছে।
গ্রামের বাজারে লাইব্রেরি নেই। ছেলে মেয়েরা খাতা – কলম সব মুদি দোকান থেকে কেনে। তাই যে কোন বইয়ের জন্য সদরে’ই যেতে হয়।

স্কুল থেকে সদর কাছে। তাই হেডস্যারের কাছ থেকে লাইব্রেরির ঠিকানা নিয়ে সেখানে গিয়েছিল। গেলে কি হবে, সেই দোকানেও তেমন কিছু নেই। সেখান থেকে ঠিকানা নিয়ে গেলো আরেক দোকানে। আর এই সবের মধ্যে কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে পৃথিলা বুঝতে পারেনি।

তাই ঘোমটা টেনেই ভালো করে বসলো। ভ্যানে বলতে গেলে এখন সে একাই। লোকাল ভ্যান, বলতে গেলে দু’তিনজন করে উঠায়। সন্ধ্যা তাই তেমন লোক নেই। তবে পৃথিলার একটু ভয় ভয়’ই করছে। সদর থেকে গ্রামের রাস্তা মোটামুটি ভালোই। আর এই ভালোয় বাসায় ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে যাবে। সেটা সমস্যা না। সাবিহাকে সকালে বলেই বেরিয়েছে। তবে এই ভ্যানওয়ালাকে তার সুবিধার লাগছে না। কেমন জানি! তার মধ্যে কিছুক্ষণ পরপর পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। ভ্যানও চালাচ্ছে কেমন ধীরে ধীরে। যেন ইচ্ছে করেই চাইছে অন্ধকার হোক।

তাই পৃথিলা একটু তাড়া দিয়ে বললো, — ভাই একটু তাড়াতাড়ি করা যাবে। আমার জরুরি একটা কাজ আছে।

— তাড়াতাড়িই তো যাইতেছি। আর কতো যামু। এটা ভ্যান, বড়লোকের চার চাকার গাড়ি তো না।

পৃথিলা বিরক্ত মুখেই বসলো। লোকটা সেধে এসেছিল। ভেবেছিল গ্রামের মানুষ হয়ত। এদিকে যাবে, তাই তাকে জিজ্ঞেস করছে। তবে পৃথিলা বুঝতে পারলো তার ভুল হয়েছে। সেই যে প্রথম দিন কুলি লোকটা বলেছিল। হাতে গোনা কয়েকটা ভ্যান। সন্ধ্যার পরে এখানে, ওখানে পড়ে থাকে। আর তার কাছে সেধে যাওয়া? একা মেয়ে দেখেছে, ব্যস সুযোগ নিয়েছে।

তখনি ভ্যান থেমে গেলো। পৃথিলা কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই ভ্যানের লোকটা এক গাল হেসে বললো, — চেইন পড়ে গেছেগা আফা। আপনি চিন্তা কইরেন না। এই দু’ মিনিটের কাজ।

পৃথিলা শান্ত চোখেই এই ভয়ংকর হাসি দেখলো। সে ভালো করেই জানে, দু’মিনিটে এই চেইন কখনো ঠিক হবে না। এটা একটা ট্রিক্স! এই লোক একা না। আরো লোক আছে। তাদের জন্যই অপেক্ষা।

পৃথিলা চুপচাপ’ই বসে রইল। বসলেও তার গলা শুকিয়ে আসছে, ভেতরটা কাঁপচ্ছে। কিছু করতে গেলেই এই লোক তার আসল চেহেরা দেখাতে শুরু করবে। আল্লাহ! কেউ আসুক। মেয়েদের সবচেয়ে ভয়ংকর মৃত্যু হলো, তার নিশ্বাস শেষ হওয়ার আগে তার সম্মান শেষ হওয়া। এই ভয়ংকর মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করো।

তখনি ধান ক্ষেতের ভেতরে থেকে টর্চের আলো ভেসে এলো। বেশ কয়েকজন লোক এগিয়ে ক্ষেতের আইল ধরে এগিয়ে আসছে। পৃথিলা শরীর ভয়ংকর ভাবে কেঁপে উঠল। সে ভেবেছে এই ভ্যানওয়ালা যাদের জন্য অপেক্ষা করছে তারা। কিন্তু পৃথিলাকে অবাক করে দিয়ে ভ্যানওয়ালা ভ্যান রেখেই দিলো ভো দৌড়।

পৃথিলা হা করে সেই দিকেই তাকিয়ে রইল। তার তাকানোর মাঝেই, সেই যে সুন্দর, মার্জিত, শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো। যার আজও চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। সেই জ্বলজ্বল করা চোখে তাকিয়ে বলছে, — আপনি! এখানে কি করছেন?

পৃথিলা কথার উত্তর দিতে পারলো না। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসলো। ভেতর এখনো কাঁপছে তার।

এরশাদ নিজেই এগিয়ে এলো। তাদের ইটের ভাটার শর্টকাট এটা। তারা প্রায়’ই এদিক দিয়ে’ই আসে। তাই এগিয়ে চিন্তিত ভাবে বললো, — আপনি ঠিক আছেন?

পৃথিলা উপর নিচে হালকা মাথা নাড়ালো! নাড়িয়ে নিজেকে সামলে বললো, — ধন্যবাদ।

এরশাদ সচারচর অবাক হয় না। তবে আজ হলো। হয়ে বললো, — কেন?

— আল্লাহ তার বান্দাদের মাঝে মাঝে সাহায্যের জন্য মানুষের রুপ করে ফেরেশতা পাঠান। আজকে সেই কাজটা আপনি করেছেন, তাই।

এরশাদ হেসে ফেললো! ফেরেশতা আর সে। তাই হেসেই বললো, — সমস্যা কি?

পৃথিলা সব বললো! এরশাদ চুপচাপ’ই শুনলো। এটা আসল ভ্যানওয়ালা না। থাকলে পালাতো না। মিথ্যা বলে কাটানোর চেষ্টা করতো। তার মানে পূর্বপরিকল্পিত কিছু। এরশাদের কিছু বুঝতে বাকি রইল না।

তাই অন্ধকারে পৃথিলা খেয়াল করলো না, এরশাদের চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেছে। সেই শক্ত চোয়ালের কঠিন মুখ নিয়েই একজনকে ভ্যান চালাতে বলে, বাকি সবাইকে চলে যেতে বললো, বলে স্বাভাবিক ভাবে পৃথিলার পাশে পা ঝুলিয়ে উঠে বসলো। বসতে বসতে বললো, — ভয় পেয়েছেন?

পৃথিলা হেসে ফেললো! প্রাণ খোলা হাসি। ইশ! কতোদিন হাসে না। সে হেসেই বললো, — আমার সব সিস্টেম এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ভয়ও! তবে ফিরে আসায় ভালো লাগছে।

এরশাদ পৃথিলার দিকে তাকালো না। তবে হাসির শব্দে ঠিক মোহাচ্ছন্ন হলো। হয়ে বললো, — সেটাতো আসতেই হতো। আসবে, অবশ্যই আসবে, সব কিছু নতুন করে, নতুন ভাবে।

পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো! এরশাদ এবার হাসলো! বুদ্ধিমতি মানুষের সাথে কথা বলে এই এক শান্তি। তারা অল্পতেই অনেক কিছু বুঝে। তাই হেসে’ই তার সাথের লোককে তাড়া দিয়ে বললো, — দুপুরে খাসনিরে ব্যাটা। গায়ের জোর কই?

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here