ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৩১

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩১

জয়তুন ভ্রু উঁচু করে চোখে মুখে কিছুটা বিস্ময় নিয়েই আয়নার দিকে তাকালো। সে দাঁড়িয়ে আছে কাচুমাচু হয়ে। গায়ের কাপড় কুঁচানো, এলোমেলো, চুলের খোঁপাও এলোমেলো। যেন এক ঘূর্ণিঝড় গেছে উপর দিয়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, চোখে চিকচিক করছে পানি। নাকও টানছে কিছুক্ষণ পর পর ।

যতোদূর দেখছে ব্যথা পাইছে তার নাতি। তো এইডার এমন ফুঁলিয়ে ফুঁপিয়ে চোখের পানি আসার মানে ডা কি? তাই সেই বিস্ময় নিয়ে বললো, — তুমিও ব্যথা পাইছো নি?

আয়না দু’পাশে মাথা নাড়লো। জয়তুন বিরক্ত চোখে দেখলো। এর সাথে বিয়ের আলাপের পর থেকে যতো গন্ডগোল শুরু হইছে, আলাউদ্দিন বললো সোনা কপালি।যেই ঘরে যাইবো ঘর আলো হইবো। আলোর কোন লক্ষণ তিনি দেখছেন না। বরং একটার পর একটা কিচ্ছা চলছে তো চলছে। আর এই চলাতে সারেং বাড়ির আলো দূর দূর পর্যন্ত চোখেও ঠেকছে না, ঠেকছে ঘুটঘুটা অন্ধকার।

তাই বিরক্ত মুখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিতেই শাহবাজ মুখ বাঁকিয়ে হাসলো। সে বসে আছে বালতির ঠান্ডা পানিতে হাত ভিজিয়ে। অবশ্য ভালো করেই জানে এই ভেজানোতে কিচ্ছু হবেনা। হাত শেষ! ভালো ভাবেই শেষ। পাকা রেলিং, বাড়ি খেয়েছে শক্ত ভাবেই। তাই ভার হয়ে আসছে। এখন শুধু ভার হলেও কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে টাটানি। তাই মুখ বাঁকিয়ে হেসে বললো, — ব্যথা পাবে কেন রে বুবু? কাঁথার মতো পেঁচিয়ে রাখছি। ঝড় তুফান যা যাওয়ার, তা তো গেলো আমার উপর দিয়ে।

বীণা আয়নার পাশে দাঁড়ানো। আজকাল কোন কিছু তার ভালো লাগে না। তবুও শাহবাজের কথা শুনে কয়েকটা দিন পরে একটু ঠোঁট টিপে হাসলো। আম্বিয়া শাহবাজের পাশেই বসা। বালতিতে সে’ই বলতে গেলে জোর করে হাত ভিজিয়ে রেখেছে। তা না হলে কোন কিছু নিয়ে এই বান্দার মাথা ব্যথা আছে? দেখা যাবে এই হাত নিয়েই দিব্যি পুরো বাড়ি ঘুরছে। তাই শাহবাজের বাহুতে এক থাপ্পড় মেরে বললো, — অন্তত ছোট বোনের তো লেহাজ কর।

শাহবাজ চোখ কপালে তুলে বললো, — সত্য তো সত্যিই! তো লেহাজের হলো টা কি? যা হয়েছে তাই তো বলছি। তাইনা আয়নামতি?

আয়না কিছু বলবে তো ভালো কথা চোখ তুলে তাকালোও না। তবে তার ফুঁপানি আরেকটু বাড়লো। কেন ফুঁপাচ্ছে সে নিজেও জানে না।

নাতিদের জন্য জয়তুনের সাত খুন মাফ। তাই শাহবাজের কথা জয়তুনের কিছুই এলো গেলো না। বরং পা ছড়িয়ে আরাম করে বসতে বসতে বললো, — তোর বউ, কাঁথার মতো ধরবি না লেপের মতো আরামে আদরে নরমে ধরবি সেটা তোর ব্যাপার। তবে ভাত খাস না ছাই খাস। একটা তোশক জামাই বউ মিলে নিতে পারিস না। গড়াগড়ি করে কাহিনী করিস। আবার বড় বড় কথা।

শাহবাজ আগের মতোই হাসলো। যেনো দাদির কথায় দুনিয়ার মজা পেয়েছে। হেসে আয়নার দিকে একবার তাকালো। পড়ে এই মেয়ে আহাম্মক। কোন নড়চড় নেই। শাহবাজের লম্বা, চওয়া শরীরের নিচে শক্ত লাঠির মতো সোজা হয়ে আছে। শাহবাজের তখন হাত বাড়ি খেয়ে ঝিমঝিম করছে, তবুও এই যে খুব কাছে শক্ত মুখটা দেখতে ভালো লাগলো। আর সেই ভালো লাগার মাঝে শক্ত লাঠির মতো পড়ে থেকেই কোন রকম ফিসফিস করে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো, — আমি কিচ্ছু করিনি।

এই রামবলদ মেয়ের কান্ডকারখানায় তার আর এখন রাগ, বিরক্তি আসে না। আসে হাসি! কি করে, কি বলে, কোন ঠিক ঠিকানা নেই। সিঁড়ি ভরা চন্দন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে নিজেই দেখেছে ছাদ থেকে চন্দন কুড়াতে। তাই কি ভাবে পড়েছে না বোঝার কিছু নেই। তাই সেও তার মতো মাথা নাড়িয়ে বলেছে ” ভাগ্যিস কিছু করোনি, তা না হলে এখন আমি অনেক কিছুই করে ফেলতাম। ”

বলেই ঝট করে উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে অবশ্য আয়নার দিকে একবারও তাকায়নি। তাকাতো কি করে, এই রামবলদ মেয়ে জানেও না, গড়াতে গড়াতে কাপড় উঠেছে কোথায়। তাই তখনের কথা মনে করে শাহবাজ এখন হেসে বললো, — বউ নিয়ে গড়াগড়ি করে কাহিনী করাও যেন তেন কথা না।

আম্বিয়া আরো দু’ইটা দিলো হাতে। দিতে দিতে বললো, — হইছে থাম! লাজ লজ্জার বালায় নাই। এখন হাত নিয়ে করবিডা কি সেইটা বল? বাড়িতে দুনিয়ার কাজ। দুইজনতো হাসাপাতাল গিয়া ফেরার নাম নাই। এখন? এই হাত ডাক্তার ছাড়া ঠিক হইবো না।

হাসপাতালের কথা শুনতেই জয়তুন হাসলো! হেসে বললো, — যা ডাক্তোরের কাছে যা। রাত বেশি হইলে আর পাবি না।

শাহবাজ কথা বাড়ালো না। এমনিতেও সে বেরোতো। সারাদিন কাজ ঝামেলায় বেরোনো হয়নি। তাই উঠতেই বীণা বললো, — ছোট ভাই আমিও যাবো।

শাহবাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — কই?

— পৃথিলা আপাকে দেখতে।

শাহবাজ নিজের রুপে ফিরে এলো! এসে তার মতোই বললো, — কোন দরকার নেই। দাদির শরীর ভালো না, চুপচাপ দাদির কাছে থাক।

— আম্বিয়াবু আছে তো। তাড়াছা দেখেই তো চলে আসবো।

— না, মানে না।

বীণার মুখ অন্ধকার হলো। একটা কদমও যদি নিজ ইচ্ছায় ফেলা যায়। তবে সবাইকে অবাক করে জয়তুন বললো, — যা, এই শাহবাজ নিয়ে যা। ও আয়নামতি তুমিও যাবা নাকি?

আয়না হা হয়ে গেলো। এতোক্ষণের ফোঁপানি ফুরুৎ করে গায়েব হয়ে গেলো। বাবারে, সূর্য আজকে কোন দিকে ডুবলো। ধুর! বারো ঝামেলায় সে তো খেয়াল’ই করেনি।

শাহবাজ বিরক্ত মাখা কণ্ঠে বললো, — কোন দরকার?

— আহা যা তো নিয়ে। আজ বাদে কাল যাইবো শ্বশুর বাড়ি। তখন আর কই আবদার রাখবো। মাইয়াগো তো যতো আবদার বাপ ভাইগো কাছে’ই।

শাহবাজ আর কিছু বললো না। নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে বললো, — নৌকায় আছি আমি।

শাহবাজ বেরুতেই বীণাও নিজের রুমের দিকে গেলো। যাওয়ার সময় টেনে আয়নাকেও নিয়ে গেলো। এর যে অবস্থা আগে একে তৈরি করতে হবে। আর যেতেই আম্বিয়া পানির বালতি হাতে নিতে নিতে বললো, — কোথাকার কোন মেয়ে, তার জন্য সবার এতো মাতামাতি। তোমার চোখে বাজে না?

জয়তুন তার চিরচেনা খিক খিক করে হাসলো! হেসে বললো, — দুই দিনের গ্রামের মেহমান। করুক না একটু মাতামাতি। মেহমানদের নিয়ে মাতামাতি না করলে আল্লাহ নারাজ হয় রে আম্বিয়া।

আম্বিয়া মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো। প্রাণের সখা মরছে দু’দিন। দেখো তার মধ্যে’ই শুরু হয়ে গেছে জয়তুনের জয়তুনগিরি।

সন্ধ্যার পরে ফরহাদ আবার এলো। এসে এবারো এরশাদ কে পেলো না। এই ছেলে বসে থাকে কখন? ইটের ভাটায় কাজ পড়েছে, তাই সেখানেই নাকি গেছে। তাই সোজা পৃথিলার কাছে এলো। ছোট চাচা আগের মতোই আছে। তবে সকালের চেয়ে চোখ মুখ আরো শুকনো দেখলো। সে এগিয়ে বললো, — কোন সমস্যা ছোট চাচা?

জাফর বড় একটা শ্বাস ফেললো। আসলে টেনশনে তার হাত পা ঘামছে। এরশাদ এক ফাঁকে হাতে তুলে দিলো। ইমদাদুল কি লিখেছে চিঠিতে! আর পৃথিলাকে খুনি ভাববে কেন? সে এখানে ছিল। তাছাড়া খুন তো করেছে। জাফর আর ভাবতে পারলো না। রক্ত আর স্নেহের মাঝামাঝি পড়ে তার অস্থির লাগছে। আর এতো এতো অস্থিরে চিঠিতো পড়েছে তবে হাতের লেখা খেয়ালও করেনি। তাছাড়া সময় ভেদে মানুষের লেখার ধরণও পরিবর্তন হয়। ইমদাদুলের সাথে বলতে গেলে চিঠি আদান প্রদান হয় অনেকটা সময় পরপর। তাই ধরতেও পারলো না।

পৃথিলা নিজেও খেয়াল করেছে। ক্লান্ত ছিল, তবে দুশ্চিন্তায় না। হঠাৎ করেই কোন টেনশন লোকটাকে জেঁকে ধরেছে। সিধেসাদা মানুষ। মুখাবয়বে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তাই সে একবার মুখ ফুটে জিজ্ঞেস’ই করলো,- কোন সমস্যা হচ্ছে আপনার?

আর সে সব সময়ের মতো’ই স্নেহভরা মুখে হাসলো। হেসে বললো, — তুমি চুপচাপ আরাম করো তো। আমাদের চারিদিকে দুনিয়ার কাজ। কতো নানান ঝামেলা। এসব নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।

পৃথিলা আর ভাবেনি। তাছাড়া ভাববে সেই অবস্থা তার বলতে গেলে নেইও। জ্বর নেই। তবে মাথা সোজা করতে পারছে না। কেমন ঘেন ঘোলা ঘোলা। আর এই কারণে’ই ডাক্তার আজকে আর তাকে ছাড়ার অনুমতি দেয় নি। একেবারে কাল।

পৃথিলা শুনে খুব করে জাফরকে বললো সবাইকে নিয়ে চলে যেতে । নার্স আছে, তাছাড়া সে থাকতে পারবে। এখন তেমন সমস্যাও নেই। এরা শুনলে তো। আর শুনছে না বলে, পৃথিলার অস্বস্তি কিছুতেই কাটছে না। ঋণের বোঝা বাড়ছে। আর এই বোঝা কমাবে কি করে?

জাফর ফরহাদের কথার উত্তর দিলো না। হালকা হাসলো! হেসে পাশের বেডে টেনে বসালো।

ফরহাদ বসলো! বসতেই চিঠির কথা মনে পড়লো। আর পড়তেই ছোট চাচার দুশ্চিন্তার কারণ বুঝতে বাকি রইল না। তাই মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে পৃথিলার দিকে তাকিয়ে বললো, — আপনি ঠিক আছেন?

পৃথিলাও হালকা হেসে বললো, — ভালো।

— এমন বিপজ্জনক জ্বর বাঁধালেন কি করে?

— বুঝতে পারছি না। হয়তো আপনাদের মিঠাপুকুর আমাকে পছন্দ করছে না।

ফরহাদ হাসলো! হেসে বললো, — এমনও হতে পারে অনেক বেশি’ই পছন্দ করে ফেলেছে।

— না, যেখানে পছন্দ শব্দ আছে, সেখানে কষ্ট শব্দটা আসে না।

— ওহ আপনি তো আবার জ্ঞানী মহীয়সী নারী। বলছেন যখন ঠিক’ই হবে।

— আপনি বুঝি না?

ফরহাদ আবারো হাসলো! হাসতেই আয়না, আর বীণা এসে দাঁড়ালো। আয়না স্বাভাবিক তবে বীণা হকচকিয়ে গেলো। সে ভাবেনি ফরহাদ ভাই এখানে থাকবে। জানলে কখনো আসতো না।

ফরহাদ অবশ্য স্বাভাবিক। স্বাভাবিক ভাবেই একবার তাকালো। তাকিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে সাইড হলো।

জাফর হালকা হেসে অবাক মাখা কণ্ঠে’ই বললো, — তোরা এখানে?

বীণা নিজেকে সামলে নিলো। নিয়ে বললো, — ছোট ভাই হাতে ব্যথা পেয়েছে।

বীণার বলতে দেরি, ফরহাদের হাসতে দেরি হয়নি। সে হেসেই বললো, — ছোট চাচা, সারেং বাড়ি এবার ছাড়ো। এই সদরে একটা বাড়ি করে ফেলো। বিশ্বাস করো যেই ভাবে তোমার গোষ্ঠীর মানুষ সিরিয়াল বাই সিরিয়াল আসা শুরু করেছে। এ ছাড়া আর উপায় নেই। একদম নেই।

বীণা কটমটিয়ে তাকালো! ফরহাদ ফিরে দেখলে তো। সে দেখলো আয়নাকে। যে তার সাথেই ঠোঁট টিপে হাসছে। তাই তাকেই বলল,– কি খবর আয়নামতি। সারেং বাড়ির ভাত কেমন লাগছে?

আয়না মুখে কিছু বললো না, তবে আস্তে করে ঘাড় কাত করলো। এই কাতের অর্থ কি ফরহাদ বুঝলো না। তবে হাসলো। হাসলো জাফরও। হেসে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, — শাহবাজ কই?

— হাড়ের ডাক্তারের কাছে গেলো।

জাফর আর কিছু বললো না, এগিয়ে গেলো। পাগল ওইটা। নিশ্চয়’ই মুখ ফুলিয়ে আছে। দাদি ছাড়া এটা কাউকে চেনে না। ফরহাদ নিজেও যাওয়ার জন্য এগুলো। এখানে দাঁড়ালে তার মেজাজ খারাপ ছাড়া কিছুই হবে না।

তবে দাঁড়ালো পৃথিলার কথার। সে বললো, — ফরহাদ সাহেব, বিয়ে কখনো হেলাফেলার জিনিস হয় না। এখানে দু’টো মানুষের সারা জীবনের ব্যাপার।

ফরহাদ ফিরে তাকালো। তাকিয়ে আরেকবার বীণার দিকে তাকালো। চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। সে চোখ ফিরিয়ে বললো, — দুনিয়ার সব কিছুই হেলাফেলা। এই যে আপনি এতো সিরিয়াস হয়ে ভালোবাসলেন, বিয়ে করলেন, সংসার সাজালেন। আপনাদেরও সারা জীবনের ব্যাপার হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে?

পৃথিলা মলিন ভাবে হাসলো! হেসে বললো, — আমার হয়নি বলে অন্য কারো হবে না, এমনতো কথা নেই।

— সত্য, তাই হেলাফেলায়ও সারা জীবনের ব্যাপার হবে না এমন কোনও কথা নেই। হয়ত হবে, আপনার চেয়েও ভালো হবে। তবে আমি তো এই হেলাফেলার বিয়ের জন্য জোর করছি না, এখানে যার যার পরিবারের মানুষ, সেই পরিবারকে যদি কেউ বোঝাতে না পারলে সেই দায় আমার না।

— বুঝলাম, অন্য বাড়ির মেয়ের দায় আপনার না। তবে এই যে হেলাফেলা বিয়ে, এই বিয়ের পরে সেই দায়টা কি নেবেন?

ফারহাদ উত্তর দেয় না। শান্ত চোখে তাকালো। পৃথিলা আগের মতোই হেসে বললো। আমার সিরিয়াস বিয়ে সারা জীবনের ব্যাপার স্যাপার না হলেও। যেই কয়দিনের ছিল আমার সব দায় তার’ই ছিল। আমার ভুল, আমার কষ্ট, আমার স্বপ্ন। কোন কিছুই সে হেলাফেলা করেনি। বরং নিজে আগলে নিয়েছে। দোয়া করি আপনার হেলাফেলার বিয়ে সারা জীবনের হোক। বাপের ঘাড়ে সব দায় ফেলে হলেও হোক।

ফরহাদ এবারো উত্তর দিলো না। উত্তর না দিলেও পৃথিলা সেই প্রথম দিনের মতো শক্ত চোয়াল দেখলো, চোখে আগুন দেখলো। দেখে বললো, — রক্ত মাংসের তৈরি একটা মানুষের বিয়ে করছেন। সে বয়সে ছোট হোক বা বড়। আগে সম্মান করতে শিখুন। আল্লাহ আপনাকে সব কিছু দিয়েছে তবে এই একটা জিনিসের বড়’ই অভাব। হয়তো কোন কারণে। তবে সব মানুষ এক হয় না। এই যে দেখেন আমি কিন্তু দুনিয়ার সব পুরুষকে ঘৃণা করছি না। অথচ মাপার যদি পাল্লা থাকতো আপনার চেয়ে আমার ধোকার পাল্লার ওজন অনেক বেশি হতো।

ফরহাদ মুখ বাঁকিয়ে হাসলো। হেসে এবারো কিছু বললো না। বীণার দিকে আবারো এক পলক তাকালো। তাকিয়ে চলে গেলো। আর বীণা অবাক হয়ে আগের মতোই রইল। ফরহাদ ভাই কারো কাছে ধোকা খেয়েছে নাকি?

পৃথিলা বীণার অবস্থা বুঝলো। বুঝে বললো, — মেয়েদের জীবন, সেটা স্বপ্নের দুনিয়া হোক আর সংসারের। কোনটাই ফুলে বিছানো হয় না। এবড়ো থেবড়ো কাটা যুক্ত। যেই রাস্তায়’ই যাও। ক্ষত বিক্ষত হতে হবেই।

বীণা বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো, — স্বপ্নের জন্য ক্ষত বিক্ষত হলেও কষ্ট লাগে না।

— তা লাগে না। তবে স্বপ্নের সেই ক্ষত বিক্ষত হতে হলে চেষ্টা করতে হয়। তুমি কি কোন চেষ্টা করেছো বীণা?

বীণা উত্তর দেয় না। অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। পৃথিলা সেই অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, — আয়না আর তোমার মাঝে পার্থক্য কি জানো? সে কিন্তু তার জন্য চেষ্টা করেছে, জীবন সম্মান সব বাজি রেখে চেষ্টা করেছে। তবে ভাগ্যের কাছে হেরে গেছে। তবে তুমি বিনা চেষ্টায় হেরে গেছো।

— আমি কি করবো?

— সেটা তোমার ঠিক করতে হবে।

— সেই শক্তি কি আমার আছে?

— স্বপ্নের পেছনে দৌড়াতে হলে শক্তি লাগে না। লাগে ইচ্ছে।

বীণা আর কিছু বলে না। আয়না এগিয়ে বীণার হাত ধরলো। শক্ত করেই ধরলো। সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষকে ঘৃণা করলেও এই মেয়েটাকে আর করে না। তাই তিন প্রান্তের তিনটা মানুষ কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। বলার মতো তো কিছু নেই। তিনজন হলো খোলা বইয়ের তিনটা পৃষ্টা। যার শব্দ গুলো ভিন্ন, তবে শুরু আর শেষ একই মলাটে আবদ্ধ।

সেই বসার মাঝেই কালাম এসে তাদের ডেকে গেলো। রাত হচ্ছে বাড়ি ফিরতে হবে। বীণা চুপচাপই উঠে গেলো। তবে আয়না গেলো না। সে এগিয়ে পৃথিলার বেডের কাছে গেলো। গিয়ে চিন্তিত ভাবে দাঁড়ালো।

পৃথিলা দেখে বললো, — কিছু বলবে আয়না?

আয়না উপর নিচ মাথা নাড়ালো। পৃথিলা হেসে বললো, — কি?

আয়না তার স্বাভাব মতো আস্তে করে বললো, — আপনি এখান থেকে চলে যান আপা।

পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাঁকাতেই আয়না সাবিহাকে জয়তুনের বলা সব কথা বললো। বলতে বলতেই বললো, — সারেং বাড়ির একটা মানুষও ভালো না আপা। এরা নিজেদের জন্য সব করতে পারে। আমাদের তো যাওয়ার জায়গা নেই। আপনার আছে। তাই সময় থাকতে চলে যান। এখানে থাকলে এই বুড়ি আপনাকে ছাড়বে না।

পৃথিলা কিছু বলতে পারলো না। তার নিজেকে নিয়ে চিন্তা নেই। তবে সাবিহার জন্য খারাপ লাগলো। তার জন্য মেয়েটার সাজানো গোছানো দুনিয়া এলোমেলো হচ্ছে। তাই তার শান্ত কণ্ঠে’ই বললো, — ধন্যবাদ আয়না! তুমি না বললে হয়তো আমি বুঝতেও পারতাম না।

— আপনি কষ্ট পেয়েছেন?

— না! বরং এই যে আমার জন্য ভাবছো। এটা জেনে ভালো লাগছে।

— আসি।

— যাও, নিজের খেয়াল রেখো।

আয়না বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে আপন মনে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে একবার যদি একটু দরজার সাইডে তাকাতো। তাহলেই তার অসুর নামের ভাসুরকে ঠিক দেখতো। যে সব সময়ের মতো শান্ত ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। সেই শান্ত ভাবেই পকেট থেকে সিগারেট ঠোঁটে রাখলো।

পৃথিলা চোখ বুঝলো নিজের মতো। মিঠাপুকুরের পাট হয়তো তার জন্য শেষ হলো। আর ঠিক তখনি নাকে সিগারেটের গন্ধ লাগলো। লাগতেই ফট করে তাকালো। তাকিয়ে অবশ্য কাউকে’ই দেখলো না। তবে হাসপাতালের ভেতরে সিগারেট খাওয়ার মতো সাহস একজনেই আছে। সেটা কে বুঝতে তার এক সেকেন্ডও লাগলো না।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here