#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব-৩৩
আয়নার উপর দিয়ে আজকে অনেক চোট গেল। সকাল থেকেই শুধু কাজ আর কাজ। আম্বিয়াবু পড়েছে পিঠা চিড়া নিয়ে। আর এদিকে রান্নাবান্নার সব দায়িত্ব পড়েছে তার ঘাড়ে। রান্না সে পারে, তবে এতো মানুষের আয়োজন কখনো করেনি। তাদের বাড়িতে অল্প কিছু মানুষ, অল্প রান্নাবান্না। তাও বেশিরভাগই বড় মা করতেন। তাই বেগ পেতে হলো। অবশ্য কাটা বাছা থেকে শুরু করে সব কাজ কাজের লোক করেছে। তবুও এতো বড় বড় হাঁড়ি ঘোটা তো কম কথা না।
তাই নেয়ে ঘেমে কান্ত শরীর নিয়ে রুমের দিকে যেতে নিল, তখনই পেছন শাহবাজ ডাকলো, — এই যে সারেং বাড়ির কামুনি বউ।
আয়না সাথে সাথেই মুখ গুঁজে ফেললো। শয়তানটা আজকে বাড়ি থেকে বের হয়নি। বাড়িতেই দুনিয়ার কাজ, তার মধ্যে গলায় হাত ঝুলানো। তাই জয়তুন আরা সোজা বলে দিয়েছে, বাসায় থেকে যেন বাইর হতে না দেখেন। এটা তো আবার দাদির ঝুনঝুনি। যা বলবে, তাই করবে। করুক, সেটা তার সমস্যা না। সমস্যা হলো, তাকে জ্বালিয়ে মারছে। একটা জিনিসও গত রাত থেকে নিজে করছে না। সব তাকে দিয়ে করাচ্ছে। এমনকি সামান্য পানি খাবে, তাও ডেকে ডেকে মাথা ঘোলা করে। আসলে সমস্যা টা কি? দিব্যি হাত নেড়ে চেড়ে সব করছে, কিন্তু কাজের বেলা তার জান খেয়ে ফেলছে।
তাই সে মুখ গুঁজেই ঘুরে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই শাহবাজ দু’ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো! হেসে বললো,– গোসল করবো আমি, বসে আছি। তোমার তো দেখি খবরই নাই।
— আপনি গোসল করবেন, তাতে আমার কী?
শাহবাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। পড়ে অবাক মাখা সুরের নাটক করে বললো, — এখানে আপনি কে?
আয়না উত্তর দিলো না। সে সত্যিই ক্লান্ত। এই যে কোমরটা কেমন টাটিয়ে উঠছে। এখন গা একটু না এলিয়ে দিয়ে ঠুস করে এখানেই না পড়ে যায়।
শাহবাজ এতো কিছু বুঝলে তো! সে তার রঙে বললো, — এটা অন্যায় বউ। ভাসুর, চাচা শ্বশুরের সামনে তুমি। আর একলা পেলে ‘আপনি’। এটাতো আমি মানবো না।
— সেটা তো আপনিও বলেন। একবার তুমি, আপনি, আবার তুই।
— আমার সাথে তোমার তুলনা?
আয়নার গুঁজে থাকা মুখ আরও গুঁজালো। না, তুলনা হবে কেন? জয়তুন আরার নাতি আপনারা। সাত খুন যেখানে মাফ, সেখানে তুমি আপনি কোন গাছের ছাল। তাই গুঁজে’ই বললো, — কি হয়েছে সেটা বলেন। আপনি তুমি আপাতত থাক।
— আচ্ছা থাক, দিলাম ছাড়। সারেং বাড়ির বউ বলে কথা। এখন দশ কথার এক মুদ্দা কথা আপনার প্রাণ প্রিয় স্বামী গোসল করবে, ব্যবস্থা করেন।
আয়না হাল ছাড়লো। প্রাণ প্রিয় স্বামী না, প্রাণ খেকো স্বামী। বলতে বলতে রুমে দিকে গেল। রুম থেকে গামছা, লুঙ্গি নিয়ে গোসলখানায় রাখলো। রেখে এসে বললো, — সব গুছিয়ে দিয়ে এসেছি, যান।
— যান মানে? আমি কেমনে গোসল করবো?
— সব সময় কেমনে করেন?
— সব সময় আর এখন এক হইলো?
আয়না মাথা নাড়লো। নেড়ে তবুও আস্তে করে বললো, — হাতটা একটু সাইড করেই তো পানি ঢালতে পারেন।
— বউ থাকতে আমি কোন দুঃখে সাইড করে পানি ঢালবো। বিয়ের জন্য গায়ে আগুন দিতে গেছো, আর এখন সেবার বেলায় নাই?
আয়না হাত জোড় করলো। করে বললো, — মাফ করো আমায়। আমার অনেক ভুল হয়েছে। আসো, গোসলখানায় আসো।
শাহবাজ ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে এগিয়ে গেল। গিয়ে সোজা গোসলখানায় পা ভাঁজ করে বুকটা টানটান করে বসলো। তার এমন ভাব যা খুশি করো।
আয়না কিছুই করলো না। ক্লান্ত ভাবে সেও সাইডে বসলো। বসে বললো, — একটা কথা বলি?
শাহবাজ সাথে সাথেই আয়নার ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকালো। এতো স্বাভাবিক স্বরে কখনো কথা বলেছে বলে মনে পড়ে না। সব সময় ভয়, আতঙ্ক আর বলার জন্যই বলা। তাই সেও স্বাভাবিক ভাবে বললো, — বলো!
— এসব কেন করছেন?
— শুনতে পারবে?
আয়না মাথা কাত করলো। সেই কাত করা মুখটা শাহবাজ দেখলো। দেখে তার সেই চিরচেনা হাসি হাসলো। হেসে বললো, — ইচ্ছে ইচ্ছে করে আঁচল সরিয়ে কোমর দেখিয়েছো। এখন আমার এই কোমর চাই।
আয়না থমকালো! সাথে এতো লজ্জা পেলো। শয়তানটার কাছ থেকে ভালো কিছুই আশা করা যায় না। তাই সাথে সাথেই উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে ঝট করেই গোসলখানা থেকে চলে গেলো।
শাহবাজ স্বাভাবিক ভাবেই ডান হাতে মগ টেনে নিল। নিয়ে গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে বললো, — যার চোখে ছিল বিষের বান, সেই করলো হৃদয় হান। জিতে গেছোস রে কালনাগিনী। রাম বলদ তো তাই বুঝতে পারছিস না।
দুপুরে খেয়ে জয়তুন কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করেন। না, ঘুম আসেন না। এই বয়সে দুপুরে ঘুমালে রাতে আর চোখের পাতায় ঘুম নামে না। তাই এমনিই একটু আরাম করেন। তবে আজ আর গা এলিয়ে দিলেন না। বসলেন তার রুমের জানালার পাশে। তার রুম নিচের একেবারে সামনে। জানালা খুললেই পুরো উঠান সামনে ভাসে। তাই আজও ভাসলো।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজন চলছে। তিনি সেই আয়োজন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। কাল থেকে হচ্ছিলো সব ঝিমিয়ে। সকালে শুধু এসে হাজির হয়েছে প্যান্ডেলের লোক। তবে এরশাদ ফিরতেই কাজের ধরণ বদলে গেছে। একদিকে যেমন চলছে প্যান্ডেলের কাজ, তেমনি আরেকদিকে চলছে সমান তালে কালকের রান্নার বাবুর্চির আয়োজন। একের পর এক আসছে ভ্যানভর্তি লাকড়ি। তেমনি বসে গেছে বাজার সদাইয়ের হাট। এক হাতে দশ কাজ করার গুণ এই ছেলেটার আছে।
জয়তুন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়েই বসলেন। অনুষ্ঠানটা নিয়ে তিনি চিন্তায় ছিলেন। যাক! ব্যবস্থা হলো তাহলে। দাওয়াত পৌঁছানোর সব দায়িত্ব শাহবাজ করেছে। এখন ভালোয় ভালোয় বাকি সব মিটে গেলেই হলো।
তখনই বীণা এসে দরজায় দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বললো, — ডেকেছো, দাদি?
জয়তুন বীণার দিকে ফিরে তাকালেন। তিন দিনে বিয়ের শোকে বিছানায় লেগে গিয়েছিল। কাল সদর কী গেলো, পুরো হোলই পাল্টে গেলো। এই শোক তো ভালোই, বিয়ের কোন লক্ষণ তিনি দেখলেন না। দেখলেন সেই আগের বীণা। মাথায় গুছিয়ে লম্বা বেনি, গায়ে রঙিন ওড়না, পায়ে সেই পা ঝাপ। কিছুদিন ধরে এই গান সারেং বাড়ির কোণায় বাজে না। তবে আজ সকাল থেকে ঠিক সুর তুলে গাইছে। আর এই গান এতোদিন ভালো লাগলেও, জয়তুনের এখন ভালো লাগলো না। অবশ্য বুঝতেও দিলেন না। বরং হেসে বললেন, — এমন কী রাজকার্য আছে, দরজায় দাঁড়িয়ে তাড়া দেখাস?
বীণা জানে কেন তাকে ডাকা হয়েছে। তাই কোন ঝামেলায় গেলো না। এসে খাটে পা ঝুলিয়ে বসলো। বসে বললো, — তাড়া কোথায় দেখালাম? জিজ্ঞেস করলাম।
— ভালো! তয় আজকাল অনেক কিছুই বুঝি নারে বুবু। তাড়া কী, অভিমান কী? এই যে দেখ, আমার বড় নাতি গাল ফুলিয়ে আছে, সেটাও বুঝি না।
বীণা উত্তর দিলো না। এরশাদ ভাইয়ের সাথে দাদির কী হয়েছে, সে জানে না। তবে উপরে স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভয় করছে। কোন দিন দাদির কথার উপরে যাইনি। আর এখন বলতে গেলে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে।
বীণা কিছু না বললেও জয়তুন বললো, — ফরহাদকে নাকি আইতে কইছোস?
— হুম।
— ক্যা?
— পড়ার জন্য।
— কিসের পড়া?
বীণা উত্তর দিলো না। জয়তুন আবার উঠানের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বললেন, — তোর অনুমতি নিয়েই জয়তুন জবান দিয়েছে। এখন আবার পড়া আসছে কেন?
— আমি তো জবানের খেলাফ করছি না। বিয়ে আমি করবো। তবে পরীক্ষাও দেবো।
জয়তুন হাসলো! তার খিকখিক করা হাসি। হেসে বললো, — আমার বাড়ির বউরে আমি উঠান পেরুতে দেই না। তবে মহাজন বুঝি তার বউকে ঢ্যাং ঢ্যাং করে স্কুলে পাঠাবে?
— না পাঠালে নিষেধ করে দিক। তবে আমি পরীক্ষা দেবো।
জয়তুন আবার বীণার দিকে ফিরে তাকালো। তার চোখ মুখ শান্ত। শান্ত চোখেই তাকিয়ে রইলেন। তখনই আম্বিয়া এলো, তার সাথে কাজের লোক। আর তাদের হাত ভর্তি বীণার বই খাতা।
বীণা দেখেই চমকে উঠলো! উঠে’ই দাদির দিকে তাকালো। জয়তুন অবশ্য তাকালেন না। সে তাকালেন আম্বিয়ার দিকে আর তাকিয়েই বললেন, — সব আগুন দিয়ে জ্বালা। আর হ্যাঁ! মহাজন বাড়ি খবর পাঠা। কাল টুকটাক কথা না, বিয়ের দিন তারিখ হবে।
বীণার চোখে পানি এসে পড়লো। তখনই জাফর উঁকি দিয়ে বললো, — এসব কী রে আম্বিয়া ?
জাফর তার কথা শেষও করতে পারলো না। বীণা দৌড়ে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো। ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বললো, — ও ছোট চাচা, আমি শুধু একটু পড়তে চাই। পৃথিলার আপার মতো। আমাকে একটু পড়তে দাও।
জাফর প্রথমে চমকে গেলো! চমকে সাথে সাথেই নিজেকে সামলে নিলো। এদের সে স্নেহ করেন। বলতে গেলে নিজের সন্তানের মতো’ই করেন। তবে এদের জীবনে জয়তুনের প্রভাব বেশি, অনেক বেশি। তাই কখনো কোন বিষয়ে তেমন ভাবে নাক গলায় না। তবে আজকে প্রথমবার শান্ত ভাবে জয়তুনের উপরে গিয়ে আম্বিয়াকে বললেন, — বই খাতা সব বীণার রুমে নে।
আম্বিয়া জয়তুনের দিকে তাকালো। তাকিয়ে অবশ্য সুবিধা করতে পারলো না। শক্ত, তবে দৃঢ় কণ্ঠে জাফর প্রায় ধমকে বললো, — বললাম না, বীণার রুমে নে।
আম্বিয়া চমকে উঠলো! চমকে অবশ্য আর সময় নষ্ট করলো না। সব আবার সাথে সাথেই নিয়ে গেলো। যেতেই জাফর জয়তুনের দিকে তাকিয়ে বললো, — কালতো আজিজ ভাইয়েরা আসছেই, এবার আমি কথা বলবো।
জয়তুনও তার তেজের সাথে বললো, — আমি মরে গেছি নাকি?
— না! তবে এবার আমাদের সন্তানের সুখের ব্যাপার। নিজেরটা নিয়ে ছিনিমিনি খেললেও সন্তানদের নিয়ে কোন বাবা, চাচাদের পক্ষে সম্ভব না।
— আমি জবান দিছি, জাফর।
— জানি! আপনার জবান আর আমাদের জবান আলাদা কিছু না। আপনার গায়ে কাঁদা উঠা মানেই আমাদের গায়ে উঠা। আম্মা তো আর শুধু মুখে মুখে ডাকি না, মন থেকেই মানি। তাই নিশ্চিন্তে থাকুন।
পৃথিলা তার সেই একটা সুটকেস, আর একটা হ্যান্ডব্যাগ। আগের মতোই গুছিয়ে নিলো। এখান থেকে তার গন্তব্যে কোথায় যাবে, সে জানে না। তবে আগের মতো আর নিজেকে নিঃস্ব লাগছে না। বরং কেন জানি মনে হচ্ছে, চলে গেলেই ভালো। তাছাড়া, জ্বরের কারণে পত্রিকায় আর চোখ রাখা হয়নি। পুলিশ কেন আর কোনো খবর পাঠালো না বুঝতে পারছে না। তাই গিয়ে আগে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করবে? নাকি আসল খুনিকে পেয়ে গেছে? কী জানি! পৃথিলা আর ভাবলো না। উঠে দাঁড়ালো। ইমরান যাবে স্টেশন পর্যন্ত।
তবে সাবিহা বসে বসে কাঁদছে। কত ভরসা করে মেয়েটাকে আসতে বলেছিল! আর হলো কী? তাই বলছে, জাফর চাচাকে একবার সব জানাতে। পৃথিলা রাজি হয়নি। কেননা, সে নিজেও চায় না আর থাকতে। তাই আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী? তবে ইমরান ভাই তার সাইড হয়েই সাবিহাকে বোঝালো। বোঝালো, এটাই ভালো হবে। পৃথিলা আপা শিক্ষিত মানুষ, তার চাকরির অভাব হবে না। বরং এখানে থাকলে ঝামেলা আরো বাড়বে।
তাই সাবিহা আর কথা বাড়ায়নি। তবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঠিক কাঁদছে। সেই কাঁদার মাঝেই পৃথিলা এসে জড়িয়ে ধরলো। ধরে বললো, — তোর ঋণ জীবনেও শোধ হবে না রে। ভালো থাকিস। পৌঁছে চিঠিতে জানাবো।
সাবিহা নিজেও জড়িয়ে ধরলো। ধরে বললো, — তোর মায়ের কাছে যা না একবার পৃথিলা। এবার আর মুখ ফিরিয়ে নেবে না, দেখিস।
পৃথিলা হাসলো! তবে কিছু বললো না। এগিয়ে জুঁইয়ের কপালে চুমু খেলো। খেয়ে আর সময় নষ্ট করলো না। ইমরান ভাই ভ্যান এনেছে, সেই ভ্যানে গিয়ে উঠল।
এই দু’দিনে দেয়ালের কাজ অনেকটাই হয়ে এসেছে। তাই এই মায়াময় বাড়িটা আর ভ্যান থেকে দেখা গেলো না। তবে পৃথিলা তাকিয়ে রইল। সেই তাকানোর মাঝে ইমরানও উঠে বসলো অন্য সাইডে। আর উঠতেই ভ্যান চলতে শুরু করলো। সেই পরিচিত এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা, ধানের ক্ষেত, রাস্তার পাশের গাছগাছালি সব নিজের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আর পৃথিলার ভ্যান এগিয়ে গেলো নিজ ছন্দে।
অবশ্য এই ছন্দের পতন ঘটল মাঝ রাস্তায় এসে। সেই যে একদিন সন্ধ্যায় ধানের ক্ষেত দিয়ে এরশাদ এলো। সেখানে এসে ভ্যান থেমে গেলো। রাস্তার মাঝ বরাবর বিশাল এক গাছের গুড়ি। তার সাইডেই কিছু লোক দাঁড়িয়ে । এই লোকদের ইমরান চেনে। ইটের ভাটার লোক! সারেং বাড়িতে যেমন জয়তুনের লোক তেমনি ইটের ভাটায় শুধু এরশাদ ভাইয়ের লোক। আর এদের ভেতরে কোন দয়া মায়া নেই।
ইমরান দেখেই ঢোক গিললো। পৃথিলা প্রথমে বুঝলো না, তাই ইমরানের দিকে তাকালো। ইমরার নিজেও অসহায় চোখে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — এরা এরশাদ ভাইয়ের লোক।
পৃথিলার কিছু বুঝতে আর বাকি রইল না। আর এও বুঝলো তার আর স্টেশনে যাওয়া হবে না। স্টেশন কেন, কোথাও যাওয়া হবে না। এই লোক তাকে ছাড়বে না। এক ভুলের শাস্তি উপরওয়ালা তাকে আর কতো ভাবে দেবে? তার এক ভুলের ওজন বুঝি এতোই বেশি?
তার চিন্তার মাঝেই লোকগুলো এগিয়ে এলো। এসে স্বাভাবিক ভাবে বললো, — ইমরান ভাই, ভ্যান নিয়ে বাড়িত চলে যান। যাগো নুন খান তাগো থালিতে ছেদ করতে নাই।
ইমরান কি করবে দিশে পেলো না। পৃথিলা সব সময়ের মতোই শান্ত, শান্ত কণ্ঠে বললো, — কি চান আপনারা?
— কিছু চাওয়ার মতো দুঃসাহস আমাদের নাই। তবে আপনি নামেন আপা। আমাদের সাথে যাইতে হবে। বলেই ব্যাগ, সুটকেস হাতে তুলে নিলো।
— আমি যাবো না। মেরে ফেললেও না।
— মারার হুকুম নাইগো আপা। তবে জোরের আছে। তাই চাই না আপনার কোন অসম্মান হোক। ভাই আবার সোজা বলছে কোন বেয়াদবি করা যাবে না। তবে বিশ্বাস করেন, আমারা খুব’ই বেয়াদব লোক। তাই নিজে থেকে গেলে খুব ভালো হয়।
পৃথিলা আগের মতোই বললো, — আপনাদের যা করার করতে পারেন। আমি যাবো না।
— না গেলেও তেমন সমস্যা নাই। তাহলে আপনি বরং ইমরান ভাইয়ের সাথে বাসায় ফিরে যান। আমাদের কাছে থাকার চেয়ে বান্ধবীর বাড়ি থাকা ভালো।
পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। লোকগুলো দাঁত বের করে হেসে বললো, — এতো অবাক হওয়ার তো কিছু নাই আপা। এই গ্রাম থেকে আপনি আর বের হতে পারবেন না। নয় বাড়ি ফিরে যান, নয় আমরা নিয়ে যাবো। এখন যা আপনার ইচ্ছা। তবে তাড়াতাড়ি বললে সুবিধা হয়। গাছের গুড়ি আবার সরিয়ে রাস্তা ফাঁকা করা লাগবে। খাটনি তো কম না। বিশাল গাছের গুড়ি।
— আমি থানায় যাবো।
— সেটাও পারবেন না। আপনার গন্তব্যে এখন শুধু দুটো জায়গায়। এর বাইরে কোথাও পা ফেলতে পারবেন না।
— যদি ফেলি?
— ফলাফল আরো খারাপ হবে আপা। অযথা জেদ করবেন না। মিঠাপুকুরের ভেতরে আপনি কোন কিছুই করতে পারবে না। এরশাদ ভাইয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে আপনার ধারণা নাই। অবশ্য আপনার দোষ দিয়াও লাভ নাই। আসলে কারোই ধারণা নাই।
পৃথিলা আর কিছু বললো না। বলে অবশ্য লাভ আছে বলে মনেও হয় না। সে এরশাদ নামক এক গোলক ধাঁধায় ফেসে গেছে। এখান থেকে মুক্তি পাবে কি করে?
লোকগুলো ব্যাগ সুটকেস আবার ভ্যানে রাখলো। রাখতেই ভ্যান ঘোরানোর ইশারা দিলো। ভ্যানওয়ালা তাড়াতাড়ি ভ্যান ঘোরালো। ঘুরিয়েই এক টান দিলো। পৃথিলা চুপচাপই বসে রইল। ভ্যান আবার বাড়ির সামনে থামতেই পৃথিলা নামলো। তবে ভেতরে গেলো না। গেলো সোজা সারেং বাড়িতে।
সারেং বাড়ির উঠান ভরা মানুষজন। সবাই আড়চোখে দেখলো। পৃথিলা সবার দৃষ্টি এড়িয়ে এগিয়ে গেলো ধীরে ধীরে। আর এই ধীরে ধীরে’ই প্রথম বার সারেং বাড়ির সিঁড়িতে পা রাখলো। রেখে খোলা দরজার সামনে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে দরজায় দু’টো হালকা টোকা দিয়ে বললো, — কেউ আছেন?
জয়তুন ভ্রু কুঁচকে তাকালো! সে মাত্রই বসার ঘরে এসে বসেছে। কণ্ঠ চিনতে অসুবিধা হলো না। তাই ভ্রু কুঁচকেই বললো, — আরে ম্যাডাম দেখি! আসেন, আসেন। শরীর এখন কেমন আপনের?
পৃথিলা কিছু বললো না। ভেতরে এলো। সারেং বাড়ি বাহিরটা যেমন, ভেতরটা আরো ঝলমলে। কোন কমতি কোথাও চোখে পড়বে না। অথচ প্রত্যেকটা মানুষের ভেতর অন্ধকার। তাই ভেতরে আসতেই বললো, — এই ভর দুপুরে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।
— আরে বসো, বসো। জয়তুন এতো সহজে বিরক্ত হয় না। এই কে আছিস ম্যাডামের জন্য শরবত আন।
— তার দরকার নেই। আমি শুধু একটু সাহায্যের জন্য এসেছি।
জয়তুর অবাক হলেন’ই বটে। অবাক হয়ে বললেন, — কিসের সাহায্য?
— ঢাকায় যাওয়ার। আপনার বড় নাতি আমাকে যেতে দিচ্ছে না। বরং মিঠাপুকুরে পুরো আটকে ফেলেছে।
জয়তুন শান্ত চোখে তাকালো। পৃথিলার দৃষ্টিও শান্ত। শান্ত ভাবেই বললো, — আমাকে সাহায্য করুন। এতে আপনার যেমন ভালো, তেমনি আমারও।
চলবে…..

